আমাদের স্যার কালচার

৪৪৫ পঠিত ... ১৬:০৪, মার্চ ৩০, ২০২৩

Sir-culture (1)

 

লেখা: শাব্বির আহমেদ

 

দুই দশক আগে সিভিল সার্ভিসে যখন ঢুকি, ‘স্যার’বলা আর শোনাটা দেখলাম অনিবার্যের মতো। কাজের জন্য যারা আসছেন, বেশিরভাগই স্যার ডাকছেন। মনে হতে লাগলো, স্যার সম্বোধন পাওয়াটাই রেওয়াজ। ক্যাডার সার্ভিস, গেজেটেড অফিসার, কাগজপত্র সত্যায়ন করি, চরিত্রের সার্টিফিকেট দেই, স্যার শুনবো না?

আমার নিজের ক্যাডারে শুরুতে নিয়ম ছিলো, দুয়েক ব্যাচ আগে পরের কাউকে স্যার বলা আবশ্যকীয় না, ভাই-আপাও বলা যাবে। পরে এটা বদলে গেল। সিনিয়র ব্যাচ মানেই স্যার।

ভাই-আপা একসাথে ষোলো বছর কাজ করেছি, দিনরাত আড্ডা দিয়েছি, গল্প করেছি, একদিন কোনো এক সকালে তাদের প্রমোশনের সরকারি জিও হলো, ব্যস, সম্পর্ক বদলে গেল। সবাই স্যার হয়ে গেলেন।

কেন এ রকম হয়? এক সিনিয়র বললেন, ডিসিপ্লিন, বয়, ডিসিপ্লিন। এই ‘স্যার’ছাড়া ডিসিপ্লিন থাকবে না।

আরেক সিনিয়র একবার মজার গল্প বললেন।

পরিচিত একজন (সরকারি কর্মকর্তা) ফোনে কনভারসেশন করছেন। অপর পাশ কথা বলছে, আর এ পাশ শুধু শুনছে, আর বলছে স্যার, স্যার, স্যার, স্যার স্যার… আর কিছু না, শুধু স্যার। দীর্ঘ স্যার, হ্রস্ব স্যার, আবেগের স্যার, অনুযোগের স্যার, তেলতেলে স্যার, বিস্ময়ের স্যার।

দেখা গেল ৩ মিনিটের ফোনকলে এ পাশে স্যার উচ্চারিত হয়েছে ৩৮ বার!

 

২.

একসময় মনে হতো আমাদের এই সিভিল সার্ভিস, এই ব্যুরোক্রেসি, এই কালচার, এটা ব্রিটিশদের মতো করে সাজানো।

ওদের নিয়ে পড়াশোনা করে ভুল ভাঙলো।

যুক্তরাজ্যের সিভিল সার্ভিস এখন একেবারেই আলাদা। অসাধারণ ডাইনামিক, অসম্ভব people-centric.

যুক্তরাজ্যে সিভিল সার্ভিসের দরজা সবার জন্য খোলা। Fast Stream প্রোগ্রাম আছে, এক্সিকিউটিভ লীডারশীপ  প্রোগ্রাম আছে, Apprenticeship প্রোগ্রাম আছে, এইসব এন্ট্রি রুট দিয়ে মেধা আর যোগ্যতা থাকা যে কেউ যে কোনো সময় সিভিল সার্ভিসে ঢুকতে পারে।

তারা বলে, ‘we look at your talent, not your background, age or degree subject, there’s nothing to stand in your way.’

যে কোনো পেশা থেকে সিভিল সার্ভিসে ঢোকা যায়, বের হওয়া যায়, আবার ফিরে আসা যায়।

সিনিয়র সিভিল সার্ভিসে যে কোনো বিভাগে জয়েন করে যে কেউ পার্মানেন্ট সেক্রেটারি (সচিব) হতে পারেন, কেবিনেট সেক্রেটারি হতে পারেন।

যুক্তরাজ্যের বর্তমান কেবিনেট সেক্রেটারি Simon Case সিভিল সার্ভিসে জয়েন করেছিলেন ২০০৬ সালে, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পলিসি অ্যাডভাইজার হিসেবে। পরে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা দপ্তর (GCHQ) তে কাজ করেছেন, ব্রেক্সিট নেগোনিয়েশন টিমে থেকেছেন, প্রিন্স উইলয়াম আর প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরনের প্রাইভেট সেক্রেটারি হিসেব কাজ করেছেন। বিভিন্ন দায়িত্ব পালন শেষে ২০২০ সালে Simon Case যখন কেবিনেট সেক্রেটারি হন, বয়স মাত্র ৪১। সরকারি চাকরীতে যোগদানের ১৫ বছরের মাথায় যুক্তরাজ্য সিভিল সার্ভিসের সর্বোচ্চ ব্যক্তি!

 

৩.

Sir Mark Sedwill যুক্তরাজ্য সিভিল সার্ভিসে সবচেয়ে নামকরাদের একজন।  সিভিল সার্ভিসে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন ফরেন অফিসের গালফ ওয়ার ইমার্জেন্সি ইউনিটে, ১৯৮৯ সালে। ডিপ্লোমেটিক ক্যারিয়ারে এরপর বিভিন্ন দায়িত্ব শেষে আফগানিস্তানে রাষ্ট্রদূত আর NATO Representative হন।  ২০১৩তে হন হোম সেক্রেটারি, আর ২০১৮তে কেবিনেট সেক্রেটারি। সিভিল সার্ভিসে অসামান্য অবদানের জন্য ২০১৮ সালে Mark Sedwill নাইটহুড লাভ করেন।

Mark Sedwill এর নামের আগে সবাই ‘স্যার’ লিখেন; সেটা এই নাইট খেতাব পাওয়ার কারণে।

যুক্তরাজ্যের জনগণ সিভিল সার্ভিসের কাউকে স্যার ডাকে না।

সার্ভিসের ভেতরেও কেউ কাউকে স্যার ডাকে না।

 

৪.

