উন্নয়নের স্বেচ্ছাসেবকদের ইতিহাস নির্মাণের তাড়াহুড়ায় যেভাবে এলো ঐতিহাসিক 'রাজাকারের তালিকা'

৩৪৯৩ পঠিত ... ১৯:২১, ডিসেম্বর ১৯, ২০১৯

ক্যাসিনোর ধরপাকড়ের পর উন্নয়নের স্বেচ্ছাসেবকেরা কিছুটা থমকে যায়। দশ বছরে ‘ফইন্নিপতি’ থেকে কোটিপতি হওয়া লোকেরা কিছুটা দুঃশ্চিন্তায় পড়ে যায়। এক ফইন্নিপতি তার বস ফইন্নিপতিকে বলে, সহমত ভাই বসন্ত কী শেষ! আর কি ফুল ফুটবে না!

: অপেক্ষা করো। ভুঁড়িডা লুকাইয়া ঘুরো। চর্বি দেখলেই কিন্তু পুলিশ ধরবে। 

: বিশ্বাস করেন ভাই, বেশি কিছু খাই না, কিন্তু যা খাই গতরে লাইগা যায়। তা ভাই, পেঁয়াজ আমদানির কিছু টেকা মালয়েশিয়ায় পাঠাইতে চাইছিলাম। একটু ব্যবস্থা কী করা যায়!

: বেশি উতলা হইসনারে ফইন্নি; দাঁত-মুখ আঁইটা মটকা মাইরা পইড়া থাক।

মাছ ধরার ছিপ ফেলে যেভাবে শিকারি নিঃশ্চুপ বসে থাকে; ঠিক সেভাবে চুপচাপ বসে থাকে উন্নয়নের স্বেচ্ছাসেবকেরা। বিজয় দিবস এলো-গেলো, বিরিয়ানির ডেগ চড়লো না; একটু বেবি ডল বাজিয়ে খুশিজল খাওয়ার মচ্ছবটা হলো না। দেশের মানুষের দেশপ্রেম কী কমে গেলো নাকি! এমন প্রশ্ন নিয়ে হাজির হয় এক খামজীবী সংস্কৃতিমামা।

: ও সহমত দাদা, এটা কি বিজয় দিবস নাকি আশুরার শোক। বারান্দায় রোদ্দুর, হা হয়ে গেলামরে ভাই; খামের দেখা নাইরে খামের দেখা নাই। দেশপ্রেম নিয়ে কোবতে লিখেছিলাম; পড়বো কোথায় আসর পেলাম না।

: আপনেরাই তো ফেসবুকের কন্ট্রোল হারাইলেন সংস্কৃতিমামা। দেশপ্রেমের দোলা দিয়া সেই প্রেম উথলে ওঠা জোয়ার আনতে তো পারলেন না। ফেসবুকে দেখি খালি দুর্নীতি নিয়া আলাপ। বোঝেন না কেন, দুর্নীতি নিয়া যত আলাপ--তত ধরপাকড় আর পুলিশের জোলাপ। অথচ ফেসবুকে যদি চলে দেশপ্রেমের প্রলাপ; আমরা ঋণখেলাপে ফোটাইতে পারি গোলাপ। বাদ দেন; আপনাকে আর লাগবে না। এইবার ধর্ম-মামা ডাইকা ওয়াজ করামু।

ধর্ম-মামারা সহমত ভাইয়ের খাম পেয়ে আলাপ শুরু করে, কোনটি সহি কোনটি সহি নয় তা নিয়ে। সহমত ভাই পঁই পঁই করে বলে দেয়, 'যাই কন ধর্ম-মামা, দুর্নীতি টপিকটা বাদ রাখবেন। কীভাবে মিছওয়াক করতে হবে, কী করে ঢিলাকুলুপ ব্যবহার করতে হয় এইসব বলবেন। কিন্তু দুর্নীতি-টাকাপাচার এইসব ব্যাপারে মুখে কুলুপ আঁইটা রাখবেন। কে সহি মুসলমান, কে নয়; এইবার তার একটা ফয়সালা হয়ে যাক।'

ধর্ম-মামার বয়ান শুনে গরিব মানুষেরা প্রশ্ন করে, আমরা তো কোন অন্যায় করি না মামা; কাম করি, খাই; একটু নামাজ পইড়া দুয়া করি যেন ক্রসফায়ারে পইড়া না যাই। কিন্তু যারা লুটপাট করতেছে; আমগো মুখেরটা কাইড়া খাইতেছে; তাদের জন্য আল্লার কী বিধান তা তো কইলেন না!

