টিসিবির লাইন উন্নয়ন প্রকল্প

২১৯ পঠিত ... ১৮:১১, মার্চ ২৭, ২০২২

TCB-line

:স্যার। টিসিবির লাইনে লোক তো বাড়তেছে!

:আলহামদুলিল্লাহ। খুশির খবর। মিষ্টি বিলানো উচিত। কোথা থেকে মিষ্টি কিনলে ভালো হয়? প্রিমিয়াম সুইটস নাকি অন্য কোথাও থেকে?

:প্রিমিয়াম সুইটস থেকে কেনা উচিত স্যার। এমন খুশির খবর দিতে একটু দামি মিষ্টি না হলে ঠিক জমে না। 

:ঠিক আছে। তুমি একটা সংবাদ সম্মেলনের ব্যবস্থা করো। খুশির খবরটি দেশবাসীকে জানানো উচিত। আর হ্যাঁ, সাংবাদিকদের জন্য দ্রুত মিষ্টির ব্যবস্থা করো। এখন যাও, আমি একটু একা থাকতে চাই। 

সেক্রেটারি দবির আলীর কাছ খবরটি জেনে কিছুটা নস্টালজিক হয়ে গেলেন উত্তর কোরিয়ান মন্ত্রী মশাই। ওনার বারবার মনে পড়ছে ফেলে আসা দিনগুলোর কথা। ১০ বছর আগে এমন একটা স্বপ্নই তিনি দেখেছিলেন। একদিন সরকারের সকল সেবা দেশের সব মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার স্বপ্ন। টিসিবির লাইনে লোক বাড়ার খবর শুনলেই আনন্দে চোখটা জ্বলজ্বল করে ওঠে তার। নিজেকে বেশ সফল মনে হয়। খুশিতে চোখ বুজে কিছুটা ঘুমিয়ে নিলেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলন করা হলো। মন্ত্রী সাহেব সফলতার খবর জানালেন দেশবাসীকে। সম্মেলন শেষে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বললেন, আপনারা কিন্তু মিষ্টি না খেয়ে যাবেন না।

সাংবাদিকদের মিষ্টি খাওয়ানো হলো। মন্ত্রী মশাই চিন্তা করলেন, টিসিবির লাইনের লোকদেরও মিষ্টি খাওয়ানো দরকার। ওদের জন্যই তো সব। যেই ভাবা সেই কাজ। মন্ত্রী সাহেব নিজে মিষ্টি নিয়ে গেলেন। লাইনে দাঁড়ানো সবাইকে মিষ্টি দেয়া হলো, তারা অবাক হয়ে মিষ্টি খাচ্ছে। দৃশ্যটি দেখে মন্ত্রী সাহেবের চোখ ভিজে গেলো। এমন খুশির দৃশ্য দেখে হাউমাউ করে কাঁদতে ইচ্ছে করলো তার। কিন্তু তিনি কাঁদলেন না। খুশিতে কেউ হাউমাউ করে কাঁদে না। খুশির কান্না হয় নিরবে। চোখ দিয়ে টুপ করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। 

কেউ কেউ মিষ্টি খেতে চাইলো না। একজন বললো, মিষ্টি তার পছন্দ না। অন্য একজন বললো, তার ডায়বেটিস। কারো কোন কথা শোনা হলো না। সবাইকে জোর করে মিষ্টি খাওয়ানো হলো। মন্ত্রী সাহেব বললেন, খুশির মিষ্টি খেলে ডায়বেটিসের সমস্যা হয় না।

মিষ্টি খাওয়ানোর ছবিও তোলা হলো। কেউ কেউ ছবি তোলার সময় মুখ লুকালেন। তাদেরকে জোর করে ধরে ছবি তোলা হলো। একজন ধরলেন দুই হাত, আরেকজন ঘাড় চেপে ধরলেন, যেন মাথা ঝোকাতে বা ঘুরাতে না পারে। 

লাইনে লোক বাড়তেছে। তাদের সুবিধার জন্য আরও কিছু জিনিস করা দরকার। দেশটা তো তাদেরই। তাদের জন্য কিছু করতে না পারলে ক্যামনে কী! ভাবতে ভাবতেই সেক্রেটারি দবির আলীকে ডেকে পাঠেলেন মন্ত্রী। 

:দবির মিয়া

:জে স্যার!