স্বনামধন্য একজন, তুখোড় লেখেন, অ্যানালাইসিস করেন, ভালো বলেন, পরামর্শ দেন, একদিন নিজের ব্যবসায়িক কাজে আমার অফিসে এসে স্যার ডাকা শুরু করলেন। আমি তো লজ্জায় হেঁট। আমি বয়সে, অভিজ্ঞতায় ছোট, উনাকে শ্রদ্ধা করি।

অনেকবার বলেও নিবৃত্ত করা যাচ্ছে না, উনি স্যারই বলবেন।

কথা বলার পর যা বুঝলাম, তিনি এখন কাজের সূত্রে বিভিন্ন অফিসে যান, অনেকেই স্যার শুনতে চায়। স্যার না বললে মাইন্ড করে বসে, কাজে তার প্রভাব পড়ে। তাই ঠিক করেছেন, ছোট-বড় সবাইকে স্যার ডাকবেন।

আমাকে বাদ দিবেন না, কারণ, প্রথমত: আমি এই সিস্টেমেরই একজন, দ্বিতীয়ত: আমাকে স্যার না বললে উনার স্যার ডাকার অভ্যাস ব্যহত হতে পারে।

এরপর যতবারই দেখা হয়, আমি ভাই ডাকি, উনি স্যার সম্বোধন করেন। তার স্যার উচ্চারণের underlying mockery টা দুজনেই বুঝি। আমি হাসি, তিনিও হাসেন।

 

৫.

‘স্যার’ডাকার, স্যার শোনার কালচারটা আমরা বয়ে নিচ্ছি কেনো? আলোচনাটা একবার নিজেদের মধ্যে তুলেছিলাম।

‘স্যার না ডাকলে কী ডাকবে? নাম ধরে?’

‘অমুক সাহেব, তমুক সাহেব বলে ডাকতে দিলে মানুষ মানবে? আইন শৃঙ্খলা রাখা যাবে?’

‘স্যার শব্দটা নিরাপত্তার দেয়ালের মতো। ফিল্ডে কাজ করতে গেলে এটা লাগে।’

কনসার্নগুলো দেখলাম প্রায় এ রকম।

প্রশ্ন হলো, স্যার কালচার উঠে গেলে পাবলিক সার্ভিস ডেলিভারিতে সমস্যা কতোটা হবে?

হাতেগোনা কয়টা দেশ ছাড়া আর কোথাও স্যার কালচার নেই, পাবলিক সার্ভিসে তারা কি খারাপ করছে? অনেকে তো বরং মডেল হয়ে আছে।

আমরা কি উন্নত সমাজে ট্রান্সফর্ম করবো না? কাজটা পাবলিক সার্ভিস থেকে শুরু না হলে কোথা থেকে হবে?

দূরত্বের কৃত্রিম দেয়াল বানানোর ভয়াবহ দিক আছে। 

এই নিরাপত্তা, এই দেয়াল, এই নাম ধরে সম্বোধিত না হওয়ার ইচ্ছা, সম্মানিত হওয়ার আকাঙ্খা, এগুলো নিশ্চিত করার জন্য আমরা ধীরে ধীরে নিজেদেরকে আলাদা একটা শ্রেণিতে তুলছি, যাদেরকে মানতে হবে, সম্মান করতে হবে, যাদের নাম ধরে ডাকা যাবে না, যাদের সাথে নিরাপদ দূরত্ব রাখতে হবে।

আমাদের এই যে এই স্পেশাল শ্রেণি, তার পরিচয়, তার ইউনিফর্ম, তার লোগো, তার সিমবল হয়ে উঠছে এই ‘স্যার’। 

প্রশ্ন হলো, যারা ‘স্যার’ না, তাদের কী হবে?

নিজেদের এই যে আলাদা একটা ক্লাস বানিয়ে ফেলছি, এটা কি ঠিক হচ্ছে?

এমনটা কি কথা ছিলো?

Men are born equal,  এইটা বিশ্বাস করে, এই সমতা আনার জন্য আমাদের পূর্ব-পুরুষেরা কত সংগ্রাম করেছেন, বন্দী থেকেছেন, নিগ্রহ সয়েছেন, কত জীবন দিয়েছেন, তা ভুলে যাওয়ার কথা ছিলো?

 

৬.

সিভিল সার্ভিস কি এমনই থাকবে?

না।

এই সিভিল সার্ভিস বদলে যাবে। উন্নত সমাজে যেমনটা আছে তেমন হবে।

সবার জন্য সিভিল সার্ভিস খোলা থাকবে। উত্তর প্রজন্মের তুখোড় মেধাবীরা দেশে বিদেশে পড়াশোনা করে যখন খুশি সিভিল সার্ভিসে ঢুকতে পারবে, অবদান রাখতে পারবে।

কোনো একদিন এক আদেশ বলে ‘স্যার’উঠে যাবে।

সেটা হবে দারুণ একটা দিন!

আমার ভাইয়ের কাছ থেকে ‘স্যার’ সম্বোধন শোনার যে রুগ্ন মোহ আমাকে বন্দী রেখেছে তা থেকে মুক্তি মিলবার দিন। 

আমি সেটা দেখে যাবো? জানি না।

তবে, আমার সন্তানেরা দেখবে, আমি নিশ্চিত।

 

লেখাটি লেখকের সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত পোস্ট থেকে সংগৃহিত

৪৪৫ পঠিত ... ১৬:০৪, মার্চ ৩০, ২০২৩

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top