সুষ্ঠু নির্বাচনের ইলেকশন থিয়েটার

২৮৬ পঠিত ... ১৭:২৩, নভেম্বর ২৭, ২০২৩

17 (1)

নির্বাচনে যেহেতু প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী নেই; তাই একে দেখে ক্লাসে একজন ছাত্রের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকারের মতো দেখাতে পারে। সেকারণেই বলা হয়েছে, একা একা জিতে এলে হবে না; ডামি ফিট করে; তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার অভিনয় করে জেতার দৃশ্য চাই।

ক্ষমতাশ্বরের এই নির্দেশ পাবার পর; সুষ্ঠু নির্বাচনের ইলেকশন থিয়েটার ওয়ার্কশপ শুরু হয়। দিল্লি স্কুল অফ ড্রামার খ্যাতনামা থিয়েটার নির্দেশক রতি অগ্নিহোত্রী আসেন থিয়েটারের নির্দেশনা দিতে। সেন্টার ফর রুথলেস ইন্টেলিজেন্সের নাট্যকার বাড়াভাত ছাইষ্ণু (বাছা) পাণ্ডুলিপি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে প্রম্পট করার জন্য। বায়নাঘরের রুপসজ্জাকর আহসান ব্যস্ত হয়ে পড়ে ডামি প্রার্থীদের মেক আপ দিতে। ভাতের হোটেল এসে নির্দেশক অগ্নিহোত্রীকে জিজ্ঞেস করে, লাঞ্চে কী খাবেন রতিদা; ইলিশ মাছ ভাজি নাকি! সঙ্গে একটু মাটন।  

: ইলিশ! ইলিশ ভাজুন মশাই। আমাদের মুল্লুকে ওটারই অভাব।

নাট্যকার বাছা নির্দেশককে জিজ্ঞেস করে, দেবর-ভাবী, তৃণখড়, গুম্ফরাহিম থাকতে আবার নতুন করে ডামি লীগ লাগছে কেন?

: ৮.৮৬ শতাংশের বেশি দর্শক টানতে এই নাটকে আরো উত্তেজনা দরকার। আই মিন ফোর প্লে দরকার। গৃহপালিত দেবর-ভাবী, তৃণখড়, গুম্ফরহিম দিয়ে হাম্বি তাম্বির ফোর প্লে হবে না। তাই শ্রীকৃষ্ণের জন্য একজন রাধা প্রয়োজন; যে রাধা দর্শকের মনে সেই গানে রেশ ছড়িয়ে দেবে, বোল রাধা বোল সঙ্গম হোগা কী নেহী!

 একজনকে ডামি প্রার্থী সাজিয়ে নিয়ে আসে বায়নাঘরের মেকআপ ম্যান। নাট্যকার বাছা তাকে সংলাপ বুঝিয়ে দেয়। সিকোয়েন্সটা নির্বাচনী বিতর্কের। সেখানে ডামি প্রার্থীর সংলাপ,

‘ভাইরে জিনিসপত্রের দাম কী একটু কমানো যায়না। গার্মেন্ট শ্রমিকদের আরেকটু মজুরী বেশি দিলে ক্ষতি কী! দুর্নীতির প্রতি কী জিরো টলারেন্স দেখানো যায় না! ভাইরে!’

নির্দেশক অগ্নিহোত্রী রেগে যান, নাহ এতো সফট করে বললে হবে না! আরে বাবা এই নাটকে তো সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টের ভয় নাই। আমরা আমরাই তো; তাই একটু কঠিন করে বলো; এর চেয়ে তো দেখছি আমাদের দেশের ইউনিভার্সিটির ছাত্ররাই কড়া করে কথা বলে সরকারের বিরুদ্ধে। একটু কানহাইয়া কুমারের মতো করে বলো দেখি ভাই।

ডামি প্রার্থী বলে, আপনি জানেন না স্যার, অভিনয় করতে গিয়েও যদি একটু কড়া সরকার বিরোধী হয়ে যাই; তাহলে বিদূষকেরা পুলিশকে আমার বাড়ি দেখিয়ে দেবে। আপনি এই দেশ চেনেন না স্যার!

