হোক ভালোবাসা (প্যাসেজ টু হেভেন: পর্ব ১৯)

৮৪ পঠিত ... ১৭:৩৩, জুন ১০, ২০২৪

23 (16)

যুক্তরাষ্ট্রে গে ম্যারেজ আইনসিদ্ধ হওয়ায় বেহেশতে কবি উইলিয়াম শেক্সপীয়ারের খুব ভালো লাগে । ফোন করেন ডার্ক লেডিকে।

: দেখলে পৃথিবী এসব ট্যাবু ভেঙ্গে বেরিয়ে এলো; আর আমরা কত না সংগুপ্ত রেখেছি ভালোবাসার ব্রাত্য মুহূর্তগুলো।

: এতো হবারই ছিলো; পৃথিবীটা পাখির মত ডানা মেলে উড়বে মুক্ত আকাংক্ষায়। সামাজিক পুলিশিহীন পৃথিবী চাই।

শেক্সপীয়ার একটা পার্টি থ্রো করতে চান। এ ব্যাপারে বেগার খাটার লোক স্বর্গে দেবদাস ছাড়া আর কে আছে!

: হ্যালো দেবুদা শুনেছেন তো সমলৈঙ্গিক বিয়ে আইনসিদ্ধ হলো।

: মানে!

: কী বলেন শেক্সপীয়ার মহাশয়; মানে আমার সঙ্গে চুনিদার বিয়ে; পার্বতীর সঙ্গে চন্দ্রমুখীর ।

: হ্যাঁ অনেকটা সেরকমই।

: তা কী করে হয়? আর আমি কেন এই পারু-চন্দ্র-আনা জটিলতায় দিনানিপাত করি। কারণ চুনিদার সঙ্গে আড্ডা ঠিক আছে; কিন্ত বিয়ে; আমি বুঝতে পারছি না মহাশয়।

: আরে দেবুদা আপনাকে বিয়ে করতে বলছে কে! পারু-চন্দ্র বিয়ে হয়ে গেলে আপনার তো পুরো ঝামেলাই শেষ ।

: এটা মন্দ বলেননি। আর আমি দেখেছি মেয়েরা মেয়েদের সঙ্গে গল্প করেই বেশি আরাম পায়। মেয়েরাই মেয়েদের বেশি বোঝে । ছেলেদের ক্ষেত্রেও তাই। কিন্তু তাই বলে আমি কিন্তু চুনিদাকে বিয়ে করতে পারবো না।

: নাহ দেবুদা; আপনার চুনিদাকে বিয়ে করতে হবে না। আমাকে একটু সাহায্য করতে হবে । একটা সেলিব্রেশান পার্টি তো মাস্ট।

দেবুর দৌড় আনা পর্যন্ত। কারণ সে উদ্যোগ নিতে পারে; কিন্তু কায়িক পরিশ্রমে অপারগ । বেহেশতে এসে উত্তম কুমার বাঙ্গালী পুরুষের এই আলস্য আদর্শ বিসর্জন দিয়েছেন। কিন্ত দেবুদা একই জায়গায় আছে। কিন্তু আনাকে এই প্রস্তাব দিতে সংকোচ হয়।

: শেক্সপীয়ার মহাশয় আমি আপনাকে জানাচ্ছি।

কবি জালালুদ্দীন রুমী আর ফিররাখ গৌরকপুরীকে আমন্ত্রণ জানাতে ভুলবেন না যেন।

: ঠিক আছে মহাশয়।

আনা ল্যাপটপে বসে ফেসবুকিং করছিলো । সে অবাক হয়ে বলে,

: দেবুদা গে ম্যারেজ ল পাস হওয়ায় বাংলাদেশের অনেকেই রংধনু প্রোপিক দিয়ে ভালোবাসার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছে। কিন্তু প্রোপিকের গে কাপলগুলোই কালার চেঞ্জ করেনি; স্টেইঞ্জ তো!

: আরে বাবা ওরা পলিটিক্যাল কাপল; একটা নেতা, আরেকটা হাতা !

আনা হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে দেবুদার গায়ে । দেবুদা একটু সরে বসে। আনা ক্ষেপে যায়,

: তুমি কি খুলে বলবে তোমার সমস্যা কী? তুমি কি গে?

