ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রথম প্রেমের উপাখ্যান

৩৯৫ পঠিত ... ১৭:৫০, মে ১০, ২০২২

DU-Premkahini

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর সর্বপ্রথম ৮৪৫ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু হয়। কিন্তু উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠালগ্নে একজন নারী শিক্ষার্থীও ভর্তি হতে পারেনি। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই নারীদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ ছিলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন তথা (Dhaka University Act XVII of 1920) ৫ নং ধারায় বলা হয়েছে যে, ‘The University shall be open to all persons of either sex and of whatever race, creed or class.’

নীতিগতভাবে নারীর উচ্চশিক্ষা গ্রহণের বিষয়টি স্বীকৃত থাকলেও, বাস্তবে কোনো ব্যবস্থা ছিল না। কারণ প্রথম হতেই সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ঢাকা হল ও জগন্নাথ হলে ছাত্রদের আবাসিক সুযোগ থাকলেও ছাত্রীদের জন্য কোনো সুবিধা বা আবাসিক হল পরিকাঠামো ছিল না। এদিকে একজন নারী শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ দিলে আরো অনেক নারী শিক্ষার্থীকে ভর্তির সুযোগ দিতে হবে। তাই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শুরুতে নারী শিক্ষার্থী ভর্তির পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।

লীলা রায় নামে একজন নারীর কাছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো নারী শিক্ষার্থী ভর্তি না হওয়ার বিষয়টা ভীষণভাবে মনে দাগ কাটে। কিশোর বয়স থেকেই লীলা রায় নারী শিক্ষা, সম্মান ও অধিকারের ক্ষেত্রে সোচ্চার ছিলেন। সাহিত্যিক কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন লীলা রায়ের সিনিয়র ব্যাচমেট। মোতাহার হোসেন তার সম্পর্কে বলেন, ‘লীলা রায়ের মত সমাজ-সেবিকা ও মর্যাদাময়ী নারী আর দেখি নাই। তার থিওরী হল, নারীদেরও উপার্জনশীলা হতে হবে, নইলে কখনো তারা পুরুষের কাছে মর্যাদা পাবে না।’ 

লীলা রায় তখন কলকতার বেথুন কলেজ থেকে প্রথম শ্রেণীতে বি.এ পাস করে ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য লীলা রায়ের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পাড়ি জমানোর কথা ছিলো। আসামের গোয়াল পাড়ায় জন্ম নেওয়া লীলা রায় বেশীরভাগ সময় ভারতে অবস্থান করলেও ১৯১৬ সালে তার পিতা গিরীশচন্দ্র নাগ জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের চাকরি হতে অবসর গ্রহণের পর স্থায়ীভাবে সপরিবারে পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন।

যাইহোক, লীলা রায় তখন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার ক্ষেত্রে তাকে দুইটি সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। প্রথমত, সে সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী সহশিক্ষা বাস্তবিকপক্ষে চালু ছিল না। দ্বিতয়ত, স্নাতক সম্পন্ন হওয়ায় তিনি ঢাবিতে মার্স্টার্স অফ আর্টসে (এম.এ) ভর্তি হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠালগ্নে ঢাবিতে এম.এ পড়ার সুযোগ ছিলো না।

লীলা রায় ঢাবির তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলর পি.জে হার্টগের কাছে মার্স্টার্সে ভর্তি হওয়ার আবেদন করেন। পি.জে হার্টগ লীলা রায়ের আবেদন প্রাথমিক অনুমতি প্রদান করেননি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈষম্যহীনতা এবং লীলা রায়ের মেধা ও আকাঙ্খার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় হতে স্নাতক সম্পন্ন করার প্রস্তাব দেন।

কিন্তু লীলা রায় এই প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন। তার জেদ, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই এম.এ পড়বেন। “মেয়েরা কেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারবে না”, এই মর্মে লীলা রায় ঢাবির চ্যান্সেলর তৎকালীন বাঙলার গভর্নর জন অ্যান্ডারসনের সাথে দেখা করে কেস প্লিড করেন। কিন্তু লীলা রায়ের আবেদনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ্যক্ট ১৯২০ বর্হিভূত হওয়ায় গর্ভনর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার ব্যাপারে তাকে কোনো সমাধান দিতে পারেননি। কিন্তু লীলা রায়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা অব্যাহত থাকে।

