আপনার যা জানা দরকার: আপনার বাড়ির ভৌতিক বিদ্যুৎ বিলে আদানীর কতটুকু অবদান?

৮০৫ পঠিত ... ১৭:৪১, জুন ০৫, ২০২৪

13 (12)

লেখা: এম হাসান

আপনি হয়তো কল্পনাও করতে পারবেন না, ২০১৫ বাংলাদেশের জন্য কতো গুরুত্বপূর্ণ একটা বছর ছিলো! ২০১৫-তে বাংলাদেশে কি ঘটেছিলো? অনেকেই ২০১৫-কে মনে রাখবে ২০১৪ সালের নির্বাচনের বর্ষপূর্তিকে কেন্দ্র করে বিএনপির আন্দোলনের জন্য। অনেকেই মনে রাখবে ব্লগার হত্যার জন্য।কিন্ত আসল ঘটনা অনেকের চোখের সামনে ঘটলেও টের পাবে না।

২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হবার ঠিক এক বছর পরে ২০১৫ সালে প্রথম বাংলাদেশ সফরে আসেন। তখন খুব সম্ভবত বিএনপি ২০১৪ সালের নির্বাচনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মাঠে। আগেই বলেছি, ২০১৫ সাল একটা গুরুত্বপূর্ণ বছর। শুধু রাজনীতি না,  অর্থনীতি এবং বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের জন্য না আরো অনেক ইস্যুতেই এই বছর খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ২০১৫ সালের আগে-পরে বেশ কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের চুক্তি করে। এটা ছিলো বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের জন্য একটা টার্নিং পয়েন্ট।

মূলতো এই চুক্তিগুলোর পরিপ্রেক্ষিতেই একটা অদ্ভুত অবস্থা সৃষ্টি হয়। এই চুক্তিগুলোর ফলে চাহিদার চেয়ে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বেড়ে যায়। ২০১৫ সালে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ১২০০০ মেগাওয়াট যেখানে সেসময়ে পিক আওয়ারে সর্বোচ্চ চাহিদাই ছিলো ৮১৭৭ মেগাওয়াট। এতে সমস্যা কোথায়?

ধরা যাক আপনার পরিবারের জন্য মাসে ১ কেজি চাল দরকার। কিন্তু আপনি অনেক টাকা লোন করে এমন কিছু স্টোরেজ নির্মাণ করলেন যেখানে ১০ কেজি চাল রাখা সম্ভব। এখন আপনি এক কেজি চাল রাখেন আর ১০ কেজি রাখেন, ওই স্টোরেজ বানানোর জন্য নেওয়া ঋণের টাকা কিন্ত আপনাকে শোধ করতেই হবে। প্রয়োজন ছাড়া অতিরিক্ত বিদ্যুত কেন্দ্রের জন্য করা সব লোন এবং চুক্তির টাকা কিন্ত বাংলাদেশকেই শোধ করতে হচ্ছিলো।

২০১৫ সালেই আদানির সাথে বাংলাদেশ সরকারের একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের ব্যাপারে চুক্তি হয়। প্রাথমিক আলোচনায় এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাংলাদেশের ভেতরে স্থাপন করার কথা থাকলেও পরবর্তীতে কাগজে কলমে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র ভারতের ঝাড়খন্ডে স্থাপনের বিষয়ে চুক্তি হয়।

এর কারণ অবশ্য সেসময় জানা যায়নি। খুব সম্ভবত যুক্তি দেখানো হয়েছিলো ঝাড়খন্ডে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করা সম্ভব হলে কয়লা পরিবহনের যে খরচ সেটা অনেকাংশে হ্রাস করা সম্ভব হবে। যেহেতু ঝাড়খন্ডে প্রচুর কয়লা খনি আছে। যার ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ কমে আসবে।

ব্যাপারটা অনেকটা এরকম… আপনি বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে আপনার ফ্যামিলির জন্য একটা পানির পাম্প স্থাপন করলেন। কিন্ত নিজের বাড়িতে জমি থাকা সত্যেও আপনি পাম্পটা পাশের বাড়িতে বানালেন। এবং সেখান থেকে চড়াদামে পানি কিনার চুক্তি করলেন। যেখানে আপনার পানির কোন দরকারই ছিলো না।

