আগস্ট ১৪ ও 'অশ্লীলতা' বিরোধী ক্যাম্পেইন

৩২৯৩ পঠিত ... ০৬:১০, জুন ১৫, ২০২০

২০১৩ সালের মালিবাগের চামেলীবাগে এক ফ্ল্যাটে এক কিশোরী কফির সঙ্গে ঘুমের বড়ি খাইয়ে বাবা-মাকে কুপিয়ে হত্যা করে। নামকরণ, সিনেমার বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন দৃশ্য, 'সত্য ঘটনা অবলম্বনে' বলা ইত্যাদির কারনে শিহাব শাহীন পরিচালিত ওয়েব সিরিজ '১৪ আগস্ট' যে আসলে চাঞ্চল্যকর সেই ঐশী কেসের ফিকশনাল রূপ, তাতে কারও সন্দেহ থাকার কথা না। পরিচালকও সেটা শুরুতেই জানিয়ে দিয়েছেন যদিও সিনেমায় চরিত্রদের নাম ধাম বদলে দিয়েছেন। 

ওয়েব সিরিজটি নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা-বিতর্ক। বিতর্কের একটি কেন্দ্রীয় বিষয় বাংলাদেশের সিনে-আলোচনার সবচেয়ে পুরোনো: অশ্লীলতা। সিরিজের একটি সংক্ষিপ্ত রিভিউ-এর পর কথা বলবো সেটি নিয়েও। 

১.
পরিচালক শিহাব শাহীন গল্পটা শুরু করেছেন হত্যাকান্ডের পর থেকে। মূল চরিত্র তুশির হাত ধরে দর্শক গল্পের ভেতরে প্রবেশ করতে থাকে। বাবা-মাকে হত্যার পর সে কীভাবে পালাতে চায়, কিভাবে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে আর শেষপর্যন্ত পুরো ঘটনা সে বিস্তারিত জানায়ে- কাহিনী আগায় এই ধারাবাহিকতায়।

রিয়েল লাইফ কেসের প্লটের মতো হলেও নেপথ্য সঙ্গীতের মাধ্যমে তৈরি রোমাঞ্চকর ও ভীতিপ্রদ আবহ থ্রিলারপ্রেমীদের ভালো লাগার কথা৷ শতাব্দী ওয়াদুদ, শহীদুজ্জামান সেলিমসহ ওভারঅল সবার অভিনয়ই ভালো ছিলো। কেউই অতিনাটকীয় বা ফিল্মী অভিনয় করেননি। ফলে এক ধরণের ডার্ক আন্ডারটোন ছিলো যা পুরো সিরিজটির বিষয় ও ভাবের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিলো৷ সিরিজের আরেকটা দিক উল্লেখ করা দরকার। সেটি হলো টিপিক্যাল বাংলাদেশি সিনেমার মতো অহেতুক কমিক রিলিফ আনার চেষ্টা করেননি পরিচালক। 

সবচেয়ে ভালো করেছেন মূল চরিত্র তুশির ভূমিকায় অভিনয় করা তাসনুভা তিশা। সিরিজটির অন্য সবার অভিনয়কে ছাপিয়ে গিয়েছে মানসিকভাবে অপ্রকৃতস্থ ও মাদকাসক্ত এক কিশোরীর ভুমিকায় তার অভিনয়।  তাসনুভার দেহ ও মুখের ভাষা-ভঙ্গি এক কথায়  ছিলো অনবদ্য। সবাই যে বলছে, তাসনুভা সম্ভবত এখন পর্যন্ত তার ক্যারিয়ার সেরা কাজটি করেছে এই সিরিজে, সেই কথায় সত্যি আছে। 

 

২.
আগস্ট ১৪-তে প্রচুর গালাগালি আছে। আছে পর্ন দেখে মাস্টাবেশনের দৃশ্য বা চুম্বন দৃশ্য অনেকের কাছে যা  ভালো না লাগতেই পারে। বাস্তবে, দৈনন্দিন জীবনে আমরা এমন ভাষা কিন্তু অনেককেই ব্যবহার করতে দেখি। এমন কিছু দৃশ্য ছিল যা সপরিবারে দেখার মতো না। আপনাকে সপরিবারে দেখতেই বা হবে কেন?  আপনারা যদি বিদেশি সিরিজ বা সিনেমা দেখেন সেগুলোর কয়টা ঠিক সপরিবারে দেখার মতো? সপরিবারে কোন বিদেশি সিরিজ আপনি স্ট্রিমিং করেছেন সর্বশেষ? আমাদের মনে হয় দেশের এই বস্তাপচা 'পরিবারের সবাইকে নিয়ে' ধারণা থেকে বের হওয়ার সময় হয়েছে। 

অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এসেও এসব সেন্সর করতে হলে তো ভাই সমস্যা। একজন খুনি ছুড়ি দিয়ে রক্তে কব্জি ডুবিয়ে হত্যা করতেই পারে- এগুলো দেখালে হত্যা, রাহাজানি, ধর্ষণ বেড়ে যায় এগুলো বাজে কথা। এগুলো বাস্তব পৃথিবীকে পর্দায় নিয়ে আসে। তেমনি আগস্ট ১৪-তে সেটাই ঘটেছে। সিনেমায় যৌনতা-অযৌনতা, সহিংসতা সবই আসবে। 

তাছাড়া এসব সিন না থাকলে কী হতো? 

