উন্নয়নে টেকাস্তান: টাকা দিবসের বিশেষ রচনা

৩৪৪ পঠিত ... ১৯:০৬, মার্চ ০৪, ২০২১

taka dibosh

টেকাস্তানের টাকশাল উপচে টেকাটুকার নহর বইছে। উন্নয়নের সূচক পরিমাপে বেরিয়ে আসে, আগে যারা তিরিশ টাকায় মাথার ঘনচুল কাটাতো; এখন তারা চুলের সামান্য আভাস কেবল সেটিং করাতে পাঁচতারা হোটেলে যায়। চুলের আভাস কাটার জন্য তিরিশ ডলার খরচে সমস্যা নেই তাদের। টেকার খনির শ্রমিকেরা দেশে-বিদেশে কাজ করে টেকাস্তানের টাকশালে টাকা উপচে দেয়; আর টেকা-ঠিকাদারেরা সেই উপচে পড়া টেকা দিয়ে টাক ঢাকে পাঁচতারা হোটেলে।

সেখান থেকে তাদের যেতে হয় টেকা-ক্লাবে। নাগরিক সমাজের যাদের নতুন টেকাটুকা হয়েছে তারা এখন ক্লাবিং করে। জিডিপি গ্রোথের সোনার কাঠি রুপার কাঠি সেলিব্রেশান হয় টেকা ক্লাবে। সেখানে সাংবাদিক আসে, পুলিশ আসে, ব্যবসায়ী আসে, লেখক আসে নীতি নির্ধারক টাকঢাকা ভাইয়াদের সঙ্গে সেলফি তুলতে। সোশালাইটস আছে কতিপয় যারা নারী অধিকারের দোকানদারি করে তারা নানা লাস্যে টেকা-ক্লাবের উঠতি সাঁঝগুলোকে আরো তারা ঝলমলে করে তোলে। স্যার স্যার, ভাইয়া ভাইয়া ওমকারে ধামাধরাব্রতের নহর তৈরি হয়ে যায়। টাকঢাকা ভাইয়ার মন আকুলি বিকুলি করে। এ যে স্বর্গসুখ।

টেকাস্তানে রাজন্যবর্গ সিদ্ধান্ত নেয় রাজকর্মচারীদের উতসবভাতা দেবে। এতে সৎ রাজকর্মচারীদের চিত্ত প্রশান্ত থাকবে। আর অসত রাজকর্মচারীদের জন্য এটাকা একরাতের ফূর্তিফার্তার খরচ। তাই তাদেরকে আরো বড় বড় প্রকল্পে জামাই আদরে রাখা হয় “সাত খুন মাফ” করে দিয়ে।

কিন্তু এই উৎসবটাকে নিয়ে একদম খুশী নয় টেকাস্তানের ওলামাবর্গ। তাদের একদফা একদাবী; নারী তুই শুধুই বিবি; সবসময় ঘোমটা দিবি; আর সারাক্ষণ ঘরে থাকবি। আর ওলামাবর্গ মনে করে এই উতসবটার কোন দরকার নাই। বিভিন্ন জায়গায় শুধু ওরস হবে; মাইক লাগিয়ে যেইসব নারী মেহরাম ছাড়া বাইরে ঘোরাঘুরি করে; তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করাই হবে একমাত্র তাহরুশ উতসব।

টেকাস্তানের ওলামাবর্গ এই কাজ প্রায় চারদশক ধরে করে চলেছে। তারা যেহেতু ধর্মের ঠিকাদার; তাদের কাজ হচ্ছে আল্লাহর ভীতি রচনা। একারণে প্রচ্ছন্নভাবে তাদের কাজ অপরাধী তৈরি করা। অপরাধী তৈরি করা খুবই সহজ। ছেলে-মেয়েরা আলাদা স্কুলে পড়ে; সব সময় আলাদা থাকে। বিবাহ অনুষ্ঠানে নারী-পুরুষ আলাদা আলাদা স্থানে বোরহানী দিয়া বিরিয়ানী ভক্ষণ করে। এইরকম আলাদা আলাদা থাকার সমাজপ্রথা তৈরি করে দিলে স্বাভাবিকভাবেই নারী-পুরুষের লুকিয়ে লুকিয়ে লিটনের ফ্ল্যাটে দেখা করার হার বাড়ে। লিটনের ফ্ল্যাট থেকে ফিরেই নারী এবং পুরুষ অপরাধ বোধে ভুগে। তখন ধর্মের ঠিকাদারদের দুজন অপরাধী কাস্টমার তৈরি হয়। মসজিদে নামাজ আদায়ের সময় অপরাধী পুরুষ কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। হুজুর এসে মাথায় দোয়া পড়ে ফুঁ দিলেই; অপরাধী পকেটে যা আছে সব টেকাটুকা হুজুরকে দিয়ে দেয় পাপ স্খলনের জন্য।