একথা সত্য যে ঝাড়খন্ড ভারতের প্রধান কয়লা উৎপাদনকারী প্রদেশ গুলোর একটা। কিন্ত শেষ পর্যন্ত ঝাড়খন্ডের ওই বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ঝাড়খন্ডের কয়লা ব্যবহার করা হয়নি। ঝাড়খন্ডের ওই বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহারের জন্য কয়লা অস্ট্রেলিয়ার একটি কয়লা খনি থেকে নিয়ে আসা হয়। যার মালিকানা আদানি গ্রুপের। যে বন্দরে কয়লা খালাস করা হয় তার মালিকানাও আদানী গ্রুপের। এখন এটা সহজবোধ্য যে ঝাড়খন্ড থেকে কয়লা সংগ্রহের বদলে অস্ট্রেলিয়া থেকে সংগ্রহ করলে সেখানে খরচ অবশ্যই বেড়ে যাবে। প্রশ্ন হচ্ছে আদানী গ্রুপ এই পথে কেন পা বাড়াল?

উত্তর হচ্ছে, কারণ এতে আদানী গ্রুপের হারানোর কিছুই ছিলো না। কারণ এই পুরো খরচটাই বাংলাদেশকে বহন করতে হচ্ছিলো। আর এতে কয়লা বিক্রি থেকে পরিবহন পর্যন্ত ধাপে ধাপে বিপুল অংকের অর্থ আদায় করতে পারছিলো আদানী।

অবশ্য শুরুতে আদানীর প্রস্তাবনা ছিলো ঝাড়খন্ডে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করে ঝাড়খন্ডেই বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে। কিন্ত আদানী পরে হিসাব নিকাশ করে দেখে ঝাড়খন্ড থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি করলে বেশি টাকা পাওয়া যাবে। ঝাড়খন্ড বিদেশী একটা রাষ্ট্রে বিদ্যুৎ সরবরাহ করার জন্য নিজের কয়লা দিতে অস্বীকৃতি জানায়।

এই অস্বীকৃতি আদানীর জন্য সাপে-বর হয়ে দাঁড়ায়। দৃশ্যপটে চলে আসে অস্ট্রেলিয়ার Carmichael coal mine. অস্ট্রেলিয়ার Carmichael coal mine নানা কারণে বিতর্কিত। এর বিরুদ্ধে খোদ অস্ট্রেলিয়াতেই ব্যাপক আন্দোলন চলমান ছিলো। যার মূল স্লোগান ছিলো – STOP ADANI বিভিন্ন এসেসমেন্টে দেখা যাচ্ছে – এর পরিবেশগত প্রভাব হবে মারাত্মক। কোন কোন গবেষকের মতে এই প্রজেক্টের ফলে গ্রেট ব্যারিয়ার রীফ ধ্বংস  হয়ে যাবে।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বড় বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান/ ব্যাংক গুলোকে কিছু নিয়ম নীতি মেনে চলতে হয়। যার মাঝে একটা হচ্ছে তারা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক কোন প্রজেক্টে বিনিয়োগ করবে না।  এই বিতর্ক সৃষ্টি হবার পর বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান এই প্রজেক্টের সাথে সম্পর্কিত আদানীর প্রতিষ্ঠানের প্রজেক্টে বিনিয়োগ করা থেকে সরে আসে। কিন্ত আদানীর অন্য প্রজেক্ট গুলোতে বিনিয়োগ অব্যাহত রাখে। আদানী তাদের এই প্রজেক্ট নিয়ে বিপদে পড়ে।  

সেই বিপদ থেকে উদ্ধার পাবার জন্য তারা বেছে নেয় বাংলাদেশকে। স্বাভাবিকের চেয়ে বহুগুণ বেশি দামে বাংলাদেশকে বিদ্যুৎ কিনতে বাধ্য করা হয়। এমনকি এই ব্যায় বহুল কয়লা প্রজেক্ট থেকে কয়লা সংগ্রহের খরচ ও বাংলাদেশকেই বহন করতে হয়। অবস্থা এক পর্যায়ে এতোটাই সংগীন অবস্থায় পৌছায় যে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিক ভাবে কয়লার দাম পুনর্বিবেচনার জন্য অনুরোধ করে আদানীকে। যার কোনো আপডেট আর পরে পাওয়া যায়নি।

প্রশ্ন হচ্ছে বাংলাদেশ আদানীর সাথে এই অসম চুক্তি করতে কেন বাধ্য হলো?  

