স্মৃতিগদ্য: ইদের ম্যারাথনানন্দ

১০৪ পঠিত ... ১৭:৩৫, এপ্রিল ২৬, ২০২৩

Eid-er-marathonando

শৈশবের ঈশ্বরদীতে এক ঈদের কাফেলার গান-বাদ্য-ব্যানার-বেলুনের আনন্দ মিছিলের সঙ্গে অনেক পথ হেঁটেছিলাম। তখন বয়স বড় জোর ছয়; বাসার সামনে দিয়ে ইদের মিছিল যেতে দেখে তাদের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে বহুদূর। এরই মধ্যে বাসায় আতংক ছড়িয়ে পড়েছিলো; হারিয়ে গেছি বলে। লোকজন দিক-বিদিক খুঁজতে বেরিয়েছিলো।

কিন্তু সেসময়ের সমাজ তো স্নেহময় ছিলো; কাফেলার উদ্যোক্তারা সবাই ছিলো আব্বার ছাত্র। তারা কাফেলার ফাঁকে ফাঁকে যাত্রা বিরতিতে বিভিন্ন বাসায় আমাকে সেমাই-পায়েস খাইয়ে ঠিকই বাসায় পৌঁছে দিয়েছিলো।

জীবনে অনেক ইদ করেছি; কিন্তু সেই ঈদের কাফেলার সঙ্গে বেদুইনের মতো হারিয়ে যাবার আনন্দ আর কোন ইদে পাইনি।

এখনো এই প্রাক-বৃদ্ধ বয়সে ইদের ম্যারাথন দাওয়াত খেতে হয়; নিদ মুবারকের ইচ্ছা ভরপুর থাকলেও স্ত্রীর চাপাচাপিতে ইদ মুবারাক করতে যেতে হয়।

ঘর থেকে বের হলেই যেখানে বৈষম্য চোখে পড়ে; ট্রাফিক লাইট লাল হলেই যেখানে হ্যাভস নট জানালায় হাত পাতে; সেখানে হ্যাভস-দের ইদ রিইউনিয়ন আমি কখনোই উপভোগ করি না।

রাস্তায় আজকাল স্ট্রে ডগের সংখ্যা বেড়েছে; আমার স্ত্রী জিজ্ঞেস করে, স্ট্রে ডগ এতো বেড়েছে কেন! আমার বিশেষজ্ঞ অভিমত চায়।

আমার তো মনে হয়, এইসব জনপদে যেসব লোকেরা খুন করে; ঘুষ খেয়ে, মানুষের হক মেরে বড় লোক হয়েছিলো; তাদেরকেই মৃত্যুর পর স্ট্রে ডগ করে ধরণীতে ফেরত পাঠিয়েছেন বিধাতা!

: তাহলে আমরা কেন এরকম বৈষম্য আর অনিয়মের সমাজে জন্মালাম!

: তুমি আগের জন্মে হয়তো নাতসি সমর্থক ছিলে; আমি হয়তো ছিলাম রাসপুটিন; তাই মৃত্যুর পর বিধাতা দোজখে জন্ম দিয়েছেন, যা জ্বলে মরগে যা!

দু'চারজন সিনিয়র সিটিজেনের সঙ্গে দেখা করতে যেতে হয়; যাদের ছেলেমেয়ে দোজখ ছেড়ে পশ্চিমের বেহেশতের লোভে চলে গেছে; পড়তে-কাজে। সেসব এম্পটি নেস্টে কিছু স্মৃতি-কিছু সাদাকালো-রঙ্গিন ছবির ফ্রেম-আর ঘরময় দীর্ঘশ্বাস। দোতলা সম্পন্ন বাড়ি; অথচ ঘরগুলো খালি-থাকার কেউ নেই। দেখে আমার নিজের বাড়ির কথা মনে পড়ে। বাড়ির খালাম্মাকে দেখে মনে পড়ে মা'র কথা। ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যায়। আমি তো চেয়েইছিলাম; নিজের এলাকায় থেকে যেতে। কাছের ইউনিভার্সিটিগুলোতে ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি হিসেবে পড়াতে; আর লেখালেখি করতে। কিন্তু আব্বা-আম্মা রাজি হননি, কখন কোন লেখা কার অনুভূতিতে আঘাত হানে!

আমার কখনোই বাঘ-হাতি-ঘোড়া মারা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি। আমার বাবা-মা-র আনন্দময় শিক্ষকতার জীবনই আমাকে আকৃষ্ট করতো। আমাদের গৃহকোণ দ্যুতি-অরণীতে যে জীবন তাঁরা আমাকে দিয়েছিলেন; তাতে দুনিয়ার কোথাও কোন গৃহের জীবন দেখে আমার বিস্ময় জাগেনি। বিশেষ করে রাতে খাবার টেবিলে, সহজাতভাবে সমাজ-সংস্কৃতি-সাহিত্য-চলচ্চিত্র-দর্শন নিয়ে গল্পগুলো হতো; সেগুলো অনেক খুঁজি; আঁতিপাতি করে খুঁজি।

