সত্যাজিৎ-মৃণাল সেনের ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ

১০২ পঠিত ... ১৭:৫৭, নভেম্বর ১৪, ২০২৩

19

 

লেখা: কমলেন্দু সূত্রধর

সত্যজিৎ রায় ও মৃণাল সেন- বাংলা চলচ্চিত্র জগতের দুই প্রবাদপ্রতিম দিকপাল। সিনেমাবোদ্ধাদের অনেকে প্রায়ই বলেন যে সত্যজিৎ আর মৃণালের মধ্যে মিল শুধু দৈহিক উচ্চতায় আর গায়ের রঙে। সংবেদনশীল শিল্পী হিসেবে দু’জনেই চারপাশের ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা আর হালচালে প্রভাবিত হতেন। যদিও তাদের প্রকাশভঙ্গি আর শিল্প ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। খোদ সত্যজিৎ তা নির্দ্বিধায় স্বীকার করে লিখেছেন,

‘They started at about the same time as I did, Ritwik and Mrinal.....They were making films very different from mine, very different, but very powerful, I think.’

বিশিষ্ট চলচ্চিত্র সমালোচক ধীমান দাশগুপ্ত এই দুই মহীরুহর আন্তঃসম্পর্ককে চমৎকার ভাবে বর্ণনা করেছেন, ‘সত্যজিৎ সমন্বিত, সুষম, শীলিত, কমনীয়।......অন্যদিকে মৃণাল দ্রুত, তীক্ষ্ণ, তৎপর ও নমনীয়।’ আর মৃণাল সেন নিজে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন —

‘I am not a Kurosawa, I am not a Satyajit Ray, I am not a Godard, who believe in drawing sketches. I can’t do that. I can’t draw a single line. My films are a kind of thesis.

ষাটের দশকে ‘সত্যজিৎ রায় বনাম মৃণাল সেন’, এই ঘিরে বাঙালি দুই ক্যাম্পে ভাগ হয়ে গিয়েছিল একটা পর্যায়ে। শুধুমাত্র কোন পরিচালকের ছবি ভালো লাগে, সেটাই কিন্তু এই ভাগাভাগির একমাত্র কারণ নয়। মৃণাল সেনের সিনেমা 'আকাশ কুসুম' ঘিরে ১৯৬৫ সালে দুই পরিচালকের মধ্যে মতবিরোধ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যার সাক্ষী ছিলো এক সংবাদপত্রে লেখা একগুচ্ছ চিঠি। মৃণাল সেনের ‘আকাশ কুসুম’ ছায়াছবি নিয়ে সত্যজিৎ রায় চাছাঁছোলা ভাষায় সমালোচনা করেন, যার জবাবে ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় চিঠি-পাল্টাচিঠিতে শুরু হয় দু’জনের মধ্যে এক দীর্ঘ, বিতর্কিত সংঘাতের।

ফরাসি চিত্রনির্মাতা ফ্রাঁসোয়া ত্রুফোর দ্বারা প্রভাবিত মৃণাল সেন ১৯৬৫ সালের জানুয়ারি মাসে ‘আকাশ কুসুম’ ছায়াছবিটি বানাতে শুরু করেন, যার গল্পকার ছিলেন আশীষ বর্মণ এবং অভিনয়ে ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও অপর্ণা সেন। প্রকাশের পর এই ছবির ভাষাভঙ্গি নিয়ে চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের মাঝে সাড়া পড়ে যায়। তাঁর আত্মজীবনী থেকে জানা যায় যে এই ছবির সমালোচকদের একজন ছিলেন খোদ সত্যজিৎ রায়।

‘আকাশ কুসুম’ নামের এই ছবির গল্পটা এক মধ্যবিত্ত শ্রেণির যুবককে নিয়ে, যে যেনতেন প্রকারেণ রাতারাতি বড়লোক হয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতো। মৃণাল চিত্রনাট্যে গল্পের ভেতর কিছু কিছু জায়গা বদলে দেন। ফলে গল্পের নায়ক অজয়ের চরিত্র হয়ে ওঠে স্বপ্নালু ও ভাবুক, যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধ বাস্তবতার ভেতরে বসেও আকাশ কুসুম স্বপ্ন দেখতো, যার প্রবল বিশ্বাস ছিল যে শুধু স্বপ্নের জোরেই সে একদিন বিরাট ধনী হতে পারবে। শেষ পর্যন্ত সে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়, এবং তার যা সহায়সম্পদ ছিল সেটাও খুইয়ে বসে।

কেন যেন অজয়ের চরিত্রটাকে চলচ্চিত্রের সমালোচকেরা ভালোভাবে নিতে পারলেন না। মৃণাল বেশ উদ্বিগ্নই হলেন। ২৫ জুলাই মৃণাল ছবির বিজ্ঞাপনেও একটি বাক্য জুড়ে দিলেন,

‘অজয় কোন ধাপ্পাবাজ নয়, সে উচ্চাকাঙ্খী। [He was not a bluffer, he only had ambitions.]’

