হলে ছাত্র নির্যাতন বন্ধ হোক : বুয়েটে ছাত্র নিপীড়নের ১৫টি বাস্তব অভিজ্ঞতা

১৫১৩ পঠিত ... ২০:৩২, অক্টোবর ০৯, ২০১৯

 

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় যাকে বুয়েট নামে পুরো দেশের মানুষ চেনে। বিখ্যাত এই প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিয়ত এমন সব ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে চলে যা বাইরের কারো পক্ষে কল্পনা করাও কঠিন। নির্যাতনের শিকার হয়ে গত ৭ অক্টোবর আবরার ফাহাদ নামের এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর যেন সকলের কাছে বুয়েটের নতুন রূপ প্রকাশ পায়। নিজ হলের অন্য একটি কক্ষে ডেকে নিয়ে আবরারকে আটকে রাখা হয় প্রায় সাত ঘন্টা। সেখানে ছাত্রলীগের বেশ কিছু সদস্য তাকে রাতভর প্রহার করে। শেষ রাতের দিকে হলের এক করিডরে পড়ে থাকতে দেখা যায় আবরারের লাশ। এরপর বুয়েট ক্যাম্পাস তো বটেই, সাড়া পড়ে যায় পুরো দেশেই। 

অনেকেই এরপর থেকে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বুয়েটের হলগুলোয় তাদের সাথে ঘটে যাওয়া নির্যাতনের বর্ণনা দিতে শুরু করেন। তবে সঙ্গত কারণেই অনেকে ফেসবুকেও এসব বলার সাহস পাননি। এসব না বলা নির্যাতনের কথা পাওয়া গেছে বুয়েটের সিএসই বিভাগের ওয়েবসাইটে। সাইটটিতে নাম প্রকাশ না করেই, সিএসসি বিভাগের ছাত্রদের অভিযোগ করার জন্য একটি ব্যবস্থা ছিল। ২০১৭ সালে এটি শুরু হয়েছিল। শুরুতে সেখানে ডিপার্টমেন্টের পড়ালেখা, শিক্ষক, কোর্স, পরীক্ষা ইত্যাদি নিয়েই অভিযোগ ছিল বেশি। তবে এ বছরের মাঝামাঝি বুয়েটে বেশ কিছু র‍্যাগিং-এর ঘটনায় আবার আলোচনায় আসে সেই মাধ্যমটি। তখন অনেকেই বুয়েটে চলমান র‍্যাগিং ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাস নিয়ে অভিযোগ করেন। 

দায়িত্বশীল বিভিন্ন ব্যক্তির নিকট করা এসব অভিযোগ আদৌ কোন আমলে নেওয়া হয়েছিল কি না তা আমাদের জানা নেই। যার ফলে, ৭ অক্টোবর প্রাণ দিতে হলো আবরারকে। eআরকির পাঠকদের জন্য থাকছে, বুয়েটের বিভিন্ন হলে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া নির্যাতনের প্রত্যক্ষ বর্ণনা। এছাড়াও যে কেউ এখানে গিয়ে পড়ে নিতে পারবেন আরও অনেক ঘটনার কথা।

 

#১

চলতি বছরের ৮ মে একটি অভিযোগে ১৮ ব্যাচের সিএসই ডিপার্টমেন্টের এক আবাসিক শিক্ষার্থী বুয়েটে শুরু করা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম দিনগুলোর বর্ণনা করেন এমন করেই। অভিযোগটি ছিল ডিপার্টমেন্ট প্রধানের উদ্দেশে।

সোহরাওয়ার্দী হলের রুম নম্বর ১১২ ও ৩০০৫-এ অনেক টর্চার করা হইছে আমাদেরকে। সিনিয়ররা অনেক মেন্টাল হ্যারাজ হরে। আর ফিজিকাল হ্যারেজমেন্টের ভয় দেখায়। আর অকথ্য ভাষায় গালি দেয়। মাঝরাতে দাঁড় করায় রাখে আর টর্চার করে আমাদেরকে সো কলড ভদ্র বানানোর বাহানায়। এতে স্টাডি আর ঘুম দুইটাই হ্যাম্পার হচ্ছে। তারা মাঝে মাঝে হল থেকে বের করে দেওয়ারও হুমকি দেয়। আর সবচেয়ে বড় কথা, ঈদের পর আমাদেরকে ছাদে ডাকা হবে। সেদিন আমাদেরকে ব্যাচ ১৮-এর সব মেটদের নাম আর ডিপার্টমেন্ট মুখস্ত বলতে হবে। আর বলতে না পারলে টর্চারের হুমকি দিছে। এই অল্প কয়েকদিনে আমাদের ফ্লোরের ৭২ জনের নাম আর ডিপার্টমেন্ট জানা পসিবল না। স্টার না করে এসব টাইম ওয়েস্টিং কাজ করা পসিবল না। তাই এসব বিষয়ে স্ট্রিক্ট স্টেপ নেওয়া অনেক প্রয়োজন।  

 

#২

৯ মে সিএসই বিভাগেরই আরেক শিক্ষার্থী বিভাগ প্রধানের উদ্দেশে বলেছিলেন নিয়মিত ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা দেখার কথা।

হলের সি সি ক্যামেরা গুলো নিয়মিত চেক করা উচিত। তাহলে অল্প হলেও মধ্যরাতে র‍্যাগিং এর আলামত ধরা পড়বে।

 

#৩ 

১৪ মে এই বিভাগের প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থী র‍্যাগের হাত থেকে তাদের বাঁচানোর জন্য রীতিমত আকুতি করেন। 

আসসালামু আলাইকুম স্যার। আমার আগেও একজন বলসে আমিও বলসি পাঁচ তলায় শুধু ১৮-ব্যাচের থাকার ব্যবস্থা করুন। আর সিঁড়িতে গেইট লাগান। রাত ১০/১১টার পর গেইট বন্ধ করে দেয়ার ব্যবস্থা করা হোক। তাহলে একটু হলেও আমরা বাঁচবো। ১ম বছরটা যদি খারাপ রেজাল্ট হয় তাহলে বাকিগুলোও খারাপ হবে। অনেক সময় নষ্ট করে ভায়েরা। রাতভোর র‍্যাগ দেয়। পড়াশোনার অনেক ক্ষতি হচ্ছে। এমন এমনভাবে র‍্যাগ দেয় কল্পনাও করতে পারবেন না। এত নিচু মানসিকতা তাদের জানা ছিলো না।

 

#৪

১০০ নাম্বার অভিযোগটিতে এক শিক্ষার্থী বিভাগ প্রধানের উদ্দেশে যে প্রশ্নটি করেছিলেন, সে প্রশ্নের সত্যি সত্যি জবাব এবং পরবর্তী পদক্ষেপের নমুনা পাওয়া গেলে হয়ত আবরার ফাহাদকে মরতে হতো না।

ডিয়ার স্যার, এতোগুলা অভিযোগ আপনাদের কাছে তবুও আপনারা কি কোন ব্যবস্থা করেছেন? এমন লোক দেখানো ব্যবস্থা নিয়ে কী লাভ? 