একটি পুরাতন ঘটনায় ফিরে যাই। ১৯১৯ সালে ব্রিটিশ সরকার ভারতবর্ষে জনগণের স্বাধীনতা ও অধিকার বিরোধী রাওলাট আইন প্রণয়ন করেন। রাওলাট আইনের বিরুদ্ধে সুভাষ চন্দ্র বসু কোলকতায় আন্দোলন গড়ে তোলেন। সেই আন্দোলনে লীলা রায়ের নেতৃত্বে বেথুন কলেজের শিক্ষার্থীরা স্বতস্ফুর্ত যোগদান করেন। সেখানে সুভাষ চন্দ্র বসুর সাথে লীলা রায়ের পরিচয় হয় এবং ধীরেধীরে সখ্যতা গড়ে উঠে।

তার বেশ কিছুদিনবাদে ঢাকায় ‘বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের’ একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সফরে সুভাষ চন্দ্র বসুর সঙ্গে এসেছিলেন প্রখ্যাত রসায়নবিদ আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের (পিসি রায়)। তারা মোট দুই দিন ঢাকায় অবস্থান করেন। দ্বিতীয় দিন পি.জে হার্টগের নিমন্ত্রণে পি.সি রায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেন। সেই অনুষ্ঠানে পি.সি রায় একটি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য প্রদান করেন।

পূর্ব ঘনিষ্ঠতা থাকায় সুভাষ চন্দ্র বসুর সঙ্গে তখন লীলা রায় ঢাকায় দেখা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার বিষয়ে সুভাষ চন্দ্র বসুকে একটি সমাধানের উপায় খুঁজে দিতে অনুরোধ করেন। সুভাষ চন্দ্র বসু বয়সে তখনও তরুণ এবং ঢাকার ছাত্র রাজনীতির প্রভাব ততোটা বিস্তৃত ছিলো না। তাই তিনি ভিন্ন কোনো পন্থায় বিষয়টির সমাধান খোঁজার চেষ্টা করেন। তিনি পি.সি রায়কে লীলা রায়ের বিষয়ে বিস্তারিত বলেন। সেবার ঢাকায়  পি.সি রায়ের সাথে ঢাবির চ্যান্সেলর পি.জে হার্টগের সাক্ষাৎ হলেও কোনো এক বিশেষ কারণে তিনি এবিষয়ে কোনো কথা বলেননি।

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই  ভাইস চ্যান্সেলর পি.জে হার্টগ দেশ বিদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে স্বনামধন্য শিক্ষকদের খুঁজতে থাকেন। তিনি জ্ঞানচন্দ্র ঘোষকে রসায়ন বিভাগে অধ্যাপক হিসাবে যুক্ত হওয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু একই সময়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য আশুতোষ মুখোপাধ্যায় জ্ঞানচন্দ্র ঘোষকে অধ্যাপক পদে নিযুক্ত আমন্ত্রণ জানান। জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ উভয় সংকটে পরেন। কোথায় অধ্যাপনা শুরু করবেন সে বিষয়ে নিজ থেকে সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না। তাই তিনি দুই উপাচার্যের কাছে কিছুদিন সময় চান। জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ এ বিষয়ে পরামর্শ নেওয়ার জন্য তার শিক্ষক পি.সি রায়ের শরণাপন্ন হন। পি.সি রায় ছিলেন জ্ঞানচন্দ্র ঘোষের সরাসরি শিক্ষক এবং তার প্রিয় ছাত্রদের একজন। পি.সি রায় তার ছাত্র জ্ঞানচন্দ্র ঘোষকে লীলা রায়ের বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি সুযোগ দেওয়ার শর্তে ঢাবির ভি.সি বরাবর একটি চিঠি লিখতে বলেন।

