তারা যে আনন্দ করতো: আইজ্যাক আসিমভের সায়েন্স ফিকশন

৪৯৫ পঠিত ... ২৩:১৯, মে ০২, ২০২০

অলংকরণ: মুবতাসিম আলভী

সে রাতে মার্জি ব্যাপারটা লিখে পর্যন্ত রাখছে। ১৭ মে, ২১৫৫ তারিখ দেয়া পৃষ্ঠায় সে লিখছে, 'আজকে, টমি আসল একটা বই  খুঁজে পাইছে।'

বইটা খুবই পুরানো। মার্গির দাদু একবার বলছিলো, দাদু যখন ছোট্ট একটা ছেলে তখন দাদুর দাদু তাকে বলছিলো যে, এক সময় সমস্ত গল্প প্রকাশ হইতো কাগজের পৃষ্ঠায়।

বইয়ের হলদে আর ভঙ্গুর পৃষ্ঠাগুলা  উল্টায়ে তারা দেখলো, শব্দগুলা স্থির হয়া থাকায় পড়তে তো দারুণ মজা! স্ক্রিণে সাধারণত চলমান শব্দরাজি যেমন হওয়ার কথা, তেমন না। এবং বইয়ের আগের পৃষ্ঠায় গিয়া দেখলো কিছুক্ষণ আগে যে শব্দগুলা ছিলো সেগুলাই আছে। 

'আজব তো' টমি বললো, 'কি অপচয়। কোনো একটা বই পড়া হয়ে গেলে জাস্ট ছুড়ে ফেলে দিবো। আমাদের টিভিপর্দায় নিশ্চয়ই লক্ষ লক্ষ বই ছিলো এবং আরও অজস্র বই আছে। এই কারণে আমি টিভিরে ফালায়ে দিই না।' 

'আমিও না।' মার্জি বললো। তার বয়স ১১। টমির ১৩। টমির মতো বেশি টেলিবুক মার্জি দেখে নাই। 

মার্জি টমিকে জিজ্ঞেস করলো, 'বইটা পাইলা কোথায়?' 

'আমার বাড়িতে।'  টমি মার্জির দিকে না তাকায়েই বললো, ‘কারণ তার পুরা মনোযোগ বইয়ে।’

'বইটা কী নিয়া?' 

'স্কুল।'

মার্জির মেজাজ খারাপ হইলো। 'স্কুল? স্কুল নিয়া লেখার কী আছে? স্কুল বিরক্তিকর।' 

স্কুল মার্জির সবসময়ই অপছন্দ। আর এখন অপছন্দের মাত্রা আরও বাড়ছে। তার যান্ত্রিক শিক্ষক ভুগোলে তাকে একের পর এক টেস্ট দিয়াই যাইতেছে আর সে ক্রমাগত খারাপ করেই যাইতেছে। অবস্থা এতই শোচনীয় যে মার্জির আম্মু দুঃখিতসূচক মাথা নেড়ে তাকে কাউন্টি ইন্সপেক্টরের কাছে পাঠাইছে। 

কাউন্টি ইন্সপেক্টর লালমুখো গোলগাল চেহারার ছোটখাটো মানুষ। বিভিন্ন ডায়াল ও তারের টুলসের একটা বাক্স পাশে নিয়া সে মার্জির দিকে তাকায়ে হাসলো। মার্জিরে একটা আপেল দিলো। তারপরে যান্ত্রিক শিক্ষকরে খুলে ফেললো। মার্জি আশা করছিলো, ইন্সপেক্টর নিজেই ওই শিক্ষকরে আবার ঠিকঠাক করতে পারবেন না। দেখা গেলো ঘন্টাখানেক পর, একদম আগের সেই টিচার, বিশাল, কালো ও কদাকার এবং আগের মতোই তার বিশাল স্ক্রিন যেখানে সমস্ত লেসন আর প্রশ্নপত্র সাজানো আছে৷ অবশ্য মার্জির সবচেয়ে অপছন্দের অংশ যে ফোল্ডারে পাঞ্চ কোডে -ছয় বছর বয়সে এই পাঞ্চ কোড তারে শেখানো হইছে- লিখে তারে হোমওয়ার্ক আর উত্তরপত্র রাখতে হয় সেইটা। আর সেই যান্ত্রিক শিক্ষক মুহূর্তের মধ্যে হিসাব করে ফেলে। 

