সুকুমার রায়কে নিয়ে যা লিখেছেন সৈয়দ মুজতবা আলী

৪৬৭ পঠিত ... ২১:৩৫, অক্টোবর ২৯, ২০১৯

[বাংলা রম্যসাহিত্যের সেরা লেখকদের একজন সৈয়দ মুজতবা আলী, সেরা বলা হলেও খুব বিতর্ক উঠবে না হয়তো। তিনি লিখেছেন আরেক কিংবদন্তী রসিক সুকুমার রায়কে নিয়ে। এ যেন এক মায়েস্ত্রোর প্রতি আরেক মায়েস্ত্রোর শ্রদ্ধাঞ্চলি! eআরকি পাঠকদের জন্য লেখাটি এখানে দেয়া হলো। ]

সুকুমার রায়ের মতো হাস্যরসিক বাংলা সাহিত্যে আর নেই সে কথা রসিকজন মাত্রেই স্বীকার করে নিয়েছে, কিন্তু এ কথা অল্প লোকেই জানেন যে, তার জুড়ি ফরাসি, ইংরেজি, জর্মন সাহিত্যেও নেই, রাশানে আছে বলে শুনিনি। এ কথাটা আমাকে বিশেষ জোর দিয়ে বলতে হলো, কারণ আমি বহু অনুসন্ধান করার পর এই সিদ্ধান্তে এসেছি।

একমাত্র জর্মন সাহিত্যের ভিলহেলম বুশ সুকুমারের সমগোত্রীয়- স্বশ্রেণী না হলেও। ঠিক সুকুমারের মতো তিনি  অল্প কয়েকটি আচড় কেটে খাসা ছবি ওতরাতে পারতেন। তাই তিনিও সুকুমারের মতো আপন লেখার ইলাস্ট্রেশন নিজেই করেছেন। বুশের লেখা ও ছবি যে ইউরোপে অভূতপূর্ব সে কথা ‘চরুয়া’ ইংরেজ ছাড়া আর সবাই জানে।

বুশ ও সুকুমার রায়ের প্রধান তফাৎ এই যে বুশ বেশিগভাগই ঘটনাবহুল গল্প ছড়ায় বলে গেছেন এবং সে কর্ম অপেক্ষাকৃত সরল, কিন্তু সুকুমার রায়ের বহু ছড়া নিছক ‘আবোল-তাবোল’; তাতে গল্প নেই, ঘটনা নেই, কিছুই নেই- আছে শুধু মজা আর হাসি। বিশুদ্ধ উচ্চাঙ্গের সংগীত যে রকম শুধু ধ্বনির উপর নির্ভর করে, তার সঙ্গে কথা জুড়ে দিয়ে গীত বানাতে হয়না, তেমনি সুকুমার রায়ের বহু বহু ছড়া স্রেফ হাস্যরস, তাতে এ্যাকশন নেই, গল্প নেই অর্থাৎ আর কোনো দ্বিতীয় বস্তুর সেখানে স্থান নেই, প্রয়োজনও নেই। এ বড় কঠিন কর্ম। এ কর্ম তিনিই করতে পারেন যার বিধিদত্ত ক্ষমতা আছে। এ জিনিস এভ্যাসের জিনিস নয়, ঘরে মেজে মাথার ঘাম ফেলে এ বস্তু হয়না।

বুশ আর সুকুমারের শেষ মিল এঁদের অনুকরণ করার ব্যর্থ চেষ্টা জর্মন কিংবা বাংলায় কেউ কখনও করেন নি। এঁদের ছাড়িয়ে যাবার তো কথাই ওঠে না।

একদিন প্যারিস শহরে আমি কয়েকজন হাস্যরসিকের কাছে ‘বোম্বাগড়ের রাজা’র অনুবাদ করে শোনাই- অবশ্য আমসত্তভাজা কী তা আমাকে বুঝিয়ে বলতে হয়েছিল (তাতে করে কিঞ্চিৎ রসভঙ্গ হয়েছিল অস্বীকার করিনে।) এবং আলতার বদলে আমি লিপস্টিক ব্যবহার করেছিলাম (আমার ঠোটে কিংবা চোখে নয়- অনুবাদে)।

ফরাসি ক্যাফেতে লোকে হো-হো করে হাসে না, এটিকেটে বারণ, কিন্তু আমার সঙ্গীগণের হাসির হররাতে আমি পর্যন্ত বিচলিত হয়ে তাদের হাসি বন্ধ করতে বারবার অনুরোধ করেছিলুম। কিছুতেই থামেন না। শেষটায় বললুম ‘তোমরা যেভাবে হাসছো, তাতে লোকে ভাববে আমি বিদেশি গাড়ল, বেফাস কিছু একটা বলে ফেলেছি আর তোমরা আমাকে নিয়ে হাসছো- আমার বড় লজ্জা করছে।’ তখন তারা দয়া করে থামলেন, ওদিকে আর পাচজন আমার দিকে আড়নয়নে তাকাচ্ছিল বলে আমি তো ঘেমে কাই। 

তারপর একজন বললেন, ‘এরকম উইয়ার্ড ছন্নছাড়া, ছিটিছাড়া কর্মের ফিরিস্তি আমি জীবনে কখনও শুনিনি।’

আরেকজন বললেন, ‘ঠিক। এবার একটা চেষ্টা দেয়া যাক, এ লিস্টে আর কিছু জুতসই বাড়ানো যায় কি না।’

সবাই মিলে অনেকষণ ধরে আকাশ পাতাল হাতড়ালুম, দুএকজন একটা দুটো অদ্ভুত কর্মের নামও করলেন কিন্তু আর সবাই সেগুলো পত্রপাঠ ডিসমিস করে দিলেন। আমরা পাঁচ প্রাণী আধ ঘন্টা ধস্তাধস্তি করেও একটা মাত্র জুতসই এপেনডিক্স পেলুম না। গোটা কবিতার তো প্রশ্নই ওঠে না।

আগের থেকেই জানতুম, কিন্তু সেদিন আবার নতুন করে উপলব্ধি করলুম, যদিও সুকুমার রায় স্বয়ং বলেছেন, ‘উৎসাহে কি না হয়, কি না হয় চেষ্টায়’, যে জগতে সুকুমার বিচরণ করতেন, সেখানে তিনি একমেবাদ্বিতীয়ম।

৪৬৭ পঠিত ... ২১:৩৫, অক্টোবর ২৯, ২০১৯

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top