জন্মদিনের অর্থনীতি ও রাজনীতি

১৫৮ পঠিত ... ২২:১০, সেপ্টেম্বর ১০, ২০২২

Jonmodiner-orthoniti

 

১.

রবীন্দ্রনাথের ভাগিনেয়ী সরলাদেবী চৌধুরানী তাঁর আত্মজীবনী জীবনের ঝরাপাতা গ্রন্থে লিখেছেন, ‘মেজমামী বিলেত থেকে ফিরে আসার পর থেকে ‘জন্মদিন’বলে একটা ব্যাপারের সঙ্গে পরিচয় হল আমাদের–সে বিলাতী ধরনে সুরেন বিবির জন্মদিন উৎসব করার উপলক্ষে। তার আগে এ পরিবারে ‘জন্মদিন’কেউ কারো জন্য করে নি (২০০৯, ৫৪)।’ মেজো মামি অর্থাৎ প্রথম ভারতীয় আইসিএস সত্যেন ঠাকুরের স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনী দেবী ১৮৭৭ সালে প্রথমবার বিলেতে যান। সঙ্গে ছিল পাঁচ বছরের ছেলে সুরেন ও চার বছরের কন্যা ইন্দিরা (যার ডাক নাম ছিল বিবি)। ১৮৮০ সালে তিনি পুত্র-কন্যা নিয়ে ফিরে আসেন। ফেরতযাত্রায় তাঁর সঙ্গে যোগ দেন স্বামী সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও দেবর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সরলাদেবীর বিবরণ থেকে প্রতিভাত হয় যে বাংলাদেশে বিলেতি কেতায় জন্মদিনের চল হয় ১৮৮০ সাল বা তার কিছু পর। এর আগে কারও কারও জন্মদিনে জন্মতিথির পূজা হয়েছে। কিন্তু জন্মদিন উৎসব ছিল বাঙালিদের অজানা। জন্মদিন পালিত হতো দেবতাদের (যেমন জন্মাষ্টমী) অথবা প্রেরিত পুরুষদের (যেমন বড়দিন ও ঈদে মিলাদুন্নবি) এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাদশাহদের। দেবতা ও পয়গম্বররা হচ্ছেন অমর। আর বাদশাহরা যখন গদিতে থাকতেন তখন নিজেদের অমর গণ্য করতেন। তবে মরণশীল মানুষের জন্মদিন নিয়ে মাতামাতি করা হতো না।

মনে করা হয়, ভারতের সাধারণ মানুষ দুটি কারণে জন্মদিন নিয়ে হই হুল্লোড় করত না। প্রথমত, উনবিংশ শতাব্দীতে অধিকাংশ ভারতীয় ছিল দরিদ্র। তাই অধিকাংশ লোকেরই জন্মদিনের রেস্ত ছিল না। তবে এ যুক্তি দুটি কারণে দুর্বল। অভিজিৎ ভি ব্যানার্জি ও এসথার ডাফলো (২০১১) সুন্দরভাবে দেখিয়েছেন, অতিদরিদ্ররাও জীবনের একঘেয়েমি থেকে মুক্তির জন্য উৎসব ও পালাপার্বণে নিজেদের ক্ষমতা না থাকলেও (ধারদেনা করে বা আধপেটা থেকে) দরাজ হাতে খরচ করতে দ্বিধা বোধ করে না। তাই অর্থাভাবে জন্মদিনের উৎসব বন্ধ হয়ে থাকার সম্ভাবনা কম। দ্বিতীয়ত, গরিব দেশে সবাই দরিদ্র নয়। এসব দেশে অনেক সচ্ছল পরিবার রয়েছে। তারাও প্রাক ব্রিটিশ বাংলায় জন্মদিন পালনে উৎসাহ দেখায়নি। তাই অর্থাভাবের কারণটি খুব প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয় না।

জন্মদিন উদ্যাপিত না হওয়ার দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ুর প্রত্যাশা ছিল খুবই কম। শিয়রে অপেক্ষমাণ যমদূত নিয়ে জন্মদিনের মাতামাতির কথা অধিকাংশ মানুষই চিন্তা করতে পারত না।

