'ছোটবেলায় কোন কথাটি মনে অনেক কষ্ট দিয়েছে' eআরকির এই প্রশ্নে পাঠকের মনে-দাগ কাটা উত্তর

৬২২৭ পঠিত ... ২০:২১, নভেম্বর ২০, ২০২১

chotobelar-kotha-koshto-

কিছুদিন আগে আমরা eআরকির পাঠকদের উদ্দেশ্যে এ প্রশ্নটি রেখেছিলাম। কমেন্টে এসেছিল হাজার হাজার উত্তর। সেসব উত্তর থেকে মানুষের ছেলেবেলায় মনে বড় দাগ কেটে যাওয়া কষ্টের কিছু ঘটনা দেওয়া হল আজ। আমাদের উদ্দেশ্য, মানুষকে যাতে বোঝে যে খামখেয়ালী, মজার ছলে কিংবা শাসনের বশে বলে ফেলা কথাগুলো একজনের মনে কীভাবে বছরের পর বছর রয়ে যায়, সৃষ্টি করে ক্ষত। আপনার বলা ছোট্ট একটি কথা কী করে একটা মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে। পড়ুন ও প্রতিজ্ঞা করুন মজার ছলে কিংবা অন্য কোন কারণে মানুষকে কষ্ট দেয় এমন কথা বলবেন না। 

#

ক্লাস সিক্সে থাকতে সেটের অংক করাতে গিয়ে স্যার আমাদের চারজন বেস্ট ফ্রেন্ডের সমতা নিয়ে সেট বুঝিয়েছিলেন! 'ধরো তুমি আর ও কালো, তাই A set, আর বাকি দু’জন ফর্সা, তারা B set!' এই কথাগুলোর আগে কালো-ফর্সা নিয়ে কখনোই মাথা ঘামাইনি।

#

ইশ, এতো মোটা কি বিশ্রি লাগে!, চাকমার মতো দেখা যায় (যদিও এটা আমার কাছে খারাপ মনে হয় না)। ছোট ছিলাম তাও কেন যেন আমার কাছ থেকে সবাই ম্যাচিওর বিহেভ আর বুদ্ধি আশা করতো, খুবই হীনমন্যতায় ভুগতাম। এখনো মনে পরে, আম্মু আর আপু আমাকে সবসময়ই আমার হাইট নিয়ে তাচ্ছিল্য করতো। যদিও এটা সবাই করতো বা করে, তাও পরিবার থেকে করলে আসলেই মনে দাগ কেটে যায়। 

#

আমি তোতলা৷ অপরিচিত কেউ নাম ঠিকানা জিজ্ঞেস করলেও পুরোপুরি বলতে পারতাম না। ছোটবেলায় খুব, খুব বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তাম, উঠতে বসতে প্রতিটা জায়গায় মানুষ ব্যাঙ্গ করতো। কিছু মানুষ সবার সামনে ব্যাঙ্গ করতো। আর ব্যাঙ্গ করার সাথে সাথে সবার অট্টহাসি। তাই বেশিরভাগ সময় চুপ থাকতাম। সবসময় ভাবি, অন্তত এই পৃথিবীটা পারফেক্ট মানুষ ছাড়া বাকিদের জন্য না! অনেক কিছু করার ইচ্ছা থাকা স্বত্ত্বেও করতাম না। একটা গল্প বলা, আবৃত্তি করা, ভরা মজলিশে একটু হাসি ঠাট্টা করা, এইসব কখনোই হয়ে উঠেনি, উঠবেও না৷ তাই এই জীবনে ভালো শ্রোতা হয়ে কাটিয়ে দিচ্ছি৷ কনফিডেন্স লেভেল জিরো হয়েও কিভাবে কিভাবে যেন কাটিয়ে দিচ্ছি জীবন!

#

শুধু মেয়েরা নয়, ছেলেরাও যে রেসিজমের শিকার হয় তা খুব ছোটবেলায় বুঝেছিলাম। মাধ্যমিক ক্লাসে সবচেয়ে কালো ছেলে নির্বাচিত করা হয়েছিল আমাকে! তাছাড়া আরো এক আত্মীয়ের বেশ কিছু ঘটনা মনে পড়লে এখনো প্রচন্ড ঘৃণা হয়। মানুষ এতো মিন মেন্টালিটির কিভাবে হয়? 

#

ছোটবেলা থেকেই আম্মাকে কাজে সহযোগিতা করতাম। আম্মা চাকরি করতেন বলে তাড়াহুড়ো করে সকালেই সব কাজ শেষ করতে হতো। এজন্য স্কুলে প্রথম পিরিয়ডে প্রায়ই লেট হতাম, আর আমাকে তো স্যার-ম্যাডাম সহ সহপাঠীরাও ‘কাজের বেটি’ বলতো। 

খুব কষ্ট লাগে এখনো মনে পড়লে! 

