যেভাবে পুরুষ হিসেবে নিজের সঠিক দায়িত্ব পালন করে আমি হলাম 'বউয়ের গোলাম'

৯৭৪ পঠিত ... ১৯:২৬, মার্চ ০৮, ২০২০

সাত সকালে বউয়ের গোলাম বনে যাওয়া কোনো কাজের কথা না!  

কাহিনি শুনতে চাচ্ছেন? সংক্ষেপে বলি। পরিবারে সদস্য সংখ্যা মোট তিনজন। মা-বাবা আর আমি। কলেজ পর্যন্ত গ্রামে ছিলাম। গ্রামে ঘর-বাড়ি ঝাড়ু দেওয়া, কাপড় কাঁচা, শুকাতে দেওয়া মেয়েদের কাজ। কোন বোন নাই। মায়ের সাথে আমার খুব ভালো সখ্য। দেখা গেল সকালে ওঠে মা কোন কাজে গেছে। উঠানটা আমিই ঝাড়ু দেই। মাঝেমধ্যে মনের খুশিতে কাপড়-চোপড় ধুই। প্রথম প্রথম আমাকে কাপড় শুকাতে দেখলে মানুষ এমন ভাব করতো যেন ভূত দেখছে!   

তবে মানুষ প্রশংসাও করতো। ছেলেটা কত্তো ভালো। মায়ের কাজে সাহায্য করে। ছেলে হয়ে উঠান ঝাড়ু দেয়। লক্ষ্মী ছেলে। ছেলেটা ভার্সিটিতে পড়ে অথচ দেখো মা-বাবার কাপড় ধুয়ে দেয়। ভাবা যায়! মা অসুস্থ হলেও চিন্তা নাই। ছেলেটা সব কাজ করে। এরকম ছেলে পাওয়া বিরাট ভাগ্যের ব্যাপার। কপাল লাগে।   

মোদ্দাকথা, পুরো গ্রামে আমার জয়জয়কার। অমুকের মা ছেলে পাইছে একটা। চান কপাল। মহিলাদের চোখে আদর্শ সন্তান আমি। 

 

বিপত্তিটা বাধল বিয়ের পর। বউ নিয়ে বাড়িতে গেছি। বারো ঘন্টার যাত্রার ধাক্কায় কাহিল অবস্থা। রাত্রে কপালে হাত দিয়ে দেখি কপাল পুড়ে যাচ্ছে। জ্বর। সকালে উঠে দেখি মায়েরও জ্বর!

অভ্যাসবশত উঠান ঝাড়ু দিলাম। রান্নাবান্নার কাজে আমি অপটু। ওটা বাবাকে দেখতে বললাম। ফার্মেসীতে যাচ্ছি ওষুধ নিতে। এক চাচীমা বললো, কিরে বাবা, শেষ পর্যন্ত বউয়ের গোলাম হয়ে গেলি! তাজ্জব হয়ে গেলাম। বাড়ি থেকে ফার্মেসি। গোটা পথে সব মহিলার একটাই কথা, এত পড়ালেখা করে কী হলো। হইলা তো সে-ই বউয়ের গোলাম! 

মায়ের কাজে সাহায্য করার জন্য যেই মহিলারা আমাকে প্রশংসায় ভাসিয়ে দিছিল তারাই এবার 'বউয়ের গোলাম' বলে ছি ছি করতে লাগলো। 

সিনিয়র সিটিজনদের ফেসবুক নিয়ে আলাদা বাতিক আছে। যা পায় তা-ই শেয়ার দেয়। রান্না করছি, এরকম একটা ছবি তুলে বাবা ফেসবুকে পোস্ট করেছে।      

এক বন্ধু (গত বছর নারী দিবস উপলক্ষে বউকে নিয়ে স্পেশাল ডিসকাউন্ট অফারের এক রেস্টুরেন্টে খেতে গেছিল) কমেন্ট করেছে, বন্ধু পাঁচটা বছর ভার্সিটিতে একসাথে পড়লাম, তোমার মাঝে যে একজন সুপ্ত 'বউয়ের গোলাম' লুকিয়ে ছিল জানতাম না!

প্রসঙ্গত, ওই রেস্টুরেন্টের ওয়েটার আমাদের পাশের বাড়ির। বলে ভাইজান, বিশ্বাস করবেন না, ওইদিন আপনার ওই বন্ধু আর তার বউ খাইতে আসছিল। ভাবীর হাত থেকে পড়ে একটা গ্লাস ভেঙে গেল। আর যায় কই। ভাই এই যে ধমক শুরু করলো। থামেই না। কী যে বিশ্রী গালিগালাজ। ইংলিশ গাইল তো আমি বুঝিও না। সবাই তাকাই আছে। ভাবীর চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে! শেষমেশ ম্যানেজার গিয়ে থামাইলো। 

কিন্তু আমরা সবাই তো অন্য বিষয় জানি। ফেসবুকে কত সুন্দর পাঁচখানা সেলফি দিছে। রেস্টুরেন্টে নারী দিবস উদযাপন। কত ভালোবাসা, কত সুখ! 

তারা দুজনই আমার বন্ধু-বান্ধবী। বন্ধুর কমেন্ট তো পড়েছি। বান্ধবীকে কল দিলাম। ওই ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিলাম। স্যরিট্যরি বলেছিল? আরে ধুর! তুইও না। ছেলেরা ওরকম রাগী হবেই। স্যরি বলার কী আছে? কিছু গালিগালাজ করছে। ব্যাপার না। বদমেজাজি না হলে ঠিক ম্যানলি ব্যাপারটা আসে না বুঝলি? আর ব্যাটা তুই এটা কী করলি? বউয়ের জ্বর হইছে। তো সমস্যা কী। জ্বর হোক যাই হোক, বউয়ের কাজ বউ করবে। তাই বলে তুই ঝাড়ু দিবি? হায় রে বউয়ের গোলাম! ব্যাটা বউরে একটু শাসনে রাখ। কোনদিন দেখবি তার ইয়েও তোরে পরিষ্কার করতে দিছে! বান্ধবীর 'অশ্লীল' হাসি যেন থামছেই না। 

ঘটনা এখানেই শেষ না। ঢাকায় আমার জন্য আরও চমক অপেক্ষা করছিলো। বন্ধুরা অনেক দিন পর মজা করার মতো একটা ভালো টপিক পেয়েছে। সামনাসামনি সেই মজা না নিলে কী আর স্বাদ মিটে। তাই, পাঁচজন বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু বললো তাঁরা আজ সন্ধ্যায় আমার বাসায় আসবে।

আমার স্ত্রী অফিসের কাজে ঢাকার বাইরে গেছে। আমি বন্ধুদের জন্য নাস্তা বানালাম। বন্ধুরা এটা শুনে বলে, 'সিরিয়াসলি দোস্ত?'

'আরে ভাই, তোদের এতো অবাক হওয়ার কী আছে বুঝি না। আমি তো প্রায়ই ওকে রান্নাবান্নায় হেল্প করি। দুজনই তো অফিস করি। অফডেতে দুজনে মিলে ঘরদোর গোছাই। বাচ্চাকাচ্চার জামা-কাপড় ধুয়ে। আমি তো ওদের কত ডায়াপারও চেঞ্জ করছি।' 

'ওরে ভাই। তুই দেখি খাঁটি বউয়ের গোলাম! শতভাগ নির্ভেজাল!'

৯৭৪ পঠিত ... ১৯:২৬, মার্চ ০৮, ২০২০

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top