১৮২০ সালে ভারতে গড় আয়ুর প্রত্যাশা ছিল মাত্র ২১। ১৯০০ সালে ভারতে মানুষ গড়ে ২৪ বছর বাঁচত। এই সময় শিশুমৃত্যুর হার ছিল অত্যন্ত বেশি। তাই এক জন্মদিন থেকে আরেক জন্মদিন পর্যন্ত বেঁচে থাকাটাই ছিল একটি বড় ঝক্কি। অবশ্য বিলাতের পরিস্থিতি ছিল অনেকটা ভিন্ন। সেখানে ১৮২০ সালে গড় আয়ুর প্রত্যাশা ছিল ভারতের প্রায় দ্বিগুণ (অর্থাৎ ৪০ থেকে ৫০ বছর)। বিলাতে তাই উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের মধ্যে জন্মদিনের রেওয়াজ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বিলাতের অনুকরণে জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর মতো বিলেতফেরতরা বাংলাদেশে জন্মদিন চালু করেন।

জন্মদিন নিয়ে আমার ঔৎসুক্যের প্রধান কারণ হলো, আমি আমার জন্মদিন কবে জানি না। অথচ আমার দুটি জন্মদিন আছে। আমার সরকারি জন্মদিন হচ্ছে ২ আগস্ট ১৯৪৪। এই তারিখ জন্মদিন হিসেবে আমার প্রবেশিকা পরীক্ষার সনদে লেখা রয়েছে। এই তারিখের ভিত্তিতেই আমি সরকারি চাকরিতে যোগ দিই এবং সরকার থেকে অবসর গ্রহণ করি। আমার মা, যিনি আমার জন্মদিন সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো জানতেন, বারবার জোর দিয়ে বলতেন যে তারিখটি একেবারেই ভুল। মায়ের মতে, আমার জন্ম শ্রাবণ-ভাদ্রে নয়, আমার জন্ম হাড়-কাঁপানো শীতে। তাহলে আমার জন্মদিন নিয়ে এমন অঘটন কেন ঘটল? আমার মা বলতেন, কাণ্ডটি ঘটিয়েছেন আমার প্রধান শিক্ষক বাবু বিহারীলাল চক্রবর্তী। তখন নাকি প্রবেশিকা পরীক্ষার বছর ফেব্রুয়ারি মাসের ১ তারিখে সাড়ে চৌদ্দ বছর বয়স না হলে সে বছর পরীক্ষা দেওয়া যেত না। ডিসেম্বরে জন্মদিন হলে পরীক্ষার জন্য এক বছর বসে থাকতে হবে। হেডমাস্টার বিধাতাকে অগ্রাহ্য করে কেরানি বাবুকে হুকুম দিলেন, ‘এর জন্মদিন ২রা আগস্ট লিখে দাও।’আমার মায়ের হিসাবে আমার জন্মদিন ২৫ ডিসেম্বর। এই দ্বিতীয় দিনটিই আমার আপনজনেরা মাঝেসাঝে পালন করে থাকে।

আমার মায়ের হিসাব ঠিক হলে আমি মহাপুরুষদের জন্মদিনে ভূমিষ্ঠ হয়েছি। বলা বাহুল্য, একই দিনে যিশুখ্রিষ্ট ও পাকিস্তানের জনক জিন্নাহর জন্ম হয়। এক স্কুলের ছাত্রকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল, মহাপুরুষের লক্ষণ কী? ছাত্রটি জবাব দিয়েছিল, মহাপুরুষ হতে হলে ছুটির দিনে জন্ম হতে হয়। ছাত্রটি অবশ্য চিন্তা করেনি যে ২৫ ডিসেম্বরের ছুটির দিনে জন্ম হওয়াতে যিশু প্রেরিত পুরুষ হননি, বরং যিশুর জন্ম হওয়াতেই ওই দিনটিতে ছুটি পালন করা হয়। ছোটবেলায় অত শত বুঝতাম না। বরং ২৫ ডিসেম্বরের ছুটির দিনে জন্ম হওয়াতে ছোটবেলায় আমার মনে অনেক অহংকার ছিল। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অবশ্য জন্মদিন নিয়ে আমার মনে কয়েকটি প্রশ্ন জাগে। বর্তমান প্রবন্ধের লক্ষ্য হলো জন্মদিন নিয়ে এসব প্রশ্নের আলোচনা।

