শাক দিয়ে মাছ ঢাকা শাস্ত্র: একটি উত্তরাধুনিক পাঠ

২৩৫৬ পঠিত ... ১৯:১৪, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২১

গ্রীক সমালোচনা শাস্ত্রের জনক ডায়োজিনেস অবিরাম শাসকের সমালোচনা করতেন; আর ক্ষিদে পেলে শাক দিয়ে রুটি খেতেন। একদিন শাসকের এক রাজবদর এই শাকাহার দৃশ্য অবলোকন করে বলেন, হে পণ্ডিত; আপনি সারাক্ষণ শাসকের সমালোচনা না করে; একটু প্রশংসা করতে যদি শিখতেন; তাহলে তো বেশ মাছ দিয়ে রুটি খেতে পারতেন। সমালোচনার বদ-অভ্যাসের কারণে রোজ রোজ শাক খেতে হয় আপনাকে।

shak mach-min

ডায়োজিনেস ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, আপনি যদি একটু শাক খাওয়ার অভ্যাস করতেন; তাহলে আপনাকে এই রোজ রোজ 'শাক দিয়ে মাছ ঢাকা'র রাজবদর পেশায় থাকতে হতো না।

'শাক দিয়ে মাছ ঢাকা'র কলাকৈবল্য পৃথিবীর সব শাসকের রাজবদরদের শিখতে হয়েছিলো। কিন্তু সাফল্য পেয়েছেন খুব কম শাসকই। শাকের চেয়ে মাছের আকার বড় হয়ে যাওয়ায়; বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মাছ বেরিয়ে যাওয়ায় শাসকেরা যুগে যুগে ব্যর্থ হয়েছেন; আর 'শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে' ব্যর্থ রাজবদরেরা নিক্ষিপ্ত হয়েছেন ইতিহাসের অন্ধকার আস্তাকুঁড়ে।

চীনের শাসক মাও সে তুং; মাছ নিয়ে জনগণের এই কৌতুহল আর রোজ রোজ শাক খুঁজে তা দিয়ে মাছ ঢাকার পরিসমাপ্তি ঘটাতে বলেছিলেন, হে জনগণ আমি তোমাদের রোজ রোজ মাছ দিতে পারবো না; কিন্তু কী করে মাছ ধরতে হয়; তা শেখাবো। এই ডাকে সাড়া দিয়ে রাজবদরেরা মাছ ধরা শিখলেও; জনগণ আরো ভালো করে শাক খেয়ে তুষ্ট থাকতে শিখে ফেলে। রাজবদরের আর 'শাক দিয়ে মাছ ঢাকা'র প্রয়োজন পড়ে না। মাওয়ের একদলীয় বিপ্লবের পলিটবুড়োরা বেড়ালের মতো কুট কুট করে মাছ খেতে থাকে। আর জনগণ রোজ রোজ শাক খাওয়াকেই দেশপ্রেমের সূচক বলে শিখে নেয়। কেউ যদি ভুল করে রাজবদর পলিটবুড়োর মাছের দিকে চোখ দেয়; তাকে তখন রাষ্ট্রদ্রোহীর তকমা দিয়ে কারাগারে নিয়মিত শাক খেতে বাধ্য করা হয়।

রাশিয়ার শাসক জোসেফ স্ট্যালিন, গণতন্ত্র ও নির্বাচনের মাছকে শাক দিয়ে ঢাকতে বলেছিলেন, জনগণের জন্য এটা জানাই যথেষ্ট যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে; ফলাফলের মাছ শাক দিয়ে ঢাকার দায়িত্ব নির্বাচনী কর্মকর্তাদের। এই স্ট্যালিনীয় 'শাক দিয়ে মাছ ঢাকা'র ডকট্রিনের বরপুত্র ভ্লাদিমির পুটিন শাকের পরোয়া আর করেন না। গণতন্ত্রের মাছের মুড়োটা বা লেজটা দেখা গেলে ক্ষতি কী। লেটুস পাতা দিয়ে মাছের পেটের জায়গাটা একটু ঢাকা থাকাই যথেষ্ট বলে মনে করেন।

