ব্যাংক ব্যবস্থার ভাঙা কোমরের সাথে ঋণখেলাপির সম্পর্ক

৭৭ পঠিত ... ১৮:০০, মে ১৬, ২০২৪

32 (1)

লেখা: তানভীর বিন হাসান 

পুরো পরিবার যে টাকা ভোগ করে, আদর্শিক ভাবে চোর না হলে সে টাকা পরিশোধ করার দায়িত্ব বেনিফিশিয়ারি পরিবারের উপরেই বর্তায়। আব্বা মারা যাবার সময় তার সকল বেনিফিট সমন্বয় করার পরে সামান্য হাউজ বিল্ডিং লোন ছিল, তার মারা যাবার পর আমাকে সেটা পরিশোধ করতে হয়েছে। ছেলেবেলায় আম্মা প্রায়ই আমাকে নিয়ে গিয়ে আব্বার অফিসে গিয়ে নানা চিঠিপত্র দিতো। শেখাতো ভবিষ্যতে কী করা লাগবে। শিখতাম।

আব্বা যখন মারা যায় আমার বয়স তখন ১১, আমি তখন থেকেই জানি আমাদের কিছু টাকা পরিশোধ করতে হবে, নইলে আমাদের মাথা গোঁজার ছাদটা নিয়ে যাবে ব্যাংক। আমাদেরকে শেখানো হয়েছে এই বাড়ি ব্যাংকের, আমাদের না। আমরা কখনো ঋণ মাফ চাই নাই, পরিশোধের জন্যে সময় চাইতাম। আব্বা মারা যাবার ১৪ বছর পরে আমার চাকুরীর ২য় বছরে ওই টাকা পরিশোধ হয়। 

উপার্জন শুরুর প্রথম দুই বছরের অর্থ দিয়ে একটা ভালো রেস্তোরাঁয় খাই নাই, ফুটাংগিরি মারি নাই, আগে ঋণ পরিশোধ করেছিলাম। তখনও ফেসবুক ছিল, তবে আমার কোন চেকইন ছিল না। এই ঋণ পরিশোধের আগ পর্যন্ত আমার জীবনের একটা লক্ষ্যই ছিল এই ঋণ পরিশোধ করা, আমার মায়ের সারাজীবনের স্বপ্নই ছিল ওই ঋণ পরিশোধ করা। আমাকে কেউ এই বলে সুযোগ দেয় নাই- বাপের ঋণ ছেলে পরিশোধ করবে কেন!! এইসব অবান্তর কথাবার্তা বেকুব অথবা সুবিধাভোগী লোকজন ছাড়া বলা অসম্ভব ব্যাপার।

বাংলাদেশের লোকজন চারিত্রিকভাবে কতটা স্বজনপ্রীতি করতে পারে সেটা স্রেফ তাদের পরিবার না পছন্দের লোকজন কিংবা একই পেশার সবচেয়ে খারাপ লোকটিকে ডিফেন্ড করা দেখেই বোঝা যায়। এমনকি এই চরিত্র আমাদের নয়া বিপ্লবী প্রজন্ম যারা নিজেদের বিশাল কুতুব, বিশাল স্মার্টি ভাবে তাদের মধ্যে দেখা যায় সবচেয়ে বেশি।

জেন-জি; মিলেনিয়ালস প্রজন্মের কিংবা তার আধা দশক আগের প্রজন্মের যারা নিজেদের মিলেনিয়ালস ভাবে, এদের আমি প্রচণ্ড মেধাবী ভাবতাম। এরা বেসিক কম্পিউটিং পেরুনো প্রজন্ম। গেমিং, প্রোগ্রামিং, রেসিং, হাই লেভেল লাইফ, কানাডা, আমেরিকা এদের কাছে পানিভাত ব্যাপার। কিন্তু, নিজে কাছ থেকে কয়েকটার অর্থনীতি জ্ঞান, ইতিহাস জ্ঞান, সামাজিক জ্ঞান, মানুষের প্রতি কর্তব্যজ্ঞান এবং ‘ফাক ইয়ু হু এভার ইয়ু আর’ অ্যাটিচিউড দেখে আমি অবাক হয়ে গেছি। শতভাগ ছেলেপেলে তো আর এক হবে না, কিন্তু মোটাদাগে এদের সংখ্যাগরিষ্ঠ একটা কমফোর্টেবল দুনিয়ায় বসবাস করে, এদের মাথাভর্তি অসংখ্য স্বার্থপর লজিকের বসবাস।

আজকে দেখলাম রাফসান দ্যা ছোটভাই ছেলেটার পক্ষে দাঁড়িয়ে গেছে এই প্রজন্মের এইসব স্যুডো বিপ্লবী ছ্যাঁচড়ারা। নিজেদের পক্ষে যুক্তি দাড় করাতে গিয়ে কল্পনার রাজ্যে ঘোরা এই আবালেরা কিছু ন্যারেটিভ দিচ্ছে:

১) ঋণখেলাপিদের জন্যে দেশের অবস্থা খারাপ না, দেশের অবস্থা খারাপ কেননা লোকজন নিজেরা পরিশ্রম না করে আরেকজন সফলতা পেলে তার পিছনে লাগে।

২) বাপের ঋণের জন্যে ছেলে কেন দায়ী হবে!