প্ৰথম খটকা আমার মনে জাগে, আমার মা কীভাবে মনে রেখেছেন আমার সঠিক জন্মদিন কবে। আমার কোনো কুষ্ঠি নেই। আমার জন্মতারিখ কোথাও লেখা নেই। আমার বাবা এতটুকু মনে করতে পারতেন যে স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য আমার বয়স বাড়ানো হয়েছিল, কিন্তু ডিসেম্বরের কোন তারিখে আমার জন্ম তিনি তা স্মরণ করতে পারেননি। ২৫ ডিসেম্বর আমার প্রকৃত জন্মদিন কি না, এ নিয়ে আমার মনে সংশয় দেখা দিলে আমার মনে প্রশ্ন জাগে, যিশুখ্রিষ্ট ও পাকিস্তানের জনক জিন্নাহর জন্য সত্যি সত্যি ২৫ ডিসেম্বর ছিল কি না। একটু গবেষণা করলেই বোঝা গেল, আমার সন্দেহ একেবারে অমূলক নয়। গবেষণা থেকে প্রতীয়মান হয় যে আমার জন্মদিন ২৫ ডিসেম্বর কি না, সে সম্পর্কে সন্দেহ রয়েছে। কিন্তু ২৫ ডিসেম্বর যে যিশু ও জিন্নাহর বানানো জন্মদিন, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। প্রশ্ন হলো, শুধু আমার জন্মদিন নয়, ভারত ও বাংলাদেশে জন্মদিন সংক্রান্ত তথ্যগুলি আদৌ নির্ভরযোগ্য কি না।

 

২. ২৫ ডিসেম্বর: কার জন্মদিন?

যিশুখ্রিষ্টের জন্ম নিয়ে দেড় হাজার বছর ধরে যে ধরনের মাতামাতি হয়েছে, মানুষের ইতিহাসে অন্য কারও জন্ম নিয়ে তত বাড়াবাড়ি করা হয়নি। এ জন্মদিন নিয়ে যত চিত্র আঁকা হয়েছে আর কারও জন্মদিন নিয়ে এত ছবি নেই। এ দিন নিয়ে যত গান গাওয়া হয়েছে এত সংগীত অন্য কারও জন্মদিন নিয়ে গাওয়া হয়নি। গির্জায় গির্জায় যিশুর জন্য যত প্রার্থনা হয়েছে তেমনটি আর কারও কপালে জোটেনি।

যিশুর জন্মের বর্ণনা রয়েছে বাইবেলে । জেরুজালেমের কুমারী মেরি কাঠমিস্ত্রি জোসেফের বাগদত্তা ছিলেন। বিয়ের আগে দেবদূতেরা স্বপ্নে মেরিকে জানালেন, মেরি ভগবানের সন্তান নিয়ে অন্তঃসত্ত্বা। কুমারী অবস্থায় মা হয়েছেন শুনে মেরি ভয় পেয়ে যান। দেবদূতেরা তাকে আশ্বস্ত করেন যে তার ভয়ের কারণ নেই। মেরি জোসেফকে যখন জানালেন যে তিনি গর্ভবতী; জোসেফ বিয়ে ভেঙে দিলেন। এবার দেবদূতেরা স্বপ্নে জোসেফকে আশ্বস্ত করলেন যে মেরি কুমারী এবং ভগবানের অভিপ্রায় যে জোসেফ যেন বিয়ে না ভেঙে দেন। জোসেফ এবার মেরিকে বিয়ে করতে রাজি হলেন। এ সময়ে বেৎলেহেম শহর থেকে জোসেফের এত্তেলা এল।

জোসেফের পূর্বপুরুষদের বাসস্থান ছিল বেৎলেহেম শহরে। ইহুদিদের প্রাচীন রীতি ছিল, প্রতিটি নাগরিককে পূর্বপুরুষদের বাসভূমিতে মাথাপিছু কর। দিতে হতো। যদি কেউ পূর্বপুরুষদের বাসভূমির বাইরে কাজ করে, তবে তাকে কর প্রদানের সময় পিতৃপুরুষদের শহরে ফিরে আসতে হয়। জোসেফ কর পরিশোধের লক্ষ্যে সন্তানসম্ভবা মেরিকে নিয়ে বেলেহেমে এলেন। অবশ্য কেউ কেউ বলেন, জোসেফকে বেৎলেহেমের আদমশুমারিতে নিবন্ধনের জন্য ডেকে পাঠানো হয়েছিল। এখানে স্মরণ করা যেতে পারে যে আদমশুমারি আর মাথাপিছু কর ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আদমশুমারির ভিত্তিতেই নির্ণীত হতো মাথাপিছু কর বাবদ মোট প্রাপ্যের পরিমাণ। তবে এ সময় জোসেফের মতো আরও অনেক প্রবাসী একই উদ্দেশ্যে বেৎলেহেমে আসেন। সব অতিথিশালা ও পান্থশালা অতিথিতে ভরে গেল। যখন জোসেফ মেরিকে নিয়ে বেৎলেহেমে এলেন তখন কোনো অতিথিশালায় বা পান্থশালায় কোনো থাকার জায়গা ছিল না। অন্তঃসত্ত্বা মেরিকে নিয়ে জোসেফ বিপদে পড়লেন। একজন পান্থশালার মালিক জোসেফ ও মেরিকে শূন্য আস্তাবলে ঠাই দিলেন। এখানে খড়বিচালির মধ্যে জন্ম নিলেন ‘জগতের প্রভু’ যিশুখ্রিষ্ট। আশপাশে যেসব রাখাল গৃহপালিত পশু পাহারা দিচ্ছিল তারা দেখতে পেল, জ্যোতির্ময় দেবদূতেরা আকাশ থেকে নেমে আসছে এবং সবাইকে মহাপ্রভুর আগমনবার্তা জানাচ্ছে।

