যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের মনোরঞ্জন করে চলবেন

৫৩৯ পঠিত ... ২০:০২, নভেম্বর ০৫, ২০১৯

 

আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ হয়েছে; কিংবা প্রধানমন্ত্রীর বদান্যতায় ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য পুনঃনিয়োগ পেয়েছেন। তাকে অভিনন্দন জানানো আপনার একান্ত কর্তব্য। কিন্তু এটা যেহেতু উপাচার্যের নিয়োগ; এখানে অভিনন্দন জানাতে আপনাকে কিছুটা শৈল্পিক হতে হবে। অমুক ভাই-তমুক ভাইয়ের নিয়োগ কিংবা পুলিশের পদায়নে আপনি যে ভাষায় অভিনন্দন জানান; সেটা উপাচার্যের ক্ষেত্রে একেবারেই জোলো ও বেমানান হবে।

আপনি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হলে, উপাচার্যকে অভিনন্দন জানানো অবশ্য কর্তব্য। কারণ এখন থেকে তার গুডবুকে থাকাটাই আপনার একমাত্র কাজ। ছাত্র-পড়ানোর দুর্বলতা, লেখাপড়ায় ফাঁকি ইত্যাদি নানা সমস্যার একমাত্র নিদান উপাচার্যের সুনজরে থাকা।

কাজেই তাকে অভিননন্দন জানান এভাবে,

'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য পিজে হার্টজ-এর প্রধান দুর্বলতা হচ্ছে; উনি বৃটিশ বলে একটা 'স্যার' ভাব নিয়ে ঘুরতেন। সরজমিন পর্যবেক্ষণের চেয়ে চেম্বারে বসে পাইপ মুখে ভাব ধরে বসে থাকাকেই প্রেস্টিজ সিম্বল হিসেবে তৈরি করে দিয়ে যান উনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ডালের বরাদ্দ চুরি করে ছাত্র-ছাত্রীদের ডালের পরিবর্তে বুড়িগঙ্গার পানি পরিবেশন করার চল হয় ঠিক সেসময়। এর ফলে ছাত্র-ছাত্রীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট সংগ্রহ করেই একটু ঘন ডাল খাওয়ার নেশায় নানা-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে। ছাত্র নেতারা একটু ঘন ডাল খাওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশের হোটেল-রেস্টুরেন্টগুলোতে তস্করের মতো হানা দিতে শেখে। জাতীয় জীবনের তস্কর বৃত্তি ছড়িয়ে পড়ার গোড়ায় রয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ডালের ঘনত্বজনিত গলদ। এই বিসমিল্লায় গলদ সংশোধনে, হার্টজ থেকে আরেফিন স্যার ইতিহাসের সব উপাচার্যই ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু সমকালের সমাজবিজ্ঞানী উপাচার্য দায়িত্ব নিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ডালের ঘনত্ব পরীক্ষা করেছেন। মাত্র দশ টাকায় টিএসসি ক্যাফেটেরিয়ায় উপহার দিয়েছেন, ছা-ছপ-ছমুছা। এইসব মহতী উদ্যোগ ভিসি মহোদয়ের নাম ইতিহাসে সোনার অক্ষরে খোদাই করেছে।'

আপনি সরকারি দলের ছাত্র হলে নেতা উপাচার্যকে অভিনন্দন জানানো আপনার জন্য অবশ্য কর্তব্য। কারণ আপনার হেলমেট, হাতুড়ি, চাঁদাবাজির গৌরবজ্জ্বল ইনিংস চালিয়ে যেতে উপাচার্য হবেন প্রধান সহায়ক শক্তি। তার প্রতি অভিনন্দন জানান এভাবে,

'মনে পড়ে সেই কালরাতের কথা। বিএনপি-জামায়াত-এর ষড়যন্ত্রকারীরা কোটা-সংস্কার আন্দোলনের এক ফাঁকে ভিসির বাড়িতে আগুন দেয়। সেই থেকে আমাদের প্রাণের ভিসি যেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্ধকার যুগের জোয়ান অফ আর্ক হয়ে গেলেন। তিনি সরকারি ছাত্র সৈনিকদের দিতে থাকেন নবজাগরনের চিরকুট। যে টা দেখালে লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই যে কোন বিভাগে ভর্তি হয়ে ছাত্রত্ব রক্ষা করা যায়। এমন আদুভাই হিতৈষী উপাচার্য বার বার চাই।'

