বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু সম্পর্কে আপনি যা নাও জানতে পারেন

৯৯৫৬ পঠিত ... ১৫:৩৫, আগস্ট ১১, ২০২০

চিনতে নাকি সোনার ছেলে
ক্ষুদিরামকে চিনতে?
রুদ্ধশ্বাসে প্রাণ দিল যে
মুক্ত বাতাস কিনতে?

বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুকে নিয়ে লিখেছেন আল মাহমুদ। সত্যিই তো, স্কুল কলেজের বইপত্রে তার নামটা জানলেও এই বিপ্লবী সম্পর্কে কতটুকুই বা আমরা জানি! ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট ভোর ছয়টায় হাসিমুখে ফাসির মঞ্চে গিয়ে দাড়িয়েছিলেন ক্ষুদিরাম। 

এই বিপ্লবী সম্পর্কে এখানে দেয়া হলো এমন কিছু ফ্যাক্টস যা আপনি নাও জানতে পারেন। 

 

১# ক্ষুদিরাম বসু নামের পেছনের কাহিনী 

ক্ষুদিরাম বসু ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দের ৩ ডিসেম্বর মেদিনীপুর শহরের কাছাকাছি (বর্তমানে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা) কেশপুর থানার অন্তর্গত মৌবনী (হাবিবপুর) গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ত্রৈলোক্যনাথ বসু ছিলেন নাড়াজোলের তহসিলদার।তাঁর মার নাম লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবী। 

তিন মেয়ের পর মায়ের চতুর্থ সন্তান ক্ষুদিরাম। দুই ছেলে অকালে মৃত্যুবরণ করেন, তাই ছোট ছেলের মৃত্যুর আশঙ্কায় লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবী তখনকার সমাজের নিয়ম অনুযায়ী তাকে তাঁর বড়ো দিদির কাছে তিন মুঠো খুদের বিনিময়ে বিক্রি করে দেন। খুদের বিনিময়ে কেনা হয়েছিল বলে পরবর্তী সময়ে ক্ষুদিরাম নাম রাখা হয় তাঁর।

 

২# সাহেব মারার বাসনা তার ছোটবেলা থেকেই! 

ক্ষুদিরাম শৈশব থেকেই দুরন্ত ও বেপরোয়া প্রকৃতির ছিলেন। এই দুরন্ত প্রকৃতির সাথে বিপ্লবী চেতনার ছোঁয়া পেয়ে ক্ষুদিরাম যেন এক অগ্নিস্ফুলিঙ্গ হয়ে উঠলেন। বাংলায় গুপ্ত সংঘের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হেমচন্দ্র কানুনগোর সাথে ক্ষুদিরামের প্রথম সাক্ষাতের ঘটনায় তার কিছুটা আঁচ পাওয়া যায়।

ক্ষুদিরামের বয়স তখন তের-চৌদ্দ বছর হবে। একদিন হেমচন্দ্র কানুনগো মেদিনীপুরের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। ক্ষুদিরাম তাকে দেখে দৌড়ে এসে তার বাইক আটকালেন; বললেন, 'আমাকে একটা রিভলবার দিতে হবে।'

হেমচন্দ্র অচেনা অজানা একটা ছোকরার থেকে এই ধরনের আবদার শুনে স্বাভাবিকভাবেই বিরক্ত হলেন। জিজ্ঞেস করলেন, “তুই রিভলবার দিয়ে কী করবি?” ক্ষুদিরাম জবাব দিলেন, “সাহেব মারবো।” এরপর তিনি ইংরেজদের অত্যাচার-নির্যাতনের কাহিনী বলে কেন সাহেব মারবেন সেসব যুক্তি দিতে শুরু করলেন। হেমচন্দ্র সেদিন তাকে ধমক দিয়ে পাঠিয়ে দিলেও তার প্রেরণা দেখে অভিভূত হয়েছিলেন।

গ্রেফতারের পর ক্ষুদিরাম

 

৩# বিপ্লবী ক্ষুদিরামের ভুলত্রুটি

ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল সম্পূর্ণ একনিষ্ঠতা ও ত্যাগের সাথে কাজ করলেও কিছু ভুল তারা করে বসেছিলেন। বিপ্লবীদের তরফ থেকে তাদের ওপর নির্দেশ ছিল যে, তারা যেন মিশনের সময় অন্য কোনো প্রদেশের লোকের অনুকরণে পোশাক পরিধান করে, এরপর মিশন শেষে আবার বাঙালি পোশাক পরে। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে তারা তা করেননি।

ভুল ছিল আরো একটি। রিভলবার জিনিটির প্রতি ক্ষুদিরামের দুর্বলতা ছিল আগে থেকেই। অপব্যবহারের ভয়ে এর আগে এটি তার হাতে দেওয়া হয়নি। কিন্তু এ মিশনে তার এবং প্রফুল্ল দুজনের কাছেই একটি করে রিভলভার দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া ক্ষুদিরাম লুকিয়ে নিজে আরেকটি রিভলবার নিয়েছিলেন অস্ত্রাগার থেকে। বোমা বিস্ফোরণ হওয়ার পর রিভলবার ফেলে দেওয়ার জন্য তাদেরকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রিভলবারের প্রতি আকর্ষণের কারণেই সম্ভবত ক্ষুদিরাম সেটি করতে পারেননি। পরদিন তাকে যখন ধরা হয়, তখন তিনি দু’হাতে খাবার খাচ্ছেন আর পাতলা জামার দুই পকেটে ঝুলছে দুইটি রিভলবার ।