অবশেষে জ্ঞানচন্দ্র ঘোষের প্রস্তাবে পি.জে হার্টগ সম্মতি প্রদান করেন। তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত প্রথা ভেঙে মাধ্যমে লীলা রায়কে ইংরেজি বিষয়ে এম.এ অধ্যয়নের সুযোগ দেওয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনিই প্রথম নারী শিক্ষার্থী হিসাবে ভর্তি হন। তার ভর্তি ক্রমিক নাম্বার ছিল ২৫। এভাবেই দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লীলা রায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়। লীলা রায়ের ভর্তি হওয়ার পর সুষমা সেনগুপ্ত অর্থনীতি বিভাগে বি.এ সম্মান শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরবর্তীতে শুধুমাত্র এই দুইজন নারী শিক্ষার্থী ছিলেন।

লীলা রায় এবং সুষমা সেনগুপ্তার মাঝে বয়সের সামান্য তারতম্য এবং আলাদা বিভাগ হওয়া সত্ত্বেও বন্ধুত্বপূর্ণ এবং অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিলো। রঙ্গলাল সেনের ভাষ্যমতে তাদের মধ্যে খুবই হূদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। প্রায় সময়ই দু’জন একসঙ্গে ‘লেডিজ ওয়েটিং রুম’-এ বসে থাকতেন এবং আড্ডা দিতেন। তখনকার রেওয়াজ অনুযায়ী তারা অধ্যাপকদের সঙ্গে নিজ নিজ ক্লাসে যেতেন।

ঢাকা শহরে তখন এক বিপ্লবী যুবকের নাম ছিলো অনিল চন্দ্র রায়। অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র থাকাকালীন সময়ই ঢাকার বিপ্লবী টেনা দা’র বিপ্লবী সংগঠনে যোগদান করেন।  অগ্নিঝরা প্রতিবাদী এই ছাত্রনেতা কিশোর বয়সেই মহাত্মা গান্ধীর স্নেহধন্য লাভ করেন।

অনিল রায় ঢাকা কলেজ থেকে স্নাতক পাশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এম.এ শিক্ষার সুযোগ প্রদানের পর অনিল রায় সংস্কৃতে মাস্টার্স সম্পন্ন করার জন্য ঢাবিতে ভর্তি হন। অনিল রায় সংস্কৃতে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। সংস্কৃতে তার বুৎপত্তি দেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা মুগ্ধ হন এবং বিস্ময় প্রকাশ করেন।

280312157_5158779330870469_5187878353284765817_n

লীলা রায় ও অনিল রায়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মূল ক্যাম্পাসকে কেন্দ্র করে তার পূর্ব পাশে অবস্থিত ঢাকা হল (শহীদুল্লাহ হল)। ঢাকা হলের গেট ছিলো বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে প্রবেশ করার একমাত্র প্রধান প্রবেশ পথ। ক্লাস শেষে শিক্ষার্থীরা সাধারণত ঢাকা হলের ভিতর দিয়ে মাঠের বিভিন্ন পাশে আড্ডায় মত্ত থাকতো। মাঠের দক্ষিণ পাশে পুরাতন রেল লাইনের পথ। রেল লাইনের দুই ধার ছিলো কৃষ্ণচূড়া ও কড়ই গাছ শোভিত। প্রশস্ত রাজপথ সংলগ্ন রেল লাইনের একটু সামনেই ছিলো সাবেক পূর্ববাংলা ও আসাম সরকারের সেক্রেটারিয়েট ভবন।

ইংরেজি বিভাগের ক্লাস তখন কার্জন হলেই নেওয়া হতো। সুহাসিনী দাশের ভাষ্যমতে, লীলা রায় ক্লাস শেষে অধিকাংশ সময় বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে আড্ডা দিতেন এবং বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃত্ব দিতেন। ঢাকা হল এর পূর্ব পাশে বিরাট দিঘির পাশে ছিলো তাদের আড্ডার মূল জায়গা। বসন্তে লাল কৃষ্ণচূড়ার মোহে পুরাতন রেল লাইনের পথ ধরে লীলা রায় এবং সুষমা সেনগুপ্ত বন্ধুদের সাথে প্রায়প্রায়ই হেঁটে বেড়াতেন।

