সরকারি কর্মকর্তাদের যেবার উন্নত শিষ্টাচার শিক্ষার জন্য বিদেশ পাঠানো হলো

১৬৬৯ পঠিত ... ১৯:২০, জানুয়ারি ০৮, ২০২০

উচ্চ আদালত সরকারি কর্মকর্তাদের শিষ্টাচার শিক্ষার পরামর্শ রাখায়; এবার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়; আর আলু চাষ শিক্ষা বা খালকাটা শিক্ষা নয়; এবার শিষ্টাচার শিক্ষার জন্য কর্মকর্তাদের নেদারল্যান্ডসে পাঠানো হবে।

কথা মতো কাজ হয়ে যায়; বিমানে করে আমস্টার্ডামে পাঠানো হয় বেশ কিছু কর্মকর্তাকে। বিমানের মধ্যে টিমলিডার সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, দেশের মান-সম্মান রাখতে হবে। নেদারল্যান্ডসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সংস্কৃতি বিনিময় করতে হবে। শুধু শিখবেন না; কিছু শিখিয়েও আসবেন।

আমস্টার্ডামে পৌঁছানোর পর যে হোস্টেলে তাদের পৌঁছে দেয়া হয়; সেখানে কফি মেশিন আর কিছু চিপস রাখা হয়েছে। ঝুড়িতে কিছু রুটি; কিছু ফল আর চকোলেট। খাবার-দাবারের দীন-হীন অবস্থা দেখে কর্মকর্তারা নিজেদের মধ্যে আলাপ করে; খাবারের সংস্কৃতিতে এরা বেশ পিছিয়ে।

ডাচ সমন্বয়ককে দেখে এক প্রশিক্ষণার্থী কর্মকর্তা প্রশ্ন রাখে, যথাযথ সম্মান প্রদর্শন পূর্বক আমি কী একটা প্রশ্ন করতে পারি?

ডাচ সমন্বয়ক মুগ্ধ হয়ে বলে, এতো শিষ্টাচার আপনার; বলুন কী জানতে চান।

--আপনাদের রিফ্রেশমেন্ট বাজেট কি খুব কম!
--যা আছে চলে যায় আর কি। মাঝে মাঝে নিজেরা চাঁদা দিয়ে পার্টি-টার্টি দেয়া হয়।
--নিজেরা চাঁদা দেবেন কেন; উন্নয়ন বাজেট থেকে কিছু কমিশন কেটে রেখে দিলে পারেন। আরে স্যার পেটে খেলে তবে না পিঠে সয়। খামাখা কষ্ট করছেন। আমাদের সুটকেসগুলো আপনিই দেখলাম টেনে বাস থেকে নামালেন। আপনার অফিসে কোন লজিস্টিক হেলপ নাই নাকি!

ডাচ সমন্বয়কের মনে হতাশা ভর করে, বড্ডো চিন্তায় ফেলে দিলেন!

--জানেন আমাদের দেশে আপনার দেশের জনসংখ্যার প্রায় সমান সংখ্যক লোকজন সরকারি চাকরির আবেদন করে। অনেক লুক্রেটিভ চাকরি; বড় বড় বাড়ি-গাড়ি আর বিরিয়ানির হাড়ি।

বাসে করে হারলেম শহরে কর্মকর্তাদের নিয়ে যাওয়া হয় জেলা-ব্যবস্থাপনা দেখতে।

সেখানে বিভিন্ন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সংযুক্ত করে দেয়া হয় প্রশিক্ষণার্থী কর্মকর্তাদের।

জেলা অফিসে সরকারি সেবা নিতে খুব কম লোকই আসে। অনলাইনে আবেদনের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে সেবা দেয়া হয়। সে কারণে সরকারি কর্মকর্তাদের সারাক্ষণ ফাইল নিষ্পত্তির কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। কিন্তু সবাই বেশ হাসি হাসি মুখে কাজগুলো করে।

কাউন্টারে কিছু সার্ভিস কর্মকর্তার পাশে বসিয়ে রাখা হয় প্রশিক্ষণার্থীদের। এইখানে সেবা নিতে আসা লোকেরা কেউ স্যার বলেনা। কর্মকর্তা সুপ্রভাত বা শুভদিন বলে প্রত্যেককে। কাজ শেষ হলে সেবাগ্রহীতা ধন্যবাদ দিয়ে চলে যায়।

