সলিমুল্লাহ খানের ‘মাদ্রাসা’ বিষয়ক ডিসকোর্স

১৪৭৯ পঠিত ... ১৭:৪১, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২৪

429100750_308233375565303_2699432429974447935_n

দার্শনিক সলিমুল্লাহ খানের সক্রেটিক প্যারাডক্স তাঁকে প্রায়ই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পরিসরে বিতর্কের পাত্র করে। এটা ভালো; চিন্তার দ্বন্দ্ব থেকেই সভ্যতার বিকাশ। কাজেই ফেসবুক বিতর্ককে আমি সভ্যতার পথে হাঁটা বলেই মনে করি।

বাংলাদেশে ইসলাম ধর্ম চর্চার ক্ষেত্রে একটা ইনফেরিওরিটি কমপ্লেক্স কাজ করে। ইউরোপ-ক্যানাডা-আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়ার স্কুলে বাইবেল পাঠ, মা মেরি - যীশুকে নিয়ে আলোচনা ও প্রার্থনা হয়। যেখানে সবধর্মের অভিবাসী শিশু উপস্থিত থাকে। ভারতে গীতা পাঠ ও পূজা-অর্চনা শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে খুব স্বাভাবিক একটা ঘটনা। বাংলাদেশে কারা যেন শিখিয়েছে যিশুর জন্য প্রার্থনা ও পুজা-অর্চনা প্রগতিশীলতা; কিন্তু কুরান পাঠ ও ঈদে মিলাদুন্নবীর মিলাদ পড়া অনাধুনিক। কোত্থেকে এসব অচলায়তনের চিন্তা যে আসে তা সত্যিই বুঝতে পারি না।

আমাদের সমাজে ধর্ম-সংস্কৃতি ও শিক্ষা বিষয়ে  বিতর্কের ক্ষেত্রে অসৌজন্যমূলক শব্দের ব্যবহার এর মান নিম্নগামী করে। কথাটা বলে বলে প্রায় ক্লান্ত হয়ে গেলাম যে, ফট কইরা মুখে যা আইলো কইলাম; এইটা কোন বিতর্ক নয়। এটা মাতবরের সালিশে গলায় গামছা দিয়ে ধরে এনে (ট্যাগ করে) দুইডা গালি দিয়া দেয়া।

আপনি আমেরিকা-ক্যানাডা-ইউরোপ-ভারত-পাকিস্তানের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্কগুলো দেখুন। সেখানে মার্জিত ভাষায় কঠোর সমালোচনা হয় বিতর্কিত বিষয়ে।

আমরা জিডিপি গ্রোথে পেট ফুলালাম, ব্যাংক রিজার্ভে ডিজাইনার জামা পিন্দলাম, উন্নয়নের মেট্রোরেলে চড়ে বিশ্বায়নের গতিতে কাতলা মাছের মতো হাসি উপহার দিলাম; দুনিয়ার সবচেয়ে বড় গাড়ি; সবচেয়ে নিটোল ভুঁড়ি, সবচেয়ে ডেকোরেটেড নারী, সবচেয়ে সুগন্ধী হাড়ি, সবচেয়ে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি; সবচেয়ে টাকাওয়ালাদের ক্লাবের ধাড়ি হলাম; কিন্তু ঐ যে পাটগাঁতি কিংবা গড়গড়িয়ার  পঞ্চায়েতে "মুখে যা আইলো কইলাম, মুখে চুনকালি লাগাইয়া দিলাম", "মাথা ন্যাড়া কইরা পুরা বোয়ালমারী ঘুরাইলাম, চিতলমারী থিকা গলাধাক্কা দিলাম; এই যে জীনগত অসুন্দর ও স্থূলচর্চা; তা থেকে বের হতে পারলাম না এই একবিংশ শতকেও।

সলিমুল্লাহ খান যে হোলিস্টিক এপ্রোচের মাদ্রাসা শিক্ষাকে উতকৃষ্ট বলেছেন; আমি তা মিশর, সংযুক্ত আরব আমীরাত, সিরিয়া ও তুরস্কে দেখেছি; ইরানে এরকম মাদ্রাসার কথা পড়েছি; যেখানে মুসলিম দার্শনিক ইবন মাসকয়েথ বহুযুগ আগে প্লেটোইজম চর্চা করেছেন। জালালুদ্দিন রুমীর পিতা এরকম মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন। তুরস্কের আনাতোলিয়ায় রুমী নিজেও মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন।

ভারতে এরকম মাদ্রাসায় পড়া ছাত্ররা আলীগড় রেনেসাঁ সূচিত করেছিলো। তাদের লিখে যাওয়া গ্রন্থে যে গভীর চিন্তার উদ্ভাস চোখে পড়ে; আজ কোথায় গেলে পাবেন তারে।

পাকিস্তানের সিন্ধ মাদ্রাসাতুলে পড়া ছাত্ররা অনেকেই পরে অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজে উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন।

বাংলাদেশের মুসলিম রেনেসাঁর লেখক; যাদের নিয়ে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান গবেষণা করেছেন; তাঁরা মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি’র গীতিকবি আবদুল গাফফার চৌধুরী, ‘মুক্তির গান’ চলচ্চিত্র খ্যাত তারেক মাসুদ মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন।

