লাপাত্তা লেডিজ: প্রান্তিক নারীর খোঁজ

১৩৪ পঠিত ... ১৭:৩১, জুন ১১, ২০২৪

21 (12)

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ডানায় চেপে যে ফেমিনিজম মেট্রোপলিটনে প্রবেশ করেছে; তা সতত ডিল করেছে উচ্চবিত্ত মধ্যবিত্ত কিংবা শৌখিন মধ্যবিত্ত নারীর মনোস্তাত্বিক সংকটগুলো। ঔপন্যাসিক ভার্জিনিয়া উলফের মিসেস ড্যালওয়ে ডিমান্ডিং বয়ফ্রেন্ডকে ছেড়ে লিবেরেল এক পুরুষকে বিয়ে করে অ্যাটিক রুমে একা হয়ে ভাবে, এই একাকীত্ব ইমানসিপেশন থেকে পাওয়া কিনা; কিছুটা ডিমান্ডিং পুরুষই কি তবে ভালো ছিলো।

ছাত্রজীবনে এই উপন্যাসটি পড়ার পর থেকেই আমার মনে হয়েছে, এফলুয়েন্ট নারীর ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে এতো সময় ক্ষয় না করে বরং নারীমুক্তির আলোয় খোঁজ করতে হবে প্রান্তিক নারীর গুমনামি।

পরিচালক কিরণ রাও তার লাপাত্তা লেডিজ চলচ্চিত্রে সেই টমাস গ্রে'র এলিজি রিটেন ইন আ কান্ট্রি চার্চইয়ার্ড কবিতার মতো ধুলিধূসর সূর্যমুখী গ্রামে; পাতিয়ালি রেলস্টেশনের প্রায় অদৃশ্য জীবনে খুঁজেছেন নারীমুক্তির ঠিকানা।

ছবিটির প্রযোজক আমির খানের সাবেক স্ত্রী কিরণ রাও; আরও পলিটিক্যালি কারেক্ট ফেমিনিস্ট ভাষায় বললে, পরিচালক কিরণ রাওয়ের সাবেক স্বামী অভিনেতা আমির খান। এফলুয়েন্ট সমাজের মানুষ বলে তারা বিবাহ বিচ্ছেদকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সমাধান করে; লাপাত্তা লেডিজ চলচ্চিত্রের আর্টিস্টিক কোলাবরেশনে এক সঙ্গে কাজ করেছেন। কিরণ রাও পারতেন টেড লেকচারে গিয়ে, আমির খানের সঙ্গে যৌথজীবনে তিক্ততার গল্প বলে নতুন প্রজন্মকে উপদেশ দিতে, একা থাকা কষ্টের; কিন্তু সেটা প্র্যাকটিস হয়ে গেলে; এরচেয়ে আনন্দের অভিজ্ঞতা আর নেই।

এই বাক্যটিই কিরণ রাও ‘লাপাত্তা লেডিস’ ছবির রেলস্টেশনের চা-ওয়ালী মাসির মুখ দিয়ে বলিয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় হ্যাশট্যাগ মেল শভিনিস্ট আমির জাতীয় খেলনা মুভমেন্টের চেয়ে ‘লাপাত্তা লাগেজ’ ছবিতে হারিয়ে যাওয়া দুই নতুন বউ ফুল ও জয়াকে মানুষ হিসেবে পুনরাবিষ্কারের শৈল্পিক আন্দোলন করেছেন কিরণ। চিন্তার আভিজাত্য ঠিক এমনি হয়।

নতুন বউ ইয়া বড় ঘোমটা টেনে রাখায় রেলকামরায় বউ বদল হয়ে যায়। যার মুখ দেখা যাচ্ছে না; সে তো ছাতা কিংবা সুটকেসের মতো ফনফিউশন তৈরি করতেই পারে। একটি দৃশ্যে দীপক নামের এক তরুণ তার হারিয়ে যাওয়া বউকে খুঁজতে, বিয়ের ঘোমটা দেয়া ছবি দেখিয়ে এক দোকানিকে দেখালে সে উত্তর দেয়, মুখ দেখা না গেলে মানুষকে কী করে চেনা যায়! এ কথা বলতেই দোকানির স্ত্রী অন্দরমহল থেকে এসে হিজাবে ঢাকা মুখে এক কাপ চা দিয়ে যায়। মাত্র একটি দৃশ্যে নারীকে অবগুন্ঠনে ঢেকে রেখে খুঁজে বেড়ানোর আইরনি তুলে ধরা হয়।

