নর্দার্নদের কোনো কমনসেন্স নেই : একান্ত সাক্ষাৎকারে আপোষহীন নেত্রী ডেনেরিস টারগেরিয়ান

৩৩০১ পঠিত ... ১৫:৩২, আগস্ট ০৮, ২০১৭

সিজন সেভেন এপিসোড ফোরের আগে আগে নৌকা থেকে যখন নুড়িপাথর ভরা সৈকতে পা রাখলাম, তখন সূর্যটা ঠিক মাথার উপরে, গনগনে তাপের সাথে আকাশে যেন রঙিন দ্যুতি ছড়াচ্ছে। সমুদ্র সৈকতের ঠান্ডা বাতাসটাও মন্দ না। বলা যায় অনেকটা নির্ঝঞ্ঝাটেই ন্যারো সি পারি দিয়ে ড্রাগনস্টোনে পা রাখলাম আমরা eআরকি সাক্ষাৎকার টিমের দুই সদস্য। উদ্দেশ্য এ সময়ের জীবন্ত কিংবদন্তি আপোষহীন জননেত্রী, ডেনেরিস অব দি হাউজ টারগেরিয়ান, দ্য ফার্স্ট অব হার নেম, দ্য আনবার্নট, কুইন অব দি আন্দালস, দ্য রয়নার এন্ড দি ফাস্ট মেন, কুইন অব মিরিন, খালিসি অব দ্য গ্রেট গ্রাস সি, প্রটেক্টর অব দ্য রেলম, লেডি রেগনেন্ট অব দি সেভেন কিংডম, ব্রেকার অব চেইন এন্ড ড্রাগনমাতা ড্যানি আপার সাক্ষাৎকার নেওয়া।

অনেক উঁচুতে দেখা যাচ্ছে ড্রাগনস্টোন ক্যাসেল, ওয়েস্টেরসের টারগেরিয়ান রাজত্বের এক উজ্জ্বল নিদর্শন। মুগ্ধতা কাটিয়ে আমরা এগিয়ে গেলাম দ্বীপের ভেতরের দিকে, আমাদের রিসিভ করতে সেখানে ছিলেন ‘দি ইম্প’খ্যাত টিরিয়ন ল্যানিস্টার ও ঝাঁকড়া চুলের সুন্দরী দোভাষী মিসানদেই। শুরুতেই আমাদের অবাক করে দিয়ে স্পষ্ট বাংলায় মিসানদেই বললেন, ‘ড্রাগনস্টোনে স্বাগতম’। বুঝলাম হাই ভ্যালিরিয়ান থেকে বাংলা পর্যন্ত সব ভাষাই নাথ এর এই সুন্দরীর নখদর্পনে। [এর পরবর্তী সকল কথোপকথনই ‘কমন টাং’ অর্থাৎ ইংরেজিতে। পাঠকদের জন্য সেগুলো অনুবাদ করা হলো।] টিরিয়ন তার বন্ধুত্বসূলভ সারকাস্টিক হাসি দিয়ে বললেন, ‘ন্যারো সি পারি দিয়ে এতদূর আসতে কোন সমস্যা হয়নি তো? অবশ্য শুনেছি আপনাদের ঢাকা টু বরিশাল লঞ্চযাত্রার অভিজ্ঞতা থাকলে আর কোনো সাগরযাত্রাতেই সমস্যা হওয়ার কথা না।' হেসে জানালাম, বহাল তবিয়তেই এসেছে। অবশ্য মনে মনে বললাম, বরিশাল কেন? আমরা ঢাকার মানুষ, আমাদের মালিবাগ মহাসাগরের কাছেই এই সরু সমুদ্র নস্যি।

মাদার অব ড্রাগনের এই দুই ঘনিষ্ঠ সহচরের সাথে জনা বিশেক ডথরাকি রাইডারদের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে আমরা রওনা দিলাম ড্রাগনস্টোন ক্যাসলের দিকে। পাহাড়ে পাথরের মাঝে খাজ কেটে বানানো বিশাল সিড়ি। হাঁটছি সেটা ধরে।মিসানদেই জানালেন, ড্যানি আপা কিন্তু এখন ক্যাসেলে নেই, সত্যি বলতে এই দ্বীপেই নেই। ড্রাগনের পিঠে চড়ে একটু ঘুরতে গেছেন, সামনে কতো বড় যুদ্ধ, বোঝেনই তো। ড্রাগনগুলোরও তো একটু প্র্যাকটিস দরকার। তবে আপা আপনাদের থ্রোনরুমে অপেক্ষা করতে বলেছেন, তিনি ওখানেই আসবেন।'

এ কথা শুনে প্রশ্ন করলাম, ‘ওহ, তাহলে আর কে আছে এই দ্বীপে?’

