চা-ছরমিকরা খালি গরিব না, বান্ধা-গোলাম

২৬০ পঠিত ... ১৭:২২, আগস্ট ২৯, ২০২২

Cha-sromik

আমরা যখন ভার্সিটিতে ২ টাকা দিয়া চা খাই, তখন শুনতাম শেরাটনে চা'র দাম ৫০ টাকা। আমরা হাসাহাসি করতাম ৫০ টাকা দিয়া কী চা খায় অরা! কেন খায়! কারা অরা!

গত বছরেও যখন ৫ টাকা দিয়া চা খাওয়া যাইতো তখন শুনলাম গুলশানে এক চা'র দোকান হইছে, সবচেয়ে কমদামি চা'র দাম নাকি ৫০০ টাকা! আমার কয়েকজন কলিগ হাসতেছিলো, এইটা বইলা। তখন আর হাসি আসে নাই আমার তত একটা।

কারণ, ব্যাপারটা কিছুটা বুঝতে পারি, টের পাই এখন। মানে, এইটা তো চা'র দাম না, বা স্ট্যাটাসের দামও না, বরং একটা গ্রুপ অফ পিপলের এন্ট্রি রেস্ট্রিক্ট করা! শেরাটনে চা'র দাম যদি ১০০ টাকাও রাখে ফহিন্নি মিডল-ক্লাস চইলা আসবে না তখন চা খাইতে! ক্লাস কি মেইনটেইন করা যাবে! এই কারণে ২৫-৩০ গুণ ডিফারেন্স রাখতে হবে প্রাইসের।

প্রাইস ডিফারেন্সের এই নিয়মটা অন্য অনেক জায়গাতেও খাটে। যেমন ধরেন, চা-ছরমিকদের মজুরি ১২০ টাকা থিকা ৩০০ টাকা করলে মুনাফা'তে বড় রকমের হেরফের হবে, এইটা আমার মনে হয় না। মানে, চা'র দাম বাড়ায়া এর চাইতে বেশি টাকা প্রফিট করা যাবে, এই ইস্যুরে কেপিটালাইজ কইরা।

কিন্তু মুশকিলটা হইতেছে, গরিবগুলার তো ডানা গজায়া যাবে! এরা তো টাকা জমানো শুরু করতে পারবে, কিছু টাকা জমায়া ঢাকা-চিটাগাং যাওয়ার বাস-ভাড়া ম্যানেজ কইরা ‘পালায়া’ যাইতে পারবে। ২/৩ মাস থাকা-চলার ব্যবস্থা করতে পারলে অন্য গোলামি শুরু কইরা দিতে পারবে। এরা তো বান্ধা-গোলাম হয়া থাকবে না!  

আর অন্য ইন্ডাস্ট্রি থিকাও লোক ধইরা নিয়া আসা যাবে না, যেহেতু মজুরি সিগনিফিকেন্টলি কম হবে, বাড়ানোর পরেও। তার চাইতে বড় কথা হইতেছে, চা-বাগানের যেই ফরম্যাট'টা অইখানে রেসিডেন্ট-লেবার দরকার, যেইটা ভাইঙ্গা গেলে, মানে, কেউ পেটে-ভাতে থাকতে রাজি না হইলে সিস্টেমটা এইভাবে আর কাজ করবে না। এইটা হইতেছে মুশকিলটা।

এইটা আরো ভালোভাবে বুঝতে পারবেন, বাসা-বাড়িতে কাজের লোক না-পাওয়ার ভিতর দিয়া। এইটা শুরু হইছে গার্মেন্টস শুরু হওয়ার পরে। আগে বাসায় থাকতে-খাইতে দিলে, পরার কাপড় আর বছরে দুইবার বাড়ি যাওয়ার সময় কিছু টাকা দিলেই 'লোক' পাওয়া যাইতো।

কিন্তু গার্মেন্টস হওয়ার পরে সবাই গার্মেন্টেসে চইলা যায়। গার্মেন্টেসে যে খুব শান্তি… তা না, কিন্তু সিস্টেমটাই আলাদা। গার্মেন্টেসে টাকা পাওয়া যায়, বাসা-বাড়িতে আগে যেইটা দিতো না। এখন দিলেও 'লোক' পাওয়া যায় না, কারণ খালি টাকা-পয়সা না, বেসিক ফ্রিডমটাই  ছিল না অইখানে। আপনি ২৪ ঘণ্টার গোলাম। গার্মেন্টেসে ১২-১৪ ঘণ্টা ফ্যাক্টরিতে থাকলেও বাকি একটা সময় আপনার। যেই কারণে যেই মানুশ একবার গার্মেন্টেসে কাজ করছে শে বাসা-বাড়ির কাজে ফিরতে চাইবে না আবার। ফিরলেও 'ছুটা বুয়া' হিসাবে থাকবে, বাসায় থাকবে না। মানে, মিনিমাম কোন উপায় থাকলে বাঁইচা থাকার, ২৪ ঘন্টার গোলামিতে ফিরা আসতে চাইবে না কেউ।

টাকা-পয়সা তো আছেই, ফ্রিডমের জায়গাটাও এইখানে বড় ফ্যাক্টর। অনেকে দেখবেন হাসাহাসি করে যে, বু্য়ারা শর্ত দিতো আগে যে, "টিভি দেখতে দিতে হবে"; এখন মনেহয় বলে যে, "মোবাইল ইউজ করতে দিতে হবে"... তো, এইগুলা হইতেছে, ফ্রিডমের স্পেইসগুলা অনেকটা।

এই জায়গাটারে আন্ডারমাইন করার ঘটনাটা মিডল-ক্লাস ইন্টেলেকচুয়ালিটিতে, ক্লাস-হেইট্রেটের জায়গা থিকাই ঘটে বইলা মনেহয় আমার কাছে।

 

২.

তো, চা-ছরমিকদের মজুরি তাইলে বাড়ানো যাবে না?  

না, আমার কথা হইতেছে, চা-বাগানের মালিকরা যেইভাবে জিনিসটারে চালাইতেছে, সেইখানে অরা ছাড় দিবে না, নানান ইকনোমিক অ্যানালাসিস দেখাবে, ধানাই-পানাই করবে, এবং এমন কিছু জিনিস প্রপোজ করবে যাতে কইরা বান্ধা-ছরমিক পাইতে পারে সবসময়ের জন্য।

এইটা অন্য কেউ জানেন না, এইটা আমার মনে হয় না, তারপরও এই জায়গাটারে ওভারলুক করা হবে। বলা হবে, আজাইরা কথা এইগুলা! মিডলক্লাস ইন্টেলেকচুয়ালরাও কম ইন্টারেস্ট দেখানোর কথা, এইরকম বেসিক জায়গাগুলাতে। অথচ এই জিনিসগুলা তো আমাদের চোখের সামনেই ঘটতেছে। নিজেদেরকে যে দেখতে রাজি করাইতে পারতেছি না আমরা,  এইটারেই একটা বড় মুসিবত মনেহয় আমার কাছে।

২৬০ পঠিত ... ১৭:২২, আগস্ট ২৯, ২০২২

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top