ছবিবাবু সৌমিত্র্য: যিনি সংসার করলেন ছবি আর কবিতার সাথে

১৯৩ পঠিত ... ২৩:১৪, অক্টোবর ১৩, ২০২০

১৯৫৬ সাল, ‘নীলাচলে মহাপ্রভু’র অডিশনে ২১ বছরের যুবকটি হেরে গেলেন অসীম কুমারের কাছে। ১৯৫৭ সালে মুক্তি পাওয়া এই জনপ্রিয় ছবিতে শ্রীচৈতন্য রূপে অসীমকুমার তখন বাঙালির মুখে মুখে। সেই সঙ্গে দর্শক হৃদয় জয় করছেন বসন্ত চৌধুরী, নির্মলকুমার, অনিল চট্টোপাধ্যায়, বিশ্বজিৎ কিন্তু সকলের চেয়েই একধাপ এগিয়ে উত্তম কুমার!

১৯৫৯ সালে সেই হেরে যাওয়া যুবকটিই বিশ্বখ্যাত পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের ‘অপূর্ব’ হয়ে পদার্পণ করলেন বাংলা সিনেমার জগতে। চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লো, বাংলা চলচ্চিত্রে এসেছেন আরেক অপ্রতিদ্বন্দ্বী নায়ক, সেই ষাটের দশক থেকে আজ অবধি নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য পর্যায়ে, আজো তিনি তরুন নায়কদের প্রতিদ্বন্দ্বী হন, তিনি ভারতীয় উপমহাদেশের কিংবদন্তি অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

তিনি সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ হতে পারেননি, উত্তম হয়েও ‘মহানায়ক’ এর খেতাব পাননি। কিন্তু হয়েছিলেন জীবনের নায়ক। নিয়মিত কফি হাউসে যেতেন, স্যুটবুট ছেড়ে ধুতি পাঞ্জাবি পরতেন স্বচ্ছন্দে। সত্যজিৎ রায়ের মধ্যমণি ক্রমান্বয়ে তপন সিংহ, মৃণাল সেন, তরুণ মজুমদার, অজয় কর, অসিত সেন, অপর্ণা সেন, ঋতুপর্ণ ঘোষ, গৌতম ঘোষ থেকে শিবু-নন্দিতা সকল খ্যাতনামা পরিচালকদের অপরিহার্য নির্বাচন হয়ে উঠলেন।

বাঙালির আইকনিক ফেলুদা উটের পিঠে চেপে চোর ধরতে যান, এই ফেলুদা চরিত্র করে তিনি নিজেও পরিনত হয়েছেন আইকন-এ। বাংলা ছবিতে ‘সোনার কেল্লা ও জয় বাবা ফেলুনাথ’ এক অনন্য সৃষ্টি। কাজ করেছেন সত্যজিৎ এর ১৪ টি চলচ্চিত্রে, অপুর সংসার থেকে গণশত্রু। মাঝে অশনী সংকেত,তিন কন্যা,দেবী,হীরক রাজার দেশে, অরন্যের দিনরাত্রি, ঘরে বাইরে, শাখা প্রশাখা সহ আরো বেশ কিছু চলচ্চিত্র।

উত্তম কুমারের সাথে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন ‘ঝিন্দের বন্দী’ চলচ্চিত্রে। সুচিত্রা সেনের রূপের মোহে তিনি কখনোই আটকা পড়েননি, কিন্তু ‘সাত পাকে বাঁধা’য় এই জুটির রসায়নে দর্শক ঠিকই মোহে আটকা পড়েছিল। উত্তম-সুচিত্রার বাইরে সৌমিত্র-অপর্ণা জুটিও দর্শকদের হৃদয়ে স্থান নিয়েছিল। মাধবী, শর্মিলা, সাবিত্রী সবাই সাচ্ছন্দ্যে কাজ করেছেন তাঁর সাথে।

উত্তম-সুচিত্রা রক্ষণশীল বাঙালিকে প্রেম করতে শিখিয়েছিল, কিন্তু প্রেমের বিয়ে ভেঙে গেলে কিভাবে তাতে মলম লাগাতে হয় কিভাবে সেই পরিস্থিতি থেকে নিজের উত্তরণ ঘটানো যায় শিখিয়েছিল সৌমিত্র-সুচিত্রা-র ‘সাত পাকে বাঁধা’। আজকের সমাজেও সিনেমাটি একই রকম প্রাসঙ্গিক।

সৌমিত্র অভিনীত আরেক সেরা চরিত্র সুখেন্দু। অপু আর অপর্ণার দাম্পত্য যদি জীবনের বাস্তবতার একপিঠ হয়, তবে আর একপিঠে নিশ্চয়ই থাকবে দাম্পত্যের এই ছবিটিও। আর দু’চোখে যন্ত্রণার কী অসম্ভব অভিব্যক্তি ধরে রেখেছিলেন সৌমিত্র, অথচ কোথাও বিন্দুমাত্র অতিরেক নেই। ১৯৬৩ সালে ‘সাত পাকে বাঁধা’ ছবি যখন করছেন পরিচালক অজয় কর তখনই স্বামীর সঙ্গে সেপারেশন হয়ে যায় সুচিত্রা সেনের।