যিশুর জন্মদিন নিয়ে ওপরে বর্ণিত বয়ান সম্পর্কে অনেক খুঁটিনাটি বাইবেলে রয়েছে। কিন্তু বাইবেলে কোথাও স্পষ্ট করে বলা নেই, যিশু কখন অর্থাৎ কোন সালে ও কোন তারিখে জন্মগ্রহণ করেন। বাইবেলের বিবরণ পাঠ করলে মনে হয়, যিশু আদৌ ডিসেম্বরে বা শীতকালে জন্মাননি। বাইবেলের লুক খণ্ডে বলা হয়েছে, ‘And there were shepherds living out in the fields nearby keeping watch over their flocks at night.’ অর্থাৎ যিশুর যখন জন্ম হয়, তখন ভেড়ার পাল পাহারা দেওয়ার লক্ষ্যে রাখালেরা আশপাশে মাঠের মধ্যে বাস করছিল। বসন্তকাল থেকে শরকাল পর্যন্ত ভেড়ার পাল বাইরে রাখা হতো। শীতকালে ভেড়া ঘরের ভেতর রাখা হতো। কাজেই শীতকালে রাখালদের মাঠে বাস করার প্রশ্নই ওঠে না। বাইবেলের বর্ণনা সঠিক হলে যিশুর জন্ম শীতকালে হয়নি।

যিশুর জন্মসাল নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। সাধারণত মনে করা হয়, পয়লা খ্রিষ্টাব্দে যিশুর জন্ম। এ ধারণাও ঠিক নয়। যদি বাইবেলে বর্ণিত পূর্ব দেশের জ্ঞানী ব্যক্তিদের (যাদের মেজাই বলা হয়ে থাকে) দেখা তারকার ভিত্তিতে হিসাব করা হয়, তবে চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ খ্রিষ্টাব্দের কোনো এক সময়ে যিশুর জন্ম হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেন যে রাজা হারড, যিনি নবজাত যিশুকে হত্যা করার চেষ্টা করেছিলেন, এঁর মৃত্যু হয় ৪ খ্রিষ্টাব্দে। তাই কেউ কেউ বলেন, যিশুর জন্ম ৪ খ্রিষ্টাব্দে। কাজেই বেশির ভাগ গবেষক মনে করেন যে ৪ থেকে ৬ খ্রিষ্টাব্দে যিশুর জন্ম।

