গণতন্ত্রকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি না

৪১৬ পঠিত ... ১৭:২৫, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৩

গণতন্ত্রকে-গুরুত্বপূর্ণ-মনে-করি-না

গতকাল হীরক নগরীতে একটি সাত তারা হোটেলে ‘গণতন্ত্রকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি না’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে আগত বুদ্ধিজীবী, কলামিস্ট ও অর্থনীতিবিদেরা এই সেমিনারে অংশ নেন।

এতে কী নোট পেপার উপস্থাপন করেন জনতা-ব্যাংককে সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছে দেয়া প্রবাদ প্রতিম অর্থনীতিবিদ আবুল বারাকাত। তিনি বলেন, ‘এই যে মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটারহাঁস আমাদের দেশের তরুণদের গণতন্ত্রের গুরুত্ব বুঝিয়ে বেড়ান; অথচ যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের হাতে সবচেয়ে বেশি রক্তের দাগ।‘

টাইম মেশিন মেথডে লেখা এই কী নোট পেপারে অতীতে যুক্তরাষ্ট্র কী কী খারাপ করিয়াছিলো; তার ফর্দ পেশ করা হয়।

 এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবাদ প্রতিম একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জামালস্টোটোল তার শিক্ষক প্লেটোকে নিয়ে আসেন মঞ্চে। প্লেটো বর্তমানে ছাছপছমুছা চেয়ারে উপবিষ্ট ইমেরিটাস অধ্যাপক। উন্নয়নের হঠাত আলোর ঝলকানিতে এথেন্স ছেড়ে তিনি এখন এই হীরক নগরীতে।

কাঁপা কাঁপা গলায় প্লেটো বলেন, ‘এরিস্টোটলের আর আমার সংলাপ ভিত্তিক "রিপাবলিক" নয়, জামালস্টোটলের লেখা "জিপাবলিক"-ই আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ম্যাগনাকার্টা। আমি তাই প্রবাদপ্রতিম বারাকাতের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে বলবো, জ্বি হুজুর! আফসোস উনি জনতা ব্যাংকে নেই, নইলে উনার কাছে ঋণ নিয়ে গ্রিসে পাচার করতে পারতাম। বড্ড গণতন্ত্র গণতন্ত্র করে গ্রিসে আজ শুধু অভাব আর অভাব। স্বীকার করতে কুন্ঠা নেই, গ্রিসের লোকের এই দুর্দশার জন্য দায়ী সক্রেটিস, এরিস্টোটল আর আমার ডেমোক্রেসি বিষয়ক ইউটোপিয়া।‘

এরপর মঞ্চে আসেন নেদারল্যান্ডসের গ্রোয়িংগেন ইউনিভার্সিটির স্কলার ডরিন চৌধুরী। দ্রুত অসংখ্য কলাম লিখে তিনি এদেশে গরীবের অরুন্ধতি রায় নামে পরিচিত। ডরিন বলেন, ‘নেদারল্যান্ডসে গণতন্ত্র খুব ক্ষতিকর হয়েছে। সৌরশক্তি ও বায়ু শক্তি ব্যবহার করে জ্বালানী সমস্যা সমাধান করায়, কুইক রেন্টালের মাধ্যমে দ্রুততম ধনী তৈরির কাজটি হয়নি। ফলে নেদারল্যান্ডস সামিট গ্রুপের মতো দ্রুত বর্ধনশীল কোন কোম্পানি সৃষ্টি করতে পারেনি; যা সিঙ্গাপুরে গিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেবে।‘

মুহুর্মুহু করতালির মাঝ দিয়ে ডরিনের বক্তব্য শেষ হলে মঞ্চে আসেন অস্ট্রেলিয়ার স্কলার ও বলিষ্ঠ কলামলেখক ফুমিকো ইয়ামাদা। মঞ্চে একজন বিদেশিনীকে দেখে দর্শক সারিতে সহমত ভাই ও শিবব্রত দাদাদের চোখে আনন্দাশ্রু দেখা যায়।

