শরীফ শরীফার শেষ পরিণতি

১০৮৬ পঠিত ... ২২:২৬, জানুয়ারি ২৫, ২০২৪

419939354_24793015340314038_185980999159681531_n

সোমবার সকাল থেকে শরীফ বিষণ্ণ। আজ সে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাবে। যে সমাজ ও পরিবার তার অনুভূতিকে মূল্যায়ন করে না, তার উপর এক প্রকার অভিমান করে সবকিছু ছেড়ে ছুড়ে চলে যাবে সে। যাওয়ার মতো একমাত্র গন্তব্য-গুরু মা। সেখানে নতুন করে হবে তার পরিবার—যে পরিবার তার অস্তিত্ব বিকাশে বাঁধা দেবে না কোনোদিন।

রুট জটিল কিছু নয়। প্রথমে বাইকে করে ধানমন্ডি টু মহাখালী, এরপর মহাখালী থেকে রংপুরের পীরগঞ্জ।

একটা ছোটো কালো গ্যাভারডিনের কাঁধব্যাগেই প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এঁটে যায় তার। শুধু যাত্রাপথটাই তো! একদিনের ব্যাপার। এরপর থেকে পালটে যাবে তার পরিচয়। পুরুষের পোশাকে শরীফের দমবন্ধ হয়ে আসে। কোনো জৌলুস-চাকচিক্য নেই,

কোনো গ্ল্যামার নেই। ঠিক মিনারেল ওয়াটারের মতো।

কিন্তু শরীফের পছন্দ কোক। যার কোক পছন্দ, মিনারেল ওয়াটারে তার তেষ্টা মেটে না।

ব্যাগে নিয়েছে একগাছি লাল চুড়ি, নীল টিপ, আর ফার্মগেট ওভারব্রীজের নিচ থেকে কেনা এক জোড়া সস্তা লাল পেন্সিল হিল। বাসা থেকে বের হয় সে পিছুটানবিহীন মানুষের মতো। একবারের জন্যও সে পেছন ফিরে তাকায় না। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে শরীফ বাইক ডাকে পাঠাও অ্যাপে। আজকেই তার 'শরীফুল হক' অ্যাকাউন্টে শেষ দিন—ভাবতেই ঠোঁটের কোণে স্বস্তির হাসি ফুটে ওঠে।

রাইডারের  বয়স ২৫ কি ২৬ হবে। এলোমেলো চুলের ফর্সা চেহারার সুদর্শন যুবক। পার্পল রঙের শার্টের সাথে নেভি ব্লু জিন্স প্যান্ট পরেছে। একদম আশেপাশেই ছিলো সে, রাইড কল করার দুই মিনিটের মধ্যে হাজির। নতুন এক রোমাঞ্চকর জীবনের উদ্দেশ্যে বাইকে চেপে বসে শরীফ। তরুনের পারফিউমের ঘ্রাণ ডিজেলের গন্ধের সাথে মিশে অদ্ভুত এক সুবাস তৈরি করছে। শরীফের ভীষণ ভালো লাগে। আনমনে চোখ বন্ধ করে আরেকটু সামনে চেপে বসে সে। কতক্ষণ ঠিক কতো কাছে সে চেপে বসেছিলো—তার মনে নেই।

সম্বিৎ ফিরে আসে বাইকারের কর্কশ কন্ঠে, ‘ওই মিয়া পিছান...!’

এরপর আচমকা তীব্র ব্যাথার অনুভূতি—আর কিছু মনে করতে পারে না সে।

রংপুরের উদ্দেশ্যে শুরু হওয়া শরীফের অ্যাডভেঞ্চার  শেষ হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিক ওয়ার্ডে। কোথায় সেই পেন্সিল হিল? ডান পাশে কোমড়ের নিচ থেকে পুরোটা প্লাস্টার করা। যখন গোমড়ামুখের বয়স্ক নার্স নাকি গলায় 'শরীফুল হক কে? আপনের ওষুধ নেন’ বলে ওষুধ বিছানায় ছুড়ে দেয়—শরীফের হৃদয় তখন এক হাজার টুকরো হয়ে  যায়, কষ্টে নিজের মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছা করে।

এরপর থেকেই মোটামুটি বদলে যায় শরীফের জীবন। না, ভুল বুঝবেন না। তার পায়ের খুব বেশি কিছু হয়নি। প্রায় তিন মাস বিশ্রামের পরই আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যায় সে। কিন্তু তাকে তিলে তিলে ক্ষয় করে শরীফা না হতে পারার দুঃখ৷

শরীফের মা রশিদা বানু কী বুঝলেন জানিনা—হয়তো ভাবলেন বিয়ে করলে তার দুঃখী ছেলের জীবনে আনন্দের জোয়ার আসবে। অনেক দেখে শুনে অ্যাস্থেটিক, সুশ্রী, শিক্ষিতা, উচ্চবংশীয় এক মেয়ে খুঁজে বের করলেন  তিনি। রাজী না হলেও বিয়ে না করার জন্য শক্ত কোনো যুক্তি শরীফের ছিলো না। তবে যে ব্যাপারটি শরীফকে শেষ পর্যন্ত বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বাধ্য করলো তা হলো, মেয়েটির নাম। খুব সম্ভবত শরীফা হতে না পারার কষ্ট সে ওই নামের মেয়েটিকে বিয়ে করে ঘোচানোর চেষ্টাই করলো একরকম!