এর কিছুদিন আগে ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা ‘দ্য স্টেটসম্যান’-এ ছবিটার একটি সমালোচনা ছাপা হয়েছিল। তার প্রতিক্রিয়ায় সেই ২৫ জুলাইয়ে 'Letters to the Editor'-এর পাতায় চিঠি লিখে পাঠালেন পাঠকেরা। প্রতিক্রিয়ার কারণ হলো স্টেটসম্যানের সমালোচক তাঁর লেখায় বলেছিলেন যে ছবিটি সারভেন্তেসের দন কিহোতের আদলে হাস্যকর অথচ করুণ কিছু দিয়ে শেষ করলে, দর্শকরা হয়তো নায়কের প্রতি কিছুটা সহানুভূতি বোধ করতেন, তাছাড়া সমালোচনায় সিনেমাটিকে Roman Holiday-র বঙ্গীকরণও বলা হল আর শেষে বলা হল-

‘সিনেমাটি যদি দর্শকদের কাছে অতি মাত্রায় প্রাপ্তমনস্ক ও অসংবেদনশীল মনে হয়, তবে সেটা হবে খুবই দুঃখজনক। [It would be a pity if this film proved too adult, too anti sentimental for our matinee crowd.]’

এর জবাবে ৩রা অগস্ট গল্পকার তথা ছবির সহকারী চিত্রনাট্যকার আশীষ বর্মণ বলেছিলেন যে গল্পটা মোটেও ওভাবে শেষ হয়নি। কারণ ওভাবে শেষ করলে তা শুধু ভুলই হতো না, দর্শকদের কাছেও সেটা রীতিমতো অবিশ্বাস্য ঠেকত। তাঁর নিজের কথায়,

‘একটা সমসাময়িক বিষয়বস্তুতে রীতিমাফিক দ্ব্যর্থবোধকতা যোগ করা প্রায় অসম্ভব। (it is almost impossible to lend stylized ambiguity to a topical theme. I stress the word ‘topical.’)’

এই অবধি ঠিক ছিল। আচমকা সত্যজিৎ রায় এই ঝামেলায় ঢুকে পড়লেন। মৃণাল সেন স্মৃতিচারণে বলেছেন, সত্যজিৎ রায় তাঁকে ফোন করে জানান, তিনি বর্মণের লেখার জবাব দিয়ে এ-বিতর্কে যোগ দিচ্ছেন। মৃণাল সেন যেন এ-ব্যাপারে মনে কষ্ট না পান। ‘আকাশ কুসুম’ ছবির চিত্রনাট্যকার-কাহিনিকার বর্মণই সত্যজিতের সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু হবে বলে মৃণাল সেনকে সত্যজিৎ আশ্বস্ত করলেও, তাঁর চিঠি প্রকাশ হওয়ার পর দেখা গেল, তিনি ছবির একেবারে ভিত্তিমূল অর্থাৎ সমসাময়িকতার ওপর সরাসরি আক্রমণ করেছেন। সত্যজিৎ রায় তাঁর চিঠিতে লিখলেন,

‘May i point out the topicality of the theme in question stretches well back into antiquity, when it found expression in that touching fable about the poor deluded crow with fatal weakness for status symbols?…. Had Mr Burman known of the fate of this crow, he would surely have imparted this knowledge to his protagonist, who now acts in complete ignorance of traditional precepts with, need I add, fabulous consequences.’

