এক মুঠো ভাতের দাবিতে নরসিংদীর পাটকল শ্রমিকের অনশনের একদিন

৮৯৪ পঠিত ... ১৪:০৮, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৯

নরসিংদীর পাটকল শ্রমিকেরা 'এক মুঠো ভাতে'র জন্য অনশনে যায়। হাড় কাঁপানো শীতে পাটকলের গেটের সামনে রাত জেগে তাদের দাবির উষ্ণতায় অপেক্ষা করে। বড় কোন দাবি নয়; পরিবার-পরিজন নিয়ে সামান্য 'এক মুঠো ভাতে'র দাবি।

পাটকলের সামনে পাতলা একটা কাঁথা মুড়ি দিয়ে জেগে থাকতে থাকতে পাটকল শ্রমিক মোকসেদ স্বপ্ন দেখে। গরম ভাতের স্বপ্ন; বউ ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে ধোয়া ওঠা ভাত খাওয়ার আনন্দময় স্বপ্নে মোকসেদ জিভ নাড়তে থাকে।

তাকে ধাক্কা দিয়ে তোলে বিষ্ণু। একটা ঠোঙ্গায় করে মুড়ি এনেছে সে।
'এ মুকসেদ মুড়ি মুখে দে; আমি জল আনতেছি।'

ধড়মড় করে স্বপ্ন থেকে জেগে ক্ষুধার্ত মোকসেদের কাছে অমৃতের মতো লাগে। বিষ্ণু হাসতে হাসতে বলে, একজন মন্ত্রী কইছেন শুনলাম, আমগো উপার্জন ৬ হাজার ডলার হওনের আগেই আমগো পেত্যেকের গাড়ি হইবো।

মোকসেদ পানিটুকু খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। আবার এক স্বপ্নের খপ্পরে পড়ে যায় সে। দেখে, সে একটা গাড়ি চালাচ্ছে। গাড়ির অন্যান্য সিটে হাসি হাসি মুখে বসে বাচ্চারা। চকিতে গাড়িটা অদৃশ্য ডানায় আকাশে উড়তে থাকে। বাচ্চারা মেঘ স্পর্শ করে আনন্দে আর্তনাদ করতে থাকে।

বিষ্ণুর ধাক্কায় আবার ঘুম ভাঙ্গে। সে ল্যাম্প পোস্টের আলোয় পত্রিকা পড়ছে। খিল খিল করে হাসতে হাসতে বলে, 'স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কইতেছেন, পুলিশ এখন প্রশংসার যোগ্য কাজ করতেছে।'

মোকসেদ আবার ফিরে যায় স্বপ্নে। মেঘের মাঝে গাড়ি চালাতে চালাতে এক মেঘপুলিশ হাত নেড়ে বলে, 'মেঘের রাজ্যে আপনাকে স্বাগত জানাই।'

আবার বিষ্ণু ধাক্কা দিয়ে জাগায়, 'ও মোকসেদ আর চিন্তা নাইরে। পোরবিরধি হইলো গিয়ে ৮ শতাংশের বেশি। একজন সরকারি নেতা বলতেছেন ২০৪১ পর্যন্ত অপেক্ষা করার দরকার নাই। অনেক আগেই এইটা ইউরোপ এমিরিকা হইয়া যাইবো।'

মোকসেদ স্বপ্নে গাড়ি থেকে নেমে পাটকলের গেটে নেমে দেখে সাদা-সাহেবেরা লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে। কারখানার ম্যানেজার মোকসেদকে ডেকে বলে, তুমি অভিজ্ঞ শ্রমিক। ইউরোপ-এমিরিকা থেকে আসা এই শ্রমিকদের ইন্টারভিউ করে যাদের ভালো লাগবে নিয়ে নাও; বাকিদের বিদায় করে দেও। অদূরে বিষ্ণুকে দেখে সাদা শ্রমিকদের ইন্টারভিউ নিতে।

এক সাংবাদিককে পাটকল শ্রমিকদের অনশনের খবর সংগ্রহ করতে দেখে বিষ্ণু জিজ্ঞেস করে, 'ও ভাই ক্যামেরা আনেন নাই!'

