কুকুরমুক্ত না করে শহরটা যে কারণে মানুষমুক্ত করা প্রয়োজন

৪০৩৬ পঠিত ... ০৫:২৫, সেপ্টেম্বর ০৪, ২০২০

 

দিকে দিকে কুকুরের প্রশংসা ছড়িয়ে পড়েছে। করোনাকালে কুকুরেরা শৃংখলা মেনে চলেছে। কোথাও সোশ্যাল ডিসটেন্স রেখে দাঁড়ানোর সাদা বৃত্ত দেখলে সেখানে দাঁড়িয়েছে নিয়ম মেনে। বাবা-মা করোনা আক্রান্ত হলে; ছেলে-ছেলের বউ, মেয়ে-জামাই তাদের ছেড়ে গেছে; কিন্তু কুকুর পাশে থেকেছে সারাক্ষণ।
কুকুর সে গৃহপালিতই হোক কিংবা গৃহহীন হোক; তার সততা-শৃংখলা-নিষ্ঠা একইরকম। করোনাকালে লক ডাউনের সময় চোরের উপদ্রব কমাতে তারা অতন্দ্র পাহারা দিয়েছে পাড়া-মহল্লা। চোরেরা খুব ক্ষিপ্ত এই চুরির মৌসুমটি কুকুরদের কারণে বৃথা যাওয়াতে।

দুর্নীতির দায়ে বারো-রকম মানুষ ধরা পড়ার কালে; করোনার কষ্টের সময়ে মানুষের স্বার্থপরতা আরো স্পষ্ট হলে; অনেক প্রাজ্ঞ মানুষই সমস্বরে বলেন, এই কুকুরকে ট্রেনিং দিয়ে বিভিন্ন দায়িত্বে রাখলে দেশটা বোধ হয় ভালো চলতো। কুকুরের শুধু বুদ্ধি আছে; আর মানুষের বুদ্ধি বলতে আছে কেবল কুবুদ্ধি।
এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক বন্ধুদের আড্ডায় বলেন, 'কত কষ্ট করে ছেলে-মেয়ে মানুষ করলাম; তারা দূরে চলে গেলো; আর অবহেলায় বেড়ে ওঠা কুকুরটাই রয়ে গেলো কাছে; মানব সন্তানের চেয়ে কুকুরই ভালো।'

আরেক বৃদ্ধ উত্তর দেন, 'মহল্লার কুকুরগুলো কত দায়িত্ব নিয়ে এলাকা পাহারা দেয় রাতে। এদের কাজ করানোর জন্য কোন ঘুষ দিতে হয় না। আমি তো বলি; কুকুরের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হোক। মানুষের শিক্ষার পেছনে কাড়ি কাড়ি টাকা ঢেলে লাভ কী হলো! এরা চোর-ডাকাত-খুনি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলো।'

কুকুরের এমন প্রশংসা শুনে অনেক মানুষ রীতিমত হিংসা করতে শুরু করে। সরকারি ও সওদাগরি অফিসের কেরানিরা একটা আশংকা বোধ করে। চাকরির বাজারটা কুকুরের কারণে হাতছাড়া হয়ে না যায় আবার। কুকুর ঘুষ খায় না, ক্ষমতার অপব্যবহার করে না, মানুষ খুন করে না; সুতরাং তাকে চাকরি বাজার লুফে নেবে এমন একটা গুঞ্জন তৈরি হয় চারপাশে।

দলীয় কর্মীরা আরো চিন্তায় পড়ে যায়। কুকুর সতত প্রভুভক্ত; বিশ্বাসঘাতকতা তাদের রক্তে নেই। ফলে দলীয় কর্মী হিসেবে কুকুর যদি প্রবীণ নেতা-নেত্রীদের কাছে বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়; তাহলে তো আর গলি থেকে রাজপথে গিয়ে চাঁদা তুলে রাজপ্রাসাদ গড়ার সুযোগ থাকছে না। দলীয় কর্মীরা মানুষের বিরুদ্ধে কুকুরের 'ষড়যন্ত্র' রুখে দিতে অনুরোধ জানায় তাদের নগর নেতাকে।

ফেসবুকে দু'একটি পোস্ট দেখা যায়। এক তরুণী লিখেছে, প্রতারক প্রেমিক চলে গিয়ে ভেবেছিলো আমি বুঝি একা হয়ে যাবো। কিন্তু এইতো দিব্যি আছি আমার বন্ধুটিকে নিয়ে। ছবিতে দেখা যায়, মেয়েটি পার্কের বেঞ্চে বসে বই পড়ছে; আর একটি কুকুর সে বইপড়া দেখছে শান্ত ভাবে।

