৭১% বিষণ্ণতার শহরে যখন নেয়া হলো সরকারি 'হাসিখুশি প্রকল্প'

১৪৭৮ পঠিত ... ১৯:৫৯, ডিসেম্বর ০৩, ২০১৯

'ঢাকার ৭১ শতাংশ মানুষ বিষণ্ণ'-এই খবরটা ঢাকার মানুষকে বিচলিত করে।বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) বার্ষিক গবেষণায় বলা হয়েছে, চলতি বছরের জুন-জুলাই মাসে ঢাকা শহরের ১২ হাজার ৪৬৮ মানুষের ওপর একটি সমীক্ষা চালানো হয়। সমীক্ষায় দেখা গেছে, ঢাকার ১০ শতাংশ ধনী মানুষের আয় পুরো শহরের বাসিন্দাদের মোট আয়ের ৪৪ শতাংশ। আর সবচেয়ে গরিব ১০ শতাংশ মানুষের আয় মোট আয়ের ১ শতাংশের কম। রাজধানীর সাড়ে ৩ শতাংশ মানুষ এখনো তিন বেলা খেতে পায় না বলেও উঠে এসেছে গবেষণায়।

রিয়াজ সাহেব খেতে বসে খাওয়ার রুচি পান না। হাত ধুয়ে বেরিয়ে পড়েন। হাতির ঝিলের আলোক সরোবরে উন্নয়নের ভূতের আলেয়া দেখেন। ঝিলের মাঝ থেকে হাতিদের মলের গন্ধ আসছে। ঢাকার ১০ শতাংশ ধনী মানুষ যেখানে বসবাস করে; সেখান থেকেই বড়লোকির বর্জ্য স্রেফ ঝিলে ফেলে দেয়া হয়।

রিয়াজ সাহেব নাক চেপে ধরে হন হন করে হেঁটে চলে যান। একটা সিএনজি রিক্সা নিয়ে কাওরান বাজারে চলে যান। সারি সারি টিভি স্টেশান সেখানে। রিয়াজ সাহেব একটা টিভি স্টেশানে ঢুকে হেড অফ নিউজের সঙ্গে দেখা করতে চান। আগে থেকে এপয়েনমেন্ট আছে কীনা জিজ্ঞেস করে রিসেপশনিস্ট।

রিয়াজ সাহেব একটু উচ্চকন্ঠে বলেন, কী এমন ব্যস্ত লোক তিনি যান উনাকে বলুন, একজন দর্শক আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান।

রিসেপশনিস্ট ঘাবড়ে গিয়ে রিয়াজ সাহেবকে হেড অফ নিউজের কাঁচঘেরা ঘরে নিয়ে যায়।

রিয়াজ সাহেব বলেন, ফোক-ফ্যান্টাসি ফিলিম বানাতে চাইলে আরেকটু এগিয়ে এফ ডিসিতে চলে গেলেই পারেন। অযথা ফ্যান্টাসিকে নিউজ হিসেবে প্রচার করছেন কেন! বাস্তবতা জানেন! শেষ কবে গাড়ি থেকে নেমে পথে হেঁটেছেন!

হেড অফ নিউজ এরকম বিনা মেঘে বজ্রপাতের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। মিন মিন করে বলেন, মিডিয়ার স্বাধীনতা আছে; তবে-কিন্তু অতটা নেই। বোঝেন তো উন্নয়নের গুণগান না করলে চাকরি থাকবে না।

--আপনার অফিসের পেছনেই রেল-লাইনের দু'পাশে বস্তির মানবেতর জীবন কখনো দেখেছেন! নাকি শুধু ভি আইপি সংবাদ সম্মেলনে গিয়ে অদৃশ্য সাবানে হাত কচলান। বৈষম্য চোখে পড়ে না আপনাদের চোখে! কেন এই বৈষম্য, সে প্রশ্ন করতে পারেন না!

--বস্তি নিয়ে রিপোর্ট হয়েছে অনেক। আপনি হয়তো মিস করে গেছেন।

--আপনি কী জানেন এ শহরের ৭১ শতাংশ মানুষ বিষণ্ণ। যাকগে আপনার সঙ্গে কথা বলা বৃথা। কারণ বিষণ্ণতার ভাইরাস তো টিভির বিজ্ঞাপনের মাঝ দিয়েই ছড়ায় সেখানে। মানুষ যতো বিলাসি হয়; ততো বিষণ্ণ হয়। এই যেমন আপনি!

