সহমত ভাইয়ের ইতিবৃত্ত (১৯৪৭-১৯৭১)

৪১৭ পঠিত ... ১৫:৫৬, এপ্রিল ১৭, ২০২৩

সহমত-ভাইয়ের

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পূর্ববঙ্গের কৃষকের উৎপাদিত চাল চুরি করে নিয়ে গিয়ে ইংরেজ সেনাদের খাইয়ে দেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টোন চার্চিল। ফলে দুর্ভিক্ষে লাখো মানুষের মৃত্যু হয় পূর্ববঙ্গে। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন সেই দুর্ভিক্ষের ছবি এঁকেছেন। সেই উইনস্টোন চার্চিল কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের সহমত ভাইদের হাতে ভারত-পাকিস্তানের ক্ষমতা ছেড়ে দেবার প্রস্তাবে বলেছিলেন, ‘শ্রীখণ্ডের ঠগী ও ডাকাত দলের হাতে ক্ষমতা নামের সহমতের হাতের মোয়া ছেড়ে দিচ্ছেন দেন; দেখবেন কীভাবে দেশটাকে ছিবড়ে করে ফেলে তারা!’

চার্চিল নিজে ঘাতক হলেও; তার কথা ফলেছে। ঠগী সহমত ভাইয়েরা কেবল শ্রীখণ্ডকেই লুট করে ঝাঁঝরা করেনি; চুরির মাল নিয়ে গিয়ে লন্ডনের গোডাউনেও তুলেছে।

১৯৪৭ সালের শ্রীখণ্ড ভাগের সময় কংগ্রেস সহমত ভাইয়েরা ভারতের মুসলমান কবুতর পূব-পশ্চিমের পাকিস্তানের কবুতরের খোপে ঢুকিয়েছে। মুসলিম লীগের সহমত ভাইয়েরা পূব-পশ্চিম পাকিস্তানের হিন্দু কবুতর ভারতের কবুতরের খোপে ঢুকিয়েছে।

ভারতে মুসলমানদের ছেড়ে আসা ঘর-বাড়িতে কংগ্রেসের জমিদার পুত্রদের সহমত ভাইয়েরা স্বাধীনতার সুফল দখল করেছে। পূব-পশ্চিমের পাকিস্তানে হিন্দুদের ছেড়ে আসা ঘর-বাড়িতে মুসলিম লীগের সহমত ভাইয়েরা স্বাধীনতার সুফল দখল করেছে।

শ্রীখণ্ডের মানুষ অত্যন্ত স্বপ্ন প্রিয়। সুতরাং স্বাধীনতার স্বপ্নে উত্তাল লাখো লাখো মানুষ শরণার্থী হয়েছে। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের যৌথ প্রযোজনায় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা মঞ্চস্থ করে লাখো মানুষের রক্তে লাল হয়েছে সমগ্র শ্রীখণ্ড।

হিন্দু জমিদারের লন্ডন ফেরত ছেলে নেহেরু নিজে ধম্মো-কম্মো পছন্দ না করলেও ১৫ অগাস্টের স্বাধীনতা উদযাপন হয়েছে পুজো-আর্চা করে। মুসলিম জমিদারের ছেলে জিন্নাহ নিজে ধম্মো কম্মো পছন্দ না করলেও কুরান তেলওয়াত সহযোগে ১৪ অগাস্টের স্বাধীনতা উদযাপন হয়েছে।

এইবার কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের সহমত ভাইয়েরা যে যার দেশে ছোট ছোট সম্ভ্রান্ত হতে শুরু করে। যে ইউরোপিয় ক্লাবে নেটিভ আর কুকুর ঢোকা নিষেধ ছিলো; ইংরেজ আমলে; স্বাধীনতার পর সেগুলোকে ভি আই পি ক্লাব বানিয়ে নতুন স্যুট-শেরওয়ানী পরে বাদামি সাহেবদের টুইস্ট শুরু হয়।

অন্যের সম্পদ কেড়ে খাবার জন্য শুরু হয়; স্বাধীনতার শত্রু চিহ্নিত করা। সহমত ভাইয়েরা মুখে মুখে স্বাধীনতার শত্রুদের পাকিস্তান ও ভারতের ভিসা দেয়া শুরু করলো। কথায় কথায়, ভারত চইলা যা কিংবা পাকিস্তান চইলা যা--বলার সহমত ভাই কালচারের সেই শুরু। আসলে সেসবই দেশের মালিক সেজে অন্যের সম্পদ কেড়ে নিয়ে নিজেরা নতুন সম্ভ্রান্ত হবার তাল।