আর অপরাধী নারী সেও দানবাক্স দেখলে টেকাটুকা ব্যাগে যা আছে তা সমর্পণ করে। দানবাক্সের মালিক হুজুর এতিম খানার বাচ্চাদের আধপেটা ডালভাত দিয়ে নিজে মোরগা মোসাল্লাম চিবিয়ে নধর গোলগাল হয়ে ওঠে। টেকাস্তানের এ এক অপূর্ব ব্যবসা। আল্লাহর ভয়ে সে ব্যবসা বন্ধের সাহস স্বয়ং টেকার রাণীর দেশের রাজন্যবর্গ, অমাত্যবর্গও করে না। কারণ তাদেরও তো অপরাধ কম হয়নি জীবনে; তাদের শাসনামলে “উন্নয়নের জন্য গুলি” প্রকল্পে যতজন গরীব টেকাহীন মানুষ মরে; ততহাজার গুণাহ তাদের একাউন্টে জমা হয়। ফলে তারাও নামাজের সময় কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। এলাকায় মসজিদ নির্মাণ করে। হুজুর আশ্বাস দেয়, দুনিয়াবি কর্ম ফেলিয়া যারা আল্লাহর ঘর নির্মাণ করে; আল্লাহ তাহাদিগের জন্য বেহেশতে একখানি সুরম্য গৃহ নির্মাণ করেন।

হুজুরদের ডিজাইন অনুযায়ী ঐ যে নারী-পুরুষ আলাদা আলাদা থাকার যে ফতোয়া জারী হয়; তাতে তৈরি হয় আরো ভয়ংকর অপরাধী। নারীদের সাহসী কেউ কেউ রীতিমত আইএস সন্ত্রাসী গ্রুপের যৌন জিহাদে চলে যায়। আর পুরুষদের মধ্যে সাহসীরা হয়ে পড়ে ধর্ষক। নারী দেখলেই তাদের মধ্যে পাপিস্তানের বিনকাসিম মাথাচাড়া দেয়। অন্যসম্প্রদায়ের নারী কগণিমতের সামগ্রী একথা হুজুর ময়না পাখির মতো সুর করে বলেছেন। সুতরাং পাপিস্তানের মতো টেকাস্তানেও শুরু হয়ে যায় গণিমতের তনুশ্রী ধর্ষণ। আর ১৮০০ শতকের বিটিস্তানের আইনে ধর্ষণ প্রমাণ প্রায় অসম্ভব। কারণ ময়না পাখি তদন্তে হুজুরের আছর ও টেকাটুকার খেলা তো আছেই। ফলে টেকাস্তানে ধর্ষণের মড়ক লাগে। রাষ্ট্র রাজন্য বলেন, একটা-দুইটা ধর্ষণে আইন-শৃংখলা খারাপ হয়ে গেছে সে কথা বলা ঠিক নয়।

দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে টেকাস্তানের ধর্মের ঠিকাদাররা পাপিস্তানের “বিটুইন মস্ক এন্ড মিলিটারি ” মডেল বাস্তবায়ন করে ফেলে। এতে করে টেকাস্তানের মিলিটারিরা পাপিস্তানের মিলিটারিদের মত ক্ষমতায়-শান-শওকতে-ব্যবসায়-ঠিকাদারিতে সমতা আনে এবং সেইসব অপরাধবশতঃ নামাজের সময় কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। টেকাস্তানের “পাহাড়ে পাপিস্তান” মডেল বাস্তবায়নের পর তাদের ধমক ও ধর্ম-কর্ম বেড়ে যায়। গোটা টেকাস্তানের মত জলপাইবাগানে নারীর মৃত তনু পাওয়া গেলে; ঘন ঘন ময়না পাখী তদন্তে বেরিয়ে আসে, এ নিশ্চয়ই জ্বিন-ভুতের কারসাজি। আর এইসব ময়না পাখী তদন্তের প্রতিবাদ যারা করে, তাদের মৃত তনু পাওয়া যায় গুমগঞ্জের খালে। সেই প্রতিবাদী মৃত তনুর ময়না পাখী তদন্তে আবারো বেরিয়ে আসে জ্বিনভুতের কারসাজি। এইসময় সক্রিয় থাকে সত্যকে “ধামাচাপার বিনিময়ে খাদ্য” (ধাবিখা) প্রকল্পের ধামাচাপাজীবীরা।

ওদিকে টেকাস্তানকে দ্রুত সিঙ্গাস্তানের মত ঝলমলে করতে গেলে দরকার অনেক আলোকসজ্জা। তাই বিদ্যুৎ উতপাদনের জন্য টেকা রাণীর দেশের টেকার খনির কৃষক-শ্রমিকদের বাস্তুভিটা থেকে উচ্ছেদ চলতে থাকে। জ্বিন-ভুতের গুলি খেয়ে মানুষ মরতে থাকে। কিন্তু এর প্রতিবাদ করবে কে! সাংবাদিক-লেখক-পুলিশ সবাইতো টেকাক্লাবে টাকঢাকা রাজন্যভাইয়ার সঙ্গে উন্নয়নের আনন্দে মাতোয়ারা। টাক-ঢাকা ভাইয়া বলেন, উন্নয়নের জন্য জীবন উতসর্গ করতে হয়; দেয়ার ইজ নো শর্টকাট টু সাকসেস।