ভাতের হোটেল এক গ্লাস কাগজি লেবুর শরবত প্রার্থীকে দিয়ে বলে, নির্ভয়ে বলো ভাই; আমরা আছি না! দেখুমনে কোন পুলিশ তোমার বাড়ি যায়!

ডামি প্রার্থী তার সংলাপ বলে, গণতন্ত্র আজ মৃত; একে বাঁচাতে হবে; কে দেবে আশা কে দেবে ভরসা; ভরসারা খুন; সেকেন্ড হোমের নেশায় ফার্স্ট হোমে আজ লুটপাটের ঘুণ। শুধু পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের উন্নয়ন দিয়া কী পেটের ভাত হবে! এসব প্রহসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে বন্ধুরা আপনারা সমবেত হন; ঘন হয়ে আসুন; জাগো বাহে কুন্ঠে সবাই।

নির্দেশক অগ্নিহোত্রী হাততালি দিয়ে বলেন, এই তো বেশ হয়েছে; আমি জানি তো বাঙালি ক্রান্তিকারি, দ্রোহী; তাকে দিয়ে বীরোচিত অভিনয় হবে না মানে; আলবাত হবে!

বাছা এসে কাঁচুমাচু করে বলে, কিন্তু এত ভালো অভিনয় করলে যদি গ্যাটিস দেয়া মার্কার কলাগাছ পড়ে যায়; ডামি জিতে গেলে তো আবার মুশকিল রতিদা!

: এতো ভয় পেলে চলে না বাছা। একেবারের ইনকিউবেটরে রেখে শিশু পালন করলে কী চলে; সামান্য টোকায় যেসব কলাগাছের পড়ে যাবার ভয়; তা দিয়ে কোন কাজটা হবে বলো দিকি। আরে এই ডামি লীগ তো তোমাদেরই লোক। পরে আমে দুধে মিশে গেলে; জনগণ আঁটির মতো পড়ে থাকবে! এই প্রার্থী বলো তোমার ডায়ালগ বলো। এবার একটু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রেখো তোমার বক্তব্যে।

ডামি প্রার্থী আবার শুরু করে, মুক্তিযুদ্ধের প্রথম এবং প্রধান অঙ্গীকার ছিলো গণতন্ত্র; জনগণের ন্যুনতম অধিকার হচ্ছে ভোট দিয়ে তার প্রতিনিধি নির্বাচন। মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার হচ্ছে, বৈষম্যহীন সমাজ! অথচ আজ ভোটের অধিকার নাই; সেই যে পাকিস্তান আমলে পাঞ্জাবের গম ক্ষেতের শেয়ালেরা যেরকম সব সম্পদ কুক্ষীগত করেছিলো; স্বাধীন দেশে গোপাল ভিলেজের ধানক্ষেতের শেয়ালেরা ঠিক সেরকম সব সম্পদ কুক্ষীগত করে চলেছে; এভাবে চলতে পারে না। আপনারা বঙ্গবন্ধু্র মূর্তি গড়েছেন; অথচ উনার বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন ভেঙ্গে দিয়েছেন। উনি আপনাদের চোরের খনি ও চাটার দল বলেছিলেন। আর বলেছিলেন, এই আদর্শহীন অনুসারীদের হাতে আমার দ্বিতীয় মৃত্যু হবে। তিনি ত্রিকালদর্শী ছিলেন, তিনি ঠিকই চিনেছিলেন আপনাদের এই ডাকাত দলটিকে।

নির্দেশক অগ্নিহোত্রী বলেন, মারভেলাস, ইউ মেইড মাই ডে। বাদ দাও ঐ বাছার লুতুপুতু স্ক্রিপ্ট। নিজে থেকেই বলো। এতে দেখবে প্রতিযোগিতা জমে উঠবে।