 ভারতে কংগ্রসের সহমত ভাইয়েরা অত্যন্ত নতুন এলিট হয়ে পড়ায়; স্বাধীনতার সুফল বঞ্চিত ভাইয়েরা মন্দিরে গিয়ে ভগবানের ওপর আস্থা রাখলো। দিগন্ত রেখায় হিন্দুস্তানের স্বপ্ন উঁকি দিলো।

পাকিস্তানে বৃটিশ আমলের সহমত ভাই পাঞ্জাবের জমিদারেরা; বন্দুক হাতে গা গরম হয়ে যাওয়া পাঞ্জাবি সেনাদের বললো, কীসের গণতন্ত্র! জিন্নাহ মরলেই লেফট রাইট কইরা ক্ষমতা নাও। হাউ মাউ খাউ; পূর্ব পাকিস্তানের টেকাটুকার গন্ধ পাউ।

ভারতের কংগ্রেস পরিবারতন্ত্রের ঊষার আলো দেখালে; পশ্চিম পাকিস্তানে রুটি কাপড়া মকান আর অসাম্প্রদায়িকতার লিপ সার্ভিস দিয়ে ভুট্টো উঁকি দিলো আকাশে।

পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে; নতুন বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্বপ্ন উঁকি দিলো আকাশে। ৪৭-এর স্বাধীনতার সুফল ভোগকারী মুসলিম লীগের সহমত ভাইয়েরা ভুলে গেলো; পাকিস্তান গড়ার ম্যান্ডেট পেতে নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ হিন্দুরা তাদের ভোট দিয়েছিলো।  অথচ "হিন্দুরা স্বাধীনতার শত্রু" বলে ফতোয়া দিয়ে বেড়াতে শুরু করলো মুসলিম লীগের সহমত ভাইয়েরা। মুসলিম লীগের বিশ্বাস ঘাতকতায় বেদনাক্রান্ত হিন্দুরা বাঙালি জাতীয়তাবাদের নতুন স্বপ্নে আর একবার মুক্তি খুঁজলো। উচ্ছেদ হয়ে শরণার্থী হতে থাকলো সাধারণ হিন্দুরা।

এই ব্রাণ্ম মুহূর্তে পূর্ব বঙ্গে জমিদারি হারানো বৃটিশ সহমত ভাই হিন্দুরা; কলকাতায়  তাদের সেকেন্ড হোমে বসে আবার ইতিহাস লেখকদের ডাক দিলো। তাদের স্বপ্ন আবার পূর্ব বঙ্গের জমিদারি যদি ফিরে পাওয়া যায়। পূর্ব বঙ্গের সাধারণ  হিন্দুরা হিন্দু জমিদারের প্রজা হিসেবে একদা নিঃগৃহীত হয়েছে। সে কারণেই তারা নির্বাচনে কংগ্রেসকে ভোট না দিয়ে মুসলিম লীগকে ভোট দিয়েছিলো।

  কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের বিশ্বাসঘাতক নব্য মুসলিম জমিদারদের নির্যাতনকে কেবলি হিন্দুর ওপর মুসলমানের নির্যাতন হিসেবে চিত্রিত করতে শুরু করলো একদা অত্যাচারী হিন্দু জমিদারের সহমত ভাই লেখিয়েরা।

যে বৈষম্য ধনী-দরিদ্রের মাঝে; তাকে বেশ সাম্প্রদায়িক চেহারা দিলে তাতে অত্যাচারী হিন্দু-মুসলমান ধনীদের উভয়ের সুবিধা। ভাগ করো আর শাসন করো। সেই বৃটিশ প্রেতাত্মার ছায়া যেন তাদের রেখে যাওয়া হিন্দু-মুসলমান জমিদার সহমত ভাইদের ভুতের নাচনে।

পশ্চিম পাকিস্তানের বৃটিশ সহমত ভাই জমিদারদের পূর্ববঙ্গে নতুন জমিদারি বিস্তৃত করার মাঝে পূর্ব বঙ্গের সাধারণ মানুষ দেখলো; এ আবার পাকিস্তান নামের নিষ্ঠুর এক উপনিবেশ। এ থেকে মুক্তি চাই।