ভুলবশত ঘোমটা দেয়া জয়াকে নিয়ে ট্রেন থেকে নেমে যায় দীপক। আর দীপকের স্ত্রী ঘোমটা দেয়া ফুল কুমারি হারিয়ে যায়। আশ্রয় পায় রেলস্টেশনের ছোটখাট মানুষের কাছে। বাইরে থেকে যাদের ভয়ংকর মনে হয়; সেই সুন্দর মনের মানুষেরাই; চা-ওয়ালি আন্টির অভিভাবকত্বে আত্মনির্ভর এক জীবনের খোঁজ দেয় ফুলকে।

আত্মপরিচয় গোপন করে জয়া সিং; নাম নেয় পুষ্পা। তার যার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিলো সেই প্রদীপের আগের স্ত্রী আগুনে পুড়ে মারা গেছে; সন্তান না হবার দায়ে। প্রদীপ পুলিশে রিপোর্ট করলে সেই খবর সূর্যমুখী গ্রামের দারোগা মনোহরের কাছে এসে পড়ে। সে এই পুষ্পাকে ‘চোর’ ও ‘ফ্রড’ হিসেবে সন্দেহ করে। আমির খান নিজে এই মনোহর চরিত্রে অভিনয়ের জন্য অডিশন দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রফেশনালিজমে ছবির প্রযোজক অডিশনে ফেল করতে পারেন। রবি কিষাণ এই সাব ইন্সপেক্টর চরিত্রে অভিনয় করে হৃদয় জয় করেছেন।

পুষ্পা দীপকের বড় ভাইয়ের স্ত্রীর স্কেচ আঁকার প্রতিভাকে উতসাহিত করে। এই দু'জনের সুসম্পর্ক দেখে দীপকের মা ও দাদী আবিষ্কার করেন, নারী কিভাবে নারীর সঙ্গে খেলনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করে বন্ধুত্বে বেঁচে থাকতে পারে। পুষ্পা দীপকের মায়ের রান্নার প্রশংসা করে; জীবনে ‘প্রশংসা’ কি জিনিস তার স্বাদ দেয় মাকে।

পুষ্পা দীপকের বাবাকে ফসলের পোকা বিনাশের জৈব পদ্ধতি শেখায়। সে-ই প্রথম তাদের জানায়, রাসায়নিক সার ফসলের জন্য ক্ষতিকর।

ওদিকে রেলস্টেশনে চা-ওয়ালি খালার সঙ্গে কথোপকথনের মাঝ দিয়ে ফুল কুমারি নারী স্বাধীনতার চারুপাঠ পায়। টি-স্টলে কাজ করে প্রথম উপার্জনের অভিজ্ঞতা লাভ করে। নারীজীবন সম্পর্কে স্টেরিওটাইপিং থেকে বেরিয়ে আসে সে।

দীপক চরিত্রটি পুরুষ সম্পর্কে স্টেরিওটাইপিং ভেঙ্গে দেয়। সে দায়িত্ববান স্বামী; ফুল কুমারিকে খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়। আবার নিজ গৃহে ভুল করে এসে পড়া পুষ্পাকেও তার ঠিকানায় পৌঁছে দিতে সচেষ্ট হয়। হারানো ফুল কুমারীকে খুঁজে বের করতে এলাকার নেতার সাহায্য চায়। কিন্তু নেতা সেটাকে নিজের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ‘অপহরণ’ বলে ইস্যু বানায়। রাজনৈতিক নেতা যে কোন কাজে আসেনা; তা বোঝা যায় ছোট একটি দৃশ্যের মাঝ দিয়ে। এখানেই নির্মাতার বাস্তব চিত্র তুলে ধরার মুন্সীয়ানা।