আপনি উচ্চমূল্যে সরকারি বালিশ বিক্রি করে বাড়ি-গাড়ি করেছেন। বালিশের ঠিকাদার হিসেবে এই সামাজিক প্রতিষ্ঠা আপনার জন্য যথেষ্ট নয়। এখন আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং ফ্যাকাল্টির তকমাটা দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে তারপর উচ্চ মূল্যের সরকারি বালিশের কমিশন খাওয়ার জন্য বিসিএস এখন তারুণ্যের ক্রেজ ও ক্রাশ। তাদের বালিশ ক্রয় ও বিপনন শেখাতে আপনি ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি হিসেবে খুবই যোগ্য। কিন্তু উপাচার্য ছাড়া আর কেউ আপনার এই প্রতিভার মূল্যায়ন করতে পারবে না। তাই উপাচার্যের নিয়োগে আপনি একটি গরু জবাই করে মেজবান দেন। কিছু সাংবাদিক ও সংস্কৃতি মামাকে দাওয়াত দেন। ভিসি মহোদয়কে প্রধান অতিথি করুন। সেই অনুষ্ঠানে উপাচার্যকে অভিনন্দন জানান এভাবে,

'এতোদিন বিশ্ববিদ্যালয় চলেছে থিওরি মুখস্ত করে। কিন্তু সমাজবিজ্ঞানী ভিসি মহোদয় প্র্যাক্টিক্যাল মানে হাতে-কলমে শিক্ষায় আগ্রহী। উন্নয়ন হলে কিছু মানুষ বড়লোক হবে এটা পরম করুণাময় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ হচ্ছে বড় লোক হবার প্রক্রিয়াটিকে নান্দনিক করে তোলা। শেখানো কীভাবে নীরবে বড়লোক হতে হয়; যাতে লোকের চোখে পড়ে না যায়। সামাজিক শৃংখলা যাতে বজায় থাকে। সামাজিক শৃংখলার কারিগরকে উপাচার্য হিসেবে পেয়ে আমরা গর্বিত।'

আপনার হাতে অনেক সময়; আপনি বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট মেম্বর হওয়া, এলামনাই এসোসিয়েশানে পদ আলো করার প্রত্যাশী। আপনাকে এখন ভিসির নজরে পড়তে হবে। ফেসবুকের এতো অভিনন্দন-এর ভীড়ে আপনার অভিনন্দন চাপা পড়ে গেছে। সুতরাং আপনাকে আদিতে ফিরে যেতে হবে। পত্রিকার বিজ্ঞাপন হিসেবে ছাপাতে হবে আপনার অভিনন্দন পত্র। লিখুন এভাবে,

'বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়েছি অনেক আগে। কিন্ত অপরাজেয় বাংলা, মধুর ক্যান্টিন, মল চত্বর, টিএসসি আমাকে হাতছানি দেয়। ফিরে এসো পার্থ; বিশ্ববিদ্যালয়ের সেবা করো। কিন্তু এখন তো ছাত্র নই; বিশ্ববিদ্যালয়ের সেবা করার সুযোগ আমাকে কে দেবে! মনে পড়লো সমাজ বিজ্ঞানী উপাচার্যের মুখ। তিনিই যে আমাদের প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের একমাত্র ঠিকানা।'

পত্রিকার অভিনন্দন বিজ্ঞাপনের কাটিং আর আপনার ভিজিটিং কার্ড ফুলের শাখায় স্কচ টেপ দিয়ে লাগিয়ে একটা কেক-কুক নিয়ে পৌঁছে যান উপাচার্যের কাছে। তার সঙ্গে সেলফি তুলে পটাপট ফেসবুকে আপলোড করুন। আপনি আপনার স্বপ্নপূরণের খুব কাছে পৌঁছে গেছেন; এটা টের পাচ্ছেন নিশ্চয়ই।

৫৩৯ পঠিত ... ২০:০২, নভেম্বর ০৫, ২০১৯

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top