পূর্ব বঙ্গের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত তার সংস্কৃতির ওপর আঘাত আর অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলো। ১৯৪৭ সালের মুক্তিযোদ্ধারা তাদের জীবনে রাজাকার রাক্ষস হিসেবে আবির্ভূত হলো।

পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদ লুটপাট করে নিয়ে গিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের সেনা শাসকের সহমত ভাইয়েরা বিরাট অভিজাত সেজে বসলো। বুর্জোয়া টইটুম্বুর পশ্চিম পাকিস্তানের ২২ পরিবারের হাতে সম্পদ কুক্ষীগত হতে দেখে; পূর্ব পাকিস্তানের বুর্জোয়া হতে চাওয়া সমাজ ভাবলো, কীরে পাঞ্জাবের ধানক্ষেতের শেয়াল যদি দুই দশকে জমিদার হইতে পারে; আমরা পূর্ব বঙ্গের ধানক্ষেতের শিয়াল কেন জমিদার হবো নারে!

আওয়ামী লীগ তখন পূর্ব বঙ্গের স্বপ্নের প্রতীক। এইবার এইবার মানুষের মুক্তি আসবে। ১৯৭০ সালে ভোট যুদ্ধে শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগের সঙ্গে হেরে যায় ভুট্টোর পিপলস পার্টি। পাকিস্তানের আইনত প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করিয়ে; ভুট্টো তখন প্রধানমন্ত্রী হবার গোঁ ধরে বসে।  লারকানাতে পাঞ্জাবের খাঁকি হায়েনাকে হাসের মাংস খাইয়ে ভুট্টো বলে, যাও পূর্ব পাকিস্তানে মানুষের মাংসের বার বি কিউ খেয়ে এসো।

শ্রীখণ্ডের মানুষ যতবার মুক্তির স্বপ্ন দেখেছে; রাক্ষস সহমত ভাইয়েরা এসে তখনই মাংসের কারবার করেছে। পূর্ব পাকিস্তানের সেই "৪৭ এর স্বাধীনতা"র সহমত ভাইয়েরা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের হায়েনাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়; কোথায় গেলে ভালো মাংস আছে; এমনকী ললিতলোভনকান্ত মাংস। শ্রীখণ্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গণহত্যা সংঘটিত হয় বাংলাদেশে।

পশ্চিম বঙ্গের বৃটিশ সহমত ভাই জমিদারেরা কলকাতার সেকেন্ড হোমে বসে, এই বার এই বার খুকু চোখ খুললো; আলসে নয়সে বলে, এসো এসো সুরে করুণ মিনতি মাখা হলো। কংগ্রেস নেত্রী ইন্দিরা গান্ধীর জন্য ভারত সীমান্তের উভয় দিকে; পাকিস্তান থাকলে ব্যাপারটা গোলমেলে। তাই এনিমিজ এনিমি মাই ফ্রেন্ড হিসেবে; মুক্তিযুদ্ধে অসম সাহসী বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়ালেন তিনি। ভারত পাশে না থাকলে এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হতে পারতো। ইন্দিরা গান্ধী তাই সস্নেহ ধাত্রীর মতো নয় মাসেই বাংলাদেশের জন্মলাভ সম্ভব করলেন।

মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, কৃষক-শ্রমিক, শরণার্থী হয়েছেন সাধারণ মানুষ। জীবন দিয়েছেন, নির্যাতিত হয়েছেন সাধারণ নরনারী। কিন্তু ১৬ ডিসেম্বর নগরকেন্দ্রিক সেই নব্য বুর্জোয়া হতে ইচ্ছুক সহমত ভাই শ্রেণীটি মাথায় পতাকা বেঁধে হাতে বন্দুক নিয়ে বেরিয়ে পড়লো অবাঙ্গালিদের বাড়িঘর দখলে। আর শরণার্থী হয়ে ভারতে যাওয়া কোন কোন হিন্দু বাংলাদেশে ফিরবে না; তা নিয়ে অংক কষে তাদের বাড়িঘর চিহ্নিত করে রাখলো। স্বাধীনতার সুফল কুড়াতে একমূহূর্ত দেরী তো করেনি কোন দিন, কোন কালে এই সহমত ভাইয়েরা।

 

৪১৭ পঠিত ... ১৫:৫৬, এপ্রিল ১৭, ২০২৩

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top