কে এই ধ্রুব রাঠি

৩৪২ পঠিত ... ১৫:৪৫, জুন ০২, ২০২৪

7d0c36c9-4e69-4c6a-8cc3-059c27794f78

ভারতের এবারের নির্বাচনে মাঠের বিরোধী দল ছাড়াও মোদি সরকারের কঠিন প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে জার্মানিতে বসবাসরত ২৯ বছরের এক ভারতীয় ইনফ্লুয়েন্সার। বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনা নিয়ে তথ্যভিত্তিক ভিডিও বানিয়ে ইউটিউবে আপলোড করেন তিনি। তার নাম ধ্রুব রাঠি। ধ্রুবর ইউটিউব চ্যানেলে প্রায় ২ কোটির বেশি সাবস্ক্রাইবার আছে। তার দেয়া ভিডিওগুলো প্রতিদিন কোটি কোটি ভারতীয় দেখছে, কোথাও কোথাও বড় পর্দা টানিয়েও দেখা হচ্ছে ধ্রুবর ভিডিও। ভারতের এবারের নির্বাচনে বিজেপি যদি হেরে যায় তাহলে সেখানে ধ্রুব রাঠিকে অন্যতম গুরুত্বপুর্ণ নিয়ামক মনে করছেন অনেক বিশ্লেষকরা।  

গত ৬ বছর ধরে ধ্রুব ভারতের রাজনীতিকে খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করছেন আর সেই সাথে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ মূলক ভিডিও আপলোড করছেন ইউটিউবে।

তার ভিডিও প্লে করলে দেখা যায় খুব সাদামাটা একটা সেট আপ নিয়ে, এক কালার টিশার্ট গায়ে চড়িয়ে ক্যামেরার সামনে কখনও একটার পর একটা প্রশ্ন করেই যাচ্ছেন, কিংবা একের পর এক রাজনৈতিক গোমর ফাঁস করে যাচ্ছেন।

ধ্রুব কিছুদিন আগে একটা ভিডিও আপলোড করেছেন। ‘ভারতের রাজনীতি কি একনায়কতন্ত্রে রূপ নিয়েছে?’ তার মতে বাইরে থেকে দেখতে ভারতে গণতন্ত্র আছে বলে মনে হলেও ভেতরে পুরো বিষয়টা অনেক বেশি জটিল। তিনি নিয়মিত দূর্নীতি, রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থার অপব্যবহার, মোদি কিংবা তার সরকার কতৃক বিভিন্ন গণতান্ত্রিক কাজে বাধা প্রদানের বিপক্ষে কথা বলে ভিডিও বানাচ্ছেন।

ধ্রুবর ভিডিওর সবচেয়ে শক্তিশালি দিক হচ্ছে স্ট্রং তথ্য, এক ঘটনার সাথে আরেকটা ঘটনার সংযোগ ও সহজ ব্যাখ্যা। যার ফলে ভিডিওগুলো একই সাথে বিশ্বাসযোগ্য ও যেকোনো মানুষই সহজে বুঝতে পারে।

ধ্রুব ঠিক কেমন ভিডিও বানান সেটা কিছুটা হলেও বোঝার জন্য মোদির একনায়কতন্ত্র নিয়ে বানানো একটা ভিডিওর কিছু অংশ লিখছি।

২৯ মিনিটের পুরো ভিডিওতে ধ্রুব নিজের মতো করে কথা বলে যাচ্ছেন মোদি কতৃক মিডিয়া আর বিরোধী দলকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে কীভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে তা নিয়ে আর সাথে ব্যাকগ্রাউন্ডে প্রয়োজন অনুযায়ী অ্যানিমেশন আসছে, ইনফোগ্রাফ ভেসে ওঠছে। অনেক পুরোনো কিছু ঘটনা যা মানুষের কথার মাঝে আসে না সেগুলো নিয়েও কথা বলছেন তিনি। 

মোদি তার সাফল্যের খবর যেভাবে প্রচার করেন তার উলটো দিকের ঘটনাগুলো সামনে নিয়ে আসতে সব সময় সচেষ্ট থেকেছেন ধ্রুব। ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দেশ ভারত। আজ ভারতের নির্বাচনের শেষ ধাপ, ৯৭ কোটি ভোটারের অংশগ্রহণে নির্বাচনের ফলাফল পাওয়া যাবে আগামী ৪ জুন।

