গাছে দুর্নীতি গোঁফে তেল

৭৫ পঠিত ... ১৭:৪০, জুলাই ১০, ২০২৪

17

১৭৯৩ সালের বৃটিশের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে দুর্নীতিবাজদের যে বাবু কালচার শুরু হয়েছিল, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানি বন্দোবস্তের মাধ্যমে দুর্নীতিবাজদের যে সাহেব কালচার শুরু হয়েছিল; স্বাধীন বাংলাদেশে সেই একই পথ ধরে ক্ষমতাসীন সরকারের বন্দোবস্তের মাধ্যমে দুর্নীতিবাজদের বুর্জোয়া কালচার দৃশ্যমান হচ্ছে প্রতিদিনই।

সমাজের যে সব লোকের পরিশ্রম করে বেঁচে থাকার যোগ্যতা নেই; যুগে যুগে তারাই সরকারের কোলাবরেটর হয়ে ভাগ্য পরিবর্তন করে। অর্থাৎ ভ্যাগাবন্ড থেকে ল্যান্ড লর্ড হয়।

বৃটিশ আমলের সরকারি কোলাবরেটর হবার পদ্ধতি ছিল মুঘল ও নবাবী আমলকে অন্ধকার যুগ বলে বর্ণনা করে বৃটিশদের মনোরঞ্জন। বৃটিশ শাসকের সিসটেমেটিক এথনিক ক্লিনসিং-এ সাহায্য করা।

পাকিস্তান আমলের সরকারি কোলাবরেটর হবার পদ্ধতি ছিল বৃটিশ আমলকে অন্ধকার যুগ বলে বকাঝকা করে পাকিস্তানি শাসকদের মনোরঞ্জন। পাকিস্তানি শাসকের সিসটেমেটিক ক্লিনসিং-এ সাহায্য করা।

আর স্বাধীন বাংলাদেশে সরকারি কোলাবরেটর হবার পদ্ধতি হচ্ছে রাজনীতির দুটি লালসালুর মাজারের খাদেম হয়ে যাওয়া। উভয় লালসালুর শাসনামলে ক্রসফায়ারের নামে এথনিক ক্লিনজিং-এ খুশিতে বাকবাকুম হয়ে বলা, উন্নয়নের বাগানকে সুন্দর করতে এরকম আগাছা পরিষ্কার করা প্রয়োজন আছে।

ফেসবুক এসে যাওয়ায় গত দেড় দশকে তেলাঞ্জলি দিয়ে সরকারের নজরে পড়ে যাবার অভাবনীয় সুযোগ তৈরি হয়েছে। দুই নম্বর পিতা ও দশনম্বর পুত্র জোড়ায় জোড়ায় এই নজরে পড়ার কাজটি করতে থাকে। পিতা বেছে নেয় নামাজ-হজ্ব ও সমাজসেবা পদ্ধতি। পুত্র বেছে নেয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পদ্ধতি।

পিতা নামাজ পড়ে কপালে ঘাঁটি ফেলে দিয়ে এমনভাবে সমাজসেবা করে বেড়াতে থাকে যে, এলাকার লোক হাপুস নয়নে কেঁদে তাকে হাজি মুহম্মদ মহসীন ভাবতে শুরু করে। পুত্র বঙ্গবন্ধুর ছবিটি উঁচু করে তুলে ধরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার জয়গান করে হয় ছাত্রলীগে ঢুকে পড়ে; নয়তো ফেসবুকের সিপি গ্যাং-এর সঙ্গে ঘন হয়।

