ভারতের আকাশে তারুণ্যের ধ্রুবতারা

১২৯ পঠিত ... ১৬:৫৬, মে ১৪, ২০২৪

19 (6)

ভারতীয় তরুণ ধ্রুব রঠি একাই ইউটিউবে মোদি সরকারের সমালোচনা করে বিপুল জনমত তৈরি করেছেন। মেধাবী এই তরুণ বিজ্ঞান বিষয়ক টিউটোরিয়াল দিয়ে অনলাইনে যাত্রা শুরু করেছিলেন। সেগুলো দিয়েই যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিলেন তিনি। চাইলে ঐ কাজটাই করে একসময় ‘পদ্মশ্রী’ পাবার অপেক্ষা করতে পারতেন।

শুধু আলগোছে একবার বলতে হতো, মোদির সরকার, বারবার দরকার।

কিন্তু চোরের খনির চাটার দল  হয়ে তো জন্মাননি ধ্রুব। তার পূর্বপুরুষ হরিয়ানায় সম্পন্ন কৃষক ছিলেন। পরিবারে শিক্ষা-সংস্কৃতি-আধ্যাত্মিকতার চর্চা ছিলো। ধ্রুব'র বাবা ছিলেন সৎ ও মনের দিক দিয়ে সচ্ছল মধ্যবিত্ত। অল্পে তুষ্ট আনন্দঘন শৈশব ছিলো তার। সাকসেস স্টোরি বলতে গিয়ে মিডিয়াজেনিক ‘করুণ শৈশবের কাহিনী’ বলার মতো উপাদান নেই তার কাছে।

ধ্রুব মেধাবী ছাত্র ছিলেন। জার্মানিতে গিয়ে প্রকৌশল শাস্ত্র নিয়ে পড়েন। কিন্তু চাকরি করতে গিয়ে মনে হয়, এই ন'টা পাঁচটা চাকরের জীবন তার জন্য নয়। অনলাইনে শুরু করেন বিজ্ঞান বিষয়ক টিউটোরিয়াল।

ভিয়েনায় ট্রামের কামরায় দেখা হওয়া এক ইউরোপীয় তরুণীর সঙ্গে প্রেম ও পরিণয়। ইচ্ছা করলে ভারতীয় বংশোদ্ভুত কৃতি পুরুষ হিসেবে ‘আনন্দ বাজারীয়’ গর্বকাব্যের পনের মিনিটের খ্যতির উত্তরীয় পরে নিতে পারতেন। শুধু একবার বললেই হতো, কীসের ভোট; উন্নয়নটাই আসল।

ওরকম চাকরস্য চাকর মনোবৃত্তি আসলে কোন সৎ ও মেধাবী মানুষের হতেই পারেনা; যে পুন পুন করে সরকারের সমস্ত অন্যায় দেখেও মুখে কুলুপ এঁটে থাকবে আর কুঁচ কুঁচ করে ইসলামোফোবিয়া করে বিদূষক অর্ণব গোস্বামী সমাজের নয়নের মণি  হবে।

ধ্রুব ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে গবেষণা করে; হ্যাঁচকা টানে খুলে দিয়েছেন, নিও নাতসি মোদিভক্তদের মুখোশ। অসভ্যতাকে প্রত্যাখ্যান করে শুরু করেছেন সভ্যতার সত্যান্বেষণ। মোদিভক্তরা হোয়াটস এপে চারটি ধাপে কী করে সাধারণ মানুষের ব্রেন ওয়াশ করে; তার অনুপুংখ বিশ্লেষণ করেন ধ্রুব।

মোদির হোয়াটস এপ বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্তর মন্তর ঘরে যে চারটি ধাপে ব্রেনওয়াশ করা হয়; তার প্রথম ধাপ হলো, হিন্দু ধর্মের শ্রেষ্ঠতা জাহির ও হিন্দু হিসেবে গর্ব বিনির্মাণ। দ্বিতীয় ধাপে থাকে, সেই হাজার বছর ধরে হিন্দুরা অত্যাচারিত জাতীয় গালগল্প। তৃতীয় ধাপে থাকে, মুসলমানেরা হিন্দুদের অস্তিত্বের জন্য খাতরা বা ঝুঁকি জাতীয় জুজু। চতুর্থ ধাপে, সেই খাতরা থেকে একমাত্র বাঁচাতে পারে মোদি দেবতা, এ কথা বলে মোদি কাল্ট গড়ে তোলা।