এক তরুণ একটি কুকুরের পাশে বসে ফেসবুকিং করছে; এমন একটি ছবি দিয়ে লিখেছে, 'আমি মানুষ চিনতে করেছিলাম ভুল; দরকার কী ওসব দম দেয়া পুতুল। এই বেশ ভালো আছি নতুন বন্ধু নিয়ে।'

শিশুরাও কুকুরদের দিকে টেনিস বল ছুঁড়ে দিয়ে হাসি-আনন্দে-খেলায় সময় কাটাতে থাকে। করোনাকালে বন্ধুহীনতার কষ্ট আর তাদের স্পর্শ করে না।
কোন বাসায় স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ঝগড়া হলে একজন আরেকজনকে বলে, মানুষের পাল্লায় পড়ে জীবনটা ঝালাপালা হয়ে গেছে। এরচেয়ে কুকুর নিয়ে আনন্দে দিনযাপনই ভালো।

এক আধ্যাত্মিক লোক ফেসবুক লাইভে একটা কুকুর পাশে নিয়ে বলে, 'ডগ ইজ গড। ঈশ্বরের সকল গুণাবলী কেবল কুকুরের মাঝেই দৃশ্যমান। আমি দুঃখিত মানুষকে আর সৃষ্টির সেরা জীব বলতে পারছিনা। কুকুরই সেরা।'

এটা শুনে খুব ধর্মীয় লোকেরা এর মধ্যে ষড়যন্ত্রের আভাস পায়। তাদের ঝুলিয়ে রাখা দানবাক্সে টেকা-টুকা কমে যাচ্ছে কিনা; সেদিকে খেয়াল রাখে। কুকুরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রকম ফতোয়াদি খুঁজতে থাকে এ লাইনে যারা অভিজ্ঞ তাদের কাছে।

এক হোটেল মালিক স্বগতোক্তি করে, মানুষকে মাটন বলে এতো যে কুকুরের রেজালা খাওয়াইলাম; তবু একটু কুকুরত্বের গুণাবলী অর্জন করতে পারলো না; বড়ই পরিতাপের বিষয়।

সরকার দেশ-ব্যবস্থাপনায় হিমশিম খেয়ে ভাবতে থাকে, চোরের খনির মানুষের চেয়ে কুকুরই যদি শ্রেয় হয়; তাহলে তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বিভিন্ন দায়িত্বে বসিয়ে দেখা যাক; কার পারফরমেন্স ভালো। কুকুর ঘুষ খায়না; বিদেশে টাকা-পাচার করে না, অসহায় মানুষের সামনে স্যার স্যার ভাব নেয় না। জ্যেষ্ঠ নীতি নির্ধারকদের কেউ কেউ বলেন, সামরিক বাহিনীতে কুকুরের ব্যবহার উন্নত দেশে রয়েছে। এমনকি মহাশূন্যের নভোচারী হিসেবেও কুকুর সফল হয়েছে। সুতরাং 'সুশাসনের জন্য কুকুর' প্রকল্প অনুমোদিত হয়। ক্রমে ক্রমে মন্ত্রী-সাংসদ, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, মেয়র, ঠিকাদার, শিক্ষক, সাংবাদিক ইত্যাদি পেশার জন্য তাদের প্রশিক্ষণ দেবার আশা প্রকাশ করা হয়।

চোরের খনির চোরেদের মাথায় বাজ ভেঙ্গে পড়ে। তারা যন্ত্র ঐ একটাই 'ষড়যন্ত্র' ঘাড়ে নিয়ে দৌড়াতে থাকে। কুকুরের বিরুদ্ধে মানববন্ধন হয়। প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে গণপিটুনিতে দক্ষ-বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সমর্থক মানবগোষ্ঠী। 'কুকুরের চামড়া তুলে নেবো আমরা' বলে খেঁকিয়ে ওঠে তারা।

'এ শহরকে কুকুরমুক্ত করুন; মগের মুল্লুক মানুষের জন্য উন্মুক্ত রাখুন' এই শ্লোগান দিতে দিতে কুকুর বিরোধী সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ মেয়র অফিসে গিয়ে স্মারক লিপি দেয়। তাদেরকে অবাক করে দিয়ে স্মারকলিপি গ্রহণ করে এক কুকুর। দুর্নীতির দায়ে চাকরি হারানো লোকেদের জায়গায় কুকুর নিয়োগ করা হয়েছে সেখানে; দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ও দেশ গড়তে।

৪০৩৬ পঠিত ... ০৫:২৫, সেপ্টেম্বর ০৪, ২০২০

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top