এছাড়া তাদের বলা হয়েছিল ধরা পড়লে উকিলের সাথে পরামর্শ করা ব্যতীত যেন মুখ না খোলে। কিন্তু ক্ষুদিরাম ধরা পড়ার পর ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তবে অবশ্য সেখানে তিনি তার আর প্রফুল্য ব্যাতীত গুপ্তসংঘের কারো কথা উল্লেখ করেননি। বলেছিলেন সব পরিকল্পনা তারা দুজন মিলেই করেছিলেন। এভাবে তিনি গুপ্ত সংঘকে সন্দেহের বাইরে রাখার চেষ্টা করেন। আর ওদিকে প্রফুল্ল তো গ্রেফতার এড়াতে আত্মহত্যাই করে ফেলেন। 

 

৪# ক্ষুদিরামকে নিয়া লেখা সেই বিখ্যাত বিপ্লবী গান 

একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি
হাসি হাসি পরবো ফাঁসি দেখবে ভারতবাসী
কলের বোমা তৈরি করে
দাঁড়িয়ে ছিলেম রাস্তার ধারে
…. মাগো ……..
বড়লাটকে মারতে গিয়ে
মারলাম আরেক ইংল্যান্ডবাসী।

এ গানটি অনেকটাই বলে দেয় বিপ্লবী ক্ষুদিরাম দাসের স্বরূপ।

লতা মুঙ্গেশকরের গলায় গাওয়া এই গান বিপ্লবী গানের ইতিহাসে অবিস্মরণীয়। মজার ব্যাপার হলো, অনেকেই এই গানটির রচয়িতার নাম জানে না। গীতিকারের নাম পীতাম্বর দাস।  

ক্ষুদিরামের ফাঁসির রায়ের কপি

 

৫# ফাসির রায় শোনার পরে ক্ষুদিরামের সর্বশেষ ইচ্ছা 

পরাধীন ভারতবর্ষের মানুষ স্বাধীনতার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল। দেশের মানুষের মুক্তির সেই আকুতিকে বুকে ধারণ করেছিল ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকীর মতো বিপ্লবী কিছু কিশোর। জীবনের মতো অমূল্য সম্পদকে তুচ্ছজ্ঞান করে ওরা দেশের শত্রুদের তাড়িয়ে দিতে বন্ধুর পথ বেছে নিয়েছিল। তাদের সেই অসীম সাহসিকতা ইংরেজদের ভীত নাড়িয়ে দিয়েছিল। ইংরেজরা ফাঁসিতে চড়িয়েছিল ক্ষুদিরামকে। ফাঁসির মঞ্চেও মাথা উঁচু করে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন কিশোর ক্ষুদিরাম। ফাঁসির রায় শোনাবার পর তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল—কী তাঁর শেষ ইচ্ছা? 

ক্ষুদিরাম দৃঢকণ্ঠে বলেছিলেন, তিনি দেশের মানুষকে বোমা বানানো শিখিয়ে যেতে চান! 



৬# ফাঁসির আগে শেষ কথা কী ছিলো ক্ষুদিরামের?  

১১ আগস্ট, জেলের ভিতরে ডানদিকে একটু দূরে প্রায় ১৫ ফুট উঁচুতে ফাঁসির মঞ্চ। দুই দিকে দুই খুঁটি আর একটি মোটা লোহার রড যা আড়াআড়িভাবে যুক্ত তারই মাঝখানে বাঁধা মোটা একগাছি দড়ি ঝুলস আছে। তার শেষ প্রান্তে একটি ফাঁস। এরপরেই ক্ষুদিরামকে নিয়ে আসে চারজন পুলিশ। 

তথ্য বলছে, ক্ষুদিরামই হাঁটছিলেন আগে। যেন তিনিই সেপাইদের টেনে আনছেন। এরপর সে উপস্থিত আইনজীবীদের দিকে তাকিয়ে হাসে। এরপর ফাঁসির মঞ্চে উপস্থিত হলে তার হাত দুটি পিছন দিকে এনে বেঁধে দেওয়া হয়। জল্লাদ তখন শেষ মুহূর্তের কাজ করছিল। গলায় ফাঁসির দড়ি পরানো মাত্রই দামাল ছেলের প্রশ্ন, 'ফাঁসির দড়িতে মোম দেওয়া হয় কেন?'

এটাই ছিলো তার শেষ কথা যা চমকে দিয়েছিল জল্লাদকেও।

৯৯৫৬ পঠিত ... ১৫:৩৫, আগস্ট ১১, ২০২০

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top