সাটল আর্ট অফ রিডিং এ ক্লাসিক

৪২৭ পঠিত ... ২১:৫৭, জুন ২৪, ২০২০

 

আমি একসময় ক্লাসিক পড়তে পারতাম না। একদমই না। কেবল মনে হইতো ক্লাসিক বই পড়া আমার দ্বারা  কোনোদিন সম্ভব হবে না। অমন সব ধ্রুপদী গ্রন্থ কেমনে পড়ে ম্যান! ভাবতাম, হয়তো ক্লাসিক পড়া লোকদের ডিএনএ'র স্ট্রাকচারই আলাদা। 

কিন্তু না, আমি থেমে যাই নাই। আমি হতাশ হই নাই। কারণ আমি জানতাম চেষ্টা করলে, কঠোর পরিশ্রম করলে, আমি পারবোই, লক্ষ্যে আমি পৌছাবোই। আই ক্যান উইন। আই নিউ ইট। এখন আমি অনেক ক্লাসিক পড়তে পারি। এমনকি মাঝেমধ্যে এমনও হয় যে আমি একদিনে কয়েকটা ক্লাসিক বই পইড়া ফেলতে পারি। 

বিশ্বাস হইতেছে না তো? 

এ কারণে বন্ধুরা, আজ আপনাদের সাথে শেয়ার করবো কিভাবে একটা ক্লাসিক বই পড়তে হয়। শেখাবো ধ্রুপদী পুস্তক পাঠের সূক্ষ্ম শিল্প। সাটল আর্ট অফ রিডিং এ ক্লাসিক। 

অনেকে মনে করেন কালজয়ী গ্রন্থ পড়া যায় না। কেউ পড়ে না, সবাই পড়ার কথা বলে। ক্লাসিক হইতেছে ড্রয়িংরুমের শেলফে ফালাইয়া রাখার জিনিস। এই ব্যাপারে আমারে নিয়মিত অনেকেই ইনবক্সে নক দেয়। বলে, 'ভাইয়া, ড্রয়িংরুমের শেলফে সাজায়ে রাখার মতো ভালো কিছু ক্লাসিক বইয়ের নাম বলেন। সাইজে মোটা এবং ওজনে বেশি হইলে ভালো হয়।'  

ভুল। বিরাট ভুল। কে এদেরকে বুঝাবে যে কালজয়ী গ্রন্থও কিন্তু ফালায়ে রাখার জিনিস না। বুঝানোর মহৎ কাজটা কেউ করতেছে এমনটা আমার চোখে পড়ে নাই। এই মহতী দায়িত্ব তাই আজ আমি নিজের কান্ধে তুলে নিলাম।    

শুরুতেই একটা সতর্কবাণী দিয়া নিতে চাই। 

ক্লাসিক বই পড়া কিন্তু  অতো সহজ না ভায়া। অনেকে-বোকা লোকজন-ভাবতে পারে ক্লাসিক পড়া খুব সোজা- জলবৎ তরলং। জীবনে আমি অনেক ক্লাসিক পড়ছি। জীবন থেকে নেয়া অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কইতে পারি, ইউ হ্যাফটা ডু দ্য হার্ড ওয়ার্ক। ম্যান, ইউ হ্যাফটা ডিল উইথ ইট৷ কেষ্টর দেখা কি আর কষ্ট ছাড়া মেলে? 

প্রথমে বইয়ের দোকানে গিয়া একটা কালজয়ী বই কিনেন। হাত দিয়া স্পর্শ করেন কালজয়ী বইটার পৃষ্ঠা। ভাবেন কালের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ অক্ষরমালার উপরে আপনি হাত রাখছেন, আপনার রক্তমাংসের আঙুল ছুঁয়ে দিতেছে অজর অমর অক্ষয় অক্ষরসমূহ। চোখ বন্ধ করে শিহরণ অনুভব করেন।     

লকডাউনের কারণে বাসার বাইরে বের হইতে না পারলে বা দোকানে যাইতে না পারলে এই লেখার সাথে সংযুক্ত লিংকে ক্লিক করে অনলাইনে অর্ডার করে ফেলুন কালজয়ী বইটা। আপনি পড়বেন কালজয়ী পুস্তক, আমি পাবো ছোট্ট একটু কমিশন। ক্ষতি কী? উইন-উইন ব্যবস্থা।   

বই সংগ্রহ হয়া গেলেই হুটহাট পড়তে শুরু করবেন না। ফেসবুকে বইটার ব্যাপারে স্ট্যাটাস আপডেট করেন: 'জাস্ট বট অমুক বাই তমুক। কারও পড়া থাকলে জানাবেন কেমন লেগেছে।' বইটার ব্যাপারে আপনার লিস্টের বন্ধুদের অধিকাংশের মনোভাব বুঝতে এই পোস্ট অত্যন্ত কার্যকরী। বইটা নিয়া আপনার পরবর্তী কার্যক্রমের অনেক কিছু এই মনোভাব দিয়া প্রভাবিত হবে। 

যেহেতু বইটা কালজয়ী, বইয়ের বিভিন্ন উক্তি বা সুন্দর বাক্য আপনি ইন্টারনেটেও পেয়ে যাবেন। সেগুলো খুজে বের করেন দুই মিনিটে। সেখান থেকে বাছাই উদ্ধৃতি শেয়ার করেন ফেসবুকে বা ইন্সটাগ্রামে৷ সাথে বইটার একটা এইচডি ছবি শেয়ার করবেন। ছবির প্রসঙ্গে একটি কথা না বললেই নয়। ছবি তোলার সময় বইটার পাশে ধোয়া ওঠা এক কাপ কফি এবং সাদা ইয়ারফোন রাখতে ভুলবেন না কিন্তু। 