এই ছবির সমসাময়িকতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন মানিকবাবু, যা পড়ে মৃণালও ভাবলেন জবাবটা তার দেওয়া দরকার। মানিকবাবুর লেখার জবাবে একদিকে আশীষ বর্মণ লিখলেন যে,

‘কোন গল্পে মৌলিক মানবিক তাড়না, যেমন প্রেম, ঈর্ষা, ক্ষুধা, আশা কিংবা ভালো জীবনের আকাঙ্ক্ষার কথা বললেই তা সমসাময়িকতা হারায় না(...topicality of a story does not negate the basic human urges like love, jealousy, hunger, hope or the desire for a better life)’

অন্যদিকে মৃণাল সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে উত্তর দিতে গিয়ে তুলে আনলেন চ্যাপলিনকে। সমসাময়িকতার প্রশ্নে চ্যাপলিনকে উদাহরণ হিসেবে হাজির করেন তিনি। তাঁর চিঠির বক্তব্যের শেষে তিনি লিখলেন,

‘To conclude, I do not, by any chance, wish to take refuge under the fable-crow’s wings and claim to an Aesop or a Cervantes or Chaplin. I have made a film called Akash Kusum and that is all.’

অনেকেই মৃণাল সেনের পক্ষে চিঠি লেখা শুরু করেন, কেউ কেউ সত্যজিৎ-এর পক্ষে। সবাই রোজ পত্রিকা খুলেই দেখত আজ এই নিয়ে কে কী লিখলেন। ‘আকাশ কুসুম’ ছবির সমসাময়িকতার প্রতি মৃণাল সেন ও আশীষ বর্মণের ক্রমাগত গুরুত্ব আরোপ, যুক্তিপ্রদানে সত্যজিৎ এবার বেশ ক্ষিপ্ত হলেন। এর পরের জবাব হলো আরো খাপখোলা তলোয়ারের মতো। মানিকবাবু লিখলেন,

‘এই ছবির নায়কের আচরণ আর তার পরিণতির কোন সমসাময়িকতার উপরে পুরো গল্পটা দাঁড়িয়ে আছে তা বোঝা আমার সাধ্যের বাইরে। ‘আকাশ কুসুম’-এর যদি কোন সমসাময়িক প্রাসঙ্গিকতা থেকে থাকে, তা শুধুই উপরে উপরে, কিছু ছড়ানো-ছিটানো শহুরে জীবনের বর্ণনা আর ফ্যাশনদুরস্ত বয়ানে। কিন্তু এই গল্পের থিমের সমসাময়িকতা কোথায়? সে ব্যাপারে ছবির নির্মাতাদের বক্তব্য কী?(What I fail to see, however, is what conceivable topical point (the hero’s) behavior and its consequences are likely to make or have made in the film. If Akash Kusum has any contemporaneity, it is on the surface—in its modish narrative devices and in some lively details of the city-life. But where is the topicality of the theme and where is it in the attitude of its makers?)’

পাঠকদের চিঠি আসতে থাকলো। তার বেশিরভাগই মানিকবাবুর এমন রূঢ় লেখাকে ভালোভাবে নিলো না। কারো কারো কাছে মনে হলো সত্যজিৎ ‘গোঁড়া এবং অসহিষ্ণু’, কারো চোখে মনে হলো তার লেখায় ‘তলে তলে ছিদ্রান্বেষী মনোভাব সুস্পষ্ট’। এর মধ্যে মৃণালও আবার জবাব দিলেন, তবে তাঁর জবাব সচেতনভাবেই চ্যাপলিন সংক্রান্ত বিষয়ে সীমাবদ্ধ, আকাশ কুসুম নিয়ে তিনি কিছুই বললেন না।

এতসব চিঠি পড়ে মানিকবাবুর মেজাজ ঠাণ্ডা থাকার কথা না। ছদ্ম রসিকতার সব আড়াল ছুড়ে ফেলে দিয়ে খোলাখুলি আক্রমণ চালিয়ে এবার তিনি লিখলেন এক ঝাঁঝালো ব্ল্যাক হিউমার মেশানো সার-সংক্ষেপ, প্যারোডির ঢঙে এক চিঠি। ১৯৬৫-র ১ সেপ্টেম্বরের চিঠিতে সত্যজিৎ যে ভাষায় আক্রমণ শানালেন, তা অভূতপূর্ব এবং প্রায় ব্যক্তিগত। লাইনে লাইনে মৃণালের ব্যবহার করা ‘contemporary’ বা সমসাময়িক শব্দটাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-উপহাস, যেমন-

‘নায়ক থাকে এক কুঁড়েঘরে, কিন্তু তার দেহের গড়ন সমসাময়িক সুনজর পেয়ে বেশ দশাসই।(Hero lives in hovel, but by contemporary luck is blessed with physical attributes of well-bred affluence.)’