মোদি সরকার অনলাইনে নির্বাচনী প্রচারনার জন্য হোয়াটসঅ্যাপে ৫০ লক্ষ চ্যানেল ব্যবহার করছে। ভারতীয়দের কাছে মেইনস্ট্রিম খবরের চ্যানেলে প্রকাশিত খবরের চেয়ে হোয়াটসঅ্যাপে, ইউটিউবে প্রকাশ পাওয়া কোনো খবর বেশি বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয়।

ভারত ইউটিউবের সবচেয়ে বড় বাজার। এখানে কোটি কোটি ভিউ আছে এমন বিভিন্ন চ্যানেলে যেমন সরকার পন্থী প্রচারনা চালানো হয়, ইসলামফোবিক কিংবা মিথ্যা তথ্য প্রচার করা হয় তেমনি ধ্রুবের মতো যারা ভিডিও বানান তাদের ভিডিও অনেক সাড়া ফেলে।

নির্বাচনে মোদির অবস্থান শক্ত থাকলেও, ধ্রুব বিভিন্ন সময় দূর্নীতি, দ্রব্য মূল্যের দাম বৃদ্ধি, বেকারত্ব ইত্যাদি বিষয় নিয়ে যেসব ভিডিও বানান সেগুলো নিয়ে ভারতের জনগণ বেশ দুশ্চিন্তাগ্রস্থ।

ধ্রুবর চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা বিজেপির চ্যানেলের প্রায় সমান। অন্যান্য সব দলের চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবার যোগ করলে হয়ত মোটে ৫ লক্ষ হবে। বিরোধী দলের মিছিলে দেখা যাচ্ছে বড় বড় ভ্যানে করে ধ্রুবর ভিডিও প্রদর্শন করা হচ্ছে। সুনামির মতো মোদির নির্বাচনী প্রচারণায় হামলা চালাচ্ছেন ধ্রুব তার ভিডিওর মাধ্যমে।

নরেন্দ্র মোদী যখন কেবল ক্ষমতায় আসেন তখন ধ্রুব কেবল হাই স্কুল শেষ করে জার্মানী পাড়ি জমিয়েছে। মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য। সেখান থেকে তিনি প্রথম ইউটিউব ভিডিও পাবলিশ করেন। আইফোন ৫ এসে শ্যুট করা একটা ট্রাভেল ভ্লগ দিয়ে ইউটিউব যাত্রা শুরু করলেও ২০১১ সালে, আরও লাখ লাখ ভারতীয় যুবকের মতো তাদের সময়ের সবচেয়ে বড় দূর্নীতি বিরোধী আন্দোলনের দিকে ঝুঁকে যান। কংগ্রেস বিরোধী এই আন্দোলনের মাধ্যমে মোদির সফলতার গল্প শুরু হয়।

২০১৪ সালে কালো টাকার বিরুদ্ধে মোদির অবস্থানের কারণে অন্য অনেকের মতো ধ্রুব আশার আলো দেখতে পেয়েছিলেন। ধ্রুব একজন মোদি সাপোর্টার ছিলেন যিনি মোদির ক্ষমতায় আসাকে সাধুবাদ জানান। কিন্তু দ্রুতই তার ধারণা পালটায় যখন ২০১৫ সালে ভারতীয় আম আদমি পার্টি দিল্লী সরকার অধীন এন্টি কোরাপশন হেল্প লাইন চালু করলে, মোদি সরকার জোর করে সেটা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়।

ধ্রুব বলেন, পুরো ব্যাপারটা আমাকে হতাশ করেছিল। এটা কোনোভাবেই ভারত থেকে দূর্নীতি নির্মূল করার উদ্দেশ্যে করা হয়নি। ধ্রুব বলেন, তিনি চরম বিরক্ত হওয়া শুরু করেন যখন মেইনস্ট্রিম খবরে মোদি আর বিজেপি নিয়ে উদ্দেশ্য প্রণোদিত বায়াসড খবর প্রকাশ করা শুরু হয়।

এর প্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর প্রথম ভিডিও প্রকাশ করেছিলেন। নিজের ফোনে করা ভিডিওতে তিনি বিজেপির আইটি সেলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের উপর গুরুত্ব দেন। সেই ভিডিওতে কীভাবে উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে বিভিন্ন তথ্য ও ভুয়া তথ্য ব্যবহার করা হচ্ছে, ভুয়া ছবি, বক্তব্য ব্যবহার করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করা হচ্ছে, টাকা খেয়ে বিজেপির পক্ষে বিভিন্ন পোস্ট করা হচ্ছে এসব তুলে আনেন।