দেবুদার বুকের মধ্যে ধক করে ওঠে। এই রে কাজ তো কেচে গেলো? শেক্সপীয়ার ভাইয়ার বাসায় পার্টি এরেঞ্জ করার কথা বললে তো আনা রেগে ল্যাপটপ আছাড় মারবে।

ব্যালকনিতে গিয়ে দেবুদা সিগ্রেট ধরায়; ধূমপান স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর হলেও যারা সমাজ কল্যাণের সঙ্গে সম্পৃক্ত তাদের বুকের মধ্যে অনেক কষ্ট চিন চিন করে তো; তাই সিগ্রেট খেতে হয়।

আনা এসে দেবুদার কাঁধে হাত রেখে বলে, সরি; আমি ওভার রিএক্ট করেছি । আমি জানি তুমি স্ট্রেইট। আর আমি ছাড়া তোমাকে আর কেউ ২৪ ঘণ্টা সহ্য করবে না; সেও তুমি জান। এখন তোমার মতলবের কথা বলো; যেটা বলতে এসেছিলে ।

: আমাকে মতলববাজ বললা আনা; কোন কাজটা আমি নিজের জন্য করি?

: প্লিজ গাল ফুলিও না; অবশ্য গাল ফুলানো দেবুদাটাকেই আমার সবচেয়ে কিউট লাগে । তোমার সেন্স হিউমার একদম কমে যাচ্ছে।

: সারাক্ষণ এষ্টিভিজম করে মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে যাচ্ছে; মনে হয় বাই-পোলার ডিস-অর্ডারে ভুগছি।

আনা দেবুদার হাত ধরে টিভি লাউঞ্জে নিয়ে যায়। আনার সাগর-রঙা চোখের মধ্যে নরম আদরের রোদ ঠিকরে পড়ে । অকস্মাৎ আনা যেন এক জ্যোতস্নার আলো মাখা জীবন দিঘী হয়ে ওঠে। দেবুদা অনুভব করে ভালবাসার সুগন্ধী লেবু বাগানের সু্ঘ্রাণ। জীবনের এতো কাছাকাছি অনেকদিন আসা হয়নি; হোক ভালোবাসা ।

দেবুদার ভাগ্যে অখণ্ড অবসর খুবই কম। গান্ধীজীর ফোন বাজছে। এটা ধরা উচিত।

আনা সেল ফোনটা ছুঁড়ে দূরে একটা কাউচের মাঝে ফেলে দেয়।

: হোক না একটু অসত্যাগ্রহ।

দেবুদার মনে হয়; আমারো পরানো যাহা চায়; আনা তাই।

কফি খেতে খেতে একটা সিগ্রেট ধরাতেই আবার গান্ধীজীর ফোন।

:  গান্ধীজী সরি ফোনটা ধরতে পারিনি ।

-শেক্সপীয়ার বাবুকে টেনশনে রেখেছো কেন! আমি তো সাঁঝে যাচ্ছি। কজ'টাকে সমর্থন করছি। আর এদিকে শান্তিনিকেতনে রবিবাবু বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বসছেন। মোল্লার মাজার আর সাধুর আশ্রম ঘিরে গোবরডাঙা ও শিয়ালনগরে যে ক্রিমিনাল প্যারাসাইটস গ্যাং তৈরি হয়েছে; ওটা কীভাবে নির্মূল করা যায় তা নিয়েই এ বৈঠক। বেহেশতে এসব দুর্গন্ধযুক্ত

এলিমেন্টস তো পুরো ভারতবর্ষের নাম ডোবাবে। আরে বাবা বেহেশতে পৃথিবীর সব দেশের মানুষ বাস করে; তারা এই ক্রিমিনাল প্যারাসাইটস গ্যাং দেখে আমাকে প্রশ্ন করেছে,

ভারতীয় উপমহাদেশটা কি আফ্রিকায়? দেখো দেখি কী অবস্থা!

দেবুদা গান্ধীজীর ফোনটা রেখেই বঙ্গবন্ধুকে ফোন করে।

: হ্যালো বঙ্গবন্ধু আজ তো ইভেন্ট দুটো। একটা শেক্সপীয়ার মহাশয়ের বাসায়। আরেকটা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাসায়। আমি দু'জায়গায় কী করে থাকি!

: ওটা নিয়ে চিন্তা করার কিছু নেই । আমি কবিগুরুকে বুঝিয়ে বলবো । আচ্ছা দেবুদা একটু খোঁজ নেবেন আমার গৃহকর্মী মুশতাক আজ হলুদ গেঞ্জি পরে দোজখে কী একটা ইভেন্টে যোগ দিতে যাচ্ছে; কী যেন প্যারেড হচ্ছে নাকি দোজখে।

: বঙ্গবন্ধু আমি খোঁজ নিয়েই আপনাকে ফোন করছি।

দেবুদা নরকের পরিচিত এক পুলিশ কর্মকর্তাকে ফোন করে, এসপি সাহেব আমি দেবুদা। আপনি আছেন ক্যামন?

