তোতা মিয়ার যেভাবে যুদ্ধটা সম্পর্কে ধারণা বদলালো

৩৮৭ পঠিত ... ১৫:১৪, মার্চ ২৮, ২০২৪

14 (4)

যোগদানের শুরুতে তোতা মিয়ার দিন ভালোই কাটিতেছিল। মাসিক বেতন একশত টাকা, মাসান্তে রেশন, পায়ে দিবার জুতা আর দুইসেট খাকি পোশাক- ইত্যবসরে রাজাকার বাহিনীতে যোগদানকে তোতা মিয়া তাহার মা-বাপের আশীর্বাদ হিসেবেই দেখিল। কাজকর্মও তেমন কিছু না। রোজকার সকালে একটি থ্রি নট থ্রি রাইফেল কাঁধে ঝুলাইয়া এইবাড়ির গরুটা, ঐ বাড়ির মুরগিটা টানিয়া আনা হইলো লোভনীয় কাজ। কোন বাড়িতে নারী কি ছুড়ি আছে, তাহার খবর আনিয়া কমান্ডারকে দিতে হইবে। আর মাঝেমধ্যে বিভিন্ন বাড়ির চালায় কি খড়ের গাদায় আগুন দিয়া একটা ভীতির পরিবেশ তৈরি করাটা তোতা মিয়ার রাজাকার দলের বড় কাজ। অন্যথায় ক্যাম্পে পাঞ্জাবি মেজর সাহেবের পা টিপিয়া, মাথা মালিশ করিয়া তোতা মিয়ার দিন সুখেই কাটিতে লাগিল।

কিন্তু পুরো বিষয়টাই যে একটা প্রতারণা, ইহা বুঝিতে পারিল প্রথম মাস যাইবার পরে। ছেপ দিয়া গুনিয়া তোতা মিয়াকে সাকুল্যে পঞ্চাশ টেকা বেতন বুঝাইয়া দিল কমান্ডার কাদের আলী। তোতা মিয়া বলিল, 'ইহা কী করিলেন লিডার? রাজাকারের বেতন তো একশ টাকার উপরে?' কাদের আলি খেক খেক করিয়া উঠিয়া বলিল, 'একশ টাকা কি বলদার গোয়া দিয়া বাহির হয়? পার্টির বায়তুল মালে টেকা দিতে হয়, ইহা শিখো নাই? সুতরাং বাকি টেকা বায়তুল মালে গিয়াছে বুঝিয়া চুপ থাকো।' তোতা মিয়া বুঝিল, পার্টির বায়তুল মালের নামে টাকা আসলে কাদের আলী নিজেই গাপ করিয়া দিয়াছে। বুঝিলেও তোতা মিয়ার কিছু করার নাই, কাদের আলী ছাত্র সংঘের থানা লেভেলের নেতা, কাদের আছে বলিয়াই তোতা মিয়ার চাকুরি হইয়াছে।

তোতা মিয়া দ্বিতীয়বার ছ্যাঁকা খাইল পরের মাসে। দুইগ্রাম দূরের এক বাড়ি হইতে গরু টানিয়া নিয়া আসিতেছিল। পথে সেই গ্রামের সদরুদ্দিনের বুড়া বাপের সাথে দেখা হইয়া গেল। সদরুদ্দিন যুদ্ধে গিয়াছে, তাহার আশি বছরের বাপ পিঠ কুঁজা করিয়া লাঠি ভর দিতে দিতে মসজিদ হইতে নামাজ পড়িয়া ফিরিতেছিল। পথে তোতা মিয়া আর তোতা মিয়ার গরুর সাথে দেখা। তোতা মিয়া বন্দুকটা বাহির করিয়া সদরুদ্দিনের বাপের দিকে তাক করিল। তারপর দিল ট্রিগার টিপিয়া। হায় কপাল! বন্দুক খট খট করে শব্দ করে, কিন্তু গুলি তো বাহির হয় না। কী একটা লজ্জার কথা। পেছন থেকে গরু হাম্বা করিয়া উঠিল, মনে হইল তোতা মিয়ার এই পাওয়ার লেস অবস্থা দেখিয়া গরুও হাসিয়া দিয়াছে।  তোতা মিয়া পরে ক্যাম্পে আসিয়া শুনিল, রাজাকারদের কাছে যে বন্দুক দেয়া হইয়াছে, এইগুলা আসলে ট্রেনিংয়ের ডামি বন্দুক। দেখিতে বন্দুক, কিন্তু ফুটে না।