#

একবার স্কুলের এক স্যারের বউ বাসায় বেড়াতে এসেছিলো। আমার বোনকে দেখে বলেছিলো, ‘ভাবি আপনার ছোট মেয়েটা তো সুন্দর, বড় মেয়েটা (আমি) এমন কেন দেখতে?’ আমি আর আমার বোন সামনেই বসে ছিলাম, অনেক কেঁদেছিলাম সেদিন।

নিকটাত্মীয় একজন বলেছিলো, ‘মেয়েটা একে তো এমন হাতির মতো মোটা, তার উপর খাঁটো, বাপের টাকা আছে বলে রক্ষা, নাইলে একে জীবনে বিয়ে দেওয়া যেত না।’ 

স্কুলে থাকতে যারা মোটা আর ক্ষ্যাত বলে হাসাহাসি করতো, তাদের অনেকেই এখন মেকওভার করতে আমার কাছে আসে, ড্রেসিং সাজেশন নেয়। হাসিমুখেই হেল্প করি তাদের, কিন্তু ছোটকালের সেই মুহূর্তগুলো ভুলতে পারি না৷ 

#

হরমোনাল সমস্যার কারণে আমার কথাগুলো অন্যদের চেয়ে আলাদা। অনেকটা মেয়েদের মত নাকি হয়। এটা নিয়ে জীবনে কম তিরস্কার হইনি। এখনো হয়েই যাচ্ছি। মাঝেমধ্যে সুইসাইড ও করতে মন চাইতো। জীবনে কখনো বন্ধু জোটেনি। কারও সাথে মিশতে পারতাম না। মন খুলে হাসতে পারতাম না। গার্লিশ, হিজরা, হাফ লেডিস এরকম শতশত ঠাট্টা, আমায় দেখলেই অনেকের মুখ লুকিয়ে হাসা, কানাকানি করা এসব দেখলে নিজেকে মনে হয় এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকারই কোন অধিকার আমার নেই। 

#

ছোট কাকী প্রায়শই বলতো, তুই জোঁকের পেটের মতন কালো। এটা শুনলে পিচ্চিকালে খুব মন খারাপ হতো। ক্লাসমেটরা মা কালী ডেকে টিজ করতো। এজন্য আর স্কুলে যাব না বলেও ডিসিশন নিয়েছিলাম। পড়াশোনায় ভালো ছিলাম। এক কাকা আব্বাকে একদিন বলেছিলো, ‘পড়াশোনা করানো বাদ দাও। মেয়ে পড়ায়ে কী হবে?’ এতেও খারাপ লেগেছিল, কেন ছেলে হলাম না?

#

আমার মায়ের উদ্দেশ্যে আমাকে নিয়ে বলা, 'এটা কি জন্ম দিছেন আপনি?'

#

'তুমি তো পাগলি- ঝুগলি, বুঝবা না', 'খালি শরীরটাই বাড়ছে, বুদ্ধি নাই, তাও এমন ভাবে চল'

এমন কথা শুনতে হতো বয়সের চেয়ে বাড়ন্ত বেশি ছিলাম বলে। এমনকি আমার ক্লাস ফোরের ফাইনাল এক্সামে ম্যাম এসে আমি কেনো বাড়ন্ত এর জন্য বাপ মা তুলে কথা শুনিয়েছিলো। Those days are long gone but still pinch me. 

#

‘আহারে মেয়েটা এতিম হইয়া গেলো এই বয়সেই।’

#

স্কুলে একবার আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় এক স্যার বলেছিল, 

'তোমার চেহারা টা আবৃত্তির সাথে যায় না'

এখন অবশ্য আমি আবৃত্তির স্কুলের প্রশিক্ষক

#

ক্রিকেট দেখতাম বলে এক চাচী বলেছিল, ‘মেয়ে মানুষ এসব কি, আমাদের কি মেয়ে নেই। এ কোন স্বভাব।’ কিন্তু আজও আমার মাথায় ঢোকেনা যে শুধুমাত্র টিভিতে খেলা দেখতাম, তার সঙ্গে চরিত্রের কী সম্পর্ক? তাছাড়া বাইরে কোথাও কোনোদিন খেলিনি, যেতামও না কোথাও। শখ করে জার্সি কিনেছিলাম, বেয়াদবি হবে বলে পরা হয়নি কোনোদিন। 

#

ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পরীক্ষা দেয়ার পর শহরে বেড়াতে গিয়েছিলাম, শহরে কাজিনদের টিচার সরাসরি বলল, ‘কী করতে বৃত্তি দিয়েছিস, শহরের ছেলে মেয়েরা গ্রামের স্কুলে গিয়ে পরীক্ষা দেয় আর বৃত্তি তো ওরাই পায়।’ ছোট বয়সে উনার মত একজন সম্মানীত মানুষের কাছে এমন নেগেটিভ কথা শুনে অনেক কস্ট পেয়েছিলাম, পরে বৃত্তি পাওয়ার পর খুব ইচ্ছে করেছিলো উনাকে গিয়ে বলে আসি যে গ্রামের ছেলেরাও বৃত্তি পায় ম্যাডাম।

#

নামাজ পড়তাম না দেখে হুজুর স্যার অনেক অপমান করেছিল ভরা ক্লাসে দাড়া করিয়ে। বাবা-মা নিয়েও কথা বলেছিলেন। স্যারের ছেলে এখন মিডিয়াতে কাজ করে আর আমি ইনশাল্লাহ নামাজ ধরেছি অনেক বছর হয়ে গেছে।

৬২২৭ পঠিত ... ২০:২১, নভেম্বর ২০, ২০২১

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top