তারপর বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার জ্যঁ লুক গোদারের 'A film is a film is a film' উদ্ধৃতিটির অনুকরণে শেষ লাইনে মানিকবাবু চরম ব্যঙ্গ করে ‘আকাশ কুসুম’-কে নিয়ে লেখেন-

‘A crow film is a crow film is a crow film.’

কথার লড়াই ততোদিনে মূল প্রসঙ্গ থেকে সরে অনেকটাই ব্যক্তিগত যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। তাই কদর্যতায় রূপ নেয়ার আগে ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকা উদ্যোগী হলো তর্ক-যুদ্ধ অবসানের। তাঁরা মৃণাল এবং আশীষের কাছে একটি শেষ জবাব দেওয়ার অনুরোধ করলো। মৃণাল সত্যজিৎকে আক্রমণও করলেন না, তার ছায়াছবির হয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনও করলেন না। তিনি সত্যজিৎ’র চিঠির জবাবে বললেন যে,

‘চাইলে হ্যামলেটকেও সংক্ষেপে রাজবাড়ির এক খুন আর ভূত-রহস্য-প্রেম-প্রতারণা-অজাচারের গল্প বলে চালিয়ে দেয়া যায়, যে গল্পের শেষে নায়িকা উন্মাদ হয়ে আত্মহত্যা করে, আর বেশ কয়েকটি খুন ঘটার পর নায়কও আত্মহত্যা করে।(Even Hamlet could be summed up as a story of a murder in a Royal House with ghost-mystery-romance-betrayal-incest episodes, culminating in the heroine turning mad and committing suicide and the hero also killing himself, with some more murders thrown in between.)’

কেন যে সত্যজিৎ অমন আক্রমণাত্মক লেখাটি লিখেছিলেন তা আজও রহস্য। 'আকাশ কুসুম'-এর থিমের ব্যাপারে তাঁর এইরকম অভুতপুর্ব প্রতিক্রিয়ার কারণও বুঝতে বেজায় কষ্ট হয়। কারণ প্রায় কাছাকাছি থিমের একটি ছবি তিনি নিজেও এর সাত বছর আগে বানিয়েছিলেন। তাঁর ‘পরশ পাথর’ ছায়াছবিতে এমনই এক গরীব কেরানি যাদুপাথরের দৌলতে রাতারাতি বড়লোক হয়ে যায়। সে পাথর লোহাকে সোনায় পরিণত করতো, যার সুবাদে সেই কেরানির জীবনেও আমূল পরিবর্তন এসেছিল।

সেবছরের ১৩ সেপ্টেম্বর 'দ্য স্টেটসম্যান' আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আকাশ কুসুম’ ছায়াছবি নিয়ে তর্কের সমাপ্তি ঘোষণা করে জানায় যে এই বিষয়ের ওপর আর কোনো চিঠি তারা ছাপাবে না। সেদিন সন্ধ্যায় ফিল্ম সোসাইটির একটা প্রদর্শনী ছিল। সেই মিলনায়তনে সত্যজিৎ আর মৃণালের দেখা হলো। সত্যজিৎ হাসতে হাসতেই বললেন, ‘ব্যাপারটা শেষ হয়ে গেল, খুব দুঃখজনক! এভাবে বন্ধ করে দিলেন কেন? আরো বহু চিঠি লিখতে পারতাম আমি!’

‘বেশ, আমার তো আপনার মতো সমর্থক বা লোকবলের কোনোটাই নেই’— জবাব দিয়েছিলেন মৃণাল সেন, ‘আমি নেহাতই একা, তবে নিশ্চিত থাকতে পারেন, আপনার সব চিঠিরই জবাব আমি দিতাম।’ পরে মৃণাল সেন আরও স্মৃতিচারণ করে বলেন,

‘সেদিনই সত্যজিৎ রায় আমাকে বললেন, ‘আমার ব্যাগ-এ আরও অনেক শব্দ ছিল।’ বলে হাসলেন। আর আমি বললাম, ‘আমারও ছিল, ট্রাকভর্তি, যদিও আপনি আমার চাইতে ঢের বেশি বুদ্ধিমান।’

শুধু 'আকাশকুসুম'-ই নয়, মৃণাল সেনের আরেক বিখ্যাত সিনেমা 'ভুবন সোম' এরও বেশ কড়া কথায় সমালোচনা করেছিলেন মানিকবাবু। 'ভুবন সোম' ছবিটি ভালো লাগেনি মানিকবাবুর। তাঁর বই ‘Our Films, Their Films’-এ সত্যজিৎ এই বিষয়ে লিখেছেন,

