বাংলাদেশে করোনা ছড়িয়ে পড়ার আগে-পরে আশার সওদাগরদের বিবর্তন

২৪২৮ পঠিত ... ১৩:৪৪, এপ্রিল ০৭, ২০২০

চীনের উহানে করোনার প্রাদুর্ভাব হতেই; আশার সওদাগরেরা ধেয়ে আসে।

: আমাদের এখানে করোনা কিচ্ছু করতে পারবে না; আমরা ফরমালিন খেয়ে হজম করে ফেলা লোক।

: আমরা ময়লা নর্দমা থেকে ক্রিকেট খেলার টেনিস বল তুলে দুটি ড্রপ দিয়ে খেলা লোক। আমাদের করোনা ভাইরাসের ভয় দেখিও না।

করোনা যেহেতু ভাইরাস; বিষয়টা স্বাস্থ্য সম্পর্কিত; তাই আশার সওদাগর ডাক্তারেরা নেমে আসে ফেসবুক লাইভে।

: আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছি; এই করোনা ভাইরাস আমাদের তল্লাটে এসে দুর্বল হয়ে পড়বে। কারণ আমাদের এখানে তাপমাত্রা অনেক বেশি। বেশি তাপমাত্রায় করোনা বাঁচে না।

অন্ধের হাতি দর্শনের মতো আশার সওদাগর ডাক্তারেরা করোনা দর্শন করতে থাকে।

: আমাদের বিসিজি টিকা দেয়া আছে; আমরা নিরাপদ।

এক হতাশ ডাক্তার প্রশ্ন তোলে, 'ডাক্তারদের পিপিই কোথায়? পিপিই ছাড়া রোগীর দেখভাল করতে গিয়ে আমরা তো মারা পড়বো। সরকার কী করছে!'

আশার সওদাগর ডাক্তারেরা উপহাস করে, 'চীনে করোনা হইলে ভাইরাসের দোষ, ইরানে করোনা হইলে ভাইরাসের দোষ। আর এইদেশে করোনা হইলে সরকারের দোষ।'

এ সময় আশার সওদাগর এক মওলানা সাহেব তার ওয়াজকালে করোনা ভাইরাসের ওষুধ আবিষ্কারের কথা জানায়। একটা ফর্মূলা তুলে ধরে।

করোনায় কিচ্ছু হবে না সে আশায় তবলিগ জামাতের লোকেরা আধ্যাত্মিক করোনা বিনিময় কার্যক্রমে নেমে পড়ে।

রাখে ভগবান মারে কে বলে, পূণ্যস্নানে একত্রিত হয় সনাতনধর্মীরা।

আশার সওদাগর এক ভক্ত করোনা নির্মূলের জন্য পতঞ্জলি গো-অর্ঘ্যকেই সেরা বলে ঘোষণা দেয়।

শিক্ষার আশার সওদাগর সবাইকে জানান, স্কুলে করোনার রোগী ধরা পড়লে তবেই স্কুল বন্ধ হবে।

গার্মেন্টস শিল্প আশার এক সওদাগর বলে, গার্মেন্টস চালু থাকা দরকার; করোনা সিজনে মাস্ক, পিপিই সেলাই করে আমরা করোনা জিডিপি অর্জন করতে পারি।

রেমিট্যান্স আশার সওদাগরেরা করোনা হামলায় ইউরোপের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়তে দেখে ভাবে, যাই আশার দেশে যাই। নিশ্চয়ই সেখানে করোনা ঢুকতে ভয় পাবে। মানুষ তো ফেসবুকেই করোনাকে মেরে ফেলবে।

রেমিটেন্স আশার সওদাগরেরা দেশে ফিরে অন্যবারের মতোই সামাজিকতার আশায় মেতে ওঠে।

স্বাস্থ্য আশার সওদাগর প্রতিদিন সংবাদ সম্মেলন করে বলতে থাকেন, কোথাও করোনা নেই।

অন্ধের করোনা দর্শনে 'হাত ধোয়া', 'হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার', মাস্ক পরা ও সম্ভব হলে পিপিই পরে বসে থাকার অভ্যাসগুলো জায়গা করে নিতে থাকে।

নতুন আশার সওদাগরেরা কোয়ারিন্টিন শব্দটিকে মুখে মেখে নিয়ে হুংকার দিতে থাকে, গরীবকে ডাণ্ডা মেরে ঠাণ্ডা করুন। কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখুন।

পুলিশ ও প্রশাসনের আশার সওদাগরেরা ডাণ্ডা ও কান ধরা কার্যক্রমের মাধ্যমে আশাবরিদের হৃদয় জয়ের চেষ্টা করে।

আশার বড় বড় সওদাগরেরা বলতে থাকেন, আমরা করোনার চেয়ে বেশি শক্তিশালী। ইটালি-ফিটালির চেয়ে আমাদের প্রস্তুতি ভালো।

এর মাঝে এক ভক্তির সওদাগর এসে আশার বাতি জ্বেলে বলে, উনি থাকতে করোনাকে ভয় পাইনা।

করোনা প্রতিরোধে লক ডাউনের নির্দেশ দেবার সময়, যে যেখানেই আছেন সেখানেই থাকুন বলা আর হয়ে ওঠে না। ইদুল করোনার ছুটি ভেবে রাজধানী থেকে গ্রামের দিকে ছুটতে থাকে সবাই।

জিডিপি আশার সওদাগর এসে বোঝায়, রপ্তানীমুখী শিল্প কারখানা খোলা রাখতে হবে। উন্নয়নে শৃঙ্গে আরোহণ করতে হবে এরি মাঝে। কীসের করোনা!