এক সাংবাদিক প্রশ্ন করে, নেদারস্তান বা ডয়েচস্তানের মত সবুজ বিদ্যুৎ ও জ্বালানী মডেল অনুসরণ না করে আমরা কেন গোমাতাস্তানের মত কয়লা পোড়ানো মডেল অনুসরণ করছি; গোমাতাস্তানের নাগরিক সমাজ তো খুবই অখুশী এসব পরিবেশ বিনাশী কর্মকান্ডে।

টাক-ঢাকা ভাইয়া ধমকের সুরে বলে, আপনি মনে হচ্ছে স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি; উন্নয়নকে বাধা দিবেন না।

টেকাস্তানের ঐ এক অসুবিধা। ধামাচাপাজীবীরা দেশপ্রেমের ঠিকাদারিটাও নিয়ে রেখেছে ক্ষমতা হুজুরদের মতো। তারা যা কিছুই করবে তাতে বলতে হবে, হুজুরের মতে অমত কার।
টেকাস্তানের লুন্ঠন-ধর্ষণ-গুম-অন্যসম্প্রদায়ের মানুষের উচ্ছেদ সব কিছু চলছে পাপিস্তান স্টাইলে। কিন্তু এর প্রতিবাদ করলেই দেশপ্রেম সমিতির চোরের বাপের বড় গলা এসে গালাগাল দেয়, উন্নয়নে চক্ষু টাটাইতেছে; পাপিস্তানের দালাল কুনহানকার।

আবার ধর্মপ্রেম নিয়ন্ত্রণ সমিতির চাপাতি চালনা, সাম্প্রদায়িক উস্কানি বা উতসবে নারীর উপস্থিতির বিরুদ্ধে ফতোয়া জারির বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হলেই খুনীর বাপের বড়গলা এসে গালাগাল দেয়, নাশতেক কুনহানকার; মুনে কয় গোমাতাস্তানের দালাল।

ফলে টেকাস্তানে যে গুটিকতক প্রতিবাদী মানুষ আছে; 'তাদের কন্ঠ রুদ্ধ হয়; হয় বাঁশী সংগীত হারা; লুপ্ত হয় তাদের জীবন দুঃস্বপনের তলে।'

টেকাস্তানের টেকাবিপ্লবের ফলে আগে যারা সবুজ লুঙ্গি পরতো; তারাই স্যুট পরে সবুজ লুঙ্গি পরা উপায়হীন মানুষের জীবন-মৃত্যুর সওদাগর হয়ে যাচ্ছে বিশ হাজার টাকার আপসরফায়। আগে যারা দাঁতপাড় শাড়ী পরতো; তারাই এখন জামদানী পরে দাঁতপাড়ের কাপড় পরা দরিদ্র গৃহকর্মী বা সেলাই দাসের জীবন মৃত্যুর সওদা করছে দশহাজার টাকার আপসরফায়। দলিতের ছেলে রাজকর্মচারী হয়ে কোথায় দলিতের অধিকারের পক্ষে কাজ করবে; তা না সে “স্যার” হয়ে যাচ্ছে বিটিস্তানের বা পাপিস্তানের শোষক ও ঘাতকদের মতো। এবং অপরাধ অস্বীকার ও ধমকের একই ভাইরাস নিও এলিট “স্যার”দের ও “ম্যাডাম”দের।

চারিদিকে যখন উপায়হীন মানুষের মৃত্যুর মিছিল চলছে; তখন ধামাজীবীরা একটি পরিসংখ্যান নিয়ে হাজির করে। টেকাস্তানের ৭৩ শতাংশ মানুষ মনে করে টেকাস্তান সঠিক পথেই চলছে।

দেশপ্রেম নিয়ন্ত্রণ সমিতির হুজুরেরা মারহাবা মারহাবা রব তোলে।

আরেকটি পরিসংখ্যানে কালো বেড়াল বেরিয়ে আসে।
টেকাস্তানের ২৬ শতাংশ মানুষ জিহাদী জোশে আত্মঘাতী বোমাহামলা সমর্থন করে।
ধর্মপ্রেম নিয়ন্ত্রণ সমিতির ওলামাবর্গ মারহাবা মারহাবা রব তোলে।

বাকী এক শতাংশ মানুষ ক্ষীণকন্ঠে শেষকৃত্য সংগীত গায়-
টেকাই জীবন টেকাই মরণ
শুধুই টেকার খেলা
টেকাস্তানের জ্যাল-হাজতে
ক্যান যে ফাটক দিলা!

৩৪৪ পঠিত ... ১৯:০৬, মার্চ ০৪, ২০২১

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top