যিশুর সঠিক জন্মতারিখ নির্ণয়ের একটি বড় সমস্যা হলো, যিশুর জন্মের পর প্রথম ৪০০ বছরে তার জন্মদিন উদ্যাপিত হয়নি। তাই তার জন্মদিন সম্পর্কে ধর্মগ্রন্থের বাইরে কোনো নির্ভরযোগ্য উৎস নেই। অবশ্য ২০০ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে আলেকজান্দ্রিয়া নগরের ক্লিমেন্ট যিশুর সম্ভাব্য কয়েকটি জন্মতারিখ উল্লেখ করেন। এ তারিখগুলি হচ্ছে : ২০ মে, ২১ মার্চ, ১৫ এপ্রিল, ২০ অথবা ২১ এপ্রিল। ক্লিমেন্টের লেখা থেকে দেখা যাচ্ছে, দ্বিতীয় শতাব্দী পর্যন্ত ২৫ ডিসেম্বরকে যিশুর জন্মদিন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি (অ্যান্ড্রু ম্যাকগোয়ান, ২০০৯)। চতুর্থ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত যিশুর জন্মদিন উদ্যাপনও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতকে জাঁকজমকের সঙ্গে খ্রিষ্টের জন্মোৎসব পালন করা শুরু হয়। রোমান সাম্রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলে খ্রিষ্টের জন্মদিন পালিত হতো ২৫ ডিসেম্বর। মধ্যপ্রাচ্যে এ উৎসব পালিত হতে ৬ জানুয়ারি। আস্তে আস্তে ২৫ ডিসেম্বর যিশুর জন্মদিন হিসেবে বেশির ভাগ অঞ্চলে স্বীকৃতি লাভ করে। তবে এখনো কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে। আর্মেনিয়ার খ্রিষ্টানরা ৬ জানুয়ারি ক্রিসমাস উদযাপন করে। রাশিয়ার প্রাচীনপন্থী গির্জায় ৭ জানুয়ারি যিশুর জন্মদিনের উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। আবার কোথাও কোথাও ২৫ ডিসেম্বর ও ৬ জানুয়ারি দুটি দিনই উদযাপিত হয়। ২৫ ডিসেম্বর পালিত হয় যিশুর জন্মদিন রূপে। ৬ জুন প্রতিপালিত হয় Feast of the Epiphany বা প্রাচ্য অঞ্চল থেকে আসা বিজ্ঞ মেজাইদের (Magi) আবির্ভাবের দিন হিসেবে।

প্রশ্ন ওঠে; যিশুর জন্মের ৪০০ বছর পর ২৫ ডিসেম্বর হঠাৎ কীভাবে যিশুর জন্মদিনের শিরোপা পেল? যারা ২৫ ডিসেম্বরের কট্টর সমর্থক, তারা দাবি করেন যে যিশুর মৃত্যু ও মেরির গর্ভে আবির্ভাবের তারিখ অভিন্ন। সুস্পষ্ট ঐতিহাসিক প্রমাণ অনুসারে যিশুর মৃত্যু ঘটে ২৫ মার্চ। সুতরাং তাদের বিশ্বাস অনুসারে যিশু মায়ের গর্ভে আসেন ২৫ মার্চ। তাঁদের মতে, যিশু মায়ের গর্ভে ছিলেন ঠিক নয় মাস (এটা তাদের বিশ্বাস, এ নিয়ে অবশ্যই তর্কের অবকাশ আছে)। তাই যিশুর জন্ম ২৫ ডিসেম্বর।

যারা ২৫ ডিসেম্বরের কট্টর সমর্থক নন, তারা বলেন যে ২৫ ডিসেম্বর যিশুর জন্মদিন নয়। তবে রাজনৈতিক প্রয়োজনে ২৫ ডিসেম্বরকে যিশুর জন্মদিন হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। ২৫ ডিসেম্বরের কাছাকাছি সময়ে (২১/২২ ডিসেম্বর) দিন সবচেয়ে ছোট হয়। এরপর দিন বড় হতে থাকে। অতি প্রাচীনকাল থেকে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে মানুষ বিশ্বাস করে এসেছে যে পঁচিশে ডিসেম্বর সূর্যদেবতার জন্মদিন। এরপর সূর্যের তাপ বাড়তে থাকে। মধ্যযুগে খ্রিষ্টান-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলিতে ধুমধাম করে সূর্যের জন্মদিন পালন করা হতো। গির্জার নেতারা মনে করলেন যে ২৫ ডিসেম্বর যিশুর জন্মদিন পালিত হলে তা অতি সহজেই জনপ্রিয় হবে। হলোও তাই। সারা পৃথিবীতে ২৫ ডিসেম্বর যিশুর জন্মদিন হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করল (কিফ রেমন্ড, ১৯৮৬)।