ইত্যবসরে এইসব ছোটখাটো প্রতারণা মানিয়া নিলেও, আসিয়া বড় ঠেক খাইল যুদ্ধের শেষ বেলায়। কওমের শত্রু মুক্তির বিচ্ছুরা ধীরে ধীরে আশপাশ দখল করিয়া লইতে লাগিল। এখন রোজ সকালে গিয়া গরু আর জরু টানিয়া আনিবার যুদ্ধ প্রায় অসম্ভব হইয়া গেল। বাহির হইলেও ঝোপের আড়াল কি পাটখেতের চিপা থেকে মুক্তিরা গুলি ফুটিয়ে দুই চারটা পাঞ্জাবি ফালাইয়া দেয়।

এমতাবস্থায় মেজর সাহেব সহজে ক্যাম্প হইতে বাহির হয় না। তোতা মিয়া প্রতিদিন তাহার মাথা মালিশ করিয়া দেয়, পা টিপিয়া দেয়; কিন্তু মেজরের মন প্রসন্ন হয় না। তবে মেজর সাহেব প্রায়শই তোতা মিয়াকে আশার বাণী শোনায়। ' ইয়্যু নো তোতা। আম্রিকা ইজ কামিং। সেভেন্থ ফ্লিট আসিতেছে। জাহাজ নিয়া আম্রিকা রওনা দিয়াছে। আসিয়া এমন বাম্বো মারিবে, সব মুক্তি আর তাহাদের ইন্ডিয়ান দোস্তরা ঠাণ্ডা হইয়া যাইবে।' সেই ঠাণ্ডার কথা শুনিয়া তোতা মিয়ার দিল ঠাণ্ডা হয়। সে আরো জোরে মেজরের পা টিপিতে থাকে।

যুদ্ধের অবস্থা খারাপ। মেজর সাহেবের মন ভালো না। কিন্তু তোতা মিয়া বুঝে, যুদ্ধের চিন্তা মেজর সাহেব করে না। কারন আম্রিকা আসিলেই যুদ্ধ জয় হইয়া যাইবে। মেজর সাহেবের মন খারাপ অন্য কারনে। ক্যাম্পে নতুন নারী ধরিয়া আনিবার উপায় নাই। বাহির হইলেই মুক্তি বাহিনীর বিচ্ছুরা গুলি ফুটাইয়া দেয়।

তো ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের কোন এক সন্ধ্যায় তোতা মিয়া মন দিয়া পা টিপিতে ছিল। মেজর সাহেব গলা খাকারি দিয়া বলিল, 'তোতা, একটা তো ব্যবস্থা করিতে হয়।' তোতা আর কী ব্যবস্থা করিবে, গ্রামের লোক তাঁদের যুবতী কন্যা থেকে শুরু করিয়া বুড়ি মা নিয়া ভাগিয়া গিয়াছে বহু আগেই।

মেজর সাহেব বলে, 'তোতা মিয়া, আপ বুঝা। আপ যদি উপুত হইয়া চান্স দেয় গা, তো হামারা মন ভালো হয়ে গা। মন ভালো হয়ে গা তো যুদ্ধ জিতে গা। যুদ্ধ জিতে গা, তো তোমারা বহুত তরক্কি হয় গা।'

তোতা মিয়া বুঝে, মেজর সাহেবের চোখ তোতা মিয়ার পেছনের দিকে। সে আর কী করিবে। কাদের আলী আগেই বলিয়াছে, যুদ্ধের জন্য ত্যাগ স্বীকার করিতে হইবে।

তোতা মিয়া উপুত হইয়া শোয়। মেজর সাহেব যা করিবার তাহা করিয়া ফেলে। এইভাবে ডিসেম্বরের একদিন যায়, দুইদিন যায়। কিন্তু ক্রমেই তোতা মিয়ার পেছন আর পাকিস্তানীদের যুদ্ধাবস্থা, দুইটাই খারাপ হইতে খারাপের দিকে যায়।

একসময় আসে ১৬ ডিসেম্বর। তোতা মিয়া যুদ্ধ হারিয়া যায়।

পাকিস্তানিদের ক্যাম্প উড়াইয়া দেয় মুক্তিবাহিনী।

তোতা মিয়া প্রবল বেগে দৌঁড়ে পালাতে থাকে। কিন্তু পাছার ব্যাথায় সে জোরে দৌঁড়াতে পারে না।

ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে তোতা মিয়া বুঝে, যুদ্ধ জয়ের আশায় হুদাই পাছামারা খাইয়াছে। যুদ্ধটা আসলে আর কিছু না, স্রেফ একটা স্ক্যাম!

৩৮৭ পঠিত ... ১৫:১৪, মার্চ ২৮, ২০২৪

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top