এবার জবাব দিলেন টিরিয়ন, ‘উত্তরার মেয়র জন স্নো আছেন, সাথে সের ডেভোস সিওয়ার্থ।’

শুনে আমরা উত্তেজিত হলাম। কে জানে, এ সুযোগে যদি এদেরও একটা ইন্টারভিউ করে ফেলতে পারি! জন স্নোর স্বতন্ত্র আন্দোলনের কথা কে না জানে? আর সের ডেভোস তো পুরো ওয়েস্টেরস ও এসোসজুড়ে বিখ্যাত তার মোটিভেশনাল স্পিচের জন্য। বর্তমানে আমাদের দেশের অনেক ফেসবুকার ও ইউটিউবারও স্যার ডেভোসকে গুরু মেনে নিজেদের মোটিভেশনাল স্পিকিং কোর্স শুরু করেন বলে শোনা যায়।

আর কিছু সিড়ি বাকি ক্যাসেলে ঢুকতে, লর্ড টিরিয়নকে জানালাম, eআরকি থেকে আমাদের ইচ্ছা আছে কুইন সার্সিরও একটা ইন্টারভিউ নেওয়ার, এ ব্যপারে তার কোন পরামর্শ আছে কিনা। টিয়িয়ন গম্ভীরমুখে জবাব দিলেন, ‘পরামর্শ আর কী? পরামর্শ একটাই, ঘাড়ের উপর এক কল্লা নিয়ে ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছেন, এভাবে ইন্টারভিউ শেষেও যেন ঘাড়ের উপর এক কল্লা নিয়ে সহীহ সালামতে ফেরৎ আসতে পারেন, সে চেষ্টা করবেন।’

জিজ্ঞেস করলাম, 'সম্ভ্রান্ত ল্যানিস্টার বংশের টিরিয়ন ল্যানিস্টার আজ আক্ষরিক অর্থেই কুইন ডেনেরিসের ডান হাত। এর পেছনের কাহিনীটা কী? জবাব দিলেন, ‘সে এক লম্বা কাহিনী। কিন্তু সত্যি বলতে, আই ডোন্ট রিমেম্বার মাচ, আই ওয়াজ ড্রাংক মোস্ট অফ দ্য টাইম থ্রু ইট।’

কথা বলতে বলতে পৌছে গেলাম ক্যাসেলের দোরগোরায়। চকচকে টাক মাথার ও তেলতেলে চেহারার এক ভদ্রলোক জামায় দুই হাত একত্র করে সম্ভাষণ জানালেন আমাদের। বুঝলাম, এ-ই সেই ভ্যারিস দ্য স্পাইডার, মাস্টার অফ হুইস্পারার্স। পথ দেখিয়ে থ্রোনরুম পর্যন্ত নিয়ে গেলেন আমাদের, ভয়ংকর দর্শন সব ড্রাগনমূর্তি পেরিয়ে অন্ধকার পাথুরে থ্রোন রুমে ঢুকলাম আমরা। এই রুমে আসলেই কেন যেন একটা অস্বস্তি হয়। উপরের ঝড়কা দিয়ে আলো আসছে, কক্ষের এক প্রান্তে ড্রাগনগ্লাসের উঁচু থ্রোন।

এমন সময় প্রচন্ড ডানা ঝাপটানোর শব্দ পাওয়া গেলো, মনে হলো রুমটা যেন একটু কেঁপে উঠলো। ইঞ্জিনের তীব্র শব্দের মতো এক জান্তব চিৎকার ভেসে আসে। বুঝলাম, নিজের সাওয়ারি নিয়ে নেত্রী হাজির। কিছুক্ষণ পরেই নিজের রাজকীয় কালো পোষাক ও উজ্জ্বল শুভ্র চুল নিয়ে কঠিন ও ভারিক্কি চালে প্রবেশ করলেন কুইন ডেনেরিস স্টর্মবর্ন। প্রথমেই দুঃখ প্রকাশ করলেন এতক্ষণ অপেক্ষা করানোর জন্য, ‘ড্রোগোনটা অনেক দুষ্টূ হয়েছে, বোঝেনই তো। এতোকাল তো শুধু ওড়াওড়িই করতো, এখন একটু আধটু ফায়ারব্রিদিং প্র্যাকটিস করাচ্ছি, কখন লাগে বলা তো যায় না। কিন্তু বেয়াদবটা শিখতেই চায় না। সেজন্যই দেরি হলো।’ 

'আচ্ছা, তাহলে এবার দেরী না করে সরাসরি প্রশ্নে চলে যাই।' বললাম আমরা। ‘এতো বছর পর নিজের জন্মভূমিতে ফিরে এসেছেন, কেমন লাগছে?’

