বিদ্বেষের বাজারে ভালোবাসার দোকান

১১৯ পঠিত ... ১৭:৪৫, জুন ৩০, ২০২৪

33 (12)

বিদ্বেষ শব্দটিকে আমি বিশেষ অপছন্দ করি। কারণ প্রায় অর্ধশতকব্যাপী জীবনের অভিজ্ঞতায় বিদ্বেষকে কখনো জয়ী হতে দেখিনি। যেসব মানুষ বিদ্বেষ পোষণ করে; তাদের মুখমণ্ডলে ও স্বাস্থ্যে এর স্পষ্ট ছাপ পড়ে। ২০০৭ সালে যাদের সুদর্শন বলে চিনতাম; তাদের মুখমণ্ডলে আজ প্রতিহিংসার বলিরেখা দেখতে পাই। প্রকৃতি ও নিয়তি এইভাবে বিদ্বেষ-অপরাধীকে মার্ক করে রাখে; হিংসার আগুনে পুড়িয়ে দেয় হিংসুকের হৃদয়।

রাষ্ট্রের ক্ষমতা-কাঠামো আর সাধারণ মানুষ প্রথমেই পৃথক। ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশের ক্ষমতাকাঠামোর হাতে রয়েছে রক্তের দাগ, শরীরে রয়েছে লুণ্ঠনের চর্বি। কিন্তু এই তিনটি রাষ্ট্রের সাধারণ মানুষ আজো কল্যাণরাষ্ট্রের দেখা পায়নি; সামাজিক সুবিচারহীন বৈষম্যে ধূসর তিনটি দেশের জনমানুষ।

ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে দেখবেন, বিদ্বেষ বিক্রি করে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে রাজনীতি ও প্রশাসনের ভ্যাগাবন্ডেরা। দক্ষিণ এশিয়ার কৃষক-শ্রমিক-কারিগর-লেখক-গায়ক-খেলোয়াড়-সাধারণ নাগরিকেরা কখনো কাউকে বিদ্বেষ দেখিয়ে সময় নষ্ট করেনি। বরং তারা ভালোবাসার ফসল ফলিয়েছে; বাঁচিয়ে রেখেছে প্রান্তিক মানুষকে।

ইতিহাসের বাঁকবদলের যুগক্ষণে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে রক্তের হোলি খেলেছে রাষ্ট্রের ক্ষমতা-কাঠামো। আমরা বনাম ওরার মারণসূত্র প্রচার করে জীবনের শুল্ক নিয়েছে ক্ষমতা রাক্ষসেরা। আর বিদ্বেষের বাজারে সম্পদ লুট করেছে ভ্যাগাবন্ড শ্রেণি। সাউথএশিয়ান এলিট গড়ে উঠেছে বিদ্বেষের বাজারে সওদা করে।

বৃটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির কোলাবরেটর হয়ে বিদ্বেষের স্টিমরোলার চালিয়ে প্রজাশোষণ করে গড়ে উঠেছে জমিদার শ্রেণী। বৃটিশের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে গণহত্যা চালিয়েছে তারা। কৃষক প্রজার আন্দোলনের মাঝ দিয়ে; বৃটিশ বিরোধী সংগ্রামের সূত্র ধরে দক্ষিণ এশিয়া ১৯৪৭ সালে বিভাজিত স্বাধীনতা লাভ করলে; জমিদারি হারানো শ্রেণীটি সে পরাজয় কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি। তারা অপেক্ষা করেছে সুযোগ ও সময়ের।

পাকিস্তান ঔপনিবেশিক শক্তির কোলাবরেটরেরা দেশলুণ্ঠন করে নতুন জমিদার শ্রেণী হয়ে উঠলে; প্রজার জীবন সেই তিমিরেই রয়ে যায়। ভাষা ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে গণ আন্দোলনের মাঝ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে উপনীত হয় বাংলাদেশ। পাকিস্তানি ক্ষমতাকাঠামোর গণহত্যায় সাহায্য করে দেশিয় কোলাবরেটরেরা। মুক্তিযুদ্ধে পরাজয় কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি এরা। তারা সময় ও সুযোগের অপেক্ষায় থেকেছে।

ফলে স্বাধীন বাংলাদেশে ৪৭-এর পরাজিত শক্তি ও ৭১-এর পরাজিত শক্তির বিদ্বেষের বাজার বসেছে। একদল আওয়ামী লীগের ঘাড়ে চড়ে মুসলিম বিদ্বেষ বিক্রি করেছে; আরেকদল বিএনপির ঘাড়ে চড়ে হিন্দু বিদ্বেষ বিক্রি করেছে।