 

#৫

জুলাই মাসে আহসানুল্লাহ হলে জুনিয়রকে থাপ্পড় মেরে কানের পর্দা ফাটিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটান এক সিনিয়র। সেই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় আক্রান্ত ছাত্রের এক ব্যাচমেট ও বন্ধু সেখানে তার ক্ষোভ জানান।  

আহসানুল্লাহ হলে আমাদের এক বন্ধুকে থাপ্পড় মেরে এক কু*র বাচ্চা সিনিয়র কানের পর্দা ফাটায়া দিসে! সে আর কোনোদিন শুনতে পাবে না এক কানে! আমি আহসনউল্লাহ হলের না আর সিএসই-র ছাত্রও না। কিন্তু ওই সিনিয়রকে বুয়েট থেকে বের করতে হবে!

 

নিচে যেসব নির্যাতনের ঘটনা বলা হয়েছে, সেগুলো আগে ঘটলেও আবরারের মৃত্যুর পরই ঘটনাগুলো সেখানে পোস্ট করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনা যে কাউকে শিউরে তুলতে পারে। ক্যাম্পাসে কতটা ত্রাস বিরাজমান থাকলে এসব ঘটনা প্রকাশ্যে না বলে কেউ মুখ বুজে থাকে, তা সুস্থ মস্তিস্কের যে কেউই বুঝতে পারবেন। 

#৬

এটা রশীদ হলের ঘটনা। এ বছরের শুরুর দিকে রশীদ হলের ফেস্ট উপলক্ষে লীগের ১৪ ব্যাচের ভাইরা টাকা তুলছিল। এর মধ্যে ১৫ ব্যাচের একজনের রুমে টাকা চাইতে আসলে সে নীতিগত কারণে দিতে অস্বীকৃতি জানায়। (এ টাকা গুলো কীভা্বে খরচ হয়, কোন খাতে হয় - এগুলোর কোন জবাবদিহিতা নেই।) এতেই ১৪ ব্যাচের উপস্থিত সবাই সাথে সাথে খুবই রেগে যায় এবং তাকে হলে থাকতে দিবে না বলে হুমকি দেয়। এসব বলে তারা চলে যায়। 

এটা রাত ৮-৯টার দিকে ঘটনা। এরপর রাত ১২-১টার দিকে লীগের ১৫ ব্যাচের ছেলেদের দিয়ে ঐ ছেলেটাকে রশীদ হলের কুখ্যাত ৪০৬ নাম্বার রুমে ডেকে পাঠায়। আবরার ফাহাদের মত সেখানেও ঐ ছেলেটার ফেসবুক, মেসেঞ্জার চেক করা হয় । আর সেই সাথে স্ট্যাম্প, খাটের স্ট্যান্ড আর পা দিয়ে লাথি-ঘুষি-থাপ্পড় মারা হয়। ৩টার দিকে প্রায় ৪ ঘন্টার অমানুষিক নির্যাতনের পরে তাকে আবরার ফাহাদের মত একইভাবে ব্যাচমেটরা নিয়ে আসে। পরবর্তীতে জানা যায় ছেলেটার পায়ের হাড়ে ফ্রাকচার হয়েছে। দীর্ঘদিন তাকে ক্রাচ নিয়ে হাঁটাচলা করতে হয়েছে।

রশীদ হলের ১৫ ব্যাচের সবাই এ কথাগুলো জানে। কিন্তু এদের বিপক্ষে বলার সাহস কার আছে? কার ঘাড়ে দুইটা মাথা? ঐ কুখ্যাত রুমের বাসিন্দা হল মিনহাজ (মেকা '১৪, এখনো হলে থাকে, তবে রুম চেঞ্জ করেছে), অয়ন (সিভিল'১৪), বাধন (সিভিল'১৪), সৌরভ (সিভিল'১৪)। সেই সাথে ঐখানে ছিল ফাহিম (মেকা'১৪), সন্তু (নেইম '১৪)।

 

#৭

শের-এ-বাংলা হলের ৩১২ নম্বর রুমের '১৮ ব্যাচের আমরা চারজন ওয়েট করতেছিলাম কখন আমাদের কমন রুমে ডাকা হবে। সাধারণত রাত সাড়ে এগারটা থেকে বারোটার মধ্যে র‍্যাগ দেয়ার জন্য ডাকা হয়। কিন্তু প্রায় সাড়ে বারোটা বেজে গেলেও আমাদের ডাকা হচ্ছিল না বলে ধরেই নিয়েছিলাম যে ঐদিন rag দেয়া হবে না। এর কিছুক্ষণ পরেই ফোন আসলো- ‘ভাইরা কমনরুমে ডাকছে’! 

চুলে পানি দিয়ে ৪ জন মিলে গেলাম কমনরুমে। সেখানে সবাইকে মোটামুটি নির্যাতন-গালাগালি করা হলো। এরপর ১১ জনকে সিলেক্ট করা হলো ছাদে উঠানোর জন্য। সেই ১১ জনের মধ্যে আমি এবং আমার ট্রিপলই-এর রুমমেটও ছিল। আমাকে ধরা হয়েছিল চুল বড় বলে, যদিও আমার চুল অনেক ছোট ছিল। আগে কখনো ছাদে উঠে র‍্যাগ খাই নাই (রুমে ডেকে নিয়ে এর আগে ২ দিন র‍্যাগ দিয়েছিলো)। তাই প্রথমে অতটা ভয় না পেলেও পরে দাঁড়িয়ে থাকারও শক্তি পাচ্ছিলাম না। স্টাম্প দিয়ে পিটানো, চড় মারা, লাথি মারাসহ বিভিন্নভাবে টানা ৫ ঘণ্টা নির্যাতন চলে। 

এবার আসল কথায় আসি। র‍্যাগ খেতে খেতে ফজরের আযান দিয়ে দিলো। দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলাম না, নিঃশ্বাস ছাড়তে কষ্ট হচ্ছিল, চোখ দিয়ে অবাধে পানি পড়ছিলো। পাশে তাকিয়ে দেখলাম আমার রুমমেটের চোখেও পানি। চারপাশে আযান দিচ্ছিলো, আর তার মধ্যেই জানোয়ারগুলো আমাদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করছিল। মন চাচ্ছিল ঐ মূহুর্তে টিসি নিয়ে এই বুয়েট থেকে চলে যাই। কিন্তু কিছুই করার ছিল না। তখন ফজরের আযান হচ্ছিল, শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে বললাম- ‘জীবনের এক ওয়াক্ত নামাজও যদি কবুল হয়, তাহলে তার বিনিময়ে হলেও এর বিচার করো।’

