ঢাইকা ঢুইকা রাহো

৪৮৫ পঠিত ... ১৮:২৮, মে ২১, ২০২২

Dhaika-dhuika-raho

নর শিং ডিহি; এক রহস্যময় দীঘি। এই দীঘি নিয়ে অনেক উপকথা প্রচলিত আছে। বলা হয় এই জনপদের ঠগীদের অত্যাচারে অতিষ্ট ছিলো সাধারণ মানুষ। ঠগীরা রুমালের ফাঁসে হাটুরেদের মাল ছিনতাই করতো। তারপর রুমালের ফাঁসে মৃতদের গুম করে দিতো এই নর শিং ডিহিতে। শিশুদের মানা ছিলো এলাকার দীঘির ওপাশটাতে যেতে। শিশুদের ভয় দেখানো হতো, ঘুমিয়ে পড়ো, নইলে নর শিং ডিহির ভূত এসে তোমার ঘাড় মটকে দেবে।

ঠগীদের মধ্যে গণতান্ত্রিক উপায়ে ঠগী সম্রাট নির্বাচিত হয়েছিলো নর শিং ডিহিতে। সেই দিক থেকে নর শিং ডিহিই পৃথিবীর আদিতম গণতন্ত্রের পীঠস্থান। তবে এই গণতন্ত্রে ভোট দেবার অধিকার ছিলো কেবল ঠগীদের। সাধারণ মানুষ রুমালের ফাঁসের ভয়ে আর রহস্যময় দীঘির ওপর ভাসমান নৌকায় আয়োজিত ভোটাভুটিতে যেতো না।

পুরুষ ঠগীদের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে নারী শিং ঢিহি নামে আরেকটি দীঘি খনন করে পাপিয়া নামের এক মহাপরাক্রম নারী। সে লাঠি হাতে দীঘির মাঝখানের বজরায় বসে থাকতো। তারপাশে নৃত্য করতো অপরুপ লালপরী-নীলপরী। পাপিয়ার স্বপ্নপুরীর গল্প মুখে মুখে প্রচার হলে; ঠগীরা দলে দলে গিয়ে পাপিয়া দীঘিতে আত্মাহুতি দিতে শুরু করে।

ঠগীরা সবসময় মালামাল চুরি করে এনে বলতো, ঢাইকা ঢুইকা রাহো। এই মুদ্রাদোষটি নর শিং ডিহির জনমানুষের মুখে মুখে প্রচলিত ছিলো।

একদিন এক আধ্যাত্মিক গুরুর আগমন ঘটে নর শিং ঢিহিতে। তিনি সবাইকে এমন কথায় কথায় "ঢাইকা ঢুইকা রাহো" বলতে দেখে; ঠগী সম্রাটকে গিয়ে বলে, হে গণতন্ত্রের আলেয়ার আলো, এ যুগে আর চুরির মালামাল ঢেকে রাখার দরকার নাই। ঢাইকা ঢুইকা রাখা দরকার লালপরী নীলপরীরে। ঠগীবীরেরা এইভাবে পাপিয়া ডিহিতে আত্মাহুতি দিয়ে মজনু হয়ে গেলে; উন্নয়নের ধারাপাত পাঠ করার উপযুক্ত বীর খুঁজে পাওয়া যাবে না। নারী হচ্ছে তেঁতুলের মতো, ঢেকে না রাখলে তা দেখে ঋষিরও ধ্যান ভঙ্গ হয়।

নর শিং ডিহির ঠগী সম্রাটের এলান আসে, মহিলারা শুধু মহলে থাকুন, আর ঢাইকা ঢুইকা রাখুন।

নীল-পরী, লাল-পরীর রুপে মাতোয়ারা হয়ে যে স্বামীরা গৃহত্যাগী পাপিয়ান্ন্যাসী হয়েছিলো; তাদের স্ত্রীরা অত্যন্ত খুশি হয় সম্রাটের এই সিদ্ধান্তে।

নরশিংডিহির পাতকুয়ার পাড়ে, ঢাইকা ঢুইকা রাখা নারীসমাজ তাদের উকুন তোলার আসরে, নীল পরী ও লালপরীর চরিত্র কতো খারাপ; আর ঠগী ও তাদের স্ত্রীরা কত সাধু তা নিয়ে প্রবল গর্ব আলোচনা শুরু করে।

স্ত্রীরা সত্যম শিবম সুন্দরমের জিনাত আমানের মতো, পোড়ামুখ ঘোমটা দিয়ে ঢেকে; স্বামীর হৃদয়ে দোলা দিতে চায়। কিন্তু মিনসেদের মন পায়না কিছুতেই।

ঠগী মিনসেরা হতাশা প্রশমনে আধ্যাত্মিক গুরুর সঙ্গে দেখা করতে গেলে, তিনি সান্ত্বনা দেন, বেহেশতে ৭২ হুর ও উর্বশী অপেক্ষা করছে। তাদের পেতে চাইলে পাপিয়ার আইটেম নম্বর দেখা বন্ধ করতে হয়; উহাতে গুনাহ হয়।

এক গোবেচারা ঠগী জিজ্ঞেস করে, মালামাল চুরিতে কী গুনাহ হয় না!

আধ্যাত্মিক গুরু ভেবে বলে, মাথা পিছু একটা করে মডেল ধর্মশালা বানানো মানে বেহেশতে ঘর নির্মাণ। তাতে গুনাহক্ষয় হয়।

নর শিং ঢিহিতে শুরু হয়ে যায়, মডেল ধর্মশালা নির্মাণ। চুরির পয়সায় নির্মিত ধর্মশালাগুলো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে নৈতিকতার আলাপে। ঠগী সম্রাট তখন বলেন, এখন হইতে নরশিংডিহি ধর্মশালাদের সনদের আলোকে চলবে।

পাপিয়া ডিঁহিতে বসানো হয়, সংরক্ষিত মহিলা আসনে ঠগীর স্ত্রীদের নিয়ে আরেক ধর্মসভা। আগে যেইখানে লালপরী নীরপরী নাচতো; এখন সেইখানে মাতম চলে অত্যন্ত সততা আর পবিত্রতার। শুদ্ধতার আবেশে আলুথালু হয় ঠগী সমাজ।

"ঢাইকা ঢুইকা রাহো" শ্লোগান নিয়ে ঠগীর বউরা একটি সামাজিক আন্দোলন  শুরু করে। কোন নারী ঢাইকা ঢুইকা পথে বের নাহলে, সে দৃশ্য দেখলে ঠগী ও তাদের স্ত্রীর মাথায় হঠাত শিং গজিয়ে যায়; ঢাইকা ঢুইকা না রাখা নারীকে শিং দিয়ে গুতা দেয় ঠগী; আর ঠগীর স্ত্রী বলে, ঐ জাহান্নামি নারী, শালীন পোষাক পরো না ক্যান!

৪৮৫ পঠিত ... ১৮:২৮, মে ২১, ২০২২

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top