'সাকিব বনাম বিসিবি' সমগ্র: বোর্ডের সাথে যতবার দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন সাকিব

৯৩৮ পঠিত ... ১৫:৩৪, মার্চ ২৩, ২০২১

আবারও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ও সাকিব আল হাসান মুখোমুখি অবস্থানে। দেশের ইতিহাসের সেরা ক্রিকেটারের সঙ্গে ক্রিকেট বোর্ডের এই প্রকাশ্য 'গ্যাঞ্জাম' অবশ্যই বাংলাদেশের ক্রিকেট অনুরাগীদের কাছে নতুন কিছু নয়। এর আগেও নানা ইস্যুতে সাকিব-বিসিবি মুখোমুখি অবস্থানে ছিল। চলুন এমনই কিছু ঘটনা শর্টকাটে মনে করা যাক-

Shakibalhasan genjam (1)-min

 

আইপিএল নিয়ে বাহাস

কিছুদিন পর বাংলাদেশ দল শ্রীলঙ্কা সফরে যাবে টেস্ট খেলতে। একই সময়ে আইপিএল হওয়ায় সাকিব টেস্ট বাদ দিয়ে আইপিএল খেলার জন্য বোর্ডের কাছে অনুমতি চেয়ে চিঠি লিখেন। বোর্ড পরদিনই সাকিবকে ছুটিও দিয়ে দেয়। তবে ছুটি দিলেও বোর্ড সাকিবকে কিছু কটু কথা শোনাতে ছাড়েনি। বিসিবির ক্রিকেট পরিচালনা প্রধান আকরাম খান তখন বলেছিলেন ‘সাকিব এই মুহূর্তে টি–টুয়েন্টি খেলতে চায়। টেস্ট খেলতে চায় না। আইপিএলের জন্য ছুটি চেয়েছে সে। আমরাও মনে করি কেউ খেলতে না চাইলে তাকে জোর করে খেলিয়ে লাভ নেই। তাই সাকিবকে ছুটি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বোর্ড।’

কিন্তু এই ইস্যু যখন মিটমাট প্রায়, তখনই সাকিবের আরেকটি ইন্টারভিউ পুরোনা আগুনে নতুন করে ঘি ঢেলেছে। আকরাম খানের করা ‘সাবিক টেস্ট খেলতে চায় না’ মন্তব্য ধরে সাকিব বলেন- তিনি তার চিঠির কোথাও টেস্ট খেলতে না চাওয়ার কথা উল্লেখই করেননি। তাই যারা বলছেন সাকিব টেস্ট খেলতে চায় না, তারা তার চিঠিটি পড়েই দেখেননি। সাকিব বলেন, 'আমি যখন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে চিঠি দিয়েছি। আমি নিশ্চিত তারা লেটারটি পড়েনি।' 

shakib letter utpal shuvro

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ক্রিকেট অপারেশন্সের প্রধান আকরাম খানের নাম উল্লেখ করে সাকিব বলেন, 'আকরাম ভাই বারবার বলেছেন, আমি খেলতে চাই না, খেলতে চাই না, খেলতে চাই না।'

ওই সাক্ষাৎকারে সাকিব হাইপারফরম্যান্স ইউনিট (এইচপি) ও বাংলাদেশের পাইপলাইনের খেলোয়াড় নিয়েও সমালোচনা করেন। এইচপি’র দায়িত্বে আছেন সাবেক অধিনায়ক নাঈমুর রহমান দুর্জয়। সাকিবের এমন কথায় বিরক্ত দুর্জয় বলেন, 'আমার জানা মতে বোর্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত বা চলমান কোন ক্রিকেটার বোর্ডের বিরুদ্ধে বলতে পারে না। তো সেই ব্যাপারে বোর্ডে আলাপ আলোচনা করে এই ইস্যুগুলোর বিষয়ে প্রতিক্রিয়া আরো বড় পরিসরে আলোচনা করে দিব।'

 