রিয়াজ সাহেব কাওরান বাজারের এক বড় ব্যবসায়ীকে বাগে পেয়ে ক্যাঁক করে ধরে বলে, এই আপনাদের মুনাফার লোভ আর প্রতারণার কারণে ঢাকার সাড়ে ৩ শতাংশ মানুষ এখনো তিন বেলা খেতে পায় না।

ব্যবসায়ী পড়ি মরি করে দৌড়ে পালিয়ে যায়। রিয়াজ সাহেব একটু জোরে হেঁটে হোটেল সোনারগাঁতে ঢুকে পড়েন। চুল কাটার সেলুনে এক মন্ত্রীকে ধরে জিজ্ঞেস করেন, শিশুকাল থেকেই ফাইভ স্টারে চুল কাটান! নাকি উন্নয়নের চুল কাটাতে এখানে আসেন।

মন্ত্রী বিনয়ের সঙ্গে বলেন, 'উন্নয়ন হয়নি এ কথা বলেন কীভাবে! জিডিপি গ্রোথ তো ৮-এর ওপরে।'

: ঢাকা শহরের ৬৮ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত। তো আপনার জিডিপি গ্রোথ ধুয়ে কি পানি খাবো?

মন্ত্রী দ্রুত কেটে পড়লে এক সংস্কৃতি মামা রিয়াজ সাহেবের দেশপ্রেম টিপেটুপে দেখতে আসে। একটু কটাক্ষ করে বলে, 'স্যার তো মনে হয় এন্টি-গভর্নমেন্ট। সরকারের কোন ভালো দেখতে পান না।'

: তার আগে আপনি আমাকে বলবেন, যৌবন থেকেই কি ফাইভ স্টারে বিদেশি মদ খান; নাকি এটাও উন্নয়নের খুশিরধারা! এই যে ঢাকার মতো প্রাণবন্ত একটা শহর; যাকে জন্ম থেকে দেখছি হাসিখুশি; আজ এখানে ৭১ শতাংশ লোক বিষণ্ণ, এ কি ভাবা যায়!

সংস্কৃতি মামা মনে মনে একটা বিজনেস আইডিয়া ফেঁদে ফেলে। প্রকল্পের নাম: হাসিখুশি ঢাকা। সারা ঢাকার স্থানে স্থানে মোটিভেশনাল স্পিকারেরা ঘুরে ঘুরে 'হাসিখুশি ঢাকা'র ঢোল বাজিয়ে বেড়াবে। আর আমাদের হাসি-কর্মীরা ঘুরে ঘুরে মানুষকে হাসাবে।

গাড়িতে সংস্কৃতি মামার জন্য অপেক্ষা করছিলেন মন্ত্রী মহোদয়। সংস্কৃতি মামা ফিরতেই মন্ত্রী তাকে জিজ্ঞেস করেন, লোকটা কি পাগল!

: আমি সন্দেহ করছিলাম, হয় পাগল নয়তো পরাজিত শক্তি। পরে দেখি আদি ঢাকাইয়া। ঢাকাকে ভালোবাসে। আমি একটা আইডিয়া পাইলাম বস। প্রকল্প: হাসিখুশি ঢাকা।

: ব্রিলিয়ান্ট আইডিয়া।

শুরু হয়ে যায় 'হাসিখুশি ঢাকা'র ক্যাম্পেইন। 'একসেস টু লাফটার' বিশেষজ্ঞ মোটিভেশনাল স্পিকাররা ফেসবুক লাইভ শুরু করে। স্টার্টআপ লাফটার উদ্যোক্তা জোকসের অ্যাপস চালু করে। বিনা পয়সায় ডাউনলোড করে হাসুন।

এক মোটিভেশনাল স্পিকার ফার্মগেটে কিছু হতদরিদ্র মানুষকে হাসাতে অনেক চেষ্টা করে; একটা হাস্যোজ্জ্বল সেলফির জন্য সারাদিন চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়।

আরেক হাসিকর্মী উন্নয়নের অংশীদার হয়ে সচ্ছল হয়েছে; এমন লোকদের হাসাতে চেষ্টা করে। তারা অজানা আশংকায় মুখ শুকনো করে রেখেছে।

টিভিতে 'হাসি খুশি ঢাকা' শীর্ষক টকশোতে কাষ্ঠহাসি ঝুলানো কিছু টাকার যুক্তি দেখায়, আসলে পাহাড়ে ওঠার আগে মানুষের মধ্যে রোমাঞ্চ থাকে। উঠলেই বিষণ্ণতা চলে আসে। উন্নয়নের ক্ষেত্রেও একই হয়েছে।

ওষুধ কোম্পানি সুযোগ বুঝে লাফটার ট্যাবলেট বাজারে ছাড়ে। অনেকগুলো করে ট্যাবলেট খেয়েও হাসি আসে না কারো। ফেসবুকের নিয়মিত কান্দন-স্টেটাস 'একদম ঘুম আসে না'র জায়গায় 'হ্যাশট্যাগ হাসি না' যেন ট্রেন্ড হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়।

১৪৭৮ পঠিত ... ১৯:৫৯, ডিসেম্বর ০৩, ২০১৯

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top