:টিসিবির লাইনে দাঁড়ানো লোকজনের জন্য কিছু বাড়তি সুবিধা যোগ করতে চাই। কী করা যায় বলো তো। 

:স্যার, এসি লাগিয়ে দিতে পারেন। রোদের মধ্যে ওরা লাইনে দাঁড়ায়। দেশের সোনার মানুষের সোনার ঘাম টপটপ করে ঝরে। দেখলে বুকটা ফেটে যায় স্যার। কান্না আটকে রাখতে পারি না। এসি লাগালে কিছুটা আরাম পাবে।

:কিন্তু খোলা জায়গায় এসি কি ঠিকমত কাজ করবে? 

:খোলা জায়গা কই পাইলেন স্যার!  এসির বাতাস টিসিবির লাইন হয়ে শহরে, শহর হয়ে গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়বে। দেশের সব মানুষ এসির হাওয়া উপভোগ করবে। ফুটপাতে শুয়ে থাকা ওই উদ্বাস্তুও তো আমাদের দেশেরই জনগণ, ওদের তো এসির বাতাস খাওয়ার অধিকার আছে। আমরা তো এটাই চাই। দেশের প্রতিটি মানুষ যেন এসির বাতাস খাইতে পারে, এটা নিশ্চিত করা তো আমাদের দায়িত্ব।  

দবিরের বুদ্ধিতে মন্ত্রী সাহেব বেশ অবাক হলেন। দেশের মানুষকে নিয়ে কত ভাবে ছেলেটা। ভাবনা, বুদ্ধি সব একদম মন্ত্রীদের মত। সামনের নির্বাচনে ওকে এমপি বানিয়ে একটা মন্ত্রীত্ব দিয়ে দিতে হবে। 

এসি কেনার পরিকল্পনা চলছে। দেশ থেকে এসি কেনার ভাবনা অবশ্য আগেই বাদ দেয়া হয়েছে। এসি কেনা হবে বিদেশ থেকে। কিন্তু ঝামেলা বাঁধলো দাম নিয়ে। বিদেশে সাড়ে ৩ লাখ টাকা এসির দাম শুনে মন্ত্রী সাহেব বেশ ক্ষেপে গেলেন। তিনি হুংকার দিয়ে বললেন, 

:সাড়ে ৩ লাখ টাকা মানে! তোমরা ভালোভাবে দেখেছো?

:দেখেছি স্যার।

:তাহলে এসির দাম সাড়ে ৩ লাখ টাকা কেন?

:ইয়ে মানে স্যার!

:কিসের ইয়ে মানে! দেশের মানুষের জন্য তো আমি এত কম দামে এসি কিনতে পারি না। আরো বেশি দামের এসি দেখো!

:স্যার মানে, এরচেয়ে বেশি দামের এসি তো আর নাই!

:নাই মানে কী! ওদেরকে বলো, আমরা কম দামি এসি নিবো না। প্রয়োজনে সাড়ে তিন লাখ টাকার ওই এসিই ওদের কাছ থেকে সাড়ে ৩ কোটি দিয়ে কিনো। দেশের মানুষের সুখের সাথে আমি কোন কম্প্রমাইজ করতে রাজি না। ওদেরকে আমি কোনভাবেই কম দামি এসির বাতাস খাইয়ে ঠকাতে চাই না। 

সাড়ে ৩ কোটি টাকার ওই এসিই কেনা হবে ঠিক হলো। একজন আমলা কিছুটা কাচুকাচু হয়ে বললো,

:স্যার, এজাজত দিলে একটা কথা বলতে চাই।

:বলো।

:এসি কেনার জন্য আমরা অফিসের ৩২০ জন বিদেশ যেতে চাই। 

মন্ত্রী সাহেব অবাক হয়ে তাকালেন। দেশের মানুষকে কত ভালোবাসে এরা। নিজের কাজ কর্ম ফেলে, পরিবার পরিজন ছেড়ে শুধু দেশের মানুষের জন্য এসি কিনতে বিদেশ যেতে চায়। ভিনদেশে কত দুর্ঘটনা হতে পারে, বিমান ছিনতাই হতে পারে, এক্সিডেন্ট হতে পারে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিমানে এসে পড়তে পারে মিসাইল। তবুও জীবন বাজি রেখে দেশের মানুষের জন্য এই কাজটুকু করতে চায়। ভাবতে ভাবতেই মন্ত্রী সাহেবের চোখে পানি চলে আসলো। টিস্যু দিয়ে লুকিয়ে চোখ মুছলেন তিনি। গলাটা ভারি হয়ে আসলো। ভারি গলাতে বললেন, যাও। দেখে শুনে কিইনো। 