গতকাল এক বন্ধুর মা'র সঙ্গে দেখা হলো; তিনি গল্প করলেন, তার বাবা-চাচারা তাকে সিনেমা দেখাতে নিয়ে যেতেন; বলতেন পরীক্ষা তো কী হয়েছে; ৩৬৪ দিন কী করেছো; একদিন সিনেমা দেখলে কোনো ক্ষতি নেই; বরং লাভই হবে। এ আমার চেনা গল্প; আমার আম্মার শৈশবের গল্পগুলো এরকম আনন্দে ভরা। খালাম্মা, তাদের গ্রামাফোন রেকর্ড শোনার আনন্দের গল্প করলেন; প্রথম যখন ভিসিআর এলো; তখন রাতজেগে সবাই মিলে ফিল্ম দেখার গল্প করলেন। গল্পের এক ফাঁকে আম্মার ছবি দেখতে চাইলেন; ফেসবুকে আম্মার আইডিতে গিয়ে দেখিয়ে দিলাম। খালাম্মা হেসে তার মেয়ে আর আমার স্ত্রীকে বললেন, যা-ই বলো; আমাদের প্রজন্ম অনেক সুন্দর ছিলো; আমাদের তো এতো মেকআপ লাগেনি বাপু। হাসির ফোয়ারা ছুটলো।

আমার ছোট বেলা থেকেই বয়েসীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব বেশি হয়। আব্বা একবার বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন, পড়তো ক্লাস সিক্সে! কলেজের ভিপির সাইকেলে ঘোরো কেন! তোমার সমবয়েসী বন্ধু নেই! কলেজের ভিপি মিন্টু মামা এথলেট ছিলেন; তিনি পোল ভোল্ট শেখাতেন, ডিসকাস থ্রো শেখাতেন; এরপর পাল মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে নিয়ে গিয়ে মিষ্টি-দই খাওয়াতেন। আমি ঈশ্বরদীতে রয়ে গেলে; এবারের ঈদে মিন্টু মামা কিংবা এরকম সিনিয়র বন্ধুদের সঙ্গে মন্দ্র সময় কাটতো।

এবারের ইদের পার্টিতে মিন্টু মামাকে খুঁজছিলাম; কিংবা ছোট বেলার বন্ধু লীনকে খুঁজছিলাম। ইমান মজবুত থাকলে; মানুষ হয়তো কিছুটা পেয়েও যায়।  

একজন সিনিয়র সিটিজেন বললেন, দামি রেস্টুরেন্টে বসার আসন পাওয়া যায় না; অথচ মূল্যস্ফিতিতে আধপেটা খেয়ে থাকে মানুষ। এই ক্যানিবাল সোসাইটিটা ঠিক এরকম ভেঙে পড়ার কথা ছিলো।

মনে হলো; সত্যিই তো এমন সত্য কথা আগের যুগের মানুষ ছাড়া আর কে বলবেন! এইজন্যই  হয়তো প্রবীণশূন্য গ্রাম, গ্রন্থহীন গৃহের মতো; এমন একটা পুরোনো প্রবাদ চালু আছে বোধহয়।

পার্টিতে একজন নারীবাদীর সঙ্গে দেখা হলো যিনি ট্রাফিক লাইটে ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধ করার ক্যাম্পেইন করছেন। তার যুক্তি হলো; ভিক্ষা বন্ধ করে তাদের কর্মসংস্থান করুন।

আমার যুক্তি হলো; এইসব মুসোলিনি সরকার কতো কর্ম সংস্থান করতে পারে; তা তো আমরা দেখেছি। এরা গরীব কিশোরদের মধ্যপ্রাচ্যে দাস হিসেবে রপ্তানী করে ডলার আমদানি করে; আর সেই ডলার অলিগার্কদের মাঝে ভাগ করে দেয়; যাতে তারা সেসব ডলার রপ্তানী করে পশ্চিমের বেহেশতের সেকেন্ড হোম কেনে; একসঙ্গে বিজনেস ক্লাসে চেপে বেহেশতে বেড়াতে যায়; অলিগার্ককেরা। দাঁত কেলিয়ে সেলফি তোলে।

দক্ষিণ এশিয়ার গরীবের দোজখ থেকে বড়লোকেরা তাদের বেহেশত নির্মাণ করে। আর মৃত্যুর পর তারা স্ট্রেডগ হিসেবে পুনর্জন্ম লাভ করে।

আমি নারীবাদী বন্ধুকে বললাম, আজ ভদ্রভাবে ভিক্ষা চাইছে; বেশি চাপাচাপি করলে রিভলভার ধরবে গাড়ির জানালায়; আরও চাপাচাপি করলে আপনার ময়ূরপ্রাসাদের পৌঁছে দরজা-জানালা ভাংবে। সোশ্যাল সায়েন্সটা একটু বুঝে নিয়ে তারপর ভিক্ষুক হটাও অ্যাকটিভিজম করেন।

ইদের সময়ে ফেসবুকে রাগারাগি নাই; শরীর ম্যাজম্যাজ করছিলো; তাই হালকা একটু রাগারাগি হলে; অগত্যা ওস্তাদ এম রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ক্যারিওকিতে, মনে পড়ে রুবি রায় গানটা শুনিয়ে দিলাম। আফটার অল, ইদের কস্টিউম পার্টি; আমি যেখানে আসল চেহারা নিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলাম বোকার মতো।  

১০৪ পঠিত ... ১৭:৩৫, এপ্রিল ২৬, ২০২৩

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top