: ভুলেই গেলেন আমাকে । সেই যে একবার যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি পর্যবেক্ষণে এলেন আর কোন খবর নেই; দুরো দেবুদা!

: খবর নিতেই তো ফোন করা ভায়া। আজ দোজখে হলুদ গেঞ্জি গায়ে কীসের প্যারেড হচ্ছে!

: বিভিন্ন ধর্মের যে কট্টরপন্থীরা এতোদিন ব্যক্তিগত পারস্পরিক সম্পর্কগুলো গোপন রেখেছিলো; গে ম্যারেজ ল পাস হওয়ায় এবার তারা সেলিব্রেট করতে চায় । দোজখের ইউএস কালচারাল সেন্টারই এই হলুদ গেঞ্জি স্পন্সর করেছে। বিরাট উৎসব অনেকদিন পর দোজখে; চলে আসবেন নাকি আপনার পার্টনার চুনিদাকে নিয়ে!

দেবুদার বুকের মাঝে ধক করে ওঠে । পার্টনার শব্দটা কানে লাগে ।

: না মানে চুনিদা আমার বন্ধু।

: এতো সংকোচের কী আছে দেবুদা? এইতো সময় প্রেম করবার; চোখে নতুন রঙ মাখবার।

ঠিক আছে রাখি ভাই বলে সব্বোনেশে কবি পুলিশ কর্মকর্তার কাছ থেকে বিদায় নেয়।

দেবুদা বঙ্গবন্ধুকে ফোন করে দোজখের আপডেটটা দেয়। বঙ্গবন্ধু শুনে একটু গম্ভীর হয়ে যান। তারপর হঠাৎই হেসে বলেন, এইজন্য মুশতাক হলুদ গেঞ্জি পরে পারফিউম মেরে খুব খোশ মেজাজে প্যারেডে গেছে। ঠিক আছে যে যেভাবে খুশি থাকতে চায় থাকুক।

: তাহলে বঙ্গবন্ধু আমি শেক্সপীয়ার মহাশয়ের পার্টিতেই যাই।

: হ্যা হ্যা আমাদের মিটিং-এ যে সিদ্ধান্ত হবে ওটা বাস্তবায়নে দেবুদাকে তো লাগছেই।

বঙ্গবন্ধু আপনার আর গান্ধীজীর স্নেহের সুবাতাসে আমি আপনাদের সাম্যবাদী দলই কি হয়ে গেলাম? আমার থার্ড ফোর্সের কী হবে তবে!

বঙ্গবন্ধু এবার অট্টহাসিতে ফেটে পড়েন, আমরা থার্ড ফোর্সের দেবুদাকেই

ভালোবাসি। কারণ একটা সার্বক্ষণিক বিরোধীদল গণতন্ত্রে জরুরি। ওদিকে কাম্যবাদী দলের জনপ্রিয়তা বেশ কমেছে। এ মোল্লার মাজার আর সাধুর আশ্রমকে সমর্থন দিয়েই ওরা ডুবেছে।

: ভালো থাকুন বঙ্গবন্ধু। দেখি শেক্সপীয়ার সাহেবের গালা পার্টির কাজকম্ম কিছু করি।

দেবুদাকে অবাক করে দিয়ে আনা শেক্সপীয়ারের পার্টিতে বেশ আগ্রহ দেখায়। ফোন করে পরিচিত গে কাপলদের খবর দেয়।

সন্ধ্যায় চুনিদার ট্যাক্সিতে দেবুদা আর আনা শেক্সপীয়ারের বাড়িতে পৌঁছে যায়।

: আমাকে তো টেনশানে ফেলে দিয়েছিলেন।

অতিথিরা বেশিরভাগই এসে পড়েছেন। ঋতুপর্ণ ঘোষ গল্প করছেন কৰি

জসিমউদ্দীনের সঙ্গে । কৰি গীনসবার্গের বাহুলগ্ন মাইকেল জ্যাকসান।

হঠাৎ মাইক্রোফোনে লাল পার্টি ড্রেস পরা লাল লিপস্টিক আর প্রজাপতির মত চোখের লম্বা পাঁপড়ি নেড়ে ডার্ক লেডী পাঠ করেন তাকে নিয়ে লেখা শেক্সপীয়ারের সনেট

In the old age black was not counted fair,

Or if it were, it bore not beauty’s name;

But now is black beauty’s successive heir,

And beauty slandered with a bastard shame:

For since each hand hath put on Nature’s power,

Fairing the foul with Art’s false borrowed face,

Sweet beauty hath no name, no holy bower,

But is profaned, if not lives in disgrace.