ধর্ম মামা মুখ চাওয়া চাওয়ি করে নিরুত্তর হয়ে যায়। সহমত ভাইকে এসে বলে, 'কাম হইতেছে না; মানুষ খালি দুর্নীতির কথাটা তোলে। একটা হিন্দু ধর্ম মামা আইনা দেন ভাই; একটু কবির লড়াই করি।'

সহমত ভাই হেসে বলে, 'তারে তো ইনভাইট কইরা আনার দরকার নাই; আপনে খালি একটু ভারতে মুসলমান নির্যাতন নিয়া হুক্কা-হুয়া দিলে, হিন্দু ধর্ম মামারা আপনেতেই এসে কবির লড়াই-এ লেগে যাবে।'

কিন্তু মুসলমান-হিন্দুমামার কবির লড়াইয়েও ফেসবুকে এমন হৈ চৈ তৈরি হয় না; যার আড়ালে টাকা পাচার করা করা যায়। উন্নয়নের স্বেচ্ছাসেবকেরা তাই অপেক্ষায় থাকে। বড়শি ফেলে যেমন বসে থাকে মাছের শিকারি।

সংস্কৃতি মামা আবার এসে একটু আলো দেখায়, দুর্নীতির নতুন চুইংগাম মানুষ চিবাইতে পছন্দ করে, এইখানে দেশপ্রেমের চিবানো চুইংগাম যদি আবার একটু চিনির শরবতে ঢুবাইয়া তারপর চিবাইতে দেওয়া যায়; কাম হইতে পারে। উন্নয়নের স্বেচ্ছাসেবকদের দুর্নীতির তালিকা নিয়া ব্যস্ত মানুষরে একটু রাজাকারের তালিকা দিলে কেমন হয়!

: ওগো তো বিচার হইছে-হইতাছে; পাবলিক কি খাইবো একই জিনিস!

: খাইবো খাইবো না কা; খাওয়াইতে জানলে ঠিকই খায় পাবলিক।

সংস্কৃতি মামা এক মন্ত্রীর কাছে গিয়ে বলে, স্যার আপনার অমরতার আয়োজন করুন। রাজাকারের তালিকাটা ছাইড়া দেন।

মন্ত্রী ডাকেন আমলাদের, 'তালিকাটা কোথায় বাতেন সাহেব!'

বাতেন সাহেব বলেন, 'কোন তালিকা স্যার!'

: আপনি আবার কটা তালিকা করছেন, রাজাকার তালিকার কথা বলছি।

আমলা বাতেনের মাথায় বাজ ভেঙ্গে পড়ে। উনি মন্ত্রীর দপ্তর থেকে ফিরে গিয়ে মন্ত্রণালয় তোলপাড় করে ফেলেন। কয়েক ঘন্টা পরে জানতে পারেন, যে কপি-পেস্টার-এর পেনড্রাইভে তালিকা আছে; সে আজ অফিসে আসেনি।

ড্রাইভার কুব্বাতকে মাইক্রোবাস নিয়ে কপি পেস্টারকে জীবিত অথবা মৃত ধরে আনার নির্দেশ দেয়া হয়।

পেন-ড্রাইভ উদ্ধার হলে প্রিন্ট আউট আধিকারিক ব্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রকাশিত হয় ঐতিহাসিক 'রাজাকার তালিকা'।

'রাজাকার তালিকায়' মুক্তিযোদ্ধার নাম রয়ে গেছে। দেশ স্বাধীন হয়ে যাবার পর খুব নিশ্চিন্ত মনে কাঁকড়া স্বভাবটি উঁকি দেয় দেশের কিছু মানুষের মনে। দ্রুত মুক্তিযুদ্ধের সফলতা কুড়াতে প্রাপ্তির দৌড়ে প্রতিযোগী কমাতে ও হিংসুটে স্বভাবের কুঁচকুঁচানিতে; একে অপরের বিরুদ্ধে 'বানোয়াট' অভিযোগ দায়ের করেছেন। আবার মুক্তিযুদ্ধের সময় উপকার করেছে এমন মানুষের প্রতি স্বভাবসুলভ কৃতঘ্নতা প্রকাশে থানায় গিয়ে উপকারীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে দিয়ে এসেছে। কিন্তু সেই সময়ই এই মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে বানোয়াট মামলা ও অভিযোগ যাচাই করে তাদের অব্যাহতি দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু অমরতার আয়োজন ও ইতিহাস নির্মাণের তাড়াহুড়ায় এসব দেখে তালিকা শুদ্ধ করা হয়নি। 

সুতরাং ফেসবুকে শুরু হয় খাণ্ডবদাহ। দেশপ্রেমের মাধুকররা 'এই জিনিসটা কিছুতেই মন থেকে তাড়াতে পারছি না; এতো বড় অপমান!' এই বলে মাতম শুরু করে। শরীরে চর্বি হলে কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের প্রতিদিনের অপমান আর চোখে পড়ে না। বিত্তশালীর অপমানই তখন একমাত্র অপমান। সুতরাং দেশপ্রেম উথলে ওঠে ফেসবুকে।

এই হৈ হট্টগোলের মাঝে পেয়াজ আমদানির কথা বলে দুশো কোটি টাকা পাচার হয়ে যায়। মোটাতাজা খাম হাতে সংস্কৃতি মামা আঙ্গুল উঁচিয়ে বলে, ঘাপটি মেরে বসে থাকা লোকেরা অশুদ্ধ তালিকা দিয়ে আমাদের এতোবড় অপমান করলো!

শুরু হয়ে যায় 'হ্যাশট্যাগ ঘাপটি মেরে বসে থাকা' আন্দোলন।

৩৪৯৩ পঠিত ... ১৯:২১, ডিসেম্বর ১৯, ২০১৯

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top