 

#৮

এগুলো আমারই ছবি, ছয় বছর আগের, আবরার মারা গেছে, আমি ওই দফায় বেঁচে ফিরেছি। বুয়েটের ও এ বি এর দোতলায় মেকানিক্যাল ড্রয়িং কুইজ দেয়া শেষ হওয়া মাত্রই পরীক্ষার রুম থেকে তন্ময়, আরাফাত, শুভ্র জ্যোতি টিকাদারদের নেতৃত্বে ৮-১০ জন ছাত্রলীগের ছেলে শিক্ষকের সামনে থেকে তুলে নিয়ে আহসানউল্লাহ হলের তখনকার টর্চার সেল ৩১৯ নাম্বার রুমে নির্যাতন করে। আমি কারো সাথে যেখানে রাগারাগি পর্যন্ত করতাম না, কারো সাথে কখনোই সম্পর্ক খারাপ পর্যন্ত যেখানে ছিল না, শুধুমাত্র ফেইসবুকে সরকারি নীতির সমালোচনা করে পোস্টের কারণে বুয়েটের মত একটা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রলীগ আমার সাথে এমন আচরণ করে। এর ৬ দিন আগে সাবেক বুয়েট ছাত্রলীগ সভাপতি শুভ্র জ্যোতি টিকাদার('০৯) ও কাজল('০৯) ল্যাব থেকে আমাকে ধরতে এসে ব্যর্থ হয়ে পরীক্ষার রুম থেকে আমাকে একা ধরতে ওরা ৮-১০ জন প্রস্তুতি নিয়ে আসে! বিকেল ৫ টা থেকে রাত ১১ টা ৩০!! বদ্ধ রুমে আমার পিঠের ওপর লোহা দিয়ে '১০ ব্যাচের এক ভাই প্রধানত তার শক্তি পরীক্ষা করে। 

সারাজীবন একটি মাত্র স্বপ্ন দেখেছিলাম- বুয়েটে পড়বো। বুয়েটের ছাত্রদের ভাবতাম আদর্শ। অথচ সেখানেও এমন হবে- জানা ছিল না। ভার্সিটি এডমিশনের সময় বাবা অন্য ভার্সিটিগুলোর ফর্ম নিতে দিচ্ছিলেন না, বলছিলেন- ওসবে কালো রাজনীতি ছেয়ে গেছে, বুয়েটেই চান্স পেতে হবে, ওখানেই পড়তে হবে, ওখানে কালো রাজনীতি নেই। জানি, তুমি পারবা। পরবর্তীতে আমার বাবা আমার ওপর নির্যাতন দেখে ডুকরে কেঁদেছেন। আমি হাসিমুখে বলেছি- সব ঠিক হবে, আল্লাহ ভরসা, কোনো অন্যায় করিনি, আমার আল্লাহ সাক্ষী, আল্লাহই এর প্রতিদান দেবেন। 

এত নির্যাতনের পর আবার আমাকেই উলটো পুলিশে দেয়ার জন্য পুলিশ ডেকে আনে। কিছু শিক্ষক অনেক চেষ্টা করে আর অনেক অপমান সহ্য করেও তা থেকে বাঁচিয়ে নেন। ছাত্রকল্যাণ পরিচালক দেলোয়ার স্যারকে পরে অভিযোগ জানালে উনি বলেন- ওদের সাথে তাল মিলিয়ে চল না কেন? হায়রে!!!!! সেদিন চ্যালেঞ্জ করেছিলাম স্যারকে- এ রকম শুধু আমাকেই না, আরো ১৭ টি নির্যাতনের ঘটনা কিছুদিনেই ঘটেছে। অথচ যারা ভুক্তভোগী তাদের বিরুদ্ধে একটা মাত্র বুয়েটের শৃংখলা ভঙ্গ বা কারো সাথে ঝামেলার ঘটনার প্রমাণ দেন। আর যারা নির্যাতন করছে- তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে কত গুণ্ডামীর প্রমাণ লাগে বলুন। 

আমার বিরুদ্ধে আনা কোনো অভিযোগ ওরা প্রমাণ করতে পারেনি। কিন্তু আমার এই ছবিগুলো তখনই প্রচার হয় বলে ওরা এতে ব্যাপক ক্ষেপে যায়। পাশাপাশি বুয়েট শিক্ষক সমিতি এর বিচারের দাবী জানিয়ে লিখিত বিবৃতি দিয়েছিল। আমাকে ওরা এজন্য ক্যাম্পাসেই ঢুকতে দিতো না, মৃত্যুর হুমকি দিতো। এসব দেখে অন্য নির্যাতিত আরও অসংখ্য ছাত্র নির্যাতিত হলেও প্রকাশ করতো না। নইলে বুয়েটে পড়াশোনা কন্টিনিউ করাই সম্ভব হবে না ওদের। সেদিন দলকানা ছাত্রকল্যাণ পরিচালক চরম অসহযোগিতা করেছেন। পক্ষান্তরে নিরপেক্ষ শিক্ষকেরা অপমান সহ্য করেও আমাকে উদ্ধার করেছেন। দলকানা শিক্ষকেরা সব সময় স্বার্থবাদী হয়। আমি জীবন নিয়ে ফিরতে পারলেও আবরার জীবন দিল। এভাবে অপরাজনীতির শিকার আরও কত জীবন হবে তা ভাবা অসম্ভব। এসব অপরাজনীতি থাকলে ক্যাম্পাসে রক্ত ঝরবেই। তাই নির্যাতিত ছাত্র হিসেবে দাবী জানাই- ক্যাম্পাসে শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত হোক, ছাত্র এবং শিক্ষকদের রাজনীতি নিষিদ্ধ হোক। 

 

#৯

২৩ নভেম্বর ২০১৮, রাত ১১টা। পরেরদিন দিন আমার অপারেটিং সিস্টেম অনলাইন থাকায় আমি আর আমার রুমমেট হাসিব পড়তেছিলাম। হঠাত ১০-১২ জন আমার রুমে ঢুকে। তাদের মধ্যে ১৪ ব্যাচের ৫-৬ জন, ১৫ ব্যাচের ৩-৪ জন, বাকিরা ১৬, ১৭ ব্যাচের ছিল। ১৪ ব্যাচের মিনহাজ ভাই আমাদের জিজ্ঞেস করে, ‘তোরা কে কে হল হল ফেস্টের টাকা দিস নাই।’ আমাদের রুমের কেউই টাকা দিই নাই। আমি বললাম, ‘ভাই আমি হল প্রোগ্রামে থাকবো না তাই টাকা দিব না।’ ১৪ ব্যাচের বাধন ভাই বললো, ‘হল ফেস্টে থাকিস বা না থাকিস টাকা দিতে হবে।’  

‘ভাই আমি হল হল ফেস্টে থাকব না ত কেন টাকা দিব?’ 

