সহমত ভাইয়ের ইতিবৃত্ত (১৭৫৭-১৯৪৭)

৭২৯ পঠিত ... ১৫:১২, এপ্রিল ১৬, ২০২৩

সহমত-ভাইয়ের

ইংরেজরা শ্রীখণ্ডে আসার আগে; হিন্দু-রাজা ও মুসলিম বাদশাহদের আমলে সীমিত পর্যায়ে সহমত ভাই সংস্কৃতির চর্চা ছিলো। কিন্তু সেসব সময়ে তেলাঞ্জলি দেবার পাশাপাশি কিছু গুণাবলী প্রয়োজন হতো; একজন সহমত ভাই হতে। একটু কাব্য প্রতিভা; উচ্চাঙ্গ সংগীত, সূফি গান গাওয়ার ক্ষমতা, একটু রসবোধ, হাসির ছলে কিছু সত্য কথা বলার সাহস; এসব যোগ্যতা প্রয়োজন পড়তো সহমত ভাই হতে।

কিন্তু ইংরেজরা এসে বিদেশ-বিভুঁই-এ অন্ধ আনুগত্যের তালাশ করে। পুরো শ্রীখণ্ড তন্ন তন্ন করে সবচেয়ে অনুগত সহমত ভাই খুঁজে পাওয়া যায় সুতানুটিতে। সবচেয়ে বেশি  আভিজাত্যের কুঁচকুঁচানি খুঁজে পাওয়া যায় বলেই ডিভাইড অ্যান্ড রুলের রাজধানী হিসেবে কলকাতাকে বাছাই করে বৃটিশেরা। আর পলাশীর যুদ্ধের সময়েই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বুঝে গিয়েছিলো, এই মাটি উর্বর; এখানে সহমত ভাইয়ের বাম্পার ফলন হয়।

পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজদের সহমত ভাইদের মধ্যে মীরজাফর, জগত শেঠকে; সহমত প্রজাতির যৌথ পিতা বললে ভুল হবে না। এই যুদ্ধে সহমত ভাইদের চাচা-কাকা, মামা, খালু, ফুফা, মেসো মশাইদের একটি দীর্ঘ তালিকা রয়েছে যা লিখে ইতিবৃত্তকে ভারাক্রান্ত করতে চাই না।

বৃটিশেরা একটু অবাক হয়; নিজেরা শ্বেতাঙ্গ হয়েও যতটা বর্ণ বিদ্বেষী হতে পারেনি; তার চেয়ে বেশি বর্ণ বিদ্বেষী এখানকার লোক। গায়ের রঙ একটু উজ্জ্বল শ্যামলা হলেই নিজেকে আর্য বলে হাঁক দিচ্ছে।

ইংরেজ জিজ্ঞেস করে, কী চাই সহমত ভাই; কী শখ তোমার!

সে লাজুক চোখে মাখো মাখো হয়ে বলে, একটু বোতাম-অলা জামা পরতে চাই।

--যে বিশাল বপু; বপুর সঙ্গে তনু মিলিয়ে বর্ধমান মধ্যপ্রদেশ বোতাম দিয়ে আটকে রাখা কঠিন হবে।

--ঐ যে কী একটা দড়ি দিয়ে পাতলুনটাকে ওপর দিকে টেনে রেখেছেন; ঐ একখানা হলেই চলে।

--সাসপেন্ডার পরতে হলে তো আধুনিক হতে হবে সহমত ভাই। ইংরেজি শিখতে হবে। আর বাংলা নিয়ে ভেবো না; আধুনিক বাংলার ব্যাকরণ আমরাই বানিয়ে দেবো।

ইংরেজরা লন্ডনে ছোট ছোট ইটের খুপরিতে থাকে; শুকনো পাউরুটি আর বিস্বাদ সসেজে সমাহিত জীবন। শ্রীখণ্ডে এসে রাজা-বাদশা'র লাইফ স্টাইল দেখে তারা ভড়কে গেছে। এই তো চাই। প্রভু এবং দাসের সংস্কৃতি যেভাবে আগে থেকেই  বিকশিত; তাতে প্রভু হিসেবে দিব্যি কাটিয়ে দেয়া যাবে জীবন।

ইংরেজরা রাজা-বাদশার জীবন দীর্ঘায়িত করতে; তাদের গর্বিত ইতিহাস বলে তাক লাগিয়ে দেয় নেটিভদের। নেটিভদের জিজ্ঞেস করে, কী পারবে না এরকম ইতিহাস রচনা করতে!