Therefore my mistress’ eyes are raven black,

Her eyes so suited, and they mourners seem

At such who, not born fair, no beauty lack,

Sland’ring creation with a false esteem:

Yet so they mourn becoming of their woe,

That every tongue says beauty should look so.

এমন সময় পার্বতী আর চন্দ্রমুখী খিল খিল করে হাসতে হাসতে পার্টিতে প্রবেশ করে। দেখে সবাই তাদের খুবই সুখী যুগল বলে মনে করে। দেবুদা আনার কানের কাছে ফিস ফিস করে বলে পার্টিতে আমার কাছ থেকে দূরে দূরে থাকো। আমার দুই এক্স কোন সিনক্রিয়েট করুক এটা আমি চাইনা।

আনা হাসি লুকিয়ে খাতুপর্ণ ঘোষের আড্ডায় যোগ দেয়। কবি জালালউদ্দীন কৰি ফিররাখ গৌরকপুরী পাশাপাশি বসে একে অপরকে নতুন লেখা কবিতা পড়েন। দেরুদা আর চুনিলাল অতিথিদের খোঁজ খবর নেয়। কার কোন বিষপান পছন্দ।

লিওনার্দো দা ভিঞ্চি দেবুদা আর চুনিদাকে আশীর্বাদ করে বলেন, তোমাদের জুটিটা ভারী মানিয়েছে।

দেবুদা চমকে ওঠে, জুটি!

ওদিকে পার্বতী আর চন্দ্রমুখী একজন আরেকজনের কাঁধে মাথা রেখে প্রায় উকুন তোলার আনন্দে গল্প করছে।

এমন সময় লায়লা আর জুলিয়েটের কাঁধে ভর দিয়ে গান্ধীজী এলেন। শেক্সপীয়ার উঠে গিয়ে তাকে নিয়ে আসেন। এক ফাঁকে গান্ধীজী দেবুদাকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন, আজ সারাদিন নাথথুটাকে দেখলাম না আশ্রমে । কাজ-কর্ম ফেলে সে নাকি হলুদ রঙের গেঞ্জি পরে কোথায় বেড়াতে গ্যাছে।

: দোজখে গেছে গান্ধীজী; সেখানে কন্টরপন্থী যুদ্ধাপরাধী ও খুনীদের গে প্যারেড হচ্ছে।

: আমারো মুশতাকের সঙ্গে নাথথুর মাখামাখিটা প্রেম বলেই মনে হয়েছিলো; যাকগে জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক।

দেবুদাকে একা একা ঘুরতে দেখে মিকেল এঞ্জেলো জিজ্ঞেস করেন, একা নাকি; তুমিতো আমার ডেভিডের ভাস্কর্যের চেয়েও সুদর্শন।

এমন সময় আনা এসে মিষ্টি হাসি হেসে বলে, এটা আমার ডেভিড; ও একা নয়; একা একা ঘোরে । নো হার্ড ফিলিংস মি এঞ্জেলো।

এঞ্জেলো চোখ টিপ দিয়ে বলেন, ছ্যামড়াটাকে দেখে রেখো; একটু আগেই কিন্তু আরেক ছ্যামড়ার সঙ্গে ঘুরছিলো।

আনা দেবুদার দিকে বিস্ময়ের চোখে তাকাতেই দেবুদা ঢোক গিলে বলে, আরে ওটা চুনিদা।

আনা শুধু একবার তাকিয়ে দেখে নেয় চুনিদা চন্দ্রমুখী আর পার্বতীর সঙ্গে গপ্পে মগ্ন।

আনা দেবুদার শার্টের হাতা ধরে গেটের বাইরে চুনিদার ট্যাক্সিতে নিয়ে যায়। চারিদিকে ভালবাসার জয়গানে গাড়িটা পরমানন্দে নাচতে থাকে।

(চলবে)

২০তম পর্বের লিংক

১৮তম পর্বের লিংক

৮৪ পঠিত ... ১৭:৩৩, জুন ১০, ২০২৪

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top