জার্মানির শাসক হিটলার উগ্রজাতীয়তাদের শাক দিয়ে স্বৈরাচারের মাছ ঢেকে রাখার কার্যকর কৌশলের সন্ধান পান তার তথ্য মন্ত্রী ও খ্যাতিমান রাজবদর গোয়েবলসের মাধ্যমে। গোয়েবলস বলেন, মাননীয়, শাক দিয়ে মাছ ঢাকা লাগবে কেন; আপনার প্লেটে কোন মাছ নেই; মাছ ব্যাপারটা দেশদ্রোহীদের সৃষ্টি; এই কথাটা একশোবার আমাদের আল-বাতাবি মিডিয়ায় প্রচার করলেই; জনগণ বিশ্বাস করবে, আপনার প্লেটে কোন মাছ নেই। শাকের পরোয়া আমরা করিনা মাননীয়।

পাকিস্তানের শাসক ইয়াহিয়া; তার রাজবদর ভুট্টোর কাছে সন্ধান পান গোয়েবলসের এই আল-বাতাবি মিডিয়া কৌশলের। কিন্তু সমস্যা দাঁড়ায় শাক ও মাছ নিয়ে। ইয়াহিয়া ভুট্টোকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, মাছ ও শাক আবার কী! আমি তো চিনি শুধু গরু আর এলকোহল। ভুট্টো আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে বলেন, আপনি গরু আর এলকোহল খেতে থাকেন। আমি শাক আর মাছের সূত্রটা দেখছি। আল-বাতাবি মিডিয়ায় একশোবার বলে দিচ্ছি, কোথাও কোন মাছ নেই; তাই শাকের প্রয়োজন কী!

বৃটিশ রাজনীতিক উইনস্টোন চার্চিল ভারতীয় উপনিবেশের রাজবদর মাউন্ট ব্যাটেনকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ভারতীয় উপনিবেশ থেকে এতো বড় মাছ; শাক দিয়ে ঢেকে আনতে কী পারবে তুমি! মাউন্টব্যাটেন বলেছিলেন, ও নিয়ে ভাববেন না; ভারতীয় উপমহাদেশ হচ্ছে 'শাক দিয়ে মাছ ঢাকা'র পীঠস্থান। নেটিভরাই ধামায় করে এতো শাক নিয়ে আসবে; যে আমরা নিরাপদে মাছ নিয়ে লন্ডনে চলে আসবো। ওরা তখন শাক নিয়ে শোক করে 'যন্ত্র ঐ একটাই-ষড়যন্ত্র" কান্দন দিয়ে বাকি জীবন কাটিয়ে দেবে। সেখানকার শাক শাস্ত্র ধন্বন্তরী; 'কামাসূত্র' আর 'শাক দিয়ে মাছ ঢাকা' সূত্র; এই দুটিই তো ওদের সর্বশ্রেষ্ঠ উদ্ভাবন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতিদিনই 'শাক দিয়ে মাছ ঢাকা' শেখানো হয়। আগামীতে ঐসব পণ্ডিতদেরকে বৃটেনে নিয়ে এলে; ঝুম ঝুম বাজনদার গোত্রের রাজবদরের অভাব হবে না; আমাদের গণতন্ত্রে।

এরপর ভারতে অসাম্প্রদায়িকতার শাক দিয়ে সাম্প্রদায়িকতার মাছ ঢাকার কলাকৈবল্য বিকশিত হয়। পাকিস্তানে 'মসজিদে'র শাক দিয়ে "মিলিটারি'-র মাছ ঢেকে রাখার কৌশল প্রবাদপ্রতিম সাফল্য লাভ করে।
আর বাংলাদেশে 'শাক দিয়ে মাছ ঢাকা' এক নান্দনিক শিল্প হিসেবে বিকশিত হয়।

বাংলাদেশ মাছের দেশ-ভাতের দেশ-নানা রঙের শাকের দেশ। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে 'শাক দিয়ে মাছ ঢাকা' নিয়ে নিরন্তর গবেষণা হয়। এমনকী কারো গবেষণা নকল করে কেউ ধরা পড়ে গেলে; শাক দিয়ে সে "নকলের মাছ" ঢাকারও ব্যবস্থা হয়।

এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে পাশ করে আসা ছাত্ররা, আল-বাতাবি মিডিয়ার সাফল্যধারাকে মাকামে মাহমুদে পৌঁছে দেয়। টকশোগুলোতে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার এমন ধ্রুপদী শিল্পকলা প্রদর্শিত হয়; যেন মনে হয়, ইলিশ মাছ ও পালং শাকের যুগলবন্দী চলছে।