সূর্যদেবতার অনুকরণে যিশুর জন্মদিন নির্ধারিত হলো। আর যিশুর জন্মদিনের আলোকে নিজেকে মহিমান্বিত করার উদ্যোগ নিলেন পাকিস্তানের কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। তিনি ছিলেন শিয়া মুসলমান। তাঁর কোনো কুষ্ঠি নেই। তিনি কখনো এন্ট্রান্স পাস করেননি (সে আমলে ব্যারিস্টারি পাস করার জন্য এন্ট্রান্সের বালাই ছিল না)। তাই তাঁর জন্মতারিখ-সংবলিত সনদপত্র নেই। তার যখন জন্ম হয়, তখন করাচি পৌরসভায় জন্মনিবন্ধনের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। কাজেই, জিন্নাহ যে তারিখ তার জন্মদিন বলে ঘোষণা করেন তা প্রত্যাখ্যান করা শক্ত। জিন্নাহ দাবি করতেন যে তাঁর জন্ম হয়েছে। ১৮৭৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর। তাঁর জীবনীকার স্ট্যানলি ওয়ালপার্ট এ তথ্য মানতে রাজি নন। ১৮৮৭ সালে ২৩ ডিসেম্বর জিন্নাহ করাচির মাদ্রাসা-তুল ইসলামে ভর্তি হন। এই মাদ্রাসার নিবন্ধনের খাতা থেকে দেখা যায়, মাহমেদ আলী জিন্নাবাই-এর জন্মতারিখ হলো ২০ অক্টোবর ১৮৭৫। পরবর্তীকালে জিন্নাহ সবই পরিবর্তন করলেন। নিজের নাম পরিবর্তন করলেন। মাহমেদ আলীর স্থলে লিখলেন মোহাম্মদ আলী। জিন্নাহবাইকে হেঁটে নাম করা হলো জিন্নাহ। মাদ্রাসায় জিন্নাহর জন্মসাল ছিল ১৮৭৫। জিন্নাহ তা প্রায় ১৪ মাস কমিয়ে ১৮৭৬ সালে নিয়ে এলেন। জন্মতারিখ ২০ অক্টোবরের স্থলে ২৫ ডিসেম্বর নির্ধারণ করলেন। জিন্নাহ কেন এ কাজ করলেন তাঁর কৈফিয়ত আমাদের জানা নেই। তিনি কি অল্প বয়সে মাদ্রাসায় ভর্তি হয়েছিলেন, যার ফলে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ সচেতনভাবে বয়স বাড়িয়েছিলেন, যাতে তাঁর এন্ট্রান্স পরীক্ষায় ব্যাঘাত না ঘটে? আমাদের কাছে এ সম্পর্কে কোনো প্রমাণ নেই।

আরেকটি কারণ হতে পারে, তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন এবং ব্রিটিশ শাসনামলে প্রতিযোগিতার বয়স কম থাকায় তাঁর বয়স কমানোর চেষ্টা করা হয়। এ অনুমান দুর্বল মনে হয়। জিন্নাহর বয়স যখন মাদ্রাসার দলিল অনুসারে ১৮, তখন তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে তিনি বার অ্যাট ল পড়বেন অর্থাৎ তিনি সরকারি চাকরি করবেন না। তার বয়স এই সময়টাতেই কমানো হয়েছে। কাজেই এর সঙ্গে সুস্পষ্টভাবে চাকরির কোনো যোগসূত্র দেখা যাচ্ছে না। জিন্নাহর জীবনীকার স্ট্যানলি ওয়ালপার্টের ব্যাখ্যা ভিন্ন। তিনি মনে করেন যে জিন্নাহ মাদ্রাসার পর কিছুদিন একটি মিশনারি স্কুলে পড়েছেন। সেখানে ক্রিসমাসের জাঁকজমকে অভিভূত হয়ে তার জন্মদিন ২০ অক্টোবরকে পরিবর্তন করে ২৫ ডিসেম্বর করার সিদ্ধান্ত নেন। এই অনুমানের পক্ষেও যথেষ্ট প্রমাণ নেই।

কারণ যা-ই হোক না কেন, ঐতিহাসিক উপাত্ত থেকে সন্দেহের অবকাশ নেই। যে ২৫ ডিসেম্বর যিশু ও জিন্নাহর বানানো জন্মদিন, আসল জন্মদিন নয়। তাহলে কি ২৫ ডিসেম্বর আমার জন্মদিনও তাই? হতেই পারে। খ্রিষ্টান ধর্মাজকেরা যদি জনপ্রিয়তার লোভে সূর্যদেবতার জন্মদিনকে, খ্রিষ্টের জন্মদিন হিসেবে চালাতে পারে; যদি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ খ্রিষ্টের জন্মদিনকে নিজের জন্মদিন হিসেবে বেছে নিতে পারেন, তবে আমার মা যদি ভুলে বা ইচ্ছা করে ২৫ ডিসেম্বরকে আমার জন্মদিন হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

 

(লেখকের ‘আজব জবর-আজব অর্থনীতি’ শীর্ষক গ্রন্থ থেকে সংকলিত)

১৫৮ পঠিত ... ২২:১০, সেপ্টেম্বর ১০, ২০২২

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top