মিনহাজ ভাই বলেন, ‘বেয়াদব, তুই কীভাবে আমাদের মুখের ওপর এইভাবে না করতে পারিস? রুমে বড় ভাই ঢুকা সত্যেও তুই কীভাবে পড়তেছিস। ( আমার ল্যাপটপ কোড রান করার জন্য ওপেন ছিল)। তুই কিভাবে এই হলে থাকিস আমি দেখে নিব। ফাহিম, (আমার উইং এর ১৪ ব্যাচের) ওর সব কিছু নামা রুম থেকে।’ 

তারপর ‘ফাহিম, ফাহিম’ বলে চিল্লাইয়া রুম থেকে চলে গেছে। ১৪ ব্যাচের সবাই আমার ওপর চিল্লাচ্ছিল, তখন কীভাবে আমি এইভাবে না করতে পারলাম। চিল্লানোর সাথে সাথে এত অশ্লীল ভাষায় গালাগালি করছিল যে এই ধরনের গালি আমি জীবনে মুখেও আনতে পারবো না। কিছুক্ষণ পর মেহেদী আর কায়েদ আমার রুমে ঢুকে জিজ্ঞেস করলো, কী বলছিলাম আমি।

আমি বললাম যে, ‘ভাই আমি হল কনসার্টে থাকবো না তাই টাকা দিব না।’ মেহেদী বললো, ‘তর এইভাবে বলা উচিত হয়নি।’ আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তুই থাকলে কীভাবে বলতি?’ সে কিছু বললো না। ১৫ ব্যাচের সবাই তখন আমার সাথে একমত হয় যে ১৪ ব্যাচের চিল্লাচিল্লি এখানে লজিক্যাল ছিল না। অনেকেই ওই দিন টাকা দেয় নি দেখে হয়তো তারা বেশি টেম্পার দেখাচ্ছে। 

সব কিছু ভুলে গিয়ে আমি পরেরদিনের জন্য পড়াশোনা করতেছিলাম। রাত তখন সাড়ে বারোটা। মেহেদী আর নিহাদ আমার রুমে এসে আমাকে রশিদ হল ৪০৫ নম্বর রুমে নিয়ে যায়। ওই দিন ফ্যাকাল্টি ফুটবল থাকায় হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল। তাই তারা আমাকে এক রকম কাঁধে করিয়ে নিয়ে যায়। যাওয়ার আগে আমি জিজ্ঞেস করি ‘ভাইদের কী হইছে? আমি কি এমন কিছু বলে ফেলছি?’ 

‘আমরা জানি নারে ভাই ওনারা কেন এরকম পিনিক দেখাচ্ছে।’ 

‘ভাই চল, ওনারা চিল্লাফাল্লা করবে পরে অনেক।’ 

আমি ভাবলাম হয়তো ধমক টমক দিবে হয়তো , বড়জোর দুই একটা চড় থাপ্পড় দিবে। এর চেয়ে বেশি কিছু আমি স্বপ্নেও ভাবি নাই। ৪০৫ নম্বর রুমে প্রবেশ করলাম। রুমে ছিল ৬ জন। সবাই ১৪ ব্যাচের। মিনহাজ (মেকা’১৪), অয়ন (সিভিল,১৪), ঝলক (সিভিল’১৪) , বাধন (সিভিল’১৪), সৌরভ (সিভিল’১৪) আর ফাহিম (মেকা’১৪)। মিনহাজ ভাই আমি জিজ্ঞেস করলো, ‘তুই আমাকে কী বলছিলি?’ এই বলে এত জোরে থাপ্পড় মারে যে, কেউ কখনো এত জোড়ে আমাকে মারে নাই। মিনহাজ ভাই আমাকে তার হাতে হয়রান হওয়ার আগ পর্যন্ত মারে। তারপর সে একটা স্ট্যাম্প নেয়। তার গায়ে যত শক্তি আছে সেই শক্তি দিয়ে ১৫-২০টা বাড়ি দেয় আমার বাম হাতে। স্ট্যাম্প ভাঙার আগ পর্যন্ত মারতে থাকে। এই বুঝি আমার বাম হাত যেন ভেঙে গেল। 

কান্না করার স্বভাব তেমন একটা ছিল না আমার। যেহেতু আমি কাঁদতেছিলাম না সেই কারণে তারা আরও বেশি হিংস্র হয়ে উঠে। ‘তুই কীভাবে আমার সাথে এইভাবে কথা বলছস। এখন পর্যন্ত কোনো সিনিয়র আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারে নাই। আর তুই আমার সাথে এইভাবে কথা বলছস।’ এই বলে আবার আমার মুখের ওপর চড় মারে। যখন শুনতে পায় যে আমার পায়ে সমস্যা আছে তখন তারা আমার বাঁ পায়ে আঘাত করে। আমার বাঁ পায়ের হাটুতে লাথি মারে। আমি মাটিতে পড়ে যাই। মাটিতে পড়ে যাওয়ার পরেও তারা আমার পায়ের ওপর লাথি মারতে থাকে। নতুন স্ট্যাম্প নিয়ে আবার মারতে থাকে। যখনই আমার পায়ে কেউ মারছিল, ব্যাথাটা এতই বেশি ছিল যে নিজের কাছে মনে হল, এই বুঝি আমি মারা যাচ্ছি। ব্যাথায় আমি চিল্লাচ্ছিলাম। মুখ দিয়ে রক্ত ঝড়ছিল। 

কান্না করে বলছিলাম, ‘ভাই আমাকে ছেড়ে দেন। ভাই আমাকে ছেড়ে দেন। ভাই আপনাদের কাছে হাত জোর করি ভাই আমাকে ছেড়ে দেন।’ সৌরভ ভাই বলে উঠল, ‘আজ পর্যন্ত কোনো জুনিয়রকে মারতে দেখছিস? তবুও কেমনে তুই আমাদের সাথে বেয়াদবি করছস? তর কি বড় ভাই নাই। বড় ভাই থাকলে এরকম করতি না।’ সৌরভ ভাই আরও অনেক আজে বাজে বকছে যে শুনলে যেকোনো মানুষের মাথা নষ্ট হয়ে যাবে। বাধন ভাই আমাকে থাপ্পড় মেরে একই রকম কথা বলে মজা নেয়। ঝলক ভাই আমাকে জিজ্ঞেস করছিল যে, ‘তুই কী বলছিলি।’ যখনই আমি উত্তর দিতে যাই তখন আমার মুখের উপর থাপ্পড় মেরে আমাকে মেঝেতে ফেলে দিত। মেঝেতে ফেলে আবার মারতো। মুখ থেকে বের হওয়া রক্ত যখন ওর হাতে লাগে তা আমার টিশার্টে মুছছিল। 