লোক প্রশাসন কেন্দ্রে প্রতি বৃহস্পতিবার দুপুরের আহারে 'কাঁটাচামচ দিয়ে শাক তুলে; রুই মাছের পেটি ঢাকা' শেখান দেশের বরেণ্য রিসোর্স পারসনেরা। ফলে সচিবালয়ে ফিরে শাক দিয়ে মাছ ঢাকা ওয়ান টু'র ব্যাপার হয়ে যায় সুশীল সেবকদের জন্য।

পুলিশ একাডেমিতে পদ্মা নদী থেকে তাজা ইলিশ তুলে তা পদ্মা পাড়ের ঢোল কলমি শাক দিয়ে ঢেকে ফেলা শেখানো হয়। ফলে 'হৃদয় পরিচ্ছন্ন করা' কিংবা 'মাদক দমন অভিযানে' মাছ শিকার করে ঢোল কলমি শাক দিয়ে দ্রুততার সঙ্গে ঢেকে ফেলে বিশ্ব রেকর্ড করে ফেলে পুলিশেরা।

চট্টগ্রামের ভাটিয়ারিতে মিলিটারি ট্রেনিং একাডেমিতে সামুদ্রিক মাছ; সমুদ্রের শৈবাল-লতা-গুল্ম শাক দিয়ে ঢাকার অনবদ্য প্রশিক্ষণ হয়।

বিদেশের 'যন্ত্র ঐ একটাই ষড়যন্ত্রী' মিডিয়া কোন মাছের সামান্যচিত্র প্রদর্শন মাত্র; শাক-শিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক বীণার সুরযন্ত্রে ঝংকার ওঠে।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক শাক মাথা দুলিয়ে 'ও তো মাছ নয়; মাছের আলেয়া' বলে সমস্বরে ঐকতান তোলে। আল-বাতাবির অনুসন্ধানী শাক শিল্পীরা আঁটি আঁটি শাক এনে "বারান্দায় রোদ্দুর; তবু মাছের দেখা নাইরে" বলে গান ধরে।

বিশিষ্ট শাক জনেরা, শাকান্নে মাছভ্রমের প্রতিবাদে বিবৃতি দেন। কে পাবে এ বছরের শাক পদক; সেই উত্তেজনায় কাঁপতে থাকে; শাক্যমুনিরা।

মাছ ঢাকতে ঢাকতে বাজার শাক শূন্য হয়ে পড়ে। বিদেশ থেকে শাক আমদানির প্রয়োজন অনুভূত হয়। দ্রুত শাক-চাষ প্রশিক্ষণে বিদেশে প্রেরণ করা হয় সুশীল সেবকদের।

শাকের ইতিহাস নিয়ে 'কলাম' লিখতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন ইতিহাস রচনার বন্দনা ও রঞ্জনারা।

শাক আইন বিশেষজ্ঞরা আদালতে হাজির হয়ে, মাছের দর্শকদের বিরুদ্ধে মামলা করে দেয়। "মাছ নেই তবু মাছ দেখেছি বলে যারা চেঁচিয়েছে" তাদের কেন দেশের প্রচলিত আইনে বিচার হবেনা।

বিচার চাই বিচার চাই রব তোলে পাঠ্য-পুস্তকের শাকের ছবিগুলো। তারা আশ্বাস দেয়, যতক্ষণ বাজারে নতুন শাক না আসছে; ততক্ষণ আমরাই মাথা দুলিয়ে শাকের অভাব পূরণ করবো। জাতির প্রয়োজনের সময়ে, আমরা শাকেরা শুধুই পটে আঁকা ছবি হয়ে আর থাকি কেমন করে।

যুক্তরাষ্ট্রের বুদ্ধিজীবী নোয়াম চমস্কি তার 'নেসেসারি ইলিউশান' গ্রন্থটি ফায়ার প্লেসে ফেলে পুড়িয়ে দেন। সিদ্ধান্ত নেন, এবার তিনি শাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবেন। 'শাক দিয়ে মাছ ঢাকা'র উত্তরাধুনিক বিদ্যা অর্জন না করে; নেসেসারি ইলিউশান গ্রন্থটি লেখা ভুল হয়েছিলো; এই অনুতাপে শাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিপরীক্ষা কবে সেই খোঁজ খবর নিতে শুরু করেন।

২৩৫৬ পঠিত ... ১৯:১৪, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২১

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top