কলা অনুষদের ইংরেজি বিভাগ বাদে প্রত্যেকটি বিভাগের ক্লাস অনুষ্ঠিত হতো সেক্রেটারিয়েট ভবনের একতলায়, যার একাংশ পরবর্তীতে মেডিকেল কলেজে রূপান্তরিত হয়। সেক্রেটারিয়েট ভবনের দোতলায় ছিলো বারান্দা সদৃশ বিশাল খোলা জায়গা। সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিংয়ের পাশে ঘেষা ছিলো পুরাতন রেল লাইন। দোতলার বারান্দা থেকে কৃষ্ণচূড়া ও কড়ই গাছ শোভিত রেল লাইনের সেই পথ খুব সহজেই দৃষ্টিগোচর হতো।

লীলা রায়ের বর্ণনায় কোনো এক বৃষ্টিমুখর দিনে অনিল রায় বিল্ডিংয়ের বারান্দা থেকে তাকে রেল লাইনের পথ ধরে হেঁটে যেতে দেখে। সেই প্রথম দেখায় লীলা রায়ের মায়াবী চেহারায় সৌন্দর্যে অনিল রায় বিমুগ্ধ হয়ে যান। লীলা রায়ের সঙ্গে তার সরাসরি কোনো পরিচয়ের কোনো সুযোগ ছিলো না। তবে ঢাকার মেয়ে সুষমা সেনগুপ্তের সাথে অনিল রায়ের পরিচয় ছিলো। সুষমার মাধ্যমেই লীলা রায়ের সাথে অনিল রায়ের পরিচয়ের সূচনা।

লীলা রায়ের মোহে অনিল রায় এক অদ্ভুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি তার ডিপার্টমেন্ট পরিবর্তন করেন। সংস্কৃত বিভাগ থেকে তিনি ইংরেজি বিভাগে শিফট হন এবং মাস্টার্স সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেন। সুনীল দাস তার রচনায় বলেন, হঠাৎ করে অনিল রায়ের এই সিদ্ধান্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সহ সকলেই অবাক হয়ে যান। কারণ সংস্কৃতে অনিল রায়ের এক বিশেষ পান্ডিত্য ছিলো যা সচরাচর বিরল।

অনিল রায় ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হলেও লীলা রায়ের সাথে ভাব জমানোর তেমন কোনো সুযোগ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তাই তিনি নানারকম অভিপ্রায় তৈরীর চেষ্টা করেন। অনিল রায় পারিবারিকভাবে স্বচ্ছল ছিলেন এবং ইংরেজি সাহিত্যের বই কেনার জন্য তার যথেষ্ট টাকা ছিলো। কিন্তু তিনি চালাকি করে দৈন্যতার আশ্রয় নিতেন। বই কিনবার টাকা নেই এমন ভান করতেন।

লীলা রায় তখন বক্সীবাজার থাকতেন। অনিল রায় প্রায়প্রায়ই লীলা রায়ের সাথে যোগাযোগ করে তার কাছে বই ধার করতেন। আবার যথাসময়ে ধার করা বই ফেরত দিতেন। বই ফেরত দেওয়ার কিছুদিন পর আবার নতুন বই নিয়ে আসতেন। সব বই নেওয়া শেষ হলে ক্লাস নোট নেওয়ার মতলব নেওয়া শুরু করেন। ক্লাস নোট নেওয়া শেষ হলে ক্লাসের পড়া বুঝিয়ে দেওয়ার আবদার করতেন। পড়া বুঝেও না বুঝার ভান করতেন।

এভাবেই চলছিলো অনিল রায় আর লীলা রায়ের দিনকাল। একসময় তাদের বন্ধুত্বের সৌহার্দ্যতা প্রেমে পরিণত হয়। ক্যাম্পাসে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বাকী সময়টা তারা চুটিয়ে প্রেম করেন। তৎকালীন সময়ের বিভিন্নজনের লেখায় তাদের প্রেমময় জীবনের চমৎকৃত বর্ণনা পাওয়া যায়। 

...