এই বিদ্বেষ বাজারে নতুন জমিদার শ্রেণী তৈরি হয়েছে। মুসলিম বিদ্বেষকে পাকিস্তান বিদ্বেষ আর হিন্দু বিদ্বেষকে ভারত বিদ্বেষ নাম দিয়ে; এরা  আসলে ধারাবাহিকভাবে দেশ লুণ্ঠন করে চলেছে। মনে করে দেখুন যারা এন্টি ইন্ডিয়ান ও এন্টি পাকিস্তান ভং ধরে দেশের মানুষকে নানারকম সার্টিফিকেট দিয়ে বেড়ায়; এদের কোন কর্মক্ষমতা নেই। এরা বিদ্বেষের মাঝ দিয়ে হিন্দু গৃহ ও বিহারি গৃহ দখল করে; হিন্দু-বিহারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল করে বিরাট ছাপড়ি এলিট সেজে বসেছে। এখনো তারা ঔঁত পেতে থাকে দখলদারিতে।

মাথায় পতাকা বেঁধে গালে পতাকার রঙ মেখে ঘোরা তরুণেরাই দেশ লুণ্ঠক হয়। অতিরিক্ত দেশপ্রেম দেখিয়ে দেশের মালিক সাজতে চাওয়া সহমত কিংবা রহমত অথবা শিবব্রত ও শরিয়ত; এরা হচ্ছে বিদ্বেষের ফেরিওয়ালা। বিদ্বেষ না থাকলে এদের উপার্জন নেই। এদের কাছে মৃতদেহ ও গণহত্যার ধর্ম থাকে, দল থাকে; এরা কেবল নিজ গোত্রের জন্য দরদ দেখানো নরভোজি। মানুষ খেয়ে খেয়ে চেহারায় বিকৃতির ছাপ পড়ে গেছে এদের। শরীরময় লোলচর্ম জাঢ্য জরদগব দলান্ধতা।

এদের ডিএনএ-তে ষড়রিপুর তাড়না। এদের পূর্ব পুরুষ জমিদারের লেঠেল ছিলো; এক কোপে ধড় নামিয়ে দিতো প্রতিবাদী প্রজার। ফলে এদের জিনপ্রবাহে অনুতাপ নেই। ঘৃণার আগুণ উস্কে দিয়ে তাতে নরমাংস পুড়িয়ে খায় এরা।

ভারত-পাকিস্তান ও বাংলাদেশে একই ঘটনা ঘটে চলেছে; ধনী-দরিদ্রের মাঝে সীমাহীন বৈষম্যে সাধারণ মানুষ যাতে ঐক্যবদ্ধ হতে না পারে; তাই তদেরকে বিভাজিত করে রাখা হয় হিন্দু-মুসলমান বিদ্বেষ বাজারে; এন্টি ইন্ডিয়া ও এন্টি পাকিস্তান ঘৃণার লাল বাতি এলাকায়।

বৃটিশ আমলের গণহত্যার জন্য দায়ী বৃটিশ ক্ষমতা-কাঠামো, ১৯৭১ সালের গণহত্যার জন্য দায়ী পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামো, ২০০২ সালের গুজরাট গণহত্যার জন্য দায়ী ভারতের ক্ষমতা কাঠামো, বাংলাদেশের সীমান্ত হত্যার জন্য দায়ী তারাই। সাধারণ মানুষ সবসময় গণহত্যার বিপক্ষে থাকে। অপরাধ এবং অপরাধীকে পিনপয়েন্ট না করে গণহারে দেশগুলোর সাধারণ মানুষের প্রতি ঘৃণা ছড়িয়ে লোকজনকে ব্যস্ত রেখে ব্যাংক ও প্রকল্প ডাকাতি, সেকেন্ড হোম কেনা ও বিদেশে টাকা পাচারে চূড়ান্ত কুশলতা দেখিয়েছে তারা; গত পনেরো বছর ধরে যারা বিদ্বেষের নামে গালাগালের উচ্চশব্দ করে আড়াল করেছে ঘৃণ্য চোর ডাকাতদের।

বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামে আগ্রাসন কিংবা সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে ক্রসফায়ার করেছে ক্ষমতা-কাঠামো। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের এতে কোন সংশ্লিষ্টতা নেই। সাধারণ মানুষ সে বাংলাদেশ-ভারত বা পাকিস্তানের হোক; তারা সবাই ক্ষমতাকাঠামোর হাতে ভিকটিম নিপীড়িত অসহায় জনগোষ্ঠী। সুতরাং গণঘৃণার হিস্টিরিয়া যারা সৃষ্টি করে তারা আসলে দেশডাকাতির সহযোগী; তাদের কাজ বিদ্বেষের দোকান চালিয়ে সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে না দেয়া। এদের থেকে সাবধান থাকা আমাদের কর্তব্য।

একমাত্র ভালোবাসাই পারে সভ্যতা সৃজন করতে।

১১৯ পঠিত ... ১৭:৪৫, জুন ৩০, ২০২৪

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top