লাইনে এসি লাগানো হলো। কোন দেয়াল না থাকায় লাইনের পাশে খুঁটি গেড়ে সেই গেড়ে খুঁটিতে লাগানো হলো এসি। কিন্তু সমস্যা হলো, এসি লাগানোর পরও লাইনের মানুষ ঘামছে। এরমধ্যে প্রথম দিনই একটা খুঁটি থেকে এসি পড়ে লাইনে দাঁড়ানো একজনের মাথা ফেটে গেছে। মন্ত্রী সাহেব খুবই চিন্তায় পড়ে গেলেন। দবিরকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন,

:কী দবির মিয়া! মানুষজন তো এখনও ঘামছে। কী করা? 

:স্যার আমার মনে হয়, লাইনে চলন্ত সিঁড়ি লাগিয়ে দেয়া উচিত। হেঁটে হেঁটে আগাতে হয় সেজন্য ঘেমে যাচ্ছে সবাই।

:আর এসি পড়ে যে মাথা ফেটে যাচ্ছে! এটা নিয়ে কী করবা?

:স্যার। হাসাইলেন। কিছু হেলমেট কিনলেই তো হয়। সবাই হেলমেট পড়ে লাইনে দাঁড়াবে। মাথায় এসি পড়লেও আর সমস্যা নেই। 

মন্ত্রী সাহেব আবার অবাক হলেন। দবিরকে কাছে এনে ওর কপালে একটা চুমু খেলেন। বললেন, তুই আসলেই একটা সোনার ছেলে। কোন মন্ত্রণালয় চাস বল!

চলন্ত সিঁড়ি ও হেলমেট কেনা হলো। সেসব কিনতে এবার ৪২০ জনের একটা টিম সুইজারল্যান্ড গেলো। দেশের জনগণের সেবায় জীবন বাজি রাখতে এবার এগিয়ে আসলো আরো ১০০ জন আমলা। 

টিসিবির ট্রাক উন্নয়ন প্রকল্প দিনকে দিনকে আরো এগিয়ে গেলো। টিসিবির ট্রাক নামে একটি ওয়েবসাইট খোলা হলো। খরচ হলো ৫৮ কোটি টাকা। করা হলো, একটা হেল্পলাইন প্রজেক্ট, খরচ ৪০ কোটি টাকা। কেটিভি (কোরিয়ান টেলিভিশন) থেকে বানানো হলো ২০ কোটি টাকার টিভিসি, ৩৫ কোটি টাকার ডকুমেন্টরি। টিসিবির লাইনে দাঁড়ানো সবার জন্য করা হলো বিশেষ ড্রেস। লাইন সোজা রাখা শিখতে ৫০০ সদস্যের আরো একটি দল পরিবারসহ বিদেশ সফরে গেলো। মানুষকে লাইনে দাঁড়াতে উৎসাহি করে তুলতে করা হলো সেলিব্রেটি এন্ডরমেন্ট। এলন মাস্ক, মার্ক জাকারবার্গ, জেফ বেজোস, এঞ্জেলিনা জোলি, সানি লিওনদের মত সেলিব্রেটিরা লাইনে দাঁড়িয়ে বাজার করলেন।   

পরিশিষ্ট
তিন বছর টিসিবির ট্রাককে ঘিরে এমন আরো নানান উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়া হলো। কিন্তু ঝামেলা বাঁধলো এর পরে। দেখা গেল, টিসিবির ট্রাকের উপর কোরিয়ান সরকারের আর কোন নিয়ন্ত্রণ নাই। পুরোটাই চলে গেছে সিন্ডিকেন্টের আন্ডারে। টিসিবির ট্রাকে পণ্যের দাম এখন বাজারের চেয়েও বেশি। মন্ত্রী সাহেব টেনশনে পড়ে গেলেন। দবিরকে ডেকে বললেন,

:দবির! কী করা বলো।

:স্যার, এই টিসিবির ট্রাকের চিন্তা বাদ দেন। চলেন আমরা আরেকটা টিসিবির ট্রাক প্রকল্প চালু করি। এই বখে যাওয়া ট্রাকের পাশেই থাকবে আমাদের ট্রাক।

মন্ত্রী সাহেব খুশি হলেন। বললেন,

:আলহামদুলিল্লাহ। মিষ্টি আনো। সংবাদ সম্মেলনের ব্যবস্থা করো।   

২১৯ পঠিত ... ১৮:১১, মার্চ ২৭, ২০২২

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top