সাংবাদিক বিষ্ণুর দিকে তাকিয়ে বলে, 'টিভি-মামারা বড় বড় খবর নিয়া ব্যস্ত। ভারতে নাগরিকত্ব বিল সংশোধনের খবরটা মিডিয়া কাঁপাইয়া দিছে।'

বিষ্ণু অবাক হয়ে বলে, 'আমরা এতোগুলি মানুষ এইখানে শীতের মইধ্যে কষ্ট করতেছি; আ্মগো তো ভাতের দাবি; এই চাইতে কী ভারতের খবর বেশি বড় হইলো আপনেগো কাছে!'

সাংবাদিক অসহায়ভাবে বলে, 'আমি কী করবো কও! আমার দৌড় তো পত্রিকার মফস্বল ডেস্ক পর্যন্ত।'

বিষ্ণু প্রস্তাব দেয়, 'এই যে শীতের রাইতে এইখানে শ্রমিকেরা গুটিসুটি মাইরা শুইয়া আছে; এর একটা ভিডিও ফেসবুকে ছাড়েন; সেইডাতো আপনের হাতে।'

: লাভ নাই। ফেসবুকে খালি চর্বিওয়ালা লোকগো বড় বড় ঢঙয়ের আলাপ। হাইকোর্ট রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে 'জয় বাংলা' শ্লোগান বাধ্যতামূলক কইরা দেওয়ায় বিরাট দেশপ্রেমিকেরা খুশি, বিশাল ধর্ম প্রেমিকেরা 'ন ডরাই' ফিলিমডা বাতিলের কোর্টের অর্ডারে খুশিতে বাক-বাকুম। ফেসবুকে খালি দেশপ্রেম-অনুভূতি আর ধর্মপ্রেম-অনুভূতি; সেইখানে তোমাগো কষ্টের কথা শোনার টাইম কারো নাই।

বিষ্ণু বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করে, 'ভাই অনুভূতি কী!'
: এই যে ক্ষিদা লাগলে তোমার পেট মোচড় দেয়; এইডা ক্ষিদার অনুভূতি।
: ফেসবুকের লোকেগো কী ক্ষিদা লাগে না?
: আরে নাহ, তাগো দেশের জন্য প্রাণ মোচড় দেয়, ধর্মের জন্য দিল মোচড় দেয়।
: এতো যে দেশের জন্যি পরান মুচড়াইতাছে; ধর্মের জন্যি দিল মুচড়াইতাছে; এতোই যে খাঁটি মুচড়ামুচড়ি; তাতে ঘুষ খাওয়া-চুরি দারি তো কমলো না।
: দেশের জন্যি প্রাণ মুচড়াইলে দেশে দালান তোলা যায়; অনেকে বিদেশে দালান কিনে; ধর্মের জন্য দিল মুচড়াইলে সরকার খাস জমি ও টেকাটুকা দেয়। এই দুইডা হইতেছে সবচাইতে বড়ো প্রফিটের মুচড়া-মুচড়ি।

ছোট্ট একটা মেয়ে হাতে একটা কাঁথা নিয়ে এসে ঘুমন্ত মোকসেদের পাশে শুয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে বলে,
'আব্বু তুমি রাস্তায় ঘুমাইতেছো কেন!'
বাচ্চাটা মোকসেদের চোখের পাশে শুকিয়ে যাওয়া অশ্রু ছোট আঙ্গুল বুলিয়ে স্পর্শ করে কান্নাস্বরে জিজ্ঞেস করে, 'আব্বু তুমি কান্না করতেছো কেন!'

৮৯৪ পঠিত ... ১৪:০৮, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৯

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top