সার্ভিস কর্মকর্তাদের দেখে হাসি হাসি মুখ করে রাখা অনুশীলন করতে থাকে প্রশিক্ষণার্থীরা।

এই অফিসে কে কার বস; কে অধস্তন বোঝা মুশকিল। এক কাপ কফি বানিয়ে খেতে ইচ্ছা করলে নিজে বানাতে হবে। কিংবা মেশিনে পয়সা ফেলে ইনস্ট্যান্ট কফি মিলবে। কিন্তু 'পিয়ন' বস্তুটি নেই। নেই সিং হাসনের মতো চেয়ার; বিশাল টেবিল আর বড় চেম্বার।

অফিস প্রধানকে কফির পানি গরম করতে দেখে এক প্রশিক্ষণার্থী এগিয়ে গিয়ে বলে, স্যার আমি বানিয়ে দিই কফি।

অফিস প্রধান বলে, আমি বানিয়ে দিচ্ছি। প্লিজ এখান থেকে কিছু নিন।

কিছু কেক, চিপস, চকোলেট সাজানো অটোমাট। অফিস প্রধান তার কার্ড মেশিনের পাশে চেপে ধরে হাত দিয়ে ইশারা করে।

প্রশিক্ষণার্থী ডর্মে ফিরে এসে উদাস হয়ে বলে, বসের ব্যবহার এমন মধুর কখনো দেখি নাইরে ভাই।

আরেকজন বলে, যাই বলেন স্যার; সিম্পল লাইফ আর কার্টেসি দুইটা জিনিস থাকলে জীবনে আর কিছু লাগে না।

টিম লিডার বলে, একে বলে সভ্যতা। পৃথিবীর প্রাচীনতম মানুষ, নিয়ান্দারথালের দেখা মিলেছিলো এই হল্যান্ডেই; মাসস্ট্রিশটে। এখানে সামাজিক সম্প্রীতি-আইনের শাসন সবই আছে।

এক প্রশিক্ষণার্থী টিম লিডারকে জিজ্ঞেস করে, স্যার এতোক্ষণ যে সরকারি দপ্তরে কাটালাম; কাউকে কারো সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতে দেখলাম না।

টিম লিডার হেসে বলে, আমি কী কখনো তোমাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছি।

সবাই হেসে ফেলে। প্রশিক্ষণার্থী উত্তর দেয়, আমি ওভার-অল মানুষের আচার ব্যবহারের কথা বলছিলাম।

টিম লিডার বলে, এদের দেশে মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ। এর মানে বোঝো তো, এরা প্রতিশোধ নয়; সংশোধনের মাঝ দিয়ে মানুষের শাস্তি খুঁজেছে। অপরাধী নিয়ে চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় না তুলে অপরাধ প্রবণতা দূর করেছে। চোর- নৌকা ডাকাত-খুনী এদের দেশেও ছিলো। কিন্তু জনমানুষকে এরা অপরাধ প্রবণতা থেকে মুক্ত করতে পেরেছে; ওটাই আসল মুক্তি।

এমন সময় এক ডাচ এসে আড্ডায় যোগ দেয়। প্রশিক্ষণার্থীরা তাকে নানা প্রশ্ন করে।

ডাচ লোকটি সব প্রশ্নের উত্তর দেয় আর সবশেষে বলে, আমাদের দেশে উদারনৈতিক আইন থাকায় মানুষ যাপিত জীবনে মুক্তির স্বাদ পায়। আর উন্নয়নকে মানুষের স্বার্থে-পরিবেশের স্বার্থে পরিচালিত করা হয়। জিডিপি গ্রোথ নয়; আমরা দেখি মানুষের জীবন কুশলতা; সমাজের হ্যাপিনেস গ্রোথ।

দেশে মন্ত্রী-এমপির ফোনের চাপে আনহ্যাপি এক প্রশিক্ষণার্থী জিজ্ঞেস করে, এখানে মন্ত্রীর ফোনের চাপ কেমন সরকারি আপিসে!

ডাচ লোকটি উত্তর দেয়, আমি একজন মন্ত্রী। অযথা সরকারি কর্মকর্তাদের কাউকে ফোন করে বিরক্ত না করে; নিজেই চলে এলাম আপনাদের সঙ্গে একটু আড্ডা দিতে।

১৬৬৯ পঠিত ... ১৯:২০, জানুয়ারি ০৮, ২০২০

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top