বইপড়ুয়াদের বন্ধু নীলক্ষেতের একজন মোস্তফা মামা  

২৭৩ পঠিত ... ১৯:০৭, জুন ২৯, ২০২০

নীলক্ষেতে একটা দোকান থেকে বই চুরি করতে গিয়া ধরা খাইলো এক বইচোর। আশেপাশের লোকজন চোররে ধইরা আটকাইলো। চোর বইটা যে দোকান থেকে চুরি করতে নিছিলো সেই দোকানদার কিন্তু বললেন চোররে ছেড়ে দিতে। 

বিনা শাস্তিতে চোরকে ছেড়ে দেয়ার কারণ কী? 

দোকানদারের যুক্তি, শুধু চুরি করার জন্যে চুরি করলে চোর একটা বই বেছে চুরি করতো না। বইটা তার পছন্দ হইছে। হয়তো টাকা নাই, বা অন্য কোনো সমস্যার কারণে চুরি করতে চাইছে। 

সেই চোরকে ছাইড়া দেয়া তো হইলোই, সাথে বইটা দিয়া বলা হইলো পরে তার সুবিধামতো টাকা দিয়া যাইতে।

এই দোকানদারের নাম মোস্তফা। ঢাকার বুকিশদের অতি প্রিয় মোস্তফা মামা। যদি বলি, নীলক্ষেতে বইপত্র কেনা লোকজনের কাছে উনি একজন ছোটখাটো লেজেন্ড, তাইলে অতিরঞ্জন সামান্যই হবে। মোস্তফা মামা  'মোস্তফা বইঘর'-এর দোকানদার। না, ভুল বললাম। বলা উচিত মোস্তফা বইঘরের সাবেক দোকানদার। মোস্তফা বইঘরের দোকানদার এখন আর তিনি নাই।

সর্বশেষ খবর, নীলক্ষেতের অতিপরিচিত প্রিয় মোস্তফা মামা তার দোকান বিক্রি করে দিছেন। ঢাকার বই পড়ুয়াদের একটা বড় অংশ খবরটায় মর্মাহত। করোনার ধাক্কায় সমাজের সব ক্ষেত্র বিপর্যস্ত, বন্ধ হয়া গেছে অজস্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। মানুষ হারাইতেছে তাদের জীবন-জীবিকা। এই সংকটের সময় বেচাবিক্রি না থাকায় মোস্তফা মামাও বাধ্য হইছেন তার দোকান বেচে দিতে।

ঢাকার বুকিশমাত্রই জানে, ‘বাংলাদেশের বইয়ের বেহেশত’টার নাম নীলক্ষেত। না, বাংলাবাজার না। শাহবাগের আজিজ মার্কেট, কিংবা বাংলামোটর অথবা কাটাবনের কনকর্ড এম্পোরিয়ামও না। একমাত্র নীলক্ষেত। আর নীলক্ষেতে যাতায়াত আছে বা ছিলো এমন বইপড়ুয়াদের কাছে একটা চেহারা খুব পরিচিত। মোস্তফা বইঘরের মোস্তফা মামা। 

নীলক্ষেতের মোস্তফা মামা, ঢাকার পড়ুয়াদের প্রিয়জন

লম্বাটে চেহারা। ভাঙা গাল। মুখে প্রায়শই খোচাখোচা দাড়ি। 

মুখভর্তি দাড়িও দেখা যাইতো তবে অনিয়মিত- হয়তো দাড়ি কামাইতে ভুলে যাইতেন। লিকলিকে শরীর। নীলক্ষেতের অন্যান্য দোকানদারদের তুলনায় পোষাকেও নাই তেমন কোনো পরিপাট্য। সবকিছুর মধ্যে ছিলো এক ধরণের অগোছালো ভাব। আসলে তার পরিপাট্য বাইরের ছিলো না, ছিল ভেতরে। তার দোকানের শেলফে বিষয়ভিত্তিক সাজানো সারি সারি  বইয়ের মতোই বাংলা বই বিষয়ক যে সুবিশাল তথ্যভান্ডার ছিলো তার মাথার ভিতরে সেইটা ছিলো অত্যন্ত পরিপাটি। 

পটুয়াখালির কলাপাড়া উপজেলা থেকে চলে উনিশ শ' নব্বই সালের দিকে ঢাকায় আসেন তিনি। ঢাকায় এসে শুরু করলেন বইয়ের ব্যবসা। প্রথমে ফুটপাথে, পরে দোকানও নিলেন। এই মানুষটা পরবর্তীতে  হয়া উঠলেন ঢাকার বই পড়ুয়াদের এক পরম বন্ধু। গত ত্রিশ বছরে হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন, সলিমুল্লাহ খান থেকে শুরু করে আমাদের জেনারেশন পর্যন্ত অসংখ্য মানুষের প্রয়োজনীয় বইপত্রের যোগান দিয়ে গেছেন মোস্তফা মামা। তাকে চেনে না  বা চিনতো না নীলক্ষেতে এমন বইপড়ুয়া বাটি চালান দিয়া খুজে বের করতে হবে।  

আরও অনেক দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। এর আগেও আজিজ মার্কেট বা কাটাবনের কয়েকটা বইয়ের দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু  নীলক্ষেতের ম্যাগাজিনগলির পেছনে  ঘুপচি টাইপ ছয় ফুট সাইজের ছোট্ট একটা দোকান বন্ধ হয়া যাওয়া কেন এতো মানুষরে একসাথে মর্মাহত করলো?

