একসময় ঢাকার পানি সরবরাহের একমাত্র মাধ্যম ছিল, পশু চামড়া

১০৩ পঠিত ... ১৭:১৬, ডিসেম্বর ০৬, ২০২৩

1

কাঁধের ভারের দুই পাশে দুটি টিনের বড়ো পট (যাকে জেল বলে) ঝুলিয়ে সারা দিনমান পানি পরিবহন ও সরবরাহ করেন ইদ্রিস মিয়া। হাজারীবাগের ট্যানারিতে পানি সরবরাহ করেন ইদ্রিস। কালো কুচকুচে টিনের কন্টেইনার চারদিকে বসানো রশির চাপে ও পানির ভারে চারদিক থেকে ভেতরের দিকে চেপে বসেছে। বুড়িগঙ্গার দুই কন্টেইনার পানি কারখানায় পৌঁছে দিতে পারলে তিনি পান চার টাকা। ইদ্রিস মিয়ার মতো ঢাকার রায়েরবাজার, দিয়াবাজার কাঁচাবাজার, নিউমার্কেট, সদরঘাট, শ্যামবাজার, যাত্রাবাড়ী কাঁচাবাজার ও মাছের বাজারসহ প্রায় সব এলাকার বাজারে ভার দিয়ে পানি সরবরাহ করেন পুরুষ অথবা কলসি দিয়ে মহিলারা। এরা সাধারণত বাজারে বা প্রতিষ্ঠানে পানি সরবরাহ করে থাকেন।

বিংশ শতকের প্রথম দশক পর্যন্ত এই ব্যবসার প্রচলন ছিল। ঢাকায় ছিল না মিনারেল ওয়াটারের বোতল। পশু চামড়াই ছিল পানি সরবরাহের একমাত্র মাধ্যম। পানির জন্য তৈরি চামড়ার থলেকে বলে 'মশক'। আর ওই মশকে করে যারা পানি ফেরি করে বেড়াতেন তাদের নাম ভিস্তিওয়ালা।

মীজানুর রহমান ‘ঢাকা পুরাণ’ বইতে লিখেছেন, ‘ওই সময়ে শ্রমিক সংগঠনের ধারণা তখনও চালু হয়নি কিন্তু তারপরও ঢাকায় ভিস্তিওয়ালা বা সাক্কাদের একটি সংস্থা ছিল। সংস্থা প্রধানকে 'নওয়াব ভিস্তি' বলা হতো। ঢাকার রীতি অনুযায়ী সাক্কারা যে এলাকায় বাস করে সেই এলাকার নাম সাক্কাটুলি দাঁড়িয়ে যায়, যা পরবর্তীতে বিবর্তনের ফলে সিক্কাটুলি হয়ে যায়।‘

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন,

তখন বেগে ছুটিল ঝাঁকে ঝাঁক

মশক কাঁখে একুশ লাখ ভিস্তি।

পুকুরে বিলে রহিল শুধু পাঁক,

নদীর জলে নাহিকো চলে কিস্তি।

১৮৩৯ সালের ঢাকার সিভিল সার্জন জেমস টেইলরের এক রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ঢাকার ইউরোপীয় এবং স্থানীয় অবস্থাপন্ন অধিবাসীরা দীর্ঘদিন ধরে শীতলক্ষ্যা নদীর পানি খাওয়ার জন্য ব্যবহার করতেন। সে সময় ঢাকায় কূপ থাকলেও তা বর্ষাকাল ছাড়া ব্যবহারের উপযুক্ত থাকত না। ঢাকায় প্রতি বছর দুইবার করে কলেরা হানা দিত। আপৎকালীন সে সময় শহরের ধনী ব্যক্তিরা পানীয়জল আনতেন মেঘনা থেকে।

নবাব আবদুল গনি ঢাকা শহরে প্রথম বিশুদ্ধ পানির সরবরাহের ব্যবস্থা করেন। ১৮৭৯ সালে নবাব আবদুল গনি 'কেসিএসআই' উপাধি পান। একই বছর প্রিন্স অব ওয়েলস অসুস্থতা থেকে সুস্থ হয়ে ওঠেন যার কারণে সরকারকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দান করা হয়। তখন ঢাকা শহর কমিটি সিদ্ধান্ত নেয় ঢাকাবাসীর জন্য বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা করা হবে। নবাব আবদুল গনি আরও প্রায় দুই লাখ টাকা দান করেছিলেন এই প্রকল্পে।

১৮৮৮ সালে বিশুদ্ধ পানীয় জলের জন্য ঢাকার চাঁদনীচকে ওয়াটার ওয়ার্কসের কার্যক্রম চালু করা হয়। চাহিদার তুলনায় তখনও ঢাকায় পানি সরবরাহের পাইপলাইন অপর্যাপ্ত হওয়ায় এর সুফল বিস্তৃতি লাভ করেনি। ঢাকার এক অধিবাসী হৃদয়নাথ মজুমদার তার স্মৃতিকথায় 'রেমিনিসেন্সেস অব ঢাকা'তে লিখেছেন: 'পানীয় জল সরবরাহের প্রথমদিকে ঢাকায় পানির ট্যাঙ্কের সংখ্যা ছিল চারটি। আর প্রধান রাস্তাগুলোতে ছিল লোহার হাইড্র্যান্ট।'

যেসব ঢাকাবাসী নিজ নিজ বাড়িতে বসে পানি সরবরাহের সেবা পেতে চাইতেন তাদের খরচ করতে হতো মাসে চার টাকা। এর ফলে অবশ্য ঢাকায় পানিবাহিত রোগের প্রকোপ কমেছিল উল্লেখযোগ্য হারে।

১৯৬৩ সালে ঢাকা ওয়াসা প্রতিষ্ঠিত হয়। ঢাকা ওয়াসা ঢাকার পানি সরবরাহ এবং নর্দমা ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে।

তথ্যসূত্র: ঢাকার প্রাচীন পেশা ও তার বিবর্তন, ইমরান উজ জামান

১০৩ পঠিত ... ১৭:১৬, ডিসেম্বর ০৬, ২০২৩

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top