বিশ্বকাপের আনুষ্ঠানিক টিম ফটোসেশনে অংশ না নেওয়া

২০১৯ বিশ্বকাপ উপলক্ষে মিরপুর শেরে বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপগামী সব খেলোয়াড়রা জড়ো হয়েছিলেন রীতি অনুযায়ী টিম ফটোসেশনের জন্য। দলের সবাই আছেন, কিন্তু দেখা গেল সাকিবই নেই! সাকিব সেদিন স্টেডিয়ামে এসেছিলেনও, কিন্তু ফটোসেশনের কিছুক্ষণ আগেই চলে গেছেন। স্বাভাবিকভাবেই এ ঘটনায় ক্ষেপে যান বোর্ড প্রেসিডেন্ট নাজমুল হাসান পাপন।

ক্ষিপ্ত বোর্ড সভাপতি বলেন বলেন, 'ফটোসেশনে সাকিবের অনুপস্থিতি সত্যিই দুঃখজনক। আমি স্টেডিয়ামে ঢোকার সময় সাকিবকে ফোন করে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কোথায়। ও বললো, আমি তো ঢাকায় চলে এসেছি। আপনার বাসায় আসবো রাতে। আমি বললাম, কেন? এখনই তো দেখা হবে। ও বলল, না, আমি বেরিয়ে গেছি। আমি পরে জানতে পারলাম যে সাকিবকে আগেই বলা হয়েছিল আজ দলের ফটোসেশন হবে। জাতীয় দল বিশ্বকাপে যাচ্ছে, তাই সবার সঙ্গে সাকিবকেও ফটোসেশনে দেখার আশা করেছিলাম। কিন্তু সে ছিল না।'

shakib-world-cup-2019

সাকিবকে ছাড়াই বিশ্বকাপ দলের ১৪ ক্রিকেটার অংশ নিয়েছেন ফটোসেশনে। সাকিবের অনুপস্থিতি দলের মধ্যে কোনও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে কিনা এমন প্রশ্নে নাজমুল হাসান বলেছিলেন, 'আমার মনে হয় দলের অন্যরা এত দিনে ওর এসব ব্যাপারে অভ্যস্ত হয়ে গেছে! যা হোক, আমি মনে করি এটা ওর জন্যই দুর্ভাগ্য। সাকিবের কপাল খারাপ, আমাদের বিশ্বকাপ দলের ফটোসেশনে সে থাকতে পারলো না। এছাড়া আর কী বলবো।'

 

ক্রিকেটারদের দেনা-পাওনার দাবিতে সাকিবের নের্তৃত্বে ধর্মঘট

২০১৯ সালের ২২ অক্টোবর হঠাৎ বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো বাংলাদেশের প্রথম সারির ক্রিকেটাররা বোর্ডের বিরুদ্ধে ধর্মঘটের ডাক দেন। ক্রিকেটারদের নেতৃত্বে ছিলেন সাকিব আল হাসান। প্রাপ্য সম্মান, বেতন ভাতা ও ক্রিকেট অবকাঠামো উন্নয়নসহ ১১ দফা দাবি পেশ করেন ক্রিকেটাররা। দাবিদাওয়া পেশ করা শেষে মিরপুর স্টেডিয়ামে সাকিব বলেন, ‘যত দিন এই দাবি পূরণ করা হচ্ছে না, তত দিন ক্রিকেটীয় কোনো কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছি না। দাবি মানলে আবার স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে যাব। ভবিষ্যতের খেলোয়াড়দের জন্য আমরা ভালো পরিবেশ রেখে যেতে চাই, যারা ক্রিকেটটা এগিয়ে নেবে।’

shakib cricketers strike

হঠাৎ করে ক্রিকেটারদের এমন ধর্মঘটে নিজের ক্ষোভ চাপা রাখেননি রোর্ড সভাপতি। এটিকে ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করে পাপন বলেন, ‘চক্রান্ত চলছে। কে এসব করছে এগুলো জানি। আপনারাও সব জানেন।’ খেলোয়াড়দের ধর্মঘটের পেছনে অক্রিকেটীয় কারণ আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তারা জানতো দাবি দিলেই মেনে নিব, এজন্য যোগাযোগ করেনি। এটা পরিকল্পনার অংশ। ওরা কেন আমাদের কাছে চাচ্ছে না? খেলা কেন বন্ধ করল? ক্যাম্প কেন বন্ধ করল? সবকিছুর পেছনেই একটা কারণ আছে।’ ‘এটা ঐ ষড়যন্ত্রেরই অংশ। সব খেলোয়াড় এটা জেনেশুনে করছে বলে আমি মনে করি না। তবে হাতেগোনা ২-১ জন হয়তো জানে। বাকিরা না জেনেই (ধর্মঘটে) এসেছে।’ 