বাসর রাত। ঘোমটা দিয়ে বিছানায় অপেক্ষা করছে শরীফা। শরীফকে জোর করে বাসর ঘরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে তালা দিয়ে দেওয়া হয়েছে। শরীফের মন চাচ্ছে কোথাও পালিয়ে যেতে। এই মুহুর্তে তাকে সবচেয়ে বেশি সাপোর্ট দিতে পারবে গুরু মা'র আস্তানা। প্রচন্ড অপরাধবোধে ভুগছে সে। নিজেকে নিজে হাজতবাস দেওয়া গেলে সে অন্তত দশ বছরের কারাদন্ড দিতো।

অনেক কষ্টে দুই ফোঁটা সাহস সঞ্চয় করে ধীর গতিতে শরীফার সামনে বসলো সে।

কাঁপা কাঁপা গলায় বললো, ‘শরীফা তোমাকে কিছু সত্যি কথা বলবো। আমি ছোটবেলা থেকে মনে মনে একজন মেয়ে৷ আমরা সর্বোচ্চ সোল-সিস্টার হতে পারবো, সোল-মেট নয়। প্লিজ তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও..জানি ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করে তোমার সারাটা জীবন নষ্ট করেছি আমি...’

এতটুকু বলে শরীফের গলা ধরে গেলো। কান্না করার আগ মুহুর্তে মানুষের গলা যেমন শোনায় তার গলাও তেমন শোনাচ্ছে। বাইরে কারা যেন খিলখিল করে হাসছে। মনে হচ্ছে কোনো বাংলা সিনেমার দৃশ্য চলছে৷

এক্ষুনি কেউ খাটের নিচ থেকে বেরিয়ে বলবে, ‘সব শুনে ফেলেছি..হিহিহি...' 

শরীফা অঝোরে কাঁদছিলো। শরীফের কথা শুনে সে কান্না বন্ধ করে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে। বিস্ময় না কাটতেই মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যায় নতুন চাদরে। শরীফের তখন নিজেকে ভীষণ অসহায় লাগে। চোখে মুখে বেশ কিছুক্ষণ পানি দেবার পর শরীফার যখন জ্ঞান ফিরে তখন তার চোখে ঝলমল করছে আলো।

শরীফ অবাক হয়।

তার কানে কানে শরীফা বলে, 'আমিও ছোটবেলা থেকে মনে মনে ছেলে। তোমাকে ঠকিয়েছি ভেবে কাঁদছিলাম। আজকে থেকে তাহলে আমি শরীফ আর তুমি শরীফা...’

মিসিং পাজল পিসের মতো একে অপরকে খুঁজে পাওয়ার তুমুল আনন্দে বিহ্বল হয়ে কেটে যায় তাদের ফুলশয্যার রাত। ওই মুহূর্তে পৃথিবী সবচেয়ে সুখী দম্পতির তালিকা করা হলে শরীফ শরীফা হতো প্রথম।

প্রায় এক সপ্তাহ কেটে গেছে। শরীফ-শরীফাদের বাসায়

বেড়াতে এসেছেন রশিদা বানু এবং তার স্বামী। নতুন দম্পতির জন্য শাড়ি-পাঞ্জাবি, জুতা, মালাসহ নানা উপহার এনেছেন তারা। এরমধ্যে মসলিনের পাঞ্জাবিটা প্যাকেট থেকে খুলতে খুলতে শরীফা বললো, 'মা, পাঞ্জাবিটা খুব সুন্দর, কিন্তু সাইজ তো মনে হচ্ছে আপনার ছেলের হবে না..’

রশিদা বানু বললেন, ‘এটা তোমার জন্যই এনেছি বাবা।  আর শাড়িগুলো ওর জন্য...’

শরীফ শরীফা একে অপরের দিকে বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইলো। এদিকে মুখ টিপে হাসছেন রশিদা বানু ও তার স্বামী মামুনুর রশিদ।

১০৮৬ পঠিত ... ২২:২৬, জানুয়ারি ২৫, ২০২৪

Top