মিনহাজ ভাই একটু পর পর সবাইকে বলছিল, কেন তারা আমাকে মারছে না। মিনহাজ ভাই আমাকে মারছিল আর যখন টায়ার্ড হয়ে যেত তখন উঠে গিয়ে সিগারেট খেত। সিগারেট খেতে খেতে বলত, ‘ওই তোরা ওরে মারছ না কেন? ওই তোরা ওরে মারছ না কেন? আমার ত তারে খুন করতে ইচ্ছে করতেছে।’ এই কথা বলেই আমার মুখের ওপর লাথি মারতো। যখন ওর লাথির কারণে আমি মাটিতে পড়ে যেতাম আর আমার পা বের হয়ে যেত তখন আমার পায়ে লাথি মারত। পায়ে যখন মারত তখন মনে হত এই বুঝি মারা যাচ্ছি। ভাঙা পায়ে মার মানেই কলিজা যেন ফেটে যাচ্ছে। একটু পর অয়ন ভাই রুমে ঢুকে। ‘কীভাবে তুই আমাদের সাথে বেয়াদবি করিস? তোকে শিক্ষা দেওয়া লাগবে!’ এই বলে অয়ন ভাই আমার মুখে লাথি ঘুষি মারছিল। আমার দুই পা উঁচু করে স্ট্যাম্প দিয়ে মারতে থাকে। পায়ের তালুতে কিংবা হাটুতে। অন্যরা যখন মারছিল আমাকে তখন সে বলছিল, ‘পায়ের তালুতে মার। অন্য জায়গায় মারলে দাঘ থাকবে। এখানে মারলে দাঘ থাকবে না।’ 

মিনহাজ ভাই আর অয়ন ভাই পালাক্রমে মারতে থাকে। কখনো হাতে কখনো বা স্ট্যাম্প দিয়ে। একজন টায়ার্ড হলে অন্যজন আসে। আমি ব্যাথায় চিৎকার করতেছিলাম। সবার পায়ে ধরছিলাম । কিন্তু ওই রুমের কেউ আসেনি আমাকে মার থেকে বাঁচানোর জন্য। মিনহাজ ভাই জিজ্ঞেস করলো ‘ওই তোর ফোন দে!’ 

‘ভাই আমি ফোন আনি নি।’ 

‘ফোন আনিস নাই কেন?’ এই বলে আবার আমার মুখে লাথি মারে। রক্ত বের হয়ে ফ্লোরে পড়ে। মেহেদীকে ডেকে আমার রুম থেকে ফোন আর ল্যাপটপ আনানো হয়। ওরা আমার ফেসবুক প্রোফাইল চেক করে। কিছু না পেয়ে তারা আমার মেসেঞ্জার চেক করে। মেসেঞ্জারেও যখন কিছু পাচ্ছিল না তখন দেখে যে আমার সাথে কয়েকজন মেয়ের চ্যাট আছে। (যারা হয় আমার ব্যাচম্যাট না হয় সিনিয়র আপু। যাদের সাথে প্রয়োজন আর অপ্রয়োজনে কথা হত।) 

ফাহিম ভাই আমার চ্যাট পড়ছিল আর তা ব্যঙ্গ করে সবার সামনে তা উচ্চারণ করে হাসাহাসি করছিল। একটু পর বলে যে এই এই পোলা ত আওয়ামি লীগের পোস্টে হাহা দেয়। মিনহাজ ভাই বলে, ‘কত্ত বড় সাহস তুই আওয়ামী লীগের পোস্টে হাহা দেছ! শিবির তুই!’ আমি বললাম, ‘ভাই আমি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান। আমার চাচা একজন শহীদ।’ এরপর তারা একটু থামে । শেষ পর্যায়ে যখন ৩টা স্ট্যাম্প ভেঙে যায় তখন বাহির হতে হকিস্টিক আনে। আমি সবার পায়ে ধরে মাফ চাচ্ছিলাম। ওরা বলছিল, ‘তুই আজকেই হল ছেড়ে চলে যাবি।’ আমি রাজি হয়ে যাই, ‘জি ভাই আজই চলে যাব। আর আসবো না এই হলে।’ ওদের মনে দয়া হল। আমাকে ছেড়ে দেয়। 

যখন মেহেদী আর নিহাদ আমাকে নিতে আসে তখন বলে, ‘এই পোলা ১৩ ব্যাচের ওই পোলার মত, যারে আমরা আগের দিন মারার পর পরের দিন ক্লাস করতে গেছে।’ আড়াইটায় আমি রুম থেকে বের হই। রুম থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে ৪০৬ নম্বর রুমের ফাহিম ইইই’১৫ আমাকে তার রুমে নিয়ে বসায়। কয়েকজন ফ্রেন্ড মিলে আমাকে ডিএমসিতে নিয়ে যায়। ওখানে এক্সরে আর প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর বললো যে একজন অর্থোপ্যাডিক্স ডাক্তার দেখানোর জন্য। ডাক্তার বলে যে, আমার লিগামেন্ট ছিড়ে গেছে আর পায়ে ফ্র্যাকচার দেখা গেছে। ১ মাস হাঁটতে পারব না আর ৬ মাসের মতো ভারি কোনো কাজ করতে পারব না।

 

#১০

গত ডিসেম্বরে নির্বাচনী ইশতেহার আসার পর যখন সমাবেশ করা হয় সেখানে আমি যাই নি। ১৭ ব্যাচের অনেকেই যায় নি, তাই সবাইকে ছাদে তোলা হয়েছিল। আমি ওইদিন একটা প্রজেক্টের কাজ করেছি সারাদিন । ক্লান্ত হয়ে রুমে এসে ঘুমায়ে গেছি। রাত ২টার দিকে কিছু ছেলে এসে বলে, ১৭ ব্যাচের সবাইকে ছাদে যেতে বলছে। ঘুম থেকে ডেকে নিয়ে গেছিল ওইদিন। সবাইকে জিজ্ঞেস করছিল যে কোথায় ছিল । যারা বলেছে টিউশনিতে গেছিল তাদের প্রচুর মারছে। আমাকে দেখে সকাল (খুনির আসামিদের একজন) চিল্লায়ে উঠে বলছে যে, ‘এই যে এতো দিনে পাওয়া গেছে!’ 