লীলা রায় যেহেতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী শিক্ষার্থী সেহেতু বলা যায় এটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রথম প্রেমের উপাখ্যান। দুই জনের মাঝে নতুন একটি সম্পর্ক তৈরী হলেও তাদের ব্যক্তিত্ব তার ধারাবাহিক জীবনে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। দুই জনেই বিভিন্ন বিপ্লবী সংগঠনের নেতৃত্ব দেন, আন্দোলন গড়ে তোলেন, জনহিতৈষী এবং রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন।

দু’জন মিলে ব্রিটিশ বিরোধী বিভিন্ন আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। এমনকি একজনের অনুপস্থিতে অন্যজন সংগঠনের মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। ১৯৩০ সালে ঢাকায় ঢালাও গ্রেফতারের সময় অনিল রায়কে গ্রেফতার করা হয়। অনিল রায় কারারুদ্ধ থাকায় লীলা রায় সংগঠনের সমস্ত দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এমনকি তারা দুইজন একসাথে জেলও খাটেন। জেলখানায় বসেও তারা দুইজন একসাথে সংগঠনের নেতৃত্ব দিতেন। সেজন্য একসময় অনিল রায়কে আলিপুর জেলখানায় স্থানান্তরিত করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তাদের প্রেমের পরিণতি ঘটলেও ব্যক্তিগত এবং রাজনৈতিক জীবনের ব্যস্ততায় বেশ বিলম্বে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। যদিও লোকমুখে প্রচলিত তারা বিবাহ বন্ধনের ধর্মীয় সামাজিকতার আবদ্ধ হননি। কারণ তারা দুই জনেই অত্যন্ত প্রগতিশীল, মুক্তচিন্তা, অসাম্প্রদায়িক, মানবিক এবং সংস্কৃতি মনা ছিলেন। বিভিন্ন ধর্মীয় রীতিনীতি এবং গোঁড়ামি থেকে তারা আজীবন মুক্ত থাকার চেষ্টা করেছেন।

অনিল রায় অকাল বয়সে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। অকাল বৈধব্য এবং দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের সাথী স্বামী অনিল রায়কে হারিয়ে লীলা রায় শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্থ হয়ে পড়েন। স্বামীর প্রয়াণ শোকে দীর্ঘদিন তিনি দীর্ঘদিন লোকচক্ষুর আড়ালে নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করেন।

লীলা রায় এতোটাই শোকাগ্রস্থ হয়ে পড়েছিলেন যে তিনি ঢাকা থেকে কলকাতায় পাড়ি জমান এবং স্মৃতিকারতার শোকে এই বাঙলার ভিটায় আর কখনো পা রাখেননি। শেষ বয়সে তিনি বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন এবং শরীরের ডানপাশ অচল হয়ে যায়। লীলা রায় ভীষণ সুন্দর ছবি আঁকতেন এবং সেতার বাজাতে পারতেন। বাকশক্তি হারানোর পর তিনি বাম হাতের সাহায্যে সারাক্ষণ অনিল রায় আঁকতেন। প্রিয় মানুষটির মৃত্যুর ১৮ বছর পর লীলা রায় অনেকটা নীরবে-নিভৃতে দূর দেশের জগতে পাড়ি জমান।

ঐ জগতে হয়তো কৃষ্ণচূড়া গাছের ছায়ায় পুরাতন কোনো রেল লাইনের পথ আছে। যে লাইন ধরে হাঁটতে হাঁটতে কৃষ্ণচূড়া রক্তিম আভায় ইহলোকের স্মৃতি রোমন্থন করে বারেবারে মোহিত হয়ে উঠেন…

 

রেফারেন্স

লীলা নাগ পরিচিতি: অজয় রায়

লীলা রায়, আমাদের রবীন্দ্র তর্পণ: প্রাগুক্ত

শিখাময়ী লীলা রায়: প্রাগুক্ত

দিদিকে যেমনটি দেখেছি: প্রভাতচন্দ্র নাগ

বাংলার উজ্জ্বলতম অগ্নিকন্যা: সৈয়দ বদরুদ্দিন হোসাইন

লীলা নাগকে যেমন দেখেছি: সুহাসিনী দাস

স্মৃতিকথা: কাজী মোতাহার হোসেন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী: ড. রতন লাল চক্রবর্তী

অনীল রায় শীর্ষক রচনা: সুনীল দাস

বিস্মৃত বিপ্লবী: প্রকাশ রায়

৩৯৫ পঠিত ... ১৭:৫০, মে ১০, ২০২২

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top