না থাকলে তুশির ক্যারেক্টার বিলিভেবল হতো না। কাহিনীর চিত্রায়ন বাস্তবানুগ হতো না। এই বাস্তবানুগ হওয়ার কথায় মনে হলো শিহাব শাহীন আরেকটা কারণেও ধন্যবাদ পেতে পারেন৷ সেটা হলো ঢাকার জীবনযাপন, মালিবাগ, চামেলিবাগ বা বেইলিরোডের রাস্তাঘাট, বাড়িঘর দোকানপাট মানুষজন, ১৪-ই আগস্টের মাইকে বঙ্গবন্ধুর সাত-ই মার্চের ভাষন বাজতে থাকা কিংবা ঐসময়ের হিট হিন্দিগান লুঙ্গিডান্স বাজতে থাকা ইত্যাদি অনুষঙ্গ শিহাব এত ভালোভাবে তুলে ধরেছেন যে তা কাহিনীকে আরও বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে। 

এর বাইরে অনেক কিছুই খুব একটা ভালো হয়নি এও সত্য। 

কালারগ্রেডিং বাজে। সিনেমাটোগ্রাফি সাধারণ মানের। সেট ডিজাইনও তেমন। হয়তো আরও বেশি বাজেট পেলে এগুলো আরেকটু ভালো হতেও পারতো। অভিনয় আর সংলাপের জন্যে সিরিজটা অনেকটা উতরে গেছে। 

সব মিলে আহামরি কোনো সিরিজ না হলেও বাংলাদেশি স্ট্যান্ডার্ডে বিবেচনা করলে ভালোই বলা যায়। আহামরি না হলেও, এটা অন্তত প্যাকেজ নাটক টাইপ হয়নি। চলমান একটা প্রথা তো ভেঙেছে এই সিরিজ। এই ধরনের কাজ ফলে দেশে আরও অনেক বেশি হওয়া উচিত। অনেক বেশি হলে কয়েক বছর পর হয়তো আমরা ভালো আন্তর্জাতিক মানের সিরিজ বা সিনেমা পেতেও পারি। 

 

৩.
সম্প্রতি বেশ কিছু ওয়েব সিরিজ  রিলিজের পর থেকে দেশের মূলধারার মিডিয়া তথাকথিত 'অশ্লীলতা' বিরোধী যে ক্যাম্পেইন ও প্রপাগান্ডা শুরু করেছে তা আতঙ্কজনক। শিল্পের স্বাধীনতা, অন্যের রুচি ডিক্টেইট করতে গায়ের জোর দেখানো সংস্কৃতি তৈরির সম্ভাবনা তৈরি করবে। শিল্পী ও শিল্পের স্বাধীনতা ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হওয়ার  পথ তৈরি করতে পারে। 

মিডিয়ার উস্কানিতেই আদালত ইন্টারনেটে এই সিরিজটি বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। সব মিলিয়ে সেটা যে হাস্যকর রকম অবিবেচনার কাজ হলো, এ ব্যাপারে সন্দেহ থাকা উচিত না। এ দেশের নানান ক্ষেত্রের 'কর্তৃপক্ষের' ভাবভঙ্গি দেখে মনে হয়, তারা পারলে সারা দুনিয়ার ইন্টারনেটই বন্ধ করে দেয়, সব কিছু নিজের মর্জিমতো চালায়!

সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, 'অশ্লীলতা বিরোধী' যেকোনো প্রপাগান্ডা/ক্যাম্পেইন দেখলেই আমরা হরে দরে মোল্লাদের দোষারোপ করে থাকি। তাতে সত্যি আছেও।  কিন্তু শিহাব শাহীনের এই ওয়েব সিরিজের কারণে দেখা গেলো, মূলধারায় মিডিয়া বা মূলত প্রগতিশীল-ভেকধারীরাই এইসব কর্মকান্ডে অগ্রগামী হয়ে যাচ্ছেন। মোস্তফা সরোয়ার ফারুকীর 'থার্ড পার্সন সিঙ্গুলার নাম্বার' বা রুবাইয়াত হোসেনের মেহেরজানের সময় বাংলাদেশের তথাকথিত প্রগতিশীল মিডিয়ার আসল চেহারা উন্মোচিত হয়ে গেছে। অন্যের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করা মনে আপনার অপছন্দ হলেও অন্যকে সেই কাজ করতে দেয়া, অন্যকে তাদের কথা বলতে দেয়া-যতক্ষণ না পর্যন্ত সেই কথা বা কাজ সমাজের ক্ষতি করে। আমাদের মিডিয়া ও সুশীল সমাজের এই বোধোদয় কবে হবে কে জানে! অবশ্য সেটি দীর্ঘদিন ধরে না করতে পারলে নতুন দিনে তারা নিজেরাই সমাজে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে। 

এরা ভুলে যায় যে, ইন্টারনেট খুবই সেগ্রেগেটেড একটি মিডিয়া। পরিবারের সবাইকে নিয়ে ইন্টারনেটে কেউ কিছু দেখে না বা করে না। ইন্টারনেটে ব্যক্তির গতায়াত সবসময়ই পারসোনালাইজড। আপনি গুগলে একটা কিছু সার্চ করলে যে রেজাল্ট গুগল দেখাবে সেই একই জিনিস আরেক ব্যক্তি করলে গুগল ভিন্ন রেজাল্ট দেখাবে। ইন্টারনেট দুনিয়া এমনই পারসোনালাইজড। ফলে ইন্টারনেটের পারসোনালাইজড দুনিয়ার বাংলা মুভি/সিরিজে তথাকথিত 'যৌনদৃশ্য' বা সহিংসতা কেমন থাকবে নাকি থাকবে না তা আদালতের সেন্সর করতে চাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না৷ মানুষের রুচির ঠিকাদারি করা বা মাতব্বরী করা, তা সে যে-ই করুক, তীব্রভাবে অনুচিত।

৩২৯৩ পঠিত ... ০৬:১০, জুন ১৫, ২০২০

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top