‘ভুবন সোম উৎরে গেছে কারণ মৃণাল এখনকার সিনেমার সবচেয়ে জনপ্রিয় কিছু কৌশল ব্যবহার করেছেন, যা এই ছবির ভাষার খচখচে জায়গাগুলোকে কিছুটা নরম করে দেয়। এসব কৌশলগুলো হলোঃ সুন্দরী নায়িকা, সুমধুর আবহসঙ্গীত, আর একটি সাধারণ, মন-ভালো-করে দেয়া চিত্রনাট্য ইত্যাদি। সাত শব্দে সারাংশ করলে দাঁড়ায়ঃ ‘Big Bad Bureaucrat Reformed by Rustic Belle। [It worked because it used some of the most popular conventions of cinema which helped soften the edges of its occasional spiky syntax. Those conventions are: a delectable heroine, an ear-filling background score and a simple, wholesome, wish-fulfilling screen story (summary in seven words: Big Bad Bureaucrat Reformed by Rustic Belle)]’

সত্যজিৎ-এর বইটা প্রকাশ হবার পর কলকাতার একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা মৃণাল সেনের কাছে পাঠ প্রতিক্রিয়া লেখার অনুরোধ করে। প্রথমে কিছুটা টালবাহানার পর মৃণাল লিখতে রাজি হন। ভুবন সোম বিষয়ে সত্যজিৎ-এর সমালোচনা নিয়ে তিনি লিখলেন,

‘সমালোচকেরা অনুকূল মন্তব্য করেছেন, দর্শক ছবিটা পছন্দ করেছেন, আর উভয়েই ছবিটাকে ব্যতিক্রমী মনে করেছেন। স্বভাবতই আমরা খুশি। যা হোক, অনেকে বলে এর সতেজ আমেজের কারণে ভুবন সোমকে সবাই গ্রহণ করেছে। এটুকুই যথেষ্ট।[The critics made favourable comments, the people liked it, the people and the critics considered it offbeat. Understandably, we were happy…For whatever its worth, Bhuvan Shome was accepted, so they say, for a certain freshness in approach. And that is all.]’

সত্যজিৎ-এর সাত শব্দের সারাংশ একটু পাল্টে মৃণাল তার ছবিকে বললেন,

‘Big Bad Bureaucrat Chastised by a Charmer’s Cheek’।

তাঁর এই লেখাটার শিরোনাম ছিল ‘His Book, My Comments’।

সত্যজিৎ মৃণাল সম্পর্কে আরো একবার বাঁকা মন্তব্য করেছিলেন লন্ডনে, এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে। মৃণালের জবানীতে,

‘সত্যজিৎ বাবু ওই প্রশ্নোত্তর পর্বের ব্যাপারটাকে সহজভাবে না নিয়ে আমার সম্পর্কে একটি নিষ্ঠুর মন্তব্য করলেন।’

সেটি কি? সত্যজিৎ বলেছিলেন:

‘Mrinal Sen always hits safe target.’

এটিই শিরোনাম হয়ে ছাপা হয়েছিল ‘Sunday Observer’ পত্রিকায়। মৃণালের তৈরি করা রাজনৈতিক ছবিগুলোর উপর কথা বলতে গিয়েই ‘সম্ভবত’ এমন মন্তব্য করেছিলেন সত্যজিৎ। এই সাক্ষাৎকার প্রকাশের পর পত্রিকার সম্পাদক মৃণালকে ফোন করে বলেছিলেন একটি Rejoinder পাঠাতে। পাঠিয়েছিলেন মৃণাল:

‘সত্যজিৎবাবু সবচাইতে নিরাপদ জায়গায় আঘাত হেনেছেন। লোকটি আমি, মৃণাল সেন।’

তবে মৃণাল সেন সত্যজিৎ-এর সমালোচনা করেন নি কি? করেছেন। যে ‘পথের পাঁচালী’ ভারতীয় চলচ্চিত্রকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিয়ে গিয়েছিল, সেটিকে নিয়ে, ‘অপরাজিত’ নিয়েও। মৃণাল মনে করতেন অনেক কিছুই অপ্রয়োজনীয় ছিলো ছবি দুটিতে। যেমন,