এই ছবিটি ছিল সুচিত্রার জীবনের সেই সময়েরই প্রতিচ্ছবি। ছবিতে একটি দৃশ্যে সুচিত্রা রাগে সৌমিত্রের পাঞ্জাবী ছিড়ে দিয়েছিলেন। এই ঘটনাটি শুটিংয়ের দিনে তাঁর বাড়িতেই হয়েছিল। কথা কাটাকাটির জেরে স্বামী দিবানাথ সেনের জামা ছিঁড়ে চলে এসেছিলেন সোজা শুটিংয়ে সুচিত্রা।

‘কেউ আমাকে বুঝতে পারেনি। এমনকি সুখেন্দুও না। অথচ, তাকে বোঝাবার জন্য আমি কত চেষ্টাই না করেছি।'– সারা ছবি জুড়ে এক অদ্ভুত সানাইয়ের সুর মন কেমন করিয়ে দেয়।

এছাড়া তাঁর ক্যারিয়ারে আছে ক্ষুধিত পাষান, সংসার সীমান্তে, কোনি, উত্তরণ, দেবদাস, কাঁচ কাটা হীরে, অসুখ, পারমিতার একদিন, তাহাদের কথা, পদক্ষেপের মত চলচ্চিত্র। গত বছরের সর্বোচ্চ বাণিজ্যিক সফল সিনেমা ‘পোস্ত’র প্রধান অভিনেতা তিনি, ‘ময়ূরাক্ষী’তেও ছিলেন সমুজ্জ্বল। চলচ্চিত্র অভিনেতার বাইরেও রয়েছে তাঁর গুণ, তিনি একজন মঞ্চকর্মী, আবৃত্তিকার।

সৌমিত্র যে স্বতন্ত্র ভাবে বাংলা ও বাঙালির হয়ে থাকল, তা আমাদের গর্ব আর গৌরবেরই বিষয়। কলকাতার মতো বড় শহর তার নিজেকে বিচ্ছুরিত করবার যথার্থ আনুকূল্য করেছে। নিজেই সে লিখেছে— ‘ছেলেবেলার ছোট্ট মফস্বল শহর ছেড়ে বড়ো শহরের দিকে চলে এলাম। রবীন্দ্রনাথের শহর, মাইকেলের শহর, বিদ্যাসাগর-বিবেকানন্দের শহর, সুভাষচন্দ্রের শহর ছোট, চেনা পরিবেশের থেকে মুক্ত করে বড়ো পৃথিবীর দিকে মনকে ঠেলে দিল।’ শিশিরকুমার ভাদুড়ীর মতো মেধাবী বিদ্বান ও নাটকে পারদর্শী ব্যক্তিত্বের নিত্য সান্নিধ্য এবং তার পিঠোপিঠি সত্যজিৎ রায়ের মতো ভুবনায়নচেতনাসম্পন্ন শিল্পকুশলী রূপতাপসের সঙ্গ ও স্নেহ দিয়ে সে নিজেকে বড় মাপের গ্রহিষ্ণু আধারে পরিণত করে নিতে পেরেছে।

তিনি কবিতার বৃত্তে ঘুরতে থাকলেন। তাঁর রথের চাকায় অভিনেতা সৌমিত্র, লেখক সৌমিত্র, নাট্যকার সৌমিত্র, কবি সৌমিত্র, গায়ক সৌমিত্র, একলা ঘরে নিজের সঙ্গে কথা বলার সৌমিত্র, জীবনের ধুলোবালিতে ঘুরতে থাকলেন।

কালের রক্তস্রোতে তিনি বারে বারেই প্রথম!

অভিজ্ঞতার মহাসমুদ্র পেরিয়ে, অর্জনের চূড়ায় দাঁড়িয়ে মানুষটির দু’পা এখনও সবুজে গাঁথা। কেননা তাঁর ভেতরখানাও যে সবুজই। এই অক্লান্ত পর্যটককে কুর্নিশ না-জানিয়ে উপায় নেই, উপায় নেই।

তিনি 'অপু'... আবার তিনি 'ময়ূরবাহন'... কখনো তিনি 'ফেলুদা' হয়ে দেখিয়ে দেন মগজাস্ত্রর ক্ষমতা, আবার কখনো কোনির 'ক্ষিতদা' হয়ে শিখিয়ে যান ফাইট করার মন্ত্র... আতঙ্কর অসহায় 'মাষ্টারমশাই' হোক বা ঘরে বাইরের 'সন্দীপ'... সব জায়গায়ই তিনি সমান সাবলীল... তিনি কখনো বা 'উদয়ন পণ্ডিত' হয়ে শিখিয়ে গেছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা

আবার ট্রেন চলবে আর অপু দেখবে না, ভাবতেই তো পারছি না। দুর্গাপুজো, কাশফুল, রেলগাড়ি আর অপু, যে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত আমাদের সঙ্গে। উদয়ন মাস্টার হেরে যাবে এ যে কঠিন কল্পনা। কৃষককে পথ দেখাবে কে? সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় তো শুধু রূপালি পর্দার অভিনেতা নন, উনি আমাদের মনে গড়ে দেওয়া একেকটা চরিত্রের নাম। ক্ষিদদা মনোবল হারিয়ে ফেললে বাঙালি যে জেতার ইচ্ছেটুকুই হারিয়ে ফেলবে।

মগনলালকে জিততে দেওয়া কি ঠিক হবে ফেলুদা? লালমোহন বাবু কিন্তু অপেক্ষায় আছেন, কখন আপনি সুস্থ হয়ে উঠবেন, আর উনি করোনায় শিহরণ লিখবেন। দিনেন লাহিড়ীও তো ছেলে অর্ণব লাহিড়ীর কাছে হারতে শেখেননি, সেই ইগোটুকু বাঁচিয়ে রেখে আরেকবার ফাইট করলে কেমন হয়? অথবা বিশ্বনাথ মজুমদার এই বয়সে এসে আরেকবার প্রেমে পড়ুক না, বাঙালি বুঝুক প্রেম মানে শুধু শারীরিক মিলন নয়।

অথবা দূর পাল্লার ট্রেনে তোমার দরাজ গলার 'হঠাৎ দেখা' শুনে ভাবতে বসি, রাতের সব তারাই কি আছে দিনের গভীরে?
বসন্ত বিলাপের মেয়েগুলোর কিন্তু বড্ড বার বেড়েছে!

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় একটু বেশীই অসুস্থ। অক্সিজেন স্যাচিউরেশন কমের দিকে, অন্যান্য প্যারামিটার ওঠানামা করছে। লালমোহন বাবু হলে বলতেন, ঘাবড়ানোর কিছু নেই। কতো কিছু দেখলাম আর এই করোনা! ধুর মশাই। আসুন পরের ট্রিপ প্ল্যান করি। মাঝে একটা বই বেরিয়েছে, পড়ে দেখুন দেখি, মহামারীতে মহারণ! ফেলুদা আবার এসব নিয়ে ভয় পায় নাকি।

কিন্তু ভয় তো হয়। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় তো স্রেফ একজন অভিনেতা নন। আমাদের এক চলমান নস্টালজিয়া। অপু, ফেলুদা, উদয়ন পন্ডিত, অমল, ক্ষিদদা, ময়ূরবাহন, নরসিং, অসীম, রাজা লিয়ার! হরিদাসের বুলবুল ভাজার ঝুলির মতো কতো স্মৃতি তাকে নিয়ে।

এতো দুর্ধর্ষ দুশমনের সাথে যে লোকটা লড়েছে তাকে এই জীবাণুর সাথেও লড়তে হবে এবার। জান লড়িয়ে দাও ফেলুদা। উদয়ন মাস্টার প্লিজ এবার কিছু একটা করো৷ পাতালঘরের অঘোর সেনকে খবর পাঠাও৷ কোন একটা ভ্যাক্সিন আবিস্কার করুক। দরকার পরলে ন্যাপচা থেকে নিয়ে আসুক মহাঔষধ!

কে তুমি নন্দিনীর সেই বখাটে ছেলেটাকে বাঙালি আজও বড্ড ভালোবাসে তুমি কি তা জান উদয়ন মাস্টার? তাই দড়ি ধরে মারো টান করোনা হোক খান খান।

সৌমিত্রবাবু, এত তাড়াতাড়ি লড়াই ছেড়ে দেবেন না। সুস্থ হয়ে ফিরে আসুন, আবারও মুভিতে নায়ককে ম্রিয়মান করে উজ্জ্বল হয়ে উঠুন আপনি দাদুর চরিত্রেও। আরোগ্য কামনা করি একান্তভাবে। ITU তে ক্ষিদদাকে মানাচ্ছে না।

আপনার কবিতার মতই তিনি প্রাণবান, ভালো থাকুন।

 

জীবন অগাধ

এই এক সমুদ্রের মতো নীল পৃষ্ঠা জুড়ে
শব্দের নৌকো পাল তুলেছে
কচি কচি ঢেউয়ের জলতরঙ্গে
কোথায় যেন কারা গাইছে গান :
প্যার কি কস্তি মে.....

ভালোবাসার বৈঠা হানো সমুদ্রে এবার,
জোর বৈঠা হানো...

১৯৩ পঠিত ... ২৩:১৪, অক্টোবর ১৩, ২০২০

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top