এটা বোঝাতে আমি আপনাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাবো ২০২৩ সালের ৮ ফেব্রুয়ারিতে। এই দিনে ভারতীয় লোকসভা (আমাদের জাতীয় সংসদের মতো অনেকটা) থেকে কংগ্রেস এমপি রাজানি পাতিলকে সাময়িক ভাবে বহিষ্কার করা হয়। তার অপরাধ ছিলো তিনি তার মোবাইলের মাধ্যমে লোকসভার কার্যক্রম রেকর্ড করার চেষ্টা করছিলেন। প্রশ্ন হচ্ছে…তিনি ঠিক কি রেকর্ড করার চেষ্টা করছিলেন?

মোদি এবং আদানির বন্ধন শুধু বাংলাদেশকে নয় ভারতকে নানাভাবে ভোগাচ্ছে। ২০২৩ এরপর কংগ্রেস এই বিষয়টাকে সামনে নিয়ে আসে। ৮ই ফেব্রুয়ারি কংগ্রেস সদস্যরা এক পর্যায়ে লোকসভায় মোদি আদানি ভাই-ভাই স্লোগান দেওয়া শুরু করেন। আশ্চর্যজনক ভাবে স্লোগান শুরু হবার সাথে সাথে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত টিভি চ্যানেল ‘সংসদ টিভি’লোক সভার কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়।  রাজিন পাতিল মূলতো এই ঘটনা সরাসরি লাইভ করার চেষ্টা করছিলেন। এরও আগে ২০২৩ সালে ৭ ফেব্রুয়ারি কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী সংসদে আদানি গ্রুপ এবং মোদিকে জড়িয়ে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেন। তার এই পুরো বক্তব্য সংসদের কার্যবিবরনী থেকে মুছে ফেলা হয় । এবং এর ঠিক পরপরই সুরাট এর এক আদালতে তার বিরুদ্ধে একটি মামলার কার্যক্রম শুরু হয়। ওই মামলার ফলে রাহুল গান্ধী লোকসভার সদস্য পদ হারান। সেসময় রাহুল গান্ধী একটা বেশ পুরাতন ফটোগ্রাফ দেখান যার মাধ্যমে এটা স্পষ্ট বুঝা যায় যে মোদি-আদানী গাঁট বন্ধনের ইতিহাস অনেক পুরাতন।

আদানী ভারতের রাজনীতিতে খুবই স্পর্শ কাতর একটি ইস্যু হিসেবে এরপর থেকেই বিবেচিত হয়ে এসেছে। অনেকেই এই গ্রুপের মালিক মিঃ গৌতম আদানীকে ভারতের রকফেলার হিসেবে অভিহিত করেছেন।

পরিশিষ্ট

১) গত মাসের ১৫ই মে দৈনিক দেশ রূপান্তর এক প্রতিবেদনে,  বাংলাদেশে বিদ্যুৎ বিক্রি শুরুর পর এক বছরে ভারতের আদানি পাওয়ারের নিট মুনাফা ১০ হাজার ৭২৭ কোটি রুপি থেকে বেড়ে ২০ হাজার ৮২৯ কোটি রুপি হয়েছে। মুনাফা বৃদ্ধির এই হার ৯৪.২ শতাংশ। আর এই সময়ে তাদের আয়বৃদ্ধির অর্ধেকেরও বেশি হয়েছে বাংলাদেশ থেকে।

২) দ্যা বিজনেস পোস্ট ২০২৪ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি এক প্রতিবেদনে জানায় বাংলাদেশ ব্যাংক আদানিকে পরিশোধে জন্য ১.৭২ বিলিয়ন ডলারের অনুমোদন দেয় ওই একই মাসে। উল্লেখ্য এসময় বাংলাদেশ তীব্র রিজার্ভ সংকটে ভুগছিলো।

৩) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায়-তিন মাস পরপর বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

৪) ৩০ মে, ২০২৪ সালে আদানি পাওয়ার তাদের দ্বিতীয় ধাপের বকেয়া দ্রুত পরিশোধের জন্য অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ করে।

৫) জুন ০২, ২০২৪ এ জানা যায় ফের এশিয়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত হয় গৌতম আদানী।

৮০৫ পঠিত ... ১৭:৪১, জুন ০৫, ২০২৪

Top