আমি এর আগে কখনো র‍্যাগ খাই নি । ১-১ (ফার্স্ট ইয়ার ফার্স্ট সেমিস্টার) এ ডেঙ্গু হইছিল বলে ১-২ (ফার্স্ট ইয়ার সেকেন্ড সেমিস্টার) এর শুরু থেকে খালা বাসায় থাকতাম। ওইদিন প্রথম পাইছে আমাকে। আমার চুল ধরে টান দিল একজন । পিছনে ছিল চেহারা দেখি নি । আর ফারহান জাওয়াদ চৌধুরী আমার পাছার উপরে স্টাম্পের বাড়ি দিল ৩-৪টা। প্রথমে ব্যথা লাগে নি, পরে আস্তে আস্তে বুঝসি। কিছুদিন ঠিকমতো বসতে পারতাম না। তারপর আশিকুল ইসলাম বিটু আমাকে চড় মারতে আসলো এই বলে যে আমি নাকি সালাম দেই না। সে চড় মারতে যাচ্ছিল তখন আসিফ রায়হান মিনার, তৌফিকুর রহমান শুভ থামায়ে দিয়ে আমাকে সরায়ে দিল। 

এর ঠিক পরপরই অমিত সাহা হঠাৎ করে শাখাওয়াত অভিকে মারতে শুরু করল সালাম না দেওয়ার জন্য । মারতে মারতে যখন অভি ব্যাথায় হাত ধরে বসে তখন সব জানোয়ারগুলা বলে যে, সে নাকি নাটক করেছে । তারপর একজন ওর হাত ধরতে গিয়ে দেখে খুব বাজে অবস্থা হাত ফুলে গেছে । ওকে হাসপাতালে নিয়ে যায় আর আমাদেরকে ছেড়ে দেয় ।

 

# ১১ 

আমার সাথে ঘটনাটা ঘটে ২০১৮ সালের এপ্রিলের ১ম সপ্তাহে। তখন সেটা ছিলো বুয়েটে আমার প্রথম সপ্তাহ ক্লাস। আর আমি ক্লাস করতাম বাসা থেকে। তাই হল সম্পর্কে আমার কোন ধরনের আইডিয়াই ছিলো না তখন পর্যন্ত। তো নতুন ক্যাম্পাসে তখন কারো সাথে ঠিক মতো বন্ধুত্বও গড়ে উঠেনি। তো আমাকে ডাকা হয় বুধবার আমাদের ক্লাস শেষে। আর সেদিন আমাদের কিছু বই কিনার জন্য ক্লাস শেষে নীলক্ষেত যাই। তো ব্যস্ততার কারণে লাঞ্চও করা হয়নি। আর একটা আতংক তো ছিলোই কী করা হয় না হয়! তো, ক্যাম্পাস থেকে ফোন দেয়ায় ছাত্রলীগের স্টুডেন্ট দ্বারা। তারা বলে তাড়াতাড়ি আসতে। মূলত আমাকে ডাকা হয়েছিলো আমার একটা কমেন্টের জন্য। যেটা বুয়েট সংশ্লিষ্ট কোন পেজেই আমি করি নাই বা সরকারের বিরুদ্ধেও কিছু বলি নাই, ছাত্রলীগের বিরুদ্ধেও কিছু বলি নাই, বুয়েটের বিরুদ্ধেও কিছু বলি নাই। 

আমাকে হলে আনা হলো। এর নেতৃত্ব দিয়েছিলো সিভিলের ১৬ ব্যাচের এ সেকশনের আবরার ও তৌসিফ। তো যথারীতি আমাকে শেরে বাংলা হলে নিয়ে যেতে বলে ১৭ ব্যাচের এক ছেলেকে দিয়ে। সাথে তখন তৌসিফ, আবরার আসে নাই। শেরেবাংলা হলের এক রুমে নিয়ে বসানো হলো। সেখানে ভাইরা কিছু প্রশ্ন করলো সিগারেট খাই নাকি, প্রেম করি নাকি, নামাজ পড়ি নাকি, কোন দলের সাথে ইনভলভ আছি নাকি। আরো অনেক প্রশ্ন করে। তো যেই ভাইটা আমাকে জেরা করেছিলো ওনার পার্ট ওখানেই শেষ। পরে উনার সাথে আরেকটা সিনিয়র ছিলো ১৫ ব্যাচের, সে আমাকে অন্য রুমে নিয়ে যায়। তখন সেই রুমে আগে থেকেই ৩ জনের মতো ছিলো। পরে আরো কয়েকজন প্রবেশ করলো আবরার আর তৌসিফসহ। তখন আমার মেন্টালি খুব বাজে অবস্থা ছিলো। কারণ জীবনে কোনদিন এমন কোন কিছু আগে ফেস করি নাই।

তো রুমের দরজা অফ করে দিলো সবাই সিগারেট ধরালো। স্ট্যাম্প ছিলো খাটের নিচে, সেটা বের করলো। তো প্রথমে কী জন্য কমেন্ট করেছি সেই জন্য জেরা শুরু করলো। পরে মোবাইল চাইলো, ফেসবুকে ঢুকলো। অনেক খোঁজাখুঁজি করার পরও কোন রাজনৈতিক দলের সাপোর্ট করা বা তাদের কোন পেজে লাইক কমেন্ট কিছুই পেলো না। তারা আমাকে শিবির বানানোর অনেক চেষ্টা করেছে। তখন তারা বলতেছে, ‘কিছুদিন আগে ক্যাম্পাসে দিনে দুপুরে ক্লাস চলাকালীন শিবির ধরছিলাম আমরা। তাকে ইচ্ছামত পিটায়া ক্যাম্পাস ছাড়া করেছি। কোন স্যার তাকে যে বাচাতে আসবে সে সাহস করে নাই। প্রশাসনও আমাদের কিছু করতে পারে নাই।’ 

পরে যাই হোক, কোন ভুল না পেয়ে এরপর শুরু হলো এসব জানোয়ারগুলোর বেধে দেয়া রুলস বলতে শুরু করা। যা হলে না থাকার কারণে আমি জানতাম না। সিনিয়রদের সামনে কীভাবে দাঁড়াতে হয়। দুই হাত টান করে নিচের দিকে মাথা নুইয়ে রেখে। সিনিয়ররা ভুল কিছু বললে বা অপবাদ দিলেও চুপ করে থাকা।

তখন শুরু হলো তাদের মাইর। প্রথমে থাপ্পড়। একেকটা থাপ্পড়ে আমি চোখে ঘোলা দেখছি। এভাবে প্রথমে একচোট মারলো আবরার। সে ১২-১৪ টা থাপ্পড় দিয়েছে। পরে তার পালা শেষ। এরপর আসলো ফিফটিনের একজন। সে স্ট্যাম্প দিয়ে কতক্ষণ পিটালো, ‘তোর ব্যবহার ঠিক না।’ এই সেই বলতে লাগল। বাড়িগুলো দিয়েছে তার সব শক্তি প্রয়োগ করে। তখন আবরার বের হয়ে যায়। আর সেখানে উপস্থিত সবাই সিগারেট খাচ্ছিলো। কেউ গান শুনছিলো। কেউ মোবাইল চালাচ্ছিলো। আর আমার অসহায়ত্ব দেখে তারা হাসছিল।