গার্মেন্টস আশার সওদাগর বলে, সাবধানতা অবলম্বন করে কারখানা চালু করা যাবে।

গার্মেন্টসের টেকাটুকার আশার সওদাগরেরা শ্রমিকদের কাজে ফেরার হুকুম দেয়।

লক-ডাউন উপেক্ষা করে শ্রমিকেরা রাজধানীগামী হয়। শ্রমিকেরা আনন্দে গান গাইতে থাকে,
'ও মালিক সারাজীবন কাঁদালে যখন আমায় মেঘ করে দাও
তবু কাঁদতে পারবো পরের দুঃখে অনেক ভাল তাও
মানুষ যেন কোরো না আমায় মেঘ করে দাও।'

শ্রমিকদের ১০০ কিলোমিটার হেঁটে চলার বিষাদ যমুনায় একজন শ্রমিকের ফাটা পা, রাবারের স্যান্ডেল দেখে এক মোটিভেশনাল আশার সওদাগর এসে বলে, ৫০০০ কোটি টাকা প্রণোদনার পা।

গরিব শ্রমিকের দুর্দশা দেখে মানুষ কষ্ট পায়। তারা গুঞ্জন তোলে, বড় লোকের ঢাক তৈরি গরিব লোকের চামড়ায়।

এক গার্মেন্টস মালিক তেড়ে ফুঁড়ে আসে, আমরা শ্রমিক পালি; আমরা খাওয়াই, আপনে যে সমালোচনা করতে আসছেন; আপনি পারবেন শ্রমিক খাওয়াইতে। যত বড় মুখ না তত বড় কথা আপনাগো।

আশার এক সওদাগর এসে সমালোচকদের হুঁশিয়ারী দেয়, 'গুজব ছড়াইলে সাইবার পুলিশকে দিয়ে এরেস্ট করাবো বলে দিলাম। সর্দি-জ্বর-শ্বাসকষ্টে মৃত্যুকে করোনায় মৃত্যু বলে গুজব ছড়াবেন না।'

আশার এক সওদাগর সরকারের করোনা ব্যবস্থাপনায় মুগ্ধ হয়ে বলে, 'আমরাই আমাদের মৃত্যুর জন্য দায়ী। কেউ তো কোন নির্দেশ মানতে চায় না।'

পুলিশ-প্রশাসনের আশার সওদাগরেরা গরীব মানুষের ঘরে সাহায্য পৌঁছে দেয়ার খবর এলে আশার সওদাগরেরা অশ্রুসজল হয়। গাড়ি থেকে গরীব মানুষের দিকে টাকার বান্ডিল ছুঁড়ে দিলে; তারা পিচ ঢালা পথে হুমড়ি খেয়ে পড়ে টাকা কুড়াতে।

এলাকার আশার সওদাগরেরা সাহায্য দেবার জন্য গরিবদের ডেকে পাঠালে আরেক দফা করোনা বিনিময় কার্যক্রম চলে।

মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকলে, আশার সওদাগরেরা কারফিউ দেন কারফিউ দেন বলে মাতম তোলে।

সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব পালন করতে দেখে আশার সওদাগরেরা বলে, এইবার ডাণ্ডা মেরে ঠাণ্ডা করা হোক; আমরা সঙ্গে আছি।

অবস্থা বেগতিক দেখে আশার সওদাগর প্যানিক করতে করতে বলে, 'প্যানিক করবেন না প্লিজ। করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে আমাদের জিততে হবে।'

ওদিকে করোনার কারণে মানুষ ও যন্ত্রদানবের যাতায়াত আর পরিবেশ দূষণ কমে আসায় জীবজগতের বিলুপ্ত উদ্ভিদ ও প্রাণীরা ফিরে আসতে থাকে লোকালয়ে তাদের দখল ফিরে পেতে।

এক আশার সওদাগর চোখ মুখ ফুলিয়ে প্রচন্ড আশাদায়ী ফেসবুক লাইভ করার সময় তার ঘরে ঢুকে পড়ে এক ডাইনোসর। সে দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বলে, এখন কেমন বোধ করছেন সহমত ভাই!

২৪২৮ পঠিত ... ১৩:৪৪, এপ্রিল ০৭, ২০২০

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top