শোষণ নিপীড়ন বৈষম্যের অপরিবর্তনীয় ফাঁদ

৭৩ পঠিত ... ১৭:১৭, জুলাই ০৪, ২০২৪

26

বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্যই হচ্ছে কোলাবরেটরদের দ্বারা শাসিত হওয়া। বৃটিশরা পূর্ববঙ্গ দখলের আগে পর্যন্ত ছিল কৃষক ও কারিগরের সমৃদ্ধ জনপদ। বৃটিশেরা পূর্ববঙ্গে ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তীর মাধ্যমে প্রধানত হিন্দু জমিদার শ্রেণি তৈরি করে; যারা কোলাবরেটর হিসেবে বৃটিশের চা*টার দল হয়েছিল। এই বৃটিশ কোলাবরেটর শ্রেণিটি জনগণকে প্রজায় পরিণত করে। বৈষম্যে ধূসর হয় এই জনপদ।

অনেক আত্মত্যাগের বিনিময়ে বৃটিশ খেদিয়ে ১৯৪৭ সালে পূর্ববঙ্গের কৃষক প্রজারা স্বাধীন হয়। কিন্তু অল্পসময়ের মধ্যেই তারা বুঝতে পারে; ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়। পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসক তাদের তাবেদারদের ক্ষমতা দণ্ড দিয়ে নতুন চা*টার দল মুসলিম জমিদার শ্রেণী তৈরি করে। বৈষম্যে ও নিগ্রহে রিক্ত হতে থাকে পূর্ববঙ্গ।

অনেক প্রাণের বিনিময়ে পাকিস্তান খেদিয়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে স্বাধীন করে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ। কিন্তু বৃটিশ কোলাবরেটর, পাকিস্তানি কোলাবরেটর ধাঁচে আবার এক ক্ষমতার কোলাবরেটর নতুন চা*টার দল বুর্জোয়া বা জমিদার শ্রেণির সৃষ্টি হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি ঝুলিয়ে ও জিয়াউর রহমানের ছবি ঝুলিয়ে বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো দুটি রাজনীতি ও ক্ষমতা-ব্যবসায়ী শ্রেণি সৃষ্টি হয়। ১৯৪৭ সালের পরাজিত শক্তি কট্টর হিন্দুত্ববাদী ও ১৯৭১ সালের পরাজিত শক্তি কট্টর ইসলামপন্থীরা যোগ দেয় রাজনীতির দুটি লালসালুর মাজারে।

বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য নিঃস্বার্থভাবে দেশপ্রেম চর্চা খুব কম মানুষই করেছে। যে লোকটিই দেশপ্রেমের লিপ সার্ভিস দিয়েছে; সেই টাকার অংকে তুলে নিয়েছে সেই ঠোঁট কর্মের মূল্য।

বাংলাদেশের কোলাবরেটরগুলো পিণ্ডি ও দিল্লির গোলামির চাকরস্য চাকর মাইন্ডসেট থেকে কখনও বের হতে পারেনি। জায়নিস্ট আঙ্গিকে হিন্দুত্ববাদ আর মুসলিম ব্রাদারহুড স্টাইলে ইসলামপন্থা এখানে কখনোই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হতে দেয়নি।

যে কোনো মূল্যে দেশের ক্ষমতা দখল করে দেশকে টাকা বানানোর মেশিন হিসেবে ব্যবহার করে; দেশ ডাকাতি করে বৃটিশ কোলাবরেটরদের কলকাতায় সেকেন্ড হোম বানানো আর পাকিস্তানি কোলাবরেটরদের পিণ্ডিতে টাকা পাচারের অনুকরণে; বাংলাদেশের সম্পদ লুট করে বিদেশে সেকেন্ড হোম গড়েছে স্বদেশী উপনিবেশের কোলাবরেটরেরা।

বৃটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলে একইভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা ও অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে শোষণ-বৈষম্যের কুরুক্ষেত্র নির্মিত হতে দেখায় প্রশ্ন জাগে, এই জনপদের নাগরিকদের নিশ্চয়ই কোনো দুর্বলতা রয়েছে; যে কারণে বারবার বর্গী এসে চাঁদা নেয়, ঘুঘু এসে ধান খায়!