‘পথের পাঁচালী’ ছবির শুরুতে কারো মাথার টাকে বৃষ্টির ফোঁটা, বা বিড়ালের দৃশ্যটি, ‘ডিটেলের কাজ হিসেবে এসব seuence নিশ্চয়ই ভালো, কিন্তু কোনো প্রয়োজন ছিল না এই visualization-এর। যেমন প্রয়োজন ছিল না 'অপরাজিত'-তে হরিহরের মৃত্যুদৃশ্য দেখানো। ঝাঁকঝাঁক পায়রা ওড়ার শট দিয়ে সিকোয়েন্সটা তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে ঠিকই, কিন্তু মৃত্যুর ঠিক আগে হরিহরের গোঙানি বা সর্বজয়ার ‘কী হল? কী হল?’ সংলাপের খুব প্রয়োজন ছিল কি? আসলে মৃত্যু দেখানোতেই আপত্তি আমার।

ফিল্মে তো সবকিছুই দেখানো যায় আর সেটাই সবচেয়ে বড় বিপদ ফিল্মের। Physicality পেরিয়ে যাওয়াই ধর্ম যে-কোন ফিল্মের, বা শিল্পের। মৃত্যু না দেখালেই বরং তার অভিঘাত জোরালো হয় আরও। তবে 'অপরাজিত'-র সামগ্রিক অভিঘাত এত বড় আমার কাছে যে এ-সমস্তকিছুই গৌণ বা তুচ্ছ হয়ে যায়। অতিকথন এড়িয়ে মানিকবাবুর economy বা পরিমিতি বোধ এমনভাবে ধরা পড়েছে এ-ছবিতে, বা তাঁর প্রথম দুটি ছবিতে যে মুগ্ধ না হয়ে উপায় থাকে না।’’

অবশ্য সত্যজিৎ-এর পরের ছবিগুলোকে ততোটা বাহবা দিতে নারাজ মৃণাল। বলছেন,

‘অপরাজিত-র পর থেকেই আঁটসাঁট plot-এর মধ্যে আস্তে আস্তে ঢুকে পড়ল তাঁর ছবি। এ-ছবি দুটোর (পথের পাঁচালী ও অপরাজিত) পর তাঁর ছবি যেন আস্তে আস্তে scheme-এর মধ্যে ঢুকে পড়ল, ঢুকে পড়ল নিটোল কাহিনীবৃত্তে। কাহিনীসূত্র নিশ্চয় থাকবে ছবি করার পিছনে, কিন্তু খোলা হবে গল্পের মুখটা, যাতে যেকোনো দিকেই চলে যেতে পারে ছবিটা। বেশি schematic হয়ে গেলে ছবির গতিমুখ বা মুহূর্তকে predictable বা obvious লাগতে পারে দর্শকের।‘

‘চারুলতা’ অবধি সত্যজিতের ছবিতে বিস্মিত হওয়ার মতো ঐশ্বর্য থাকলেও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে তৈরি করা ছবি নিয়ে কথা বলতে একটু ‘অস্বস্তি বোধ’ করেন মৃণাল। যে সত্যজিৎ ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ‘দেবী’ বা ‘মহাপুরুষ’-এর মতো ছবি বানান, তিনিই আবার কি করে জাতিস্মরের মতো ব্যাপারকে প্রাধান্য নিয়ে বানালেন ‘সোনার কেল্লা’, ব্যাপারটা ‘মাথায় ঢোকে না’ মৃণালের।

এছাড়া ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’য় অতিরিক্ত plot-এর আরোপ, ‘গণশত্রু’ ছবিতে ইবসেন প্রস্তাবিত protagonist তথা একা মানুষের লড়াকু শক্তিকে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান মুখরিত মিছিলের মাধ্যমে মিথ্যে করে দেওয়ারও সমালোচনা করেন মৃণাল। Art form হিসেবে সিনেমার সম্ভাবনা নিয়েও মানিকবাবুর সঙ্গে মৃণাল সেনের তর্ক হয়েছে। সিনেমার ভাষা কি শুধু Linear হবে? Non-linear হলে সমস্যা কোথায়? দুজনের সেই মতবিরোধের কিছুটা ছাপাও হয়েছিলো ১৯৯৭ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবের পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে প্রকাশিত Brochure-এ।

আর একবার গৌতম ঘোষ এক সাক্ষাৎকারে মৃণাল সেনের কাছে জানতে চাইলেন,

‘আচ্ছা, কখনও মনে হয়েছে আপনার যে সত্যজিৎ রায় পর্যায়ের প্রতিভার সমকালীন বড় পরিচালকের কাজ সম্পর্কে আরও দয়ালু হওয়া উচিত ছিল? কোথাও অন্তত পিঠ-চাপড়ানির হাত রাখা যেত?’