বাছা এসে কুঁচ কুঁচ করে, কিন্তু এভাবে নাটক যদি বাস্তব হয়ে যায়; পীরের ছেলে পীর হিসেবে গদিনসীন করার প্রকল্প যদি মুখ থুবড়ে পড়ে। বণিকের মানদণ্ড রাজদণ্ড করার প্রয়াস যদি মাঠে মারা যায়! ডামি লীগ তো খেলা জমানোর জন্য; খেলায় জিতে যাবার জন্য নয় রতিদা!

রতি অগ্নিহোত্রী বিরক্ত হন, আরে বাবা ডামি তো ইলেকশন থিয়েটার জমানোর জন্য; ভোট কেন্দ্রে কিছু লোক টেনে আনার জন্য। উগান্ডা, উত্তর কোরিয়া, বেলারুশ, কম্বোডিয়া ও ইন্ডিয়ার পর্যবেক্ষকরা দেখবে; ভোটাররা দাঁড়িয়ে আছে, কলরব করছে খুশির ঠেলায়, আনন্দে, ঘোরতে। ভোট কেন্দ্রে এলেই যে ভোট দিতে হবে এমন কোন কথা নেই। আরে বাবা জোসেফ স্ট্যালিনের ‘ইলেকশন রেজাল্টস ম্যানিপুলেশন’ বইটি পড়োনি! তোমরা তো পড়ালেখা কিছুই করো না; শুধুই কাতলা মছলির মতো হ্যা হ্যা করো আর তেলাঞ্জলি দাও। রেজাল্ট ঠিক করবে তারা; যাদেরকে দামি গাড়ি ও প্রমোশান উপহার দেয়া হয়েছে সেই দেবদূতেরা। আমাদের এই থিয়েটারের উদ্দেশ্য শুধু ভোট কেন্দ্রে ভোটার সমাগম করা।

ভাতের হোটেল প্লেটে করে একটা ভাজা ইলিশ এনে বলে, একটু টেস্ট করেন রতিদা। আর আমি বলি কী, আমার হোটেলে তো সাপ, ব্যাং, বানর সবরকম ভাইরাল জীবজন্তু আসে। ভোটকেন্দ্রগুলোতে সাপের খেলা, ব্যাং-এর দৌড়, বানর নাচ আয়োজন করলে কেমন হয়! ধরেন মেলা বসাইয়া দিলাম।

রতিদা মুচকি হেসে বলেন, ঠিক আছে; তবে মনে রেখে, ‘বোল রাধা বোল সঙ্গম হোগা কী নেহি’ হচ্ছে ডামি লীগ থিয়েটারের শ্লোগান। সুতরাং কিছু রেড স্প্যারো রাখবে সাজিয়ে গুছিয়ে, তারা সেই নাগিন ছবির শ্রীদেবীর মতো কোমর দুলিয়ে নাচবে; অথবা বেদের মেয়ে জ্যোতস্না ছবির অঞ্জুঘোষের মতো অঙ্গ দুলিয়ে নাচবে। আইটেম নাম্বার ছাড়া যৌন অবদমিত তৃষ্ণার্ত পুরুষ সমাজকে তুমি ভোটকেন্দ্রে আনতে পারবে না মনে রেখো। কই ডামি প্রার্থী তোমার শেষ ডায়ালগটা দাও।

ডামি প্রার্থী কাঁদতে কাঁদতে বলে, স্যার একটু আগে যে গরম গরম ডায়ালগ দিলাম, বাসায় থিকা ফোন আসছে, অভ্যাসবশত কে জানি পুলিশকে আমার বাড়ি দেখাইয়া দিচ্ছে। আমার ছোট ভাইকে ধইরা নিয়া গেছে!

২৮৬ পঠিত ... ১৭:২৩, নভেম্বর ২৭, ২০২৩

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top