‘কারা দেশের বিরুদ্ধে কাজ করছে এটা খুঁজে বের করতে হবে। এটা খুবই জরুরী। আমি আপনাদের কাছে কিছুদিন সময় চাচ্ছি। দৃঢ় বিশ্বাস, কারা এসব করছে আমরা বের করতে পারব।’এই ঘটনার কয়েকদিন পরই বাংলাদেশ দল ভারত সফরে যাওয়ার কথা। সেদিকে ইঙ্গত করে বোর্ড সভাপতি বলেন ভারত সফর বানচালের জন্য এমনটি করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, ‘দেশের বাইরে থেকে করা হচ্ছে। আমাদেরও ২-১ জন জড়িত থাকতে পারে, খেলোয়াড়দের কেউই জড়িত থাকতে পার।’যদিও একদিন পরই বোর্ড সভাপতি বলেন যে ক্রিকেটারদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক স্বাভাবিক আছে। 

 

গ্রামীণফোনের সঙ্গে চুক্তি করে বোর্ডের নোটিশ

২০১৯ সালে টেলিকম প্রতিষ্ঠান গ্রামীণফোনের সঙ্গে একটি চুক্তি করেন সাকিব আল হাসান। চুক্তির খবর সংবাদমাধ্যমে আসার পর বিসিবি অভিযোগ করে তাদরেকে না জানিয়েই সাকিব গ্রামীণফোনের সঙ্গে এই চুক্তিটি করেছেন এবং এর মাধ্যমে সাকিব হাসান বিসিবির সাথে তার চুক্তির বরখেলাপ করেছেন। এজন্য সাকিবকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেয় বোর্ড। বিসিবির প্রেসিডেন্ট নাজমুল হাসান তখন সাংবাদিকদের বলেছেন, সাকিবের ব্যাপারে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজামউদ্দিন চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, 'টেলিকম কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করতে হলে, তা আমাদের জানাতে হয়। চুক্তি করার আগে সাকিব আমাদের অফিসিয়ালি জানিয়েছেন বলে আমাদের রেকর্ডে নাই। এটা আমরা দেখছি। সভাপতিও এটা নিয়ে কথা বলেছেন। আমরাও দেখছি।'

papon shakib

 

টেস্ট না খেলা প্রসঙ্গে

২০১৭ সালে সেপ্টেম্বরে টেস্ট থেকে বিশ্রাম নিতে ছয় মাসের ছুটি চেয়েছিলেন সাকিব। এরপর পরে আফগানিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজের আগে ও পরে সাকিব আল হাসান অধিনায়কত্ব নিয়ে অনীহা প্রকাশ করে বলেন, এই বিষয়ে বোর্ডের সাথে আলোচনা করার আছে।বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান নাজমুল হাসান পাপন তখন সাংবাদিকদের বলেন যে, টেস্ট খেলতে না চাওয়ার কারণেই সাকিব অধিনায়কত্ব নিয়ে অনীহা প্রকাশ করেন।

'আমরা লক্ষ্য করছি টেস্ট খেলায় বেশ কিছুদিন থেকে তার আগ্রহ নেই। বিশেষ করে দেশের বাইরে টেস্ট খেলার সময় হলে সে ছুটি চায়। হয়তো তার আগ্রহ কম। টেস্ট খেললে তো অধিনায়কত্ব করতেই হবে। অধিনায়ক না হলে তো খেলার বাধ্যবাধকতা নেই। সম্ভবত এ কারণে অধিনায়কত্ব নিয়ে এমন কথা বলেছে।'