আপনি তাকে চিনলে  বরং উল্টা প্রশ্ন করতেন, মর্মাহত হবে না কেন?

আমি বলতেছি, কেন এতো এতো বইপ্রেমী খবরটায় কষ্ট পাইলো। 

আপনি যদি কখনও নীলক্ষেতের বইয়ের দোকানগুলিতে একটু-আকটু ঘুরেও থাকেন দোকানদারদের একটা বৈশিষ্ট্যে অবাক না হইয়া পারবেন না: নীলক্ষেতের কোনো দোকানদার 'বইটা নাই' এই কথা কখনও মুখে আনবে না। আপনি যদি জিজ্ঞেস করেন, 'আচ্ছা আদি আরামায়িক ভাষায় ছাপা ওল্ড টেস্টামেন্টের কোনো অরিজিনাল কপি হবে?' সে দুই সেকেন্ড ভাববে তারপর বলবে, ‘এক মিনিট দাড়ান।’ বইলা পাশের গলির দোকানে খুজতে যাবে। কিন্তু আপনারে বলবে না বইটা তার কাছে নাই। সে যেকোনোভাবে আপনারে তার দোকানের ক্রেতা বানাবে। প্রয়োজনে অন্য দোকান থেকে বইটা নিজে কিনে এনে আপনার কাছে বেচবে। 

মোস্তফা মামা কেন ঢাকার বুকিশদের কাছে একজন মাইনর কাল্ট হয়ে গেছেন?

আপনি তাকে যে কোন বইয়ের নাম বলবেন আর সে চোখ বন্ধ করে সেই বইটার লেখকের নাম, প্রকাশনীর নাম, গায়ের দাম গড়গড় করে বলে দিতে পারবে। তার চাইতেও জাদুকরী ব্যাপার হইলো, বাংলা ভাষার যেকোনো আউট অফ প্রিন্ট বই, দরকারি কিন্তু কোথাও পাওয়া যায় না এমনসব বিরল বই সে আপনাকে আইনা দিতে পারবে। নীলক্ষেতে অন্য কোনো দোকানদার এই কাজে মোস্তফা মামার মতো সুদক্ষ ছিলেন না। আমার নিজের নেশা ছিলো অবস্কিওর বইপত্র সংগ্রহ আর পড়ার। ২০১২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মোস্তফা মামার কাছ থেকে অজস্র বই আমি কিনছি। অবস্কিওর বইপত্রের ব্যাপারে মোস্তফা মামা একজন জলজ্যান্ত এনসাইক্লোপিডিয়া। কোন বিষয়ের কোন বইটা কোথায় খুজে পাওয়া যাবে এই ব্যাপারে তার মতো নির্ভরযোগ্য গাইড পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। 

আমরা তার গুণমুগ্ধ ক্রেতারা ঠাট্টা করতাম যে, তার মৃত্যুর পর কবরে ফেরেশতারা যখন প্রশ্ন করবেন, তখন মোস্তফা মামা কোন কোন বইয়ের নাম বলবেন? 

তবে সত্যের খাতিরে একটা কথা বলে নিই। অনেকে এখন অতি আবেগে হয়তো বলতেছেন মোস্তফা মামা সবচাইতে কম দামে বই বেচতেন। কথাটা সত্যি না। তিনি অনেক কম দামি বই গায়ের দামে বেচতেন। আমি এমনকি বেশ কিছু ছেড়াখোড়া বই তার কাছ থেকে এমনকি গায়ের দামের দেড়গুণ মুল্যেও কিনছি। তাতে আমার বিন্দুমাত্র অসন্তোষ নাই। কারণ তার কাছ থেকে আমি এমনসব পুরান বই পাইছি যা আমি অনেক চেষ্টা করেও অন্য কোথাও পাই নাই। এন্টিক জিনিস কিনলে আপনারে দাম তো একটু বেশি দিতেই হবে। 

বুকিশরা তাকে ভালোবাসে, ভালোবাসতো, কারণ মোস্তফা মামা শুধু ‘বইয়ের বিক্রেতা’ ছিলেন না। তিনি নিজেও ছিলেন একজন নিখাঁদ বইপ্রেমী। বইঅন্তঃপ্রাণ মানুষ। বুকিশমাত্রই জানে আরেকজন বুকিশের কাছ থেকে বই নেয়া বা কেনার আনন্দ কতটা গভীর।

তার বইয়ের দোকানটা বিক্রি করে দেয়া ঘটনারে বাংলাদেশের সাহিত্য বাজারের অসাধারণ এক বর্ণময় ইতিহাসেরই সমাপ্তি বলা যায়। 

ভালো থাকবেন মোস্তফা মামা। আপনারা ছিলেন বলেই হয়তো আমরা, আমি ও আমার মতো আরও অনেকে, বইয়ের গন্ধ ভালোবাসতে শিখছি। কালো কালো অক্ষরের  অনাবিষ্কৃত ও অনাস্বাদিত অদ্ভুত এক পৃথিবীর প্রেমে পড়ে গেছি আমরা।

ফোনে তার সাথে কথা বললাম। কেন দোকান বিক্রি করে দিলেন? কী করবেন এখন?

জানাইলেন গ্রামে গিয়া ছোট একটা দোকান দেবেন। জানাইলেন, পরিস্থিতির উন্নতি হইলে আবার তার বইয়ের ব্যবসায় ফেরার ইচ্ছা আছে। 

পরিস্থিতি তেমন উন্নতি কি আর হবে? কে বলবে?

২৭৩ পঠিত ... ১৯:০৭, জুন ২৯, ২০২০

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top