এরপর আসলো তৌসিফ। তার এক একটা থাপ্পড় যেনো বজ্রধ্বনির মতো কানে এসে বাজছিল। সে থাপ্পড় দিচ্ছিলো কন্টিনিউয়াসলি।আনলিমিটেড দিলো।তারপর রুমে বাইরে থেকে আসলো আরেকজন। তাকে চিনি না। সে কয়েকটা দিলো। তারপর আবরার আসলো আবার সে সিগারেট খেতে খেতে ডুকতেছিলো। সে সিগারেটটা আরেকজনকে দিয়ে আরেক চোট দিলো আমাকে। পরে তৌসিফ এসে আবার মারলো। এভাবে পালাক্রমে তাদের হিংস্রতা অনেকক্ষণ চলতে থাকলো। তাদের দৃষ্টিতে ,একটা প্রশ্ন করেছে এইটার এন্সার দেয়া ঠিক হয় নাই। ভুল হলে সরি বলা যাবে না। তারপর মারার সময়ও মাথা নিচের দিকে থাকতে হবে। তাদের দিকে তাকানো যাবে না। তাদের সামনে কথা বলার সময় সোজা থাকতে হবে। হাত নাড়ানো যাবে না। প্রশ্নের এন্সার দিলে মাথা নিচু করে দিতে হবে। আরো কত গাজাখুরী নিয়ম যে সেদিন দেখলাম। প্রত্যেকটা নিয়মের জন্য আমাকে মারা হইছে। 

পরে তারা যখন দেখল আমাকে মেরেও আমার কথা বলার সময় দৈহিক মুভমেন্ট  সংশোধন করতে পারছে না তখন তারা বলে, ‘তোরে আর মেরে লাভ নেই। অনেক মারছি। আমাদের নিজেদেরই হাত ব্যথা হয়ে গেছে।’ পরে তারা বললো, ‘তোরে আজকে এতো মারছি একমাত্র তোর এটিচিউড এর কারণে অন্য কোন কারণে না। এমন পোস্ট এমন অনেকেই করে। পরে তারা তাদের নাম্বার দেয়।’ জানাল পরের দিন(মানে শনিবার) তাদের এসে কল দিতে। কিন্তু আমি মনে মনে বলি ‘তোদের আর কল দিছি আমি!’ 

এরপর তারা জিনিসটা আর বড় করে নাই। ওইখানেই শেষ করে দিছে। তারা ভুলে গেছে। কারণ তাদের কাছে তখন এইগুলো পানিভাতের মতো হয়ে গেছে। কিন্তু তারা শেষ করে দিলেও তো আমার শেষ হয়ে যায় নাই। আমার টানা দুইদিন প্রচন্ড মাথা ব্যাথা ছিলো। আর পায়ে স্ট্যাম্পের বাড়ি দেয়ার কারণে ওই জায়গাগুলো ব্যথায়, ফুলে রক্ত জমে গিয়েছিলো। অনেকদিন সুস্থ স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে পারি নাই। আর মানসিকভাবেও অনেক বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। আর পড়ালেখাতেও বাজে ইফেক্ট পড়ে। যা এখনো রিকভারি করতে পারি নাই ঠিক মতো। 

সেদিন রুমে যারা ছিল প্রত্যেকেই ছাত্রলীগের হলের বিভিন্ন পোস্টধারী। আমার হায়াত ছিলো বলেই আমি আবরার ফাহাদ হই নাই। এই তৌসিফ,আবরারদের এত সাহস আসে কোথা থেকে? অবশ্যই পলিটিকাল ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে। না হলে তাদের কখনোই সাহস হতো না। তাই ভিকটিম হিসেবে সকলের নিকট আবেদন বুয়েট ক্যাম্পাস থেকে সকল ধরনের ছাত্ররাজনীতি চিরদিনের জন্য নিষিদ্ধ করতে হবে এবং এর যথাযথ প্রয়োগ দৃশ্যমান হতে হবে এবং সাধারণ স্টুডেন্টদের একটা দল থাকবে যারা এইসব আবরার, তৌসিফদের প্রতিহত করবে। ক্যাম্পাসকে সন্ত্রাসমুক্ত রাখবে। ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি কঠোর আইন করে বন্ধ না হলে এরকম আবরার তৌসিফরা আসতেই থাকবে। আর সনি আপু, আবরার ফাহাদদের লাশ আর আমাদের মতো ভিক্টিমদের সারি আরো দীর্ঘ হতে থাকবে।

 

১২#

অংশগ্রহণকারী: ১। জাওয়াদ, ১২ ব্যাচ ২। শুভ্র জ্যোতি ৩। সিয়াম, ০৯ ব্যাচ (ডিস্ট্রাকটিভ সিয়াম নামে পরিচিত) ৪। শুভম, ০৯ ব্যাচ (সিগমাইন্ড নামে এক কোম্পানি খুলেছে সে আর সিয়াম মিলে) ৫। কাজল, ০৯ ব্যাচ ৫। রাসেল, ১০ ব্যাচ (পরবর্তীতে অনুতপ্ত হয়ে তাবলীগে যোগ দিয়েছে) ৬। কনক, ১০ ব্যাচ ( সাবেক সাধারণ সম্পাদক, শিক্ষক লাঞ্ছনার দায়ে বহিষ্কৃত) ৭। টি আর, ১১ ব্যাচ (আসল নাম তানভির রায়হান) 

আমাকে তিতুমীর হলের ২০০৬ নাম্বার রুমে ডেকে নিয়ে যায় ১২ ব্যাচের জাওয়াদ। আমার কোন ধারণাই ছিল না কেন ডাকা হয়েছে। সেখানে ০৯ এর শুভ্র টিকাদার, ০৯ এর সিয়াম, ০৯ এর শুভম , ১০ ব্যাচের কনক, রাসেল আর ১১ ব্যাচের তানভীর রায়হান (টিআর নামে কুখ্যাত) আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। কোন তথ্য প্রমাণ ছাড়াই আজগুবি ভাবে আমি শিবির করি এটা প্রমাণ করার জন্য আমাকে টর্চার করে। প্রথমে তানভীর আমাকে গালে প্রচন্ড এক থাপ্পড় মারে। আমার মাথা ঘুরে যায় এত জোড়ে থাপ্পর খেয়ে, ঠোঁট কেটে যায়। 

এটা ওদের টেকনিক। আচমকা আঘাত করে টর্চারের মুড ক্রিয়েট করে। এরপর তানভীর আমার বুকে প্রচন্ড এক লাত্থি মারে। আমি মেঝেতে পড়ে যাই। কেউ এসে তোলে আমাকে। এরপর আমাকে জোর করে স্বীকার করতে বলে যে আমি শিবির করি। স্বীকার না করলে আমার মাথায় একটা বস্তা পরিয়ে দিয়ে বেঁধে দেয়া হয়। এরপর শুধু মুহুর্মুহু রডের বাড়ি পড়তে লাগল পিঠের উপরে। একজন মনে হয় টায়ার্ড হয়ে রডটা রাখতেই আরেকজন রড হাতে তুলে নেয়। এভাবে থেমে থেমে প্রায় ১ ঘন্টা বস্তাবন্দী হয়ে মার খেয়েছিলাম। 