যান্ত্রিক শিক্ষকরে ঠিক করার পরে ইন্সপেক্টর মার্জির দিকে তাকায়ে হাসলো। কাঁধ চাপড়ে দিলো। তারপর মার্গির মাকে বললো, মিসেস, জোনস, এইটা মার্জির দোষ না মোটেই। মনে হয় ভূগোল সেকশনটায় কিছু যান্ত্রিক ত্রুটি ছিলো। মাঝেমধ্যে এমন হয়, গতি বেড়ে যায়। আমি এইটারে ঠিক কইরা ১০ বছর বয়সীদের লেভেল সেট কইরা দিছি।  সত্যি কথা বলতে, মার্জির শেখার ও আত্বস্থ করা মাত্রা সন্তোষজনক।' এবং মার্জির মাথা আলতো কইরা চাপড়ায়ে দিলো।  

মার্জির মনখারাপ তাতে কমলো না। তার ইচ্ছা তারা এই যান্ত্রিক শিক্ষক জিনিসটা থেকে তারে মুক্তি দেবে। একবার তারা টমির শিক্ষকরে সরায়ে নিছিলো এক মাসের জন্যে। এ কারণে শিক্ষকের ইতিহাসের ফোল্ডারটা পুরাই শূন্য হয়া গেছিলো। 

তো, এই কারণে সে টমিরে জিগাইলো, স্কুল বিষয়ে কেউ লিখতে যাবে কেন? 

টমি বড়ভাইসুলভ চোখে তাকাইলো। 'কারণ এই স্কুল আমাদের মতো না, বোকা। এইটা শত শত বছর আগের পুরানা ধাঁচের স্কুল।' টমি শেষে রাশভারী ভঙ্গিতে যোগ করলো, 'শতবর্ষ আগে।'  

মার্জি কষ্ট পাইলো। 'আচ্ছা। আমি জানি না এতো আগে কেমন স্কুল ছিল তাদের।' সে টমির কান্ধের উপ্রে দিয়া তাকায়া বইটা একটু পড়ার চেষ্টা করলো। তারপর বললো, ওদের দেখছি শিক্ষক ছিলো। 

'অবশ্যই ওদের শিক্ষক ছিলো। তবে সেই শিক্ষক সাধারণ ছিলো না। সে ছিলো মানুষ।' 

'মানুষ? মানুষ কিভাবে শিক্ষক হয়?' 

‘হয়। সে ছেলেমেয়েদেরকে অনেক কিছু বলতো, হোমওয়ার্ক দিত এবং  প্রশ্ন করতো।' 

‘একজন মানুষ তো এত স্মার্ট হতে পারে না।’ 

‘অবশ্যই পারে। বাবাই তো আমার শিক্ষকের সমান জানে।’

'না,  পারে না। একজন মানুষ কখনও শিক্ষকের সমান জানতে পারে না।'

'সে শিক্ষকের চাইতে কম জানে না। আমি বাজি ধরতে পারি।'  

মার্জির এই ব্যাপারে তর্ক করতে প্রস্তুত ছিলো না। বললো, আমি নিশ্চয়ই অচেনা একটা লোককে আমার বাসায় শেখানোর জন্যে রাখবো না।'  

টমি উচ্চস্বরে হাসলো। 'তুমি কিচ্ছু জানো না, মার্জির। শিক্ষক কারও বাসায় বাস করতো না। একটা নির্দিষ্ট বিল্ডিং সব শিশুরা পড়তে যেতো৷'  

'সব শিশুরা একই জিনিস শিখতো?' 