কালের করাল গ্রাসে পাকিস্তানে মওলানা ফজলুর রহমানের ফুট সোলজার তৈরির কিংবা বাংলাদেশের মওলানা শফির ফুট সোলজার তৈরির মাদ্রাসা দেখে গালে সুপোরি পুরে ভস ভস করে প্রগতিচিলতার ফিল্টারে মাদ্রাসাকে খারিজ করে দিলে কী চলবে! এই যে আপনি  প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন; কালের করাল গ্রাসে তা রাজকীয় খালাম্মাদের ফুট সোলজার তৈরির ফক্সফোর্ডে পরিণত হয়েছে। তাই বলে কী আপনাকে ফেলে দেবো দলান্ধ অনুভূতিপ্রবণ আদিম মানুষের সারিতে।

বাংলাদেশে স্বাধীনতার ৫২ বছরে সরকারগুলো ব্যস্ত থেকেছে উচ্চবিত্তের সন্তানদের ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষা আর মধ্যবিত্তের সন্তানদের বাংলা মিডিয়াম শিক্ষা নিয়ে। ক্ষমতা কাঠামোর সুবিধা পাওয়া শিশুদের বড় করে আমরা পশ্চিমে পাঠিয়ে দিই। তারা নিজেরাই এমন এক একজন সাদা হাতি হয় যে রেমিট্যান্স পাঠানো দূরে থাকুক; ব্যাংক খেয়ে ও রপ্তানীর নামে বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচার করে সেকেন্ড হোম বানিয়ে স্পোর্টস কার কিনে দিয়ে তাদের পোষে এই গরীব দেশ।

আর ঐ নিম্নবিত্তের অধিকার বঞ্চিত শিশুরা মাদ্রাসায় ‘ভাতের বিনিময়ে শিক্ষা’ নিয়ে তারপর আরব পৃথিবীতে গিয়ে দেশে রেমিটেন্স পাঠিয়ে অর্থনীতির চাকা চালু রাখে তারা। বাংলাদেশের মাদ্রাসার ছেলেরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ভালো করে; পশ্চিমে উচ্চশিক্ষায় গিয়ে ভালো করে। বিসিএস পরীক্ষায় ভালো করে। বাংলা ভাষার পাঠক বলতে তারাই এখন টিকে আছে স্বদেশ ও স্বভূমির প্রতি গভীর ভালোবাসা নিয়ে। আর কথিত খেলনা অভিজাত শ্রেণীর সিনথিয়া ও সালমান বাংলা কইতে পারেনা; ইংরেজি যা বলেও সেটাও ঐ পাঁচতারা হোটেলের রিসেপশনে চাকরি করার মতো। ওকে দিয়ে গবেষণা বা সাহিত্য রচনা প্রায় অসম্ভব।

বাংলাদেশে ইসলামী ধারার কট্টর চিন্তাগুলো মাটিসঞ্জাত নয়। সৌদি আরবে কাজ করতে গিয়ে বয়ে আনা মরুভূমির সংস্কৃতি আর ভারতের কট্টর হিন্দুত্ববাদের ছোবল থেকে আত্মপরিচয় বাঁচাতে প্রতিক্রিয়াশীলতা। ভারত-পাকিস্তানের মতো এইদেশেও শুরু থেকেই ‘জঙ্গীবাদ’ রাজনৈতিক দল ও গোয়েন্দা সংস্থার সৃষ্টি। এসব ভূতের নাচন নাচানো হয়; যাতে দলীয় বুদ্ধিজীবীরা জুজুর ভয় দেখিয়ে বলতে পারে, এই সরকারকে বারবার দরকার। পক্কেও থাকবে নুকা বিপক্কেও থাকবে বৈঠা! আমগো ভোট দ্যান নইলে বাংলাদেশ পাকিস্তান-আফগানিস্তান হইবো! এই পাকিস্তানটিও আমেরিকার সিএনএন আর ভারতের রিপাবলিক টিভির লেন্সে দেখা।

কাজেই আঁশটে কাস্ট সিস্টেমের হ্যাং ওভারে ব্রাহ্মণ ও এলিট পীরের ভঙ্গিতে "মাদ্রাসা নিয়ে নাক সিটকানো বন্ধ করুন।" পৃথিবীর উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম পরিভ্রমণ করে নানাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতি দেখার পর; এইসব খেলনা প্রগতিশীলদের আমার চোখে বেশ ব্যাকওয়ার্ড, দলান্ধ ও পূর্বসংস্কারের খালের পংকজ মনে হয়। কিন্তু উন্নাসিকতা দেখানো কাজের কথা নয়। এইসমাজে মিউচুয়াল রেসপেক্টের জায়গা থেকে প্রতিটি চিন্তার পরিসর দিতে হবে। পৃথিবীর কোন কিছুই সাদা-কালো নয়; বরং ধূসরতার মাঝেই বসবাস করে সাম্যসংস্কৃতির প্রেমময় বাগান। পনেরো মিনিটের গোত্রগত শ্রেষ্ঠত্ব নয়; সামষ্টিক মানুষের মুক্তির আকাংক্ষাই সভ্যতা।

১৪৭৯ পঠিত ... ১৭:৪১, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২৪

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top