পিতা লোকজনের কাছে ইসলামের জয়গান করে বেড়াতে থাকে; সততার আবেগে তার চোখ ছল ছল করতে থাকে। আর পুত্র ফেসবুকে বীরদর্পে লোকজনকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা শিক্ষা দেয়। এই পিতা-পুত্র যৌথ থিয়েটারের আড়ালে চলতে থাকে দেশ-ডাকাতি। ছাপড়া থেকে প্রাসাদে ওঠা, গরুর গাড়ি থেকে পোরশেতে চড়া, পান্তা থুয়ে পাস্তা খাওয়া, পথসারমেয়র জায়গায় জার্মান শেফার্ড কোলে নিয়ে ছবি তোলা। সেই যে বৃটিশ ও পাকিস্তানি কোলাবরেটরেরা ‘অভিজাত জমিদার’ হবার যে স্বপ্ন শ্রীখণ্ডের লোকজনের মনে পুঁতে দিয়ে গেছে; স্বকালের কোলাবরেটরেরা তাই প্রাণপণে অনুকরণ করতে থাকে তাদের ঠাঁট বাট।

পিতা অবসরে বেহেশতি জেওর পড়ে; ছেলে রবীন্দ্র রচনাবলী হাতে নিয়ে ছবি তোলে। ধর্মশীলতা ও প্রগতিশীলতার যূথবদ্ধতায় তৈরি হয় বিষময় এক সংস্কৃতি। পিতা-পুত্র একযোগে সমাজের ‘সফল যারা কেমন তারা’ মোটিভেশনাল স্পিকার হয়ে পড়ে। দুর্নীতিবাজদের পুত্রকন্যাদের কেউ কেউ দুর্নীতির টাকায় আইভি লীগ-হার্ভার্ড-এম আইটিতে পড়ে; তারপর ফেসবুকে তরুণ প্রজন্মের আইকন হয়ে যায়। বিশাল বুক শেলফ পেছনে নিয়ে ওয়েবিনার করে পুত্রেরা এনলাইটেনমেন্টের বিষ্ঠা পরিবেশন করতে থাকে জাদুর থালায়।

দুর্নীতিবাজ ড্রাইভার বা পিয়ন হলে মিডিয়া এমনভাবে সেই দুর্নীতির খবর প্রকাশ করে যে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লোকটি তার পুত্রসহ গ্রেফতার হয়ে যায়। আর দুর্নীতিবাজ সাবেক আইজিপি, সেনা কর্মকর্তা, রাজস্ব বিভাগের উচ্চ কর্মকর্তা, শীর্ষ বনখেকো কর্মকর্তা হলে; দুর্নীতির খবর প্রকাশের পর পুলিশ এমনভাবে সক্রিয় হয় যে, লোকগুলো যাতে নিরাপদে বিদেশে সেকেন্ড হোমে পৌঁছে যেতে পারে।

দুর্নীতিবাজ কোনো জেলা শহরের সহ সভাপতি হলে পুলিশ দ্রুত পৌঁছে যায় তাকে গ্রেফতার করতে। আর দুর্নীতিবাজ ক্ষমতা-কাঠামোর বেয়াই বৃত্তের লোক হলে, পুলিশ তাকে সুইটযারল্যান্ডের সেকেন্ড হোমে চলে যাবার সুযোগ দেয়। দুর্নীতিবাজ ছোটো ব্যবসায়ী হলে ম্যাজিস্ট্রেট গিয়ে বুক ফুলিয়ে তাকে ধরে নিয়ে আসে। দুর্নীতিবাজ মায়ানগরীর ঋষি-দরবেশ-রয়্যাল ক্যাশিয়ার সওদাগর ও ব্যাংক খাদক হলে তাদের জন্য রয়েছে ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তি।

রম্য প্রিয় রসিক জনতাকে বাতাবি মিডিয়া ও রংধনু পুলিশ পুঁটিমাছ ও ডানকিনে মাছ ধরে ধরে এত সুখ দেয় যে, আইনের শাসনের আনন্দে কলকল করে তারা। রাঘব বোয়াল ধরা ছোয়ার বাইরে থাকবে; এটা সোনালি নিয়ম হিসেবে সর্ব স্বীকৃত হয়। যেমনে নাচাও তেমনি নাচি, পুতুলের কি দোষ!

৭৫ পঠিত ... ১৭:৪০, জুলাই ১০, ২০২৪

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top