খুব পারবো বলে, কাজে লেগে পড়ে সহমত ভাইয়েরা। হিন্দু ইতিহাসবিদকে লিখতে হবে মুসলিম শাসকেরা কতো খারাপ ছিলো; আর মুসলমান ইতিহাসবিদদের লিখতে হবে হিন্দু শাসকেরা কতো খারাপ ছিলো। সহমত ভাইয়েরা লেগে পড়ে শশাকাব্দ বনাম আকবরাব্দের মধ্যে কে বড়; কে বেশি অভিজাত সেই জল্পনা-কল্পনা বা ইতিহাসে।

ইংরেজরা লক্ষ্য করে, সহমত ভাইদের প্রশংসা করার ক্ষেত্রে বিশেষণের ব্যবহার অভিনব। এরকম বিশেষণবহুল জনপদ বিশ্বে আর একটিও নেই।

সহমত ভাইদের দীর্ঘ তেলাঞ্জলি পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয় ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে। লর্ড কর্নওয়ালিশের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে  শ্রীখণ্ডের সহমত ভাইয়েরা জমিদারি লাভ করে। প্রতিষ্ঠিত হয় অভিজাত হিন্দু পরিবার ও সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের ধারণা। অন্দরের নারীদের জন্য ব্লাউজ বানিয়ে আভিজাত্যের বোতাম লাগানোর কাজ সম্পন্ন হয়।

জমিদারদের গালে সুপোরি পুরে গম্ভীর থাকার অনুশীলন তৈরি হয়। শ্রীখণ্ডে সহমত ভাই হইলে জমিদার হওয়া যাইবে; এই বিশ্বাস প্রোথিত হয়।

এরপর আর সহমত সংস্কৃতিকে পিছে ফিরে তাকাতে হয়নি। কিন্তু গোল বাধে ১৮৫৭ সালের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়। ইংরেজ বিস্মিত হয়; এতো ডিভাইড এন্ড রুলের কলাকৈবল্য করেও হিন্দু-মুসলমান একসঙ্গে লড়ছে বৃটিশের বিরুদ্ধে।

আবার দেখা যায় ইংরেজি শিখে ডাস ক্যাপিটাল পড়ে কিছু নেটিভ তরুণ উচ্ছন্নে যাচ্ছে। তারা সম্পদের ওপরে জমিদারের আধিপত্যের পরিবর্তে প্রজার মালিকানা চাইছে।

বৃটিশ সিদ্ধান্ত নেয়, নাহ এবার জমিদারি গণতন্ত্র শিখাইতে হবে। হিন্দু জমিদারদের ছেলে-পেলেকে দিয়ে কংগ্রেস পার্টি বানিয়ে ওকে সেকুলার নাম দিয়ে দিলে কিছু ইংরেজি শিক্ষিত মুসলমান ছেলে এসে পড়বে। আগের জমিদার দিয়ে তেমন কাজ হয়নি; এবার রাজনৈতিক জমিদার তৈরির কাজটা জোরেশোরে করতে হবে। ১৮৮৫ সালে নেটিভ এলিটদের কংগ্রেস পথযাত্রা শুরু করে।

বৃটিশ লক্ষ্য করে পূর্ব বঙ্গে সমাজতন্ত্র মাথাচাড়া দিচ্ছে। জমিদার সহমত ভাইয়েরা কলকাতায় সেকেন্ড হোম বানিয়ে থাকে; আর জমিদারিতে কৃষকের দলাই-মলাই চলছে।

আরেকটা ডিভাইড এন্ড রুলের দরকার পড়ে যায়। ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ। মুসলমানদের এলিট পার্টি গড়ে না দিলে; কৃষক প্রজারা মিলে ইংরেজদের রাজসিক জীবনে গড়বড় করে দেবে এতো দিব্য চোখে দেখা যায়। ১৯০৬ সালে ঢাকায় গড়ে ওঠে মুসলিম জমিদার পুত্রদের মুসলিম লীগ। লীগের রাজনৈতিক জমিদারির সেই থেকে শুভ সূচনা।

কলকাতা আর ঢাকার সহমত ভাইয়েরা এতো বেশি কে কার চেয়ে অভিজাত-কে কার চেয়ে প্রবল নিয়ে ব্যস্ত; যে বৃটিশ ঠিক করে; যা তোদের ডিমোশন করে দিলাম। ইংরেজের সহমত ভাই নয়; এবার তোরা কংগ্রেস-মুসলিম লীগের সহমত ভাই হয়ে কচলাকচলি কর।

বৃটিশদের লুণ্ঠনের শেষের দিকে; দেশে ফেরার আগে রাজধানী কলকাতা থেকে বহু দূরের কংগ্রেস-মুসলিম লীগের পশ্চিম শ্রীখণ্ডের জমিদারদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে। বাঙালি সহমত ভাইদের লঞ্চও গেলো; পঞ্চও গেলো দশা।

ভারত-পাকিস্তান বানিয়ে পশ্চিমবঙ্গকে ভারতের সঙ্গে আর পূর্ববঙ্গকে পাকিস্তানের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে ইংরেজ ফিরে যায়। বলে যায়, ‘নে সহমত ভাইয়েরা, এবার জমিদারি গণতন্ত্র কর আর রাজনৈতিক জমিদারের কারখানা চালু কর।‘ লুণ্ঠন করে পশ্চিমে পাঠাস; তাহলেই হবে। প্রজাদের দলাই মলাই করার সময় আদর করে নাগরিক বলিস; তাহলেই তারা বর্তে যাবে।

(দ্বিতীয় পর্বে সমাপ্য)

৭২৯ পঠিত ... ১৫:১২, এপ্রিল ১৬, ২০২৩

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top