ধ্রুব তখন একাই কাজ করতেন, এখন যেমন কাজ করছেন তার সাথে তুলনা করলে আগেরগুলো আরও বেশি জোড়ালো ছিল। তখন থেকে ধ্রুবকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। গত ৮ বছরে তার মেইন ইউটিউব চ্যানেলে প্রায় ৬৫০ টার মতো ভিডিও আপলোড করেছেন। এছাড়া তার ট্রাভেলের প্রতি ভালোলাগা থেকে আরেকটা আলাদা চ্যানেল রেখেছেন।

ধ্রুব চ্যানেলে ভারতের ইতিহাস নিয়ে বানানো বিভিন্ন ভিডিও আছে, সমসাময়িক বিভিন্ন ঘটনা আলোচনা করে বানানো ভিডিও আছে। কিন্তু তার প্রধান আগ্রহের জায়গা রাজনীতি।

তার সফলতার পেছনে রিসার্চ, অ্যানিমেশন, ইনফোগ্রাফসহ অন্যান্য সব কিছুর দারুণ এক মিশেল জোড়ালো ভূমিকা রেখেছে।

বিজেপের প্রাণকেন্দ্র নর্থ ইন্ডিয়া যেখানে ২০১৪ ও ২০১৯ এ বিশাল সফলতা পায়। ধ্রুব সেই জায়গারই মানুষ। খুব সাধারণ মানুষের হিন্দি ভাষায় তার ভিডিওগুলো উপস্থাপন করার কারণে মানুষ আপন করে নিয়েছে তাকে।

ধ্রুব বিজেপির মতো জাতীয়তাবাদী ভাষা প্রয়োগ করেন তার ভিডিওগুলোতে। ভারতীয় রাজনৈতিক স্যাটায়ারিস্ট আকাশ ব্যানার্জির মতে ধ্রুব এমনভাবে কথা বলেন যা সাধারণ মানুষের কাছে ভালো লাগে। এছাড়া তিনি জানান দেন যে তিনি দেশ বিরোধী নন, বরং ঘৃণা বিরোধী, দলের পূজা বিরোধী।

তার মতে তিনি মানুষকে এটা বোঝাতে চান যে দেশ কিংবা দেশকে পূজা করা আর কোনো দলকে বা সেই দলের নেতাকে পূজা করা এক না।

ধ্রুব বলেন সময়ের সাথে সাথে তার ভিডিওর গুণগত মানে পরিবর্তন এসেছে। সময়ের সাথে সাথে তার ভিডিওতে তিনি বিভিন্ন রকম সংযোজন বিয়োজন করেছেন। তিনি সব সময়ই সুচিন্তিত মতামতকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি নিজে সাংবাদিক নন, কিন্তু তিনি তার ভিডিওতে সাংবাদিকদের অ্যাসেন্স নিয়ে আসেন যেটা তার দেয়া তথ্যের বস্তুনিষ্টতার সাথে চলে আসে।

২০২০ এর আগ পর্যন্ত ধ্রুব একাই নিজের ভিডিওর সব কাজ করতেন। এতে বিভিন্ন ভুল হতো এটা বুঝতেন তিনি। সেই ভুল থেকে অনেক কিছু শিখেছেনও। এখন তার সাথে স্ক্রিপ্টরাইটার, রিসার্চার ও ভিডিও এডিটরের দল কাজ করেন।

ধ্রুব বলেন, ভিডিওর বস্তুনিষ্ঠতা নিশ্চির করার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করি আমরা। ভিডিওর প্রোডাকশন কোয়ালিটির বেশ উন্নয়ন হয়েছে।

এই দীর্ঘ সময়ে ধ্রুব নিজস্ব এক উপস্থানপনার ধরন তৈরি করেছেন। এক কালার টিশার্ট গায়ে নিয়েই সব ভিডিও শ্যুট করেন। ‘নমস্কার বন্ধুরা’ বলে শুরু করা প্রত্যেকটা ভিডিওতে তিনি অনেক সহজ ভাষায় সত্যতা ও বস্তনিষ্ঠতা রেখে জটিল বিষয় তুলে ধরেন। এতে সহজেই মানুষের কাছে পৌঁছে গেছেন তিনি।

বিজেপির আইটি সেলের প্রোপাগান্ডা ছাড়া সত্য কথা যে ভারতের মানুষ শুনতে চায়, জানতে চায় তা বোঝা যায় তার ভিডিওর কমেন্ট সেকশনের কমেন্ট পড়লে।

৩৪২ পঠিত ... ১৫:৪৫, জুন ০২, ২০২৪

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top