‘দেখুন, আসলে আমি তো ভ্যাকেশনে আসিনি, এসেছি আমার অধিকার আদায় করে নিতে, টু টেক হোয়াট ইজ মাইন।’ পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন ড্যানি, ‘এখন এখানে রোমান্টিসিজমের দাম নেই, আমার উদ্দেশ্য আগে সফল করতে হবে। আপনাদের কবি সুকান্তই তো বলেছেন, ‘ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য।’--একটু থেমে সাথে আরও যোগ করলেন, ‘তবে যদি বলতেই হয়, তাহলে বলবো ভালোই লাগছে। ভাবতেই অবাক লাগে এই বিশাল বড় প্রাসাদে এক ঝড়ের রাতে জন্মেছিলাম আমি। জানেন বোধহয়, সেজন্যই আমার নামের পদবী স্টর্মবর্ন।'

নামের কথা থেকেই পরের প্রশ্নটা করলাম আমরা, ‘নামের বিষয়টা যখন উঠলোই, তখন প্রশ্নটা করেই ফেলি। এই যে আপনার সম্পূর্ণ নাম, পদবী ও উপপদবী--এসব মিলিয়ে এতো বড় নাম, এতো বড় নাম নিয়ে অস্বস্তি লাগে না?'

উত্তরে ডেনেরিস বললেন, ‘অস্বস্তি লাগবে কেন? নাম আভিজাত্যের প্রতীক। ভুলে যাবেন না, আমি একজন রাজকীয় পরিবারের সন্তান, আমার নামেই আমার অভিজাত পরিবারের নিদর্শন চলে আসে। এছাড়া বলা হয় মানুষ বাঁচে তার কর্মে, তাই আমি আমার সকল কর্ম নামের উপপদবী হিসেবে যোগ করে রেখেছি। এতে মানুষ বুঝতে পারে আমি শুধু নামে নই, কাজেও বিশ্বাসী।’ এরপর একটু হেসে যোগ করলেন, ‘আচ্ছা অফ দ্য রেকর্ড বলে রাখছি, আমার নিজেরই আসলে ঠিক পুরো নামটা মনে থাকে না। মিসানদেই-ই সবার সামনে আমার পরিচয় করিয়ে দেয় নাম বলে, মেয়েটার ব্রেইন বেশ শার্প। ছোটবেলায় নিশ্চয়ই দুধের সাথে হররলিকস খেতো।’

পরের প্রশ্ন করলাম, ‘আপনার ড্রাগনদের সম্পর্কে জানতে চাই।’

‘ওদের ব্যপারে আর কি বলবো, আপনারা তো সবই জানেন। ফেসবুকে এই তিন ভাইয়ের ফ্যান পেইজে এতো লাইক! সবাই ওদের বেশ পছন্দ করে, আমাদের প্রডিউসারার দেখছি কারি কারি টাকা ঢালছে ওদের পেছনে। আমাদের টারগেরিয়ানদের হাউজ সিজিলও কিন্তু থ্রি হেডেড ড্রাগন, এজন্যই টারগেরিয়ানদের দেখে লোকে বলতো ‘ওরা মানুষ না, ওরা ড্রাগন’। আর আপনারা সবাই-ই তো জানেন যে আমিই একমাত্র এবং সর্বশেষ জীবিত টারগে...’

এমন সময় ‘ইয়োর গ্রেইস’ ডাকে বাধা পড়ে যায় ড্রাগনমাতার ঈষৎ দম্ভ মাখা আত্মকথা। পেছনে তাকিয়ে দেখি হাজির হয়েছেন আর কেউ নন, স্বয়ং কিং ইন দ্য নর্থ জন স্নো। লম্বা চুলগুলো মাথার পেছনে বেঁধে রাখা ধূসর পোশাকের জন বললেন, ‘ইয়োর গ্রেস, আইম সরি টু ইন্টারাপ্ট, কিন্তু আমাদের এখনই ড্রাগনগ্লাস উত্তোলন ব্যবস্থা শুরু করা উচিৎ। ক্যাসেল ব্ল্যাক থেকে আরও একটা চিঠি পেয়েছি, দ্য আর্মি অব ডেড ইস কামিং ইয়োর গ্রেস।’