উত্তরে মৃণাল বললেন,

‘যতদিন পর্যন্ত জানা আছে এ আমার চেয়ে উপরে উঠবে না, ততক্ষন পিঠ চাপড়ানো যায়। যে মুহুর্তে আমি জানি, এ আমাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে, তখন আমি আর হাতটা তুলবো না। বলে না, বেশি বড় হয়ে গেলে অনেক মুশকিল হয়।‘

অথচ, এই মৃণালকেই যখন আবার বলা হলো, ‘এখনও দেখা যাচ্ছে সত্যজিৎ-এর উপর আপনার প্রচুর ক্ষোভ রয়েছে।’ উত্তরে মৃণাল বললেন,

‘দেখুন, ওর সঙ্গে আমার নানা সময়ে বিতর্ক exchange হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এটা মানতেই হবে totality নিয়ে সত্যজিৎ-এর ধারে কাছে কেউ নেই। ওঁর পাশে আমি নেহাত খুঁড়িয়ে চলেছি।‘

শেষদিকে আরো একবার সত্যজিৎ মৃণালের দিকে আক্রমণের তীর ছুঁড়েছিলেন। যদিও অনেকে বলেন তিনি এটা প্রকাশ্যে করতে চাননি। তার পুরনো বন্ধু ও বিখ্যাত চিত্রসমালোচক চিদানন্দ দাসগুপ্তকে লেখা তার এক চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন যে তথাকথিত ‘আর্ট ফিল্মের’ নির্মাতারা নিজ দেশে দর্শকদের সাথে মেলবন্ধনের চেয়ে বিদেশি ফেস্টিভ্যালে যাওয়ার ব্যাপারে বেশি উৎসাহী। ‘তারা কেউই গল্প বলার কৌশল জানে না, মৃণালও জানে না’, এই ছিল তার বক্তব্য।

১৯৯১ সালের জুনে বন্ধুকে লেখা এই ব্যক্তিগত চিঠিটি অক্টোবর মাসে একটি জাতীয় দৈনিকে ছাপা হয়ে যায় মানিকবাবুর অনুমতি ছাড়াই। ততোদিনে সত্যজিৎ খুবই অসুস্থ এবং বোঝা যাচ্ছিল যে বেশি দিন আর বাকি নেই। মৃণাল স্বভাবতই এই আকস্মিক আঘাতে বিচলিত হয়েছিলেন। তবে তিনি তা প্রকাশ করেননি। অনেকের প্রণোদনা থাকার পরেও পত্রিকাকে একটি অসম্ভব স্থিতধী মন্তব্য জানিয়েছিলেন-

‘আমি নন্দনতত্ত্ব আর গল্প বলার শৈল্পিক দিক নিয়ে সত্যজিৎ রায়ের সাথে কোন তর্কে জড়াতে চাই না। তার অসুস্থতায় ওষুধের পাশাপাশি মানসিক শান্তিও প্রয়োজন, এবং আমি তা কোনোভাবেই নষ্ট করতে চাই না।‘

মানিকবাবুর জবাব জানার আর কোন উপায় ছিল না। কারণ এই বিতর্কিত চিঠিটি প্রকাশের মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই ১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

অথচ, এক কালে দুই ভিন্নমেরুর এই দুই কিংবদন্তীদের মধ্যে সৌহার্দের অভাব ছিলনা। এই দু’জন অসম্ভব অন্যরকম শিল্পী পরষ্পরের খুব ভাল বন্ধু ছিলেন। সিনেমা করার আগেই ১৯৫৩-য় প্রকাশিত হয় মৃণাল সেনের প্রথম বই ‘চার্লি চ্যাপলিন’। সেই বইয়ের প্রচ্ছদ করে দিয়েছিলেন সত্যজিৎ, বিনা পারিশ্রমিকে।

[ছবি: সত্যজিৎ রায়ের আঁকা মৃণাল সেনের বই ‘চার্লি চ্যাপলিন’-এর প্রচ্ছদ।]