সম্প্রতি ডেইলি স্টারের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে আবারও সাবিকের সেই চিঠি প্রসঙ্গে বলেছেন নাজমুল হাসান পাপন। তিনি বলেন, এর আগেও সে চিঠি দিয়েছিল, সে টেস্ট খেলতে চায় না। আমাকে চিঠি দিয়েছিল আগে, সে টেস্ট খেলবে না। আপনি জানেন কিনা জানি না (২০১৭ দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে)। আমার কথা হলো, জাতীয় দলের খেলা থাকলে কোনো খেলোয়াড় ফ্র্যাঞ্চাইজিতে যেতে পারে না বা যাওয়ার কথা না, এজন্য বলা হয়েছে বোর্ডের অনুমতি নাও। এটা কিন্তু আইসিসিতে করা হয়েছিল এই কারণে। ও আমাকে ফোন করে বলেছে যে আইপিএল খেলতে চায়। আমি বললাম, ‘তুমি এটা কী বলো? আমার শ্রীলঙ্কা (সিরিজ), আমরা এখন এত খারাপ খেলছি টেস্ট। তোমাকে তো পেলাম না গত কদিন। ভারতে পেলাম না, পাকিস্তানে পেলাম না, ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গেও পেলাম না। সেই জায়গায় এখন আরেকটা সিরিজ আছে, এখানে তোমাকে কীভাবে অনুমতি দেই?’ তো ওর কথা শুনে মনে হলো যে ও যাবেই। তখন হঠাৎ করে আমার মনে হলো, ঠিক আছে, জোর করে তো খেলিয়ে লাভ নেই। তারপরে বললাম, ‘চিঠি দাও।’ চিঠি দিয়েছে। বোর্ডের অনেকেই রাজি ছিল না। আমিই বলেছি না দিয়ে দাও (অনুমতি)। দিয়ে দিছে। এখানেই তো শেষ। ওই সিরিজে যাওয়া, না যাওয়া ওখানেই শেষ। এরপর তো আমি আর কথাও বলিনি। আমি একটা কথা বলেছিলাম কে কোন ফরম্যাট খেলতে চায় এটা আমরা মে-জুন মাসের মধ্যে জেনে নিতে চাই।’

 

ক্যামেরার সামনে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি

২০১৪ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে সাকিব আল হাসান টেলিভিশন ক্যামেরার দিকে একটি 'একটু ইয়ে ধরনের' অঙ্গভঙ্গি করেন। তার সেই অঙ্গভঙ্গির ক্লিপ সামাজিক মাধ্যমে ছড়ালে সেটা নিয়ে আলোচনার ঝড় ওঠে। এরপর সাকিবকে ৩ ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা ও ৩ লাখ টাকা জরিমানা করে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ডিসিপ্লিনারি কমিটি। তবে সাকিব পরে বলেছেন, তিনি ওই ক্যামেরাম্যানকে চিনতেন। দুষ্টুমি করেই অমনটা করেছিলেন এবং তাঁর দাবি, সরাসরি সম্প্রচারিত হচ্ছে, এমনটা জানলে তিনি কখনোই অমন অঙ্গভঙ্গি করতেন না। 

shakib photo

 

একই বছর ৬ মাসের নিষেধাজ্ঞা

বোর্ডের শৃঙ্খলাভঙ্গ ও আচরণগত সমস্যার অভিযোগে ২০১৪ সালের ৭ জুলাই সাকিব আল হাসানকে আন্তর্জাতিক এবং ঘরোয়া সব ধরনের ক্রিকেট থেকে ছয় মাসের জন্যে নিষিদ্ধ করে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড।

এছাড়া শাস্তি হিসেবে পরবর্তী দেড় বছর দেশের বাইরে কোনো টুর্নামেন্টে খেলার জন্য এই অলরাউন্ডারকে অনাপত্তিপত্র না দেয়ারও ঘোষণা দিয়েছিল বিসিবি, যদিও সাকিবের আবেদনের প্রেক্ষিতে বোর্ড তার শাস্তি কমিয়ে দিয়েছিল।

৯৩৮ পঠিত ... ১৫:৩৪, মার্চ ২৩, ২০২১

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top