গত দশবছরে ক্ষুধায় কষ্ট পেয়েছে, কর্মসংস্থানের অভাবে জীবন বিপন্ন; কিন্তু যেহেতু হোয়াটস এপ যন্তর মন্তর ঘর ব্রেনওয়াশ করেছে, সেই দীন হীন জীবনে নাকাল মোদি ভক্তেরা বলে, বিজেপি একটি কুকুরকে ভোটে দাঁড় করালেও তাকে ভোট দেবে।

ধ্রুব একা নয়; ভারতের স্ট্যান্ড আপ কমেডি জগতের উজ্জ্বল তারকা বরুণ গ্রোভার সক্রিয় এই ব্রেনওয়াশ ও ফ্যাসিজমের আগমনীর বিরুদ্ধে। স্ট্যান্ড আপ কমেডিতে আগত তরুণ-তরুণীদের প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যায়, এরা এলিট হতে চাওয়া ছাপড়ি নয়; যারা হিন্দির সঙ্গে ইংলিশ মিশিয়ে হেহেহে করে বেড়াবে। সবসময় ঔঁত পেতে থাকবে ‘ক্ষমতাসীনে’-র সুনজরে পড়ার। যে দেশে মেধাবী ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-এমবিএ করা ছেলেমেয়েরা সমাজের সাফল্যের সংজ্ঞা প্রত্যাখ্যান করে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ান হতে পারে; সে দেশ যে জেনেটিক্যালি এভলভ করেছে; এতো খালি চোখে দেখা যায়।

ভারতের ফুড ভ্লগারদের মাঝে কাউকে দেখলাম না ভোটের আগে মোদির মন্ত্রীর সঙ্গে বসে কাচ্চি বিরিয়ানি টেস্ট করছে; কিংবা সদলবলে মোদির দরবারে হাজির হয়েছে ‘লেটস টক’ করতে।

মোদির ক্যাশিয়ার আদানি এনডিটিভি দখল করার পর; ভারতের সেরা সাংবাদিকেরা বাধ্য হয়েছেন, মূলধারার সাংবাদিকতা ছেড়ে; ইউটিউবের বিকল্প ধারার সাংবাদিকতা করতে। সেরকম একটি ইউটিউব চ্যানেল নিউজ লন্ড্রিতে যে বলিষ্ঠ সাংবাদিকতা হয়; ভারতের গদি মিডিয়ার ছাপড়ি হোস্টেরা দিনমান চেঁচিয়ে  আর তেলাঞ্জলি দিয়েও তার ধারে কাছে যেতে পারে না।

ভারতের দর্শকও ইউটিউবে অন্তঃসারশূন্য ভাঁড়ামি আর ‘প্রশ্ন নয় প্রশংসা করতে এসেছি’ জাতীয় ট্র্যাশ দেখে সময় নষ্ট করে না। তারা ধ্রুব, বরুণের মতো প্রতিবাদী তরুণদের গণতান্ত্রিক বোধ জাগানিয়া কথা শোনে। মূলধারার মিডিয়া ছেড়ে আসা খ্যাতিমান সাংবাদিকদের ইউটিউব চ্যানেল দেখে। সচেতনতার আলো দ্বিমুখী সেখানে।

রাজনীতি অনিশ্চিত বিষয়; ভারতের কট্টর হিন্দুত্ববাদের ঘা সেকুলারিজমের রেশমি বস্ত্র দিয়ে ঢেকে রাখায়; তা ক্যানসারে পরিণত হয়েছে; এই ক্যানসার আক্রান্ত ভারতকে বাঁচানো বেশ কঠিন।

কিন্তু দেশটির নিরাপোষ সাংবাদিক, ইউটিউবার,সচেতন নাগরিক সমাজ শেষ চেষ্টা করছে অশিক্ষার জঠরে জন্ম নেয়া বিদ্বেষ জাতীয়তাবাদের বিষ থেকে ভারতকে বাঁচাতে। রাষ্ট্রযন্ত্রের পীড়নের ভয়ে ভীত নয় কেউ।

ভারতের শ্রেষ্ঠত্ব এই ঋজু প্রতিবাদী ডিএনএ-র মধ্যে। ধামাধরা ছাপড়ি কালচারের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কৃতির এই দ্রোহ আরেকবার প্রমাণ করে; ভারতের দূরদর্শী নেতা জওহরলাল নেহেরু ও আবুল কালাম আজাদের জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের প্রচেষ্টা বৃথা যায়নি। ভারতের শোণিত প্রবাহে রয়েছে আলোর আহবান আর অন্ধকারের প্রতি সটান প্রত্যাখ্যান।

১২৯ পঠিত ... ১৬:৫৬, মে ১৪, ২০২৪

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top