২১১ নম্বর রুমের দই চিকেন

১৩৮ পঠিত ... ১৬:৪৬, মে ২৩, ২০২৩

২১১-নং-রুমের-দই-চিকেন

সপ্তাহে কমপক্ষে দুই থেকে তিনদিন সন্ধ্যা হলেই আমরা বেরিয়ে পড়তাম মুরগির মাংস কিনতে। কারণ রোজ দুপুরে নর্থ ইন্ডিয়ান ভেজ লাঞ্চের পর যখন শুনতাম রাতেও ভেজ আইটেম খেতে হবে তখন আমাদের বাঙালি পাকস্থলী রীতিমতো বিদ্রোহ শুরু করে দিতো। মোটামুটি আড়াই-তিন মাইল হাঁটাহাটি করে মাংস-মশলা কিনে হোস্টেলে ফিরতে ফিরতে ফিরতে মোটামুটি আটটার মতো বেজে যেতো আমাদের। তাড়াতাড়ি করে দৌড়ে গিয়ে আমি আর আমার বন্ধু সুমন মিলে মেস থেকে একদম ঠেসে ঠেসে বক্স ভর্তি করে ভাত, ডাল নিয়ে এসে সুমন বসে যেতো রান্নাবান্নায়। এর মাঝেই চলে আসতো জয়েশ আর অরুন্ধতী। ওদের কাটাকুটির মাঝে আমি বসে যেতাম গিটার নিয়ে কিংবা মাঝেমধ্যে চলতো অঞ্জন দত্তের গান। রান্নার ফাঁকে ফাঁকে চলতো আমাদের বিস্তর আলোচনা, যে আলোচনা মাঝেমধ্যে অঞ্জন দত্তের ম্যাডলি বাঙালি থেকে শুরু হয়ে শেষ হতো গিয়ে দেশভাগের দুঃখে। এইসব আলাপ আলোচনার মাঝেই শুরু হয়ে যেতো আমাদের ‘কিঞ্চিৎ’পান।

রান্না চড়িয়ে মাঝেমধ্যে চলে যেতাম ছাদে। যেখানে আমি ঢাকার গল্প বলতাম ওরা বলতো কলকাতার গল্প মাঝেমধ্যে সুমনের গ্রামের বাড়ি কালনা নিয়েও কথাবার্তা হতো। এগারোটা-বারোটা নাগাদ খিদেটা একদম চড়ে বসলে ২১১তে ঢুকে দই চিকেনের ঘ্রাণ নাকে ঢোকামাত্রই নিজেকে মনে হতো রাবনের বংশের কেউ। তাড়াতাড়ি প্লেটে ভাত নিয়ে  যে যার মতো ঝাঁপিয়ে পড়তাম। সকালে বেশিরভাগ দিন নাস্তা না করা আর দুপুরে কোনোরকমে সবজি ডাল দিয়ে একটু ভাত খাওয়া জিহ্বায় দই চিকেনের স্বাদ পাওয়া মাত্রই একেকজন চলে অন্য কোনো এক দুনিয়ায়। খেতে বসে শুরু হয়ে যেতো খাওয়া নিয়ে রোমান্টিসিজম। পাগলের মতো খেয়ে এলিয়ে পড়তাম, একেকজন তারপর আবার ঘণ্টাখানেকের আড্ডা। আমার জেএনইউর শেষ দুইমাস মোটামুটি এভাবেই কেটে গিয়েছিলো। তারপর হুট করে একদিন তন্দ্রা ভাঙলো যখন টের পেলাম এবার দিল্লী ছাড়তে হবে। দিল্লীকে আমার কোনোদিনই ভালো লাগেনি, কিন্তু ২১১ নম্বর রুম আসলে একরকম ঘোর তৈরি করে দিয়েছিলো আমাদের মধ্যে। কোর্স শেষ হয়ে যাওয়ায় আমার ভিসা বাড়ানোরও কোনো উপায় ছিলো না, রুম খালি করে দিয়ে বিরস মনে বাক্স পেটরা গুছিয়ে একদিন রওনা দিলাম ঢাকার উদ্দেশ্যে।

জয়েশ এখনও দিল্লী আছে,

অরুন্ধতী কলকাতায়,

সুমন সেই ভ্যাংকুবারে

আমি পড়ে আছি ঢাকায়।

আমাদের চারজনের মধ্যে এখন শুধু জয়েশই ক্যাম্পাসে আছে, সে এখনও মাঝেমধ্যে আমাদের চন্দ্রভাগা হোস্টেলে আমাদেরই আরেক বন্ধু সৌমিকের সাথে আড্ডা দিতে যায়। সে আড্ডাটা ২১১’র মতো হয় কিনা জানি না। আমাদের হয়তো আবার দেখা হবে আবার হয়তো দুনিয়ার কোনো এক প্রান্তে দই চিকেন রাঁধতে রাঁধতে আমরা ২১১’র স্মৃতি রোমন্থনে নেমে যাবো কিন্তু ২১১’র মতো আড্ডা আর হবে না।

কারণ ২১১ নম্বর রুমটা আর আমাদের নেই।

১৩৮ পঠিত ... ১৬:৪৬, মে ২৩, ২০২৩

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top