কিন্তু পুষ্পা ওরফে জয়া সিং তার মায়ের কাছে ফিরে যেতে চায়না; যে তাকে ‘বিয়ে দিয়ে’ যৌতুকের জন্য লালায়িত প্রদীপের হাতে তুলে দিয়েছিলো। জয়া আসলে কৃষিবিজ্ঞান পড়তে দেরাদুনে যেতে চায়; সে জানে কৃষিবিজ্ঞানীদের ভবিষ্যত উজ্জ্বল কৃষিপ্রধান ভারতে।

দেরাদুনে পালিয়ে যাবার জন্য জয়া ঘর থেকে বের হলে, স্ত্রী হারানোর শোকে এলোমেলো দীপককে দেখে তার মায়া হয়, যাত্রা স্থগিত করে সে। দীপকের বৌদি তার স্মৃতি থেকে ফুল কুমারির স্কেচ করলে; দীপকের বন্ধুর সাহায্য নিয়ে 'ফুল কুমারীর  হারানো বিজ্ঞপ্তি'র পোস্টার ছেপে প্রচার করায়।

মনোহর এর মাঝে অনুসন্ধান করে বের করে, পুষ্পার আসল নাম জয়া, তার বিয়ে হয়েছিলো প্রদীপের সঙ্গে। পুষ্পাকে গ্রেফতার করে সে। পুষ্পা পুলিশ কর্মকর্তাকে জানায়, পড়ালেখার সুযোগ খুঁজতেই সে পরিচয় গোপন করে দেরাদুন পালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলো।

প্রদীপ যথারীতি পুলিশ স্টেশনে আসে। পুরুষসূচক এনটাইটেলমেন্ট থেকে সে জয়াকে চড় দেয়।

মনোহর চরিত্রের ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যাওয়া দেখতে পাই। সে প্রদীপকে ‘চড়’ মারার অপরাধে নারী নির্যাতন আইনে গারদে ভরার ভয় দেখায়; প্রদীপের প্রথম স্ত্রী পুড়ে মরার ঘটনাটিকে হত্যা মামলা হিসেবে উত্থাপনের হুমকি দেয়। ভবিষ্যতে জয়াকে বিরক্ত করলে ভালো হবে না সেটাও বলে। যৌতুকের গয়নার পুটলিটা রেখে যেতে বলে।

যে দুর্নীতিবাজ পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রথম দৃশ্য থেকে ঘুষ খেতে দেখা যায়; দুর্বল গণতন্ত্রের দেশের সেন্সর বোর্ড হলে; এসব দৃশ্য রাখা যেতো কিনা সন্দেহ। কিন্তু জয়া'র কৃষিবিজ্ঞান পড়ার স্বপ্ন সেই পুলিশ কর্মকর্তাকে স্পর্শ করে। সেও জয়াকে মুক্তি দিয়ে স্বগত উক্তির মতো বলে, এই মেয়ে অনেক দূর যাবে!

হারানো বিজ্ঞপ্তির সাহায্যে ফুলকুমারি জানতে পারে দীপকের গ্রামের নাম; যে নামটি সে মনে করতে পারছিলো না। যেহেতু ফুলের নামে নাম, সূর্যমুখী’; অসংখ্য ফুলের নামের ভিড়ে কিছুতেই মনে আসেনি। যে স্টেশন মাস্টার, ছোটু, চা-ওয়ালি আন্টি; এরা ফুল কুমারিকে দীপকের ঠিকানায় ট্রেনে তুলে দেবার পর অশ্রুভেজা চোখে তাকিয়ে থাকে; তাদের মাঝে যে নিঃস্বার্থ আনন্দের ঝিলিক দেখা যায়; দক্ষিণ এশিয়ার এইসব ছোট খাট মানুষের ঈশ্বরেরাই সুন্দর।

কোন মেলোড্রামা নেই; অসুন্দরের হুল্লোড় নেই, ওটিটিতে গালাগাল দিয়ে রসনা তৃপ্ত করা নয়, লিবিডোর সুড়সুড়ি নয়; সরল গল্পে হ্যাভস নট নারীর নিজেকে খুঁজে পাওয়ার গল্প হয়ে ওঠে লাপাত্তা লেডিজ। কিরণ রাও শিল্পির তুলিতে এঁকে দেন ঘুম ভাঙ্গার গল্প; সম্ভাবনাময় ভোরের গল্প।

১৩৪ পঠিত ... ১৭:৩১, জুন ১১, ২০২৪

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top