এভাবে আমি যখন জ্ঞান হারানোর কাছাকাছি চলে গেছি তখন শুরু হয় আরেক টেকনিক। এবার মাথা থেকে বস্তা খুলে একজন এসে খুব আদর করে আমাকে রক্ষা করার ভান করে। বলে যে, ‘আমি শিবির করি’ এটা বললেই ও আমাকে অন্যদের থেকে বাচিয়ে নিবে। কিন্তু আমি আল্লাহর রহমতে ঘোরের মধ্যেও বুঝতে পারি এটাও ওদের চাল। এরপরে আবার মার দিতে থাকে। এক পর্যায়ে আমাকে ক্রসফায়ারে দেয়ার হুমকি দেয়। শূভম এসে আমার পা ভেংগে ফেলার পরামর্শ দেয়। পরামর্শ শুনে কাজল আর রাসেল মিলে আবার পূর্নোদ্যমে আমার পা লক্ষ্য করে রড দিয়ে পিটানো শুরু করে। একপাশ হয়ে যাওয়ায় সব মার এসে লাগে বাম পায়ে। 

একপর্যায়ে আল্লাহপাক মুখ তুলে তাকায়। ওরা কোন কারণে আমার উপরে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। আমাকে চলে যেতে বলে। আমি আমার কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। যাওয়ার সময় হলের গেটে আমাকে বলে, ‘কেউ জিজ্ঞেস করলে বলবি রাস্তায় এক্সিডেন্ট করছিস।’ পাঁচবার আমাকে দিয়ে মিথ্যা উত্তর প্র্যাকটিস করিয়ে যখন ছেড়ে দেয় তখন রাত ৩টা। আমি এখন কোথায় যাব হল থেকে? কোন রিকশাও পাওয়া যাচ্ছে না। শরীরে একফোটা শক্তি অবশিষ্ট নেই। কিন্তু যত দ্রুত পারা যায় ওদের দৃষ্টির সীমানা থেকে চলে যেতে চাচ্ছিলাম, যদি আবার সেই জাহান্নামে ডাকে! খুড়িয়ে খুড়িয়ে তিতুমীর থেকে বের হয়ে পলাশীর কাছে এসে একটা রিকশা ডাকি শরীরের সব শক্তি জড় করে। তারপর আমার চাচার বাসায় চলে যাই। এরপরের বুয়েটের বাকি সময়টা একটা ট্রমা নিয়ে কাটিয়েছি। কোন আনন্দ উল্লাস কাজ করেনি, ক্যাম্পাস লাইফ নিয়ে কোন ভালবাসা কাজ করেনি। ঘৃণা আসত নির্লিপ্ত স্বার্থপর সব বুয়েটিয়ানের দিকে তাকালে।

 

১৩# 

বুয়েট রশীদ হল ছাত্রলীগের সদস্যদের জন্য কিছু ঘুষি মারার পাঞ্চিং ব্যাগ দরকার। ১১ ব্যাচের মোহাম্মদ আফজাল হোসেন পরোক্ষভাবে আমার রুমমেটের মাধ্যমে আমাকে হুমকি দিয়েছিল। আমার রুমমেটকে সে বলেছিল, তোমার রুমে একজন শিবির আছে। আমরা তাকে সাইজ করব। 

 

১৪# 

আমরা তিতুমীর হলের ১৮ ব্যাচ। হলে উঠার পর থেকেই নিয়মিত আমাদের টর্চার করা হতো। থাপ্পড় মারা, ক্লাসমেটকে দিয়ে আরেক ক্লাসমেটকে মারা, অসংখ্যবার কানধরে উঠবোস যা করতে করতে আমরা হাঁটতেও পারতাম না কয়েকদিন। কিন্তু একবার আমি ও আমার কয়েকজন হলমেটকে ছাদে তোলা হয়। আমাদের একজনের দোষ ছিল, সে কমনরুমে বড় ভাইদের না বলে মা-বাবা নিয়ে বসেছে। আরেকজন লীগের মিছিলে না গিয়ে মুভি দেখতে গিয়েছিল। একজন টিউশনিতে ছিল, অন্য একজন ডিপার্টমেন্টে বড় ভাইকে সালাম দেয় নাই। 

এরপর ১৭ ব্যাচের ভাইরা আমাদের সবাইকে অমানবিকের মতো স্ট্যাম্প দিয়ে মারতে থাকে। আমাদের ইইই-এর এক ফ্রেন্ড মার খায় সবচেয়ে বেশি, কারণ সে মার খেয়ে টলে পড়ছিল না। ইভেন ভাইরা এটাও বলে যে, ‘শালা ব্যায়াম করে,ব্যায়াম করা শরীরে পিটায়া শান্তি।’ এরপর আমাদের সবাইকে একে একে প্রচন্ড মারে। অনেকে কেঁদে ফেলে তবুও ভাইরা থামে না। এটার পর আমরা সবাই প্রায় সপ্তাহ খানিক ঠিকঠাক চলতে পারিনি। ভাইরা এ সময় আমাদের একফোঁটাও খোঁজ নেয়নি। আর আমাদের হলে সবাই কোনো না কোনো সময় প্রচন্ড মার খেয়েছেই। হল ছেড়েও গেছে মার সহ্য করতে না পেরে।

 

১৫# 

আহসানুল্লাহ হলে ১৮ ব্যাচের রিয়াজকে ১৭ ব্যাচের প্লাবন বুয়েটে ক্লাস শুরু হওয়ার পর থেকেই হলের ছাদে তুলে প্রায় মারত। প্লাবন অন্য ১৭ ব্যাচের ছাত্রদেরকে রিয়াজের ব্যাপারে বলেছিল। রিয়াজ যখন ১৭ ব্যাচের ছাত্রদের সাথে রুমে দেখা করতে যেত তখন তাকে রুমে ঘন্টার পর ঘন্টা আটকে রেখে মজা নিত। এই প্লাবনের বিরুদ্ধে সামান্য সালাম না দেওয়ার কারণে মারার অভিযোগ আছে। যেদিন অভিজিতের কানের পর্দা ফটিয়ে দেওয়া হয়, সেদিন রাতেই এক ছেলেকে প্লাবন থাপ্পর মারে তাকে সালাম না দেওয়ার কারণে। আরেক ছেলেকে থাপ্পর মেরেছিল হাফ প্যান্ট পরে টয়লেট যাওয়ার কারণে। 

১৫১৩ পঠিত ... ২০:৩২, অক্টোবর ০৯, ২০১৯

আরও eআরকি

 
 

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top