দেখেন কথাবার্তার ছিরি। মানে মাথায় কতটুকু গোবর থাকলে এইসব কথা বলা যায়, কতটা নির্লজ্জ হলে এইসব কথাবার্তা এমন সময় প্রমোট করা যায়, ঠিক যেদিন বাংলাদেশে অফিসিয়ালি ফুড ইনফ্লেশন ১০% ছাড়িয়ে গেছে। আদতে যেটা হবে ২০%.

এই ছাগল প্রজন্ম কী জানে বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টর ধসিয়ে দিয়েছে ঋণখেলাপিরা। কয়েকটা ব্যাংককে সাপোর্ট দিতে গিয়ে টাকার পর টাকা ছাপাতে হয়েছে এই দেশে। ঋণখেলাপিদের তৈরি ইনফ্লেশনের ধাক্কা সামলাতে গিয়ে সাধারণ মানুষের টাকার ভ্যালু কমে গত কয়েক বছরেই ডলারের বিপরীতে ৩০% নিচে নেমে গেছে। সমস্যা হয় নাই শুধু রাফসানদের বাবাদের। তাদেরকে ইনফ্লেশন স্পর্শ করে নাই কারণ তারা টাকা মেরে দিয়েছে।

বেসিক ব্যাংক খেয়ে দেয়া বাচ্চুর পরিবার, তার বন্ধুবান্ধবও এভাবেই হয়তো বাচ্চুকে ডিফেন্ড করে। এভাবে প্রতিটি চোরের পরিবার তাদের ডিফেন্ড করে। আজকে দেশের প্রতিটি চাকুরীজীবী বাজার করার মত প্রাত্যহিক কাজ নিয়ে যে অনিশ্চয়তায় ভোগে এটা রাফসানদের বাপেদের অবদান।

যারা বলতে চায় রাফসানের সফলতার কারণে তার পেছনে লেগেছে লোকজন, এটা মুদ্রার আরেকটা পিঠ। এইখানে ব্যাপারটা এত সরলীকরণ করার সুযোগ নাই। এই বদমায়েশেরা বোঝাতে চায় লোকজন খারাপ তারা আরেকজনের পেছনে লাগে। আরেকজনের সফলতা দেখে ঈর্ষান্বিত হওয়া অবশ্যই কোন ভালো কথা না, ফলে এই অভিযোগ এনে তারা ছোট করতে চায় ওইসব মানুষকে যাদের পকেটের টাকা মেরে রাফসানের বাপ তার পরিবারকে দিয়েছে দূর্দান্ত একটা জীবন!! কী সুন্দর!!! মানে দেনাদারকে আপনি বোঝাতে চাইলেন ভাই মিঠা খাওয়ার আগে ঋণ ফেরত দাও, সে আপনারে বোঝালো টাকা চেয়ে আপনি খারাপ মানুষের কাজ করলেন!

উত্তরাধিকার সূত্রে ঋণ ফেরত দেয়া শুধু কথার কথা না, এটা অফিসিয়ালি ঋণ দেয়ার একটা প্যারামিটারও। ইন্টেগ্রেটেড ক্রেডিট রিস্ক স্কোরিং বা আইসিআরএস দলিলটির একটা বড় নম্বর ক্যারি করে ব্যবসায়ীর উত্তরাধিকার, তার বয়স, তার ওই ব্যবসা চালানোর এবং বাপ-মায়ের ঋণ পরিশোধ করার সুযোগ নিরুপণ করে।

ব্যাংকের ঋণ কোন ছেলেখেলা না। এটা স্রেফ বাংলাদেশেই ছেলেখেলা বানিয়ে দেয়া হয়েছে। যে টিকটক যুবক অন্যদিন ইনফ্লেশন, বাজার ব্যবস্থা নিয়ে বিশাল মুখস্থ লেকচার ঝাড়ে, সে আরেকদিন তার কনটেন্ট ক্রিয়েটর ভাইকে ডিফেন্ড করতে আসে! এদের জ্ঞানের জোর কতটুকু, এদের বিবেক কতটা শক্তিশালী তখনই বোঝা যায়। আমি এদের যারপরনাই ঘৃণা করি। প্রতিটি ঋণখেলাপিকে আমার ব্যক্তিগত শত্রু মনে হয়, আমি এদের সকল বেনিফিশিয়ারিকেই ঘৃণা করি।

৭৭ পঠিত ... ১৮:০০, মে ১৬, ২০২৪

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top