বৃটিশ-পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলের শোষণ পদ্ধতিতে যে কমন ফ্যাক্টর রয়েছে, তা হচ্ছে জাতিকে পুষ্টিহীন, শিক্ষাহীন ও স্বাস্থ্য পরিচর্যাহীন করে রাখা। যাতে দেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদ, উন্নয়নের স্বপ্ন, শুদ্ধাচার ইত্যাদি বিমূর্ত ভাটের আলাপ দিয়ে সাধারণ মানুষকে ব্যস্ত রেখে ক্ষমতার কোলাবরেটরেরা নিজেদের আখের গুছাতে পারে।

লক্ষ্য করুন এদেশের কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষ হচ্ছে ‘কাজল রেখা’ উপকথার সেই হতভাগ্য কাজলরেখা; যারা পরিশ্রম করে গল্পের রাজকুমারের সারা শরীর থেকে সুঁচ তোলে। আর ফ্রড কাঁকন দাসী রাজকুমারের চোখের সুঁচ তুলে নিজেকে কাজলরেখা বলে দাবি করে। ক্ষমতা কাঠামো দখল করে থাকে

কাঁকন দাসী; ফলে সমাজজুড়ে বিকশিত হয় কাঁকনদাসী সংস্কৃতি। এই দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরায় কাজলরেখা; আর সেই অর্থ লুট করে ছাপড়ি এলিট সাজে কাঁকন দাসী।

সাধারণত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী ক্ষমতা কাঠামোর অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। কিন্তু টিনের ছাপড়া ঘরে মোমবাতির আলোয় বসে প্রতিবাদী গান লেখা, সুর করা আত্মকেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত আসলে বুর্জোয়া শ্রেণিতে যোগ দিতে চেয়েছিল। তাই স্বাধীন দেশে ক্ষমতা-কাঠামোকে তেলাঞ্জলি দিয়ে পাকা দালানে উঠেই সে প্রতারক বুদ্ধিজীবী সাংস্কৃতিক কোলাবরেটর হয়েছে। বৃটিশ-পাকিস্তানি কোলাবরেটরদের মতোই ঘৃণ্য এই স্বদেশী উপনিবেশের কোলাবরেটরেরা।

এই দেশে ছাপড়া ঘর থেকে পাকা দালানে ওঠার জন্যই চলতে থাকে ধারাবাহিক কোলাবরেটরহুড। পাবলিক বাস থেকে প্রাইভেট কারে চড়ার জন্য এসব কোলাবরেটর গুম ক্রসফায়ার ভোটডাকাতি সমর্থন করে ক্রমাগত ভাটের আলাপ করতে থাকে।

যদি কেউ সত্যি সত্যিই মুক্তিকামী হয়, তার ডিএনএ-তে আত্মকেন্দ্রিকতা থাকবে না। নিজেরটুকু গুছিয়ে নিয়ে তারপর কুঁচ কুঁচ করে ইনিয়ে বিনিয়ে স্বৈরশাসনকে সমর্থন করা আসলে সেই বৃটিশ কোলাবরেটর ও পাকিস্তানি কোলাবরেটরের ডিএনএ-এর লেটেস্ট ভার্সন।

চারিদিকে দেশ লুন্ঠন, পাচার, নিপীড়ন, শোষণ, বৈষম্য; আর কোলাবরেটরগুলো বসে বসে ফুল ফল লতা পাতা চর্চা করে; আবার টাইম মেশিন মেথডে সুদূর অতীতের দুঃশাসনের গল্প শুনিয়ে বর্তমানের দুঃশাসনকে আড়াল করতে বানর খেলার আয়োজন করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

এ কেমন জনপদ যেখানে সৎ দেশপ্রেমিক নেই; কেবল দেশপ্রেমের ব্যাপারী আছে! যে কারণে শোষণ নিপীড়ন বৈষম্যের অপরিবর্তনীয় ফাঁদে আটকে আছে কোটি কোটি মানুষের জীবন।

৭৩ পঠিত ... ১৭:১৭, জুলাই ০৪, ২০২৪

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top