ডেনেরিস বিরক্তিমাখা কণ্ঠে বললো, ‘দেখছেন না সাংবাদিক এসেছেন। একটা জরুরী ইন্টারভিউ দিচ্ছি? এমনিতেই এখন ফর্মে নাই, দর্শকরা দিন দিন বিরক্ত হচ্ছে। এ সময় এ ইন্টারভিউ ক্যান প্লে গ্রেট রোল। যাই হোক, আমি আপনার সাথে পরে মিটিং এ বসবো।’

এ কথা শুনে জন স্নো আমাদের একবার দেখে বেরিয়ে গেলেন থ্রোন রুম থেকে। ড্যানি কৈফিয়তের সুরে বললেন, ‘এইসব নর্দানদের নিয়ে আর পারা গেলো না। কোনো কমনসেন্স নেই।’

আমরা অপ্রস্তুত হয়ে বললাম, ‘না কোনো সমস্যা নেই। আমরা আর বেশি প্রশ্ন করবো না। আচ্ছা, কুইন সার্সিকে আপনি অপনেন্ট হিসাবে কেমন দেখছেন? আপনার শিপ ফ্লিট তো ইউরন গ্রেজয় ধ্বংস করে দিলো। এখন আপনাদের অবস্থানকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?’

এবারে কুইন অব ফার্স্ট মেন কঠিন গলায় বললেন, 'দেখেন, আপনারা সবাই জানেন আমি চাইলেই সব ধ্বংস করে দিয়ে এই রাজ্য দখল করতে পারি। কিন্তু আমি তা করবো না, পুরো কিংস ল্যান্ডিংটা তো আর কেউ ইন্স্যুরেন্স করে রাখে নাই। তাছাড়া কুইন সার্সি কখনো আমার সমকক্ষ না। ভুলে যাবেন না, আমি একজন টারগেরিয়ান, আমরা মানুষ না, আমরা ড্রাগন। আর ইউরনের আক্রমণটা আকস্মিক ছিলো, এটা মানছি। আমি আমার ওয়ারপ্ল্যান নিয়ে পাবলিকলি এর চেয়ে বেশি কিছু আর বলবো না।'

‘আচ্ছা, বুঝতে পেরেছি।' আমরা তল্পিতল্পা গোটানো শুরু করলাম, এমন সময় মনে হলো একটা প্রশ্ন বাকি রয়ে গেছে, ‘আচ্ছা, শেষ প্রশ্ন!’

'জ্বী বলুন' ড্যানির উত্তর।

‘ওই যে, ফ্রি সিটি টাইরোসের সেকেন্ড সানস’দের কমান্ডার দারিও নাহারিসের সঙ্গে আপনার যোগাযোগ আছে?’

ডেনেরিস টারগেরিয়েন সরু চোখে আমাদের দিকে তাকালেন। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘কেন বলুন তো?’

‘না মানে, আপনার আর দারিও নাহারিসের ব্যাপারে ইন্ডাস্ট্রিতে নানান গুজব শোনা যায়। আমরা অবশ্য ওসবে কান দেই না, ওয়েস্টেরসলাইভ২৪ ডট কম ধরনের পোর্টালরাই এসব ভুলভাল মুখরোচক নিউজ ছড়ায়। মাঝে তো আপনাদের একটা ছবি ফেসবুকে খুব ভাইরাল হলো। সিডিও নাকি বের হয়েছিল। আমরা তাই আপনার মুখ থেকে শুনতে চাইছিলাম আরকি।'

ডেনেরিস তার সরু চোখ আরও সরু করে আমাদের দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন, ‘নো কমেন্টস’।

এরপর তিনি উঠে দাঁড়ালেন থ্রোন থেকে। মিসানদেইকে ডেকে বললেন, ‘এই ভদ্রলোক দুইজনকে আপ্যায়নের ব্যবস্থা করো, ওনারা উঠবেন।' আর আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'কোন মিসকোট যেন না হয়। আর সাক্ষাৎকার ছাপা হলে ইনবক্সে লিংকটা দিয়েন।'

আমরা দ্রুত উঠে দাড়ালাম। খেয়াল করলাম, ড্যানি আপা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন আমাদের হাটুর দিকে। যদি একটু বাঁকা হয়। 

৩৩০১ পঠিত ... ১৫:৩২, আগস্ট ০৮, ২০১৭

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top