ফুমিকো ইয়ামাদা বলেন, ‘নিউজিল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডার কথা মনে আছে নিশ্চয়ই। ওদেশে গণতন্ত্রের বাতিক থাকার কারণে জেসিন্ডা ক্ষমতা থেকে সরে গিয়ে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং লেকচারার হয়েছেন। জেসিন্ডা যদি গণতন্ত্রকে প্রাধান্য না দিয়ে উন্নয়ন প্রচারকে গুরুত্ব দিতেন, তা হলে জো বাইডেন তার দিকে ছুটে গিয়ে সেলফি তুলতেন, ঋষি সুনাক তাকে হাঁটুভাঙ্গা শ্রদ্ধা নিবেদন করতেন, ইমানুয়েল ম্যারখঁ তার হাত ধরে আর ছাড়তে চাইতেন না! গণতন্ত্র হচ্ছে অপ্রয়োজনীয় চলক। আসল হচ্ছে উন্নয়ন প্রচার, রোড শো, ব্র্যান্ডিং ও স্মার্ট দেশ!’

ফুমিকোর বক্তব্য শুনে ডুকরে কেঁদে ওঠেন তরুণ সাংসদেরা, যারা অত্যন্ত স্মার্ট পোশাক পরে হাজির হয়েছেন। সেমিনার কক্ষের প্রবেশ দ্বারটি অতো বড় না হওয়ায়, তাদের বিশাল স্মার্ট গাড়িটি ঢোকাতে পারেননি; শুধু নতুন ভুঁড়িটি কোনমতে ঢুকিয়ে সামনের সারিতে স্মার্ট আসনে দুই পা ছড়িয়ে বসেছেন।

ক্যানাডার টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর সাবেরা চৌধুরী এরপর মঞ্চে আসেন। তিনি আনন্দের আতিশয্যে টিস্যু দিয়ে চোখ মুছে বলেন, ‘আমি যখন ক্যানাডার বেগম পাড়ার বাড়িগুলোর দিকে তাকাই, প্রাণ আকুল হয়। গণতন্ত্রকে নির্বাসিত না করলে আমাদের দেশপ্রেমিক রাজনীতিক ও আমলাদের পক্ষে এরকম আলিশান সেকেন্ড হোম কিনে দেশচেতনার এতো স্ফীত প্রদর্শনী সম্ভব হতো। প্রত্যেকটা বাড়ির সামনে একটা করে স্পোর্টস কার দাঁড়িয়ে। অথচ গণতন্ত্রের মতো উপসর্গ থাকলে ভুরুঙ্গামারী, নরসিংদী, ফরিদপুরে এদের বাঁশের বাড়ির সামনে গরুর গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতো। গণতন্ত্র নেই বলেই আজ সুইস ব্যাংকে, কেমেন আইল্যান্ডে আমাদের উন্নয়নের দুরন্ত সহিসেরা সেরা ক্লায়েন্ট হতে পেরেছেন। সুতরাং গণতন্ত্র একটি বস্তাপচা ধারণা।‘

পশ্চিমে গরিবের এডওয়ার্ড সাঈদ বলে খ্যাত নন্দিতা রায় এরপর মঞ্চে আসেন। তিনি বলেন, ‘প্রায়োরিটি বুঝতে শিখুন। এখন তো ভোট, গণতন্ত্রের মতো গুরুত্বহীন বিষয়ে আলাপের সময় নয়। এখন আলাপ হতে হবে জঙ্গীবাদ নিয়ে। কেন মেয়েরা হিজাব পরে তা নিয়ে। কেন তরুণ ক্রিকেটার নারী মুক্তির বিপক্ষে কথা বললেন, তা নিয়ে গগণ বিদারী চিৎকার চাই।‘ নন্দিতা হাত দুটো সামনে প্রসারিত করে বলেন, ‘কৈ সরকারি নারীবাদীরা, আপনারা চুপ করে আছেন কেন! প্লিজ ব্রেক দ্য সাইলেন্স।‘ কদিন আগে ওমরাহ করে আসা কজন সহমত ভাই গোমড়া মুখে বসে থাকলেও শিবব্রত দাদারা চিৎকার জুড়ে দেন, ‘জঙ্গীবাদমুক্ত দেশ চাই, নারী প্রগতি বিরোধী ঘুণপোকা ক্রিকেটারদের টিম থেকে বাদ দিতে হবে।‘