সত্যজিৎ-এর 'Our Films, Their Films' বইটির সমালোচনা লিখেছেন মৃণাল ‘Sunday’ সাপ্তাহিকে। মানিকবাবুর লেক টেম্পল রোডের বাসায় মৃণালের নিত্য আসা-যাওয়া ছিল। সেখানে তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা সিনেমা নিয়ে আলাপ করতেন। ‘অপরাজিত’ দেখে মৃণাল মুগ্ধ হয়েছিলেন, তার কাছে এটাই সত্যজিৎ-এর সেরা ছবি, বলেছিলেন, ‘ছবিটার ভেতরে আমি contemporaneity খুঁজে পাই’। কিন্তু কেন জানি ‘পরশ পাথর’ অতোটা পছন্দ করেননি, সত্যজিৎকে বলেওছিলেন সেকথা। ‘বাইশে শ্রাবণ’ দেখে সত্যজিৎ-এর তেমন আহামরি কিছু মনে হয়নি। পরে অবশ্য তিনি এই মত পরিবর্তন করেছিলেন, এবং ১৯৬৫ সালের ২য় ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের জুরি থাকাকালীন সময়ে এই ছবিটার একটি বিশেষ প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেছিলেন তার বন্ধুদের জন্য।

এমন চমৎকার সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের পর ‘আকাশ কুসুম’ নিয়ে মানিকবাবুর লেখা চিঠিতে মৃণাল ও তাঁর সম্পর্কের অবনতি ঘটেছিল। তবে, আগের উষ্ণতা না থাকলেও দুজনেই বরাবরই সামাজিক সৌজন্য বজায় রেখেছিলেন। তাই তাঁর পরের ছবি ‘মাটির মণীষা’ দেখতে মানিকবাবুকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ছবি দেখে সত্যজিৎ-ও বলেছিলেন যে তাঁর ভাল লেগেছে। প্রায় দশ বছর পর মৃণালের ‘ওকা উরি কথা’ দেখেও তিনি একইভাবে প্রশংসা করেছিলেন। অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে মানিক বাবু বলেছিলেন,

 ‘জানো, মৃণালের ‘ওকা উরি কথা’ দেখলাম। খুব ভাল লাগল। একেবারে হিংসে করার মতো একটা ছবি বানিয়েছে।’’

মৃণালও তাঁর ছবি ‘ভুবন সোম’-এর একটি দৃশ্যে বাংলার গৌরব নিয়ে বলার সময় পর্দায় সত্যজিৎ’র আলোকচিত্র দেখিয়েছিলেন। সত্যজিৎ’র জীবনের শেষ দশকে তারা দুইজন বেশ কয়েকটি কমিটিতে একসাথে কাজও করেছেন। বিভিন্ন ফিল্ম সেমিনার ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মেও তাদের কাজ করতে হয়েছে।

সত্যজিৎ-এর অসুস্থতার পুরো সময়টায় সেন পরিবারের সবাই তার পরিবারের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ও সহযোগিতা বজায় রেখেছিলেন। তার মৃত্যুর খবর পেয়ে নার্সিং হোমে সবার আগে তারাই পৌঁছেছিলেন। শেষকৃত্য শেষ হওয়া পর্যন্ত মৃণাল সেনকে দেখাচ্ছিল উদ্ভ্রান্ত, শূন্য দৃষ্টিতে তিনি হেঁটে বেড়াচ্ছিলেন। একবার মৃণাল সেন সত্যজিৎকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘মাঝে মাঝে একা লাগেনা?’, সত্যজিৎ বলেছিলেন, ‘ভয়ঙ্কর একা লাগে। ভীষণ ভাবে একা লাগে।’। সেই একই একাকীত্ব যেন তাঁকে গ্রাস করেছে। সেই ক্লান্ত গ্রীষ্মের এপ্রিলের বিকেলে সত্যজিৎ’র মরদেহের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। একটু পরেই এই দীর্ঘাঙ্গী মানিকবাবুর শেষ চিহ্নটিও চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। মৃণালের উপলব্ধি হলো যে এতদিন তাকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উৎসাহে, উদ্যমে, ক্ষেপিয়ে সৃজন-উৎকর্ষের সুউচ্চ চূড়াটিতে তুলে দেয়া মানুষটি আর রইলো না। তাঁর নিজের কথায়,

‘আমার কথা বলার লোকটাই চলে গেল।‘

১০২ পঠিত ... ১৭:৫৭, নভেম্বর ১৪, ২০২৩

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top