বই সিলেকশনের ক্ষেত্রে আরেকটা বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে বলবো। খেয়াল রাখবেন, ক্লাসিক বইটার প্রচ্ছদ যেন  অবশ্যই ইন্সটাগ্রাম-ফ্রেন্ডলি হয়। ভাইব্রান্ট কালারের সুন্দর ফন্টের সৃজনশীল প্রচ্ছদ দেখে বাছাই করবেন কালজয়ী বইটি। এমন প্রচ্ছদ একান্তই যদি না পান সেক্ষেত্রে ছবি তোলা শেষে সেপিয়া এডিট করার সময় সেপিয়া ফিল্টার ইউজ করবেন। সেপিয়া এক ধরণের ভিন্টেজ ভাইব এনে দেবে। 

কালজয়ী গ্রন্থটির প্রথম অনুচ্ছেদটা মন দিয়ে পড়বেন। বইটার শেষ অনুচ্ছেদও। খুব সম্ভব সুন্দর, পাঞ্চি বা ক্যাচি বাক্য পেয়ে যাবেন। কারণ লেখকেরা বইয়ের প্রথম প্যারাগ্রাফ, বিশেষত প্রথম বাক্যটা লিখতে অসম্ভব পরিশ্রম করেন। পাঠককে প্রথম একটা দুইটা বাক্যে হুক করতে হয় তাদের। শেষ প্যারাগ্রাফেও গুডবাই কিসের মতো সুন্দর বাক্য লেখেন ক্লাসিক লেখকেরা। প্রথম বা শেষ থেকে আপনি কিছু অংশের ছবি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন। নেট থেকে কুড়ানো কোটেশনের চাইতে বই থেকে ছবি তুলে দিলে আপনার প্রতি বন্ধুদের ট্রাস্ট বাড়বে।  

আপনি চাইলে কালজয়ী বইটার একটা সংক্ষিপ্ত রিভিউও কইরা ফেলতে পারেন। তাতে লোকে বিশ্বাস করবে যে বইটা আসলেই আপনি পড়ছেন। 

কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় এইটারে ভুলে রিভিউ বলবেন না। বলতে হবে পাঠ-প্রতিক্রিয়া। একজন রিভিউ ভেটেরান হিসাবে আমি জানি সেইম টেক্সট রিভিউ বইলা পোস্ট করলে যত লাইক পড়ে পাঠ-প্রতিক্রিয়া বইলা পোস্ট করলে তার চাইতে বেশি লাইক পড়ে। কেন? আমাকে জিগাইবেন না। মানবমনের গতিপ্রকৃতি কে কবে বুঝছে ঠিকঠাক? 

আরেকটা পিস ছোট্ট সাজেশন দেবো। বইটা পাঠ না করেই কিন্তু আপনি যেকোনো বইয়ের রিভিউ করতে পারেন। আর আমারে যদি বিশ্বাস করেন, আরেক পিস প্যারাডক্সিক্যাল ট্রুথ আমি আপনার সাথে শেয়ার করবো৷ সেইটা হইতেছে, বই না পইড়া করা রিভিউ পইড়া করা রিভিউর চাইতে অনেক ভালো হয়।  

কেন বলেন তো?

সিম্পল। আপনি বইটার কষ্টসাধ্য পাঠের শেষে নিজের মতো করে ইন্টারপ্রেট তথা তাফসির বা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে যাবেন। বইয়ের বিভিন্ন অংশ বা চরিত্রের নিজস্ব অর্থ বের করবেন। অথচ বই না পইড়া ইন্টারনেটে  ক্লাসিকটার ব্যাপারে অনেক লোকের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দেখে সেখান থেকে পছন্দসই জিনিসগুলা নিজের বলে চালায়ে দেবেন। এবার আমাকে বলেন, এক মাথায় ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ভালো হবে নাকি অনেক মাথার? এইজন্যেই ভালো ভালো রিভিউ থুক্কু পাঠ-প্রতিক্রিয়া লিখলে বই না পড়েই লিখি। 

ইন্টারনেটে সার্চ করেন দেখেন। কালজয়ী গ্রন্থটি থেকে ফিল্ম বা সিরিজ বা নাটক হইছে কিনা। হয়া থাকলে দেখতেও পারেন,  আবার নাও পারেন। আপনার মর্জি। কিন্তু অবশ্যই আরেকটা পোস্ট দিন সোশ্যাল মিডিয়ায়: '(ক্লাসিক বইয়ের নাম) -এর বেজ করা বানানো মুভি/নাটক অসাধারণ এই বইয়ের নামের প্রতি সুবিচার করতে পারে নি। হ্যা, আমি জানি বই এবং ফিল্ম দুটি ভিন্ন মিডিয়াম, তবুও বলবো এরকম একটি ধ্রুপদী বইয়ের নামের সঙ্গে সুবিচার হয় নি।'

তখন আপনি আর আট-দশজন  বুকিশ লোকের মতো জাস্ট শখের পাঠক না, আপনি একজন সংস্কৃতিমনা লোক, শিল্পসাহিত্যের ব্যাপারে যার নিজস্ব মতামত আছে। শিল্পসাহিত্যের ভালোমন্দ সে বোঝে, ক্রিটিক অর্থাৎ পর্যালোচনা করা যোগ্যতা রাখে। 

তো, আজ এ পর্যন্তই। আবার শিঘ্রই আপনাদের সাথে দেখা হবে। বিদায় নেয়ার আগে একটা কথাই বলবো।

ক্লাসিক পড়েন, জাতে ওঠেন।

৪২৭ পঠিত ... ২১:৫৭, জুন ২৪, ২০২০

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top