নন্দিতা লক্ষ্য করেন কিছু সহমত ভাই চিৎকার করছেন না। তাদের কটাক্ষ করে বলেন, ‘আপনারা কী স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি! চুপ করে আছেন কেন!’  ‘বিপক্ষ শক্তির তকমার ভয়ে’ সহমত ভাইয়েরাও তখন চিৎকার করেন, ‘গণতন্ত্র নয়, শুধু প্রগতিশীলতা চাই।‘

‘দুর্গার মতো দশহাতে অসুরের বিনাশ করুন’ এমন আহবান জানিয়ে দুর্গাপূজার আগাম শুভেচ্ছা দিয়ে মঞ্চ থেকে নেমে আসেন নন্দিতা রায়।

সব শেষ বক্তা ফরাসী বুদ্ধিজীবী ম্যারি মাসদুপুই মঞ্চে আসেন। তিনি ফরাসী প্রেসিডেন্ট ম্যারখঁর হীরক নগরী সফরের পর টুইটারে ঝড় তুলেছেন তার প্রাজ্ঞ অভিমত দিয়ে। ম্যারি বলেন, গণতন্ত্রের জন্য আমরা কী প্রস্তুত! উত্তর হচ্ছে না! যে দেশের মানুষ বোঝে না যে আওয়ামী লীগ হচ্ছে এই দেশের মা’লিক; এই দেশের ভালোমন্দ বোঝার এখতিয়ার ও অধিকার শুধু আওয়ামী লীগারদের; সেইখানে এতো অপ্রস্তুত ও বুদ্ধিহীন ভোটারদের ভোট দেবার ক্ষমতা দিলে তারা গ্রেনেড রাক্ষস ও অগ্নিসন্ত্রাসীদের ক্ষমতায় নিয়ে আসবে। আমি জানি, আপনারা বলবেন, আওয়ামী লীগ ক্রসফায়ার ও গুম করেছে, ছাত্রলীগ হেলমেট পরে সন্ত্রাস করেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের হাতে মার খাওয়া হচ্ছে মায়ের হাতে মার খাওয়া। মায়ের পায়ের তলে সন্তানের বেহেশত। মা আপনাকে মেরে ফেললে আপনি বেহেশতে যাবেন। কিন্তু অন্য কোন দল আপনাকে মেরে ফেললে আপনি নিশ্চিত দোজখে যাবেন। সুতরাং চলুন সবাই বারাকাত স্যারের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলি, শুধু লীগ শুধু লীগ দাও, গণতন্ত্র চাই না ।‘

‘শুধু বিষ, শুধু বিষ দাও, অমৃত চাই না

শুধু বিষ, শুধু বিষ দাও, অমৃত চাই না

অমরত্বের লোভ করুক বিক্ষোভ

অমরত্বের লোভ করুক বিক্ষোভ

জীবনকে যদি দাও নীল বিষাক্ত ছোপ

থাকবে না, থাকবে না, থাকবে না ক্ষোভ

আমার মৃতদেহে ঝুলবে নোটিস বোর্ডে

"কর্তৃপক্ষ দায়ী না"

শুধু বিষ, শুধু বিষ দাও, অমৃত চাই না

শুধু বিষ, শুধু বিষ দাও, অমৃত চাই না

ধ্বংসের ব্যবসায় মগ্ন যে সভ্যতা, তার অমৃত চাই না

ধ্বংসের ব্যবসায় মগ্ন যে সভ্যতা, তার অমৃত চাই না

বিভেদ-মন্ত্রে দীক্ষিত যে সভ্যতা, তার অমৃত চাই না

সবুজ...

সবুজ পৃথিবীটাকে যন্ত্রের কালো হাতে

সবুজ পৃথিবীটাকে যন্ত্রের কালো হাতে

শ্বাসরোধ করে যে প্রগতি

পরিসংখ্যানে মাপে জীবনের ক্ষয়ক্ষতি

এমন প্রগতি চাই না

শুধু বিষ, শুধু বিষ দাও, অমৃত চাই না

শুধু বিষ, শুধু বিষ দাও, অমৃত চাই না!’

৪১৬ পঠিত ... ১৭:২৫, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৩

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top