'হ্যাঁ। তারা একই বয়সী হলে একই জিনিসই শিখতো।'

কিন্তু আম্মু বলছে, ‘শিক্ষকরে প্রতিটা ছেলে ও মেয়ের স্বভাবের সাথে মানায়ে নিতে হয়৷ প্রতিটা শিশুরে শিখাইতে হবে ভিন্ন ভিন্ন কায়দায়।’ 

'তাহলে তারাও নিশ্চয়ই একই রকমভাবে সবাইরে শিখাইতো না। ভালো না লাগলে এই বই তোমার পড়ার দরকার নাই।' 

'আমি তো বলি নাই যে ভাল্লাগে নাই।' মার্জি দ্রুত বললো। সে এই মজার স্কুলের ব্যাপারে আরও জানতে চায়। 

তারা বইটা অর্ধেকের মতো শেষ করছে এমন সময় আম্মু ডাক দিলো, 'মার্জি! স্কুল!' 

মার্জি ঘড়ির দিকে তাকাইলো। 'এখনও না, আম্মু।' 

'এখনই।' মিসেস জোনস বললেন, 'টমিরও মনে হয় সময় হইছে।' 

মার্জি টমিরে বললো, ‘স্কুল শেষে আমি বইটা তোমার সাথে আরও পড়তে পারি?' 

'হয়তো।' উদাসীন ভঙ্গিতে বললো টমি। শিস বাজাইতে বাজাতে বইটা নিয়া অন্য রুমে গেলো।

অলংকরণ: মুবতাসিম আলভী

মার্জি স্কুলরুমে আসলো। বেডরুমের পাশেই স্কুলরুম। যান্ত্রিক শিক্ষক চালু করাই ছিলো, মার্জির জন্যেই ওয়েট করতেছিলো। শনি আর রবিবার ছাড়া প্রতিদিনই এই সময় এইভাবেই চলে। আম্মু বলছে, নিয়মিত নির্দিষ্ট সময়ে শিখলে শিশুরা ভালো শিখতে পারে। 

স্ক্রিনে আলো জ্বলে উঠলো। স্ক্রিনে ভেসে উঠলো: 'আজকের পাটিগণিত ক্লাসের বিষয়: প্রকৃত ভগ্নাংশের যোগ। প্লিজ, গতকালের হোমওয়ার্ক নির্দিষ্ট ফোল্ডারে রেখে দাও।' 

মার্জি দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাজটা করলো। তার দাদুর দাদুর শৈশবের সেই স্কুলের কথা মনে পড়লো। এলাকার সকল শিশুরা আসতো, হাসতো, স্কুলে বইসা চিল্লাইতো৷ ক্লাসে একসাথে বসতো, দিন শেষে একসাথে বাড়ি ফিরতো। তারা সবাই একই জিনিস শিখতো বলে হোমওয়ার্কে পরস্পর সাহায্য করতে পারতো, কথা বলতে পারতো। 

এবং শিক্ষকরাও ছিলো রক্তমাংসের মানুষ... 

যান্ত্রিক শিক্ষকের উপস্থিতি স্ক্রিনে দেখা গেলো: 'আমরা ভগ্নাংশ ১/২ এবং ১/৪ যোগ করলে...' 

মার্জির মনে হইলো আগের দিনের শিশুরা নিশ্চয়ই খুব আনন্দ করতো। মার্জির সেই শিশুদের সমস্ত প্রকার মজা কল্পনা করতে চেষ্টা করলো।  

['দ্য ফান দে হ্যাড' গল্পটা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৫১ সালে একটি শিশুতোষ সাহিত্য পত্রিকায়। পরবর্তীতে সায়েন্স ফিকশন ও ফ্যান্টাসি ম্যাগাজিনে। আসিমভের বিখ্যাত এই গল্পটা আমেরিকায় স্কুলগুলোতে পাঠ্য। এখন এই করোনাকালে গল্পটা নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়া উঠলো] 

৪৯৫ পঠিত ... ২৩:১৯, মে ০২, ২০২০

আরও

 

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top