করোনা সংক্রমণের ছয় ধাপ: ইতালি থেকে আমরা যে শিক্ষা নিতে পারি

৪৯১০ পঠিত ... ০০:২৫, মার্চ ২২, ২০২০

জেসন ইয়ানোউইটজ লিস্ট করেছেন ইতালির করোনাভাইরাস সংক্রমণের ৬টি ধাপ, বাকি সবার জন্য। ইংরেজি থেকে লেখাটি অনুবাদ করেছেন আসিফ শাহরিয়ার সুস্মিত

আমার ধারণা সকলেই জানে, ইতালি কোয়ারেন্টাইনে আছে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের জন্য। পরিস্থিতি খারাপ, এবং অধিকতর খারাপ হচ্ছে এই ব্যাপারটা যে বাকি দেশের জনগণের এমন ভাব যে তাদের কিছুই হবে না। আমরা জানি আপনারা কী ভাবছেন, কারণ আমরাও তাপনাদের জায়গায় ছিলাম। চলুন দেখি কীভাবে ঘটনাগুলো ঘটল:   

ধাপ-১ 

আপনি হয়তো শুনেছেন করোনাভাইরাস বলে একটা কিছু আছে। এবং আপনার দেশে প্রথম সংক্রমণের কথা জানা যায়। সমস্যা নেই! এটা কেবলই একটি ব্যাড রেজাল্ট আমি তো আর ৭৫+ বছরের বৃদ্ধ না, আমার আর কী বা হবে! আমি নিরাপদেই আছি। বাকি সবাই ওভাররিয়েক্ট করছে। এত মাস্ক পরে ঘোরার আর টয়লেট পেপার স্টক করার মানে কী! আমি আমার জীবন আগের মতই কাটাবো। এত প্যানিক করার কিছুই নেই। 

 

ধাপ-২ 

সংক্রমণের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠেছে। তারা(কর্তৃপক্ষ) দেশে ‘রেড জোন’ আর ‘কোয়ারেন্টাইন জোন’ ডিক্লেয়ার করে দুই একটা ছোট এলাকাকে, যেখানে তারা প্রথম সংক্রমণের ঘটনা পায় এবং বেশকিছু মানুষ যেখানে ইনফেক্টেড হয়ে পড়ে (ফেব্রুয়ারি ২২)। 

আচ্ছা, তো এটা একটা দুঃখজনক ঘটনা এবং বেশ চিন্তারও, কিন্তু তারা তো পরিস্থিতির দেখভাল করছে এবং এত প্যানিক করার কিছু নাই। কিছু মৃত্যু হচ্ছে, কিন্তু তারা সবাই বৃদ্ধ ছিল এবং মিডিয়াগুলো কেবলই ভিউ বাড়াতে প্যানিক সৃষ্টি করছে। কী লজ্জার একটা ব্যপার!! মানুষজনের জীবন তো আগের মতই চলে যাচ্ছে! আমি একেবারেই বাইরে যাওয়া আর আমার বন্ধুদের সাথে দেখা সাক্ষাত যাওয়া বন্ধ করছি না। আমি নিজেকে বিরত রাখব কেন! সবাই ভালই আছে।

 

ধাপ-৩ 

আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা দ্রুত হারে বেড়ে চলেছে। প্রায় একদিনেই সংখ্যাটা দ্বিগুণ হয়ে গেছে। মৃতের সংখ্যাও বেড়েছে। যেই ৪ জায়গা থেকে বেশিরভাগ আক্রান্ত লোক পাওয়া যাচ্ছে, সেসব স্থানকে তারা (কর্তৃপক্ষ) রেড জোন এবং কোয়ারেন্টিন ঘোষণা করে (মার্চ ৭)।

ইতালিতে শতকরা ২৫ ভাগ মানুষ কোয়ারেন্টিনের মধ্যে আটকা পড়ে আছে। স্কুল কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ। কিন্তু দোকান, কর্মস্থল, রেস্টুরেন্ট ইত্যাদি ঠিকই খোলা। রেড জোন ঘোষণা করার তথ্য আগেভাগেই খবরের কাগজে চলে আসায় ১০,০০০ এর মত লোক রেড জোন থেকে পালিয়ে ইতালির অন্যত্র চলে যায় একরাতের মধ্যেই (এটা পরে গুরুত্ববাহী হয়ে উঠবে)। ইতালির শতকরা বাকি ৭৫ ভাগ মানুষের জীবন আগের মতই চলতে থাকে।

তারা পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পারে না। যেখানেই আপনি যা্ন, লোকে বলে হাত ধুতে, বড় জমায়েতে না যেতে। প্রতি ৫ মিনিট পর পর টিভিতে এগুলো দেখানো হয়। কিন্তু লোকের মাথায় এগুলোর কিছুই ঢোকেনি এখনো।

 

ধাপ-৪ 

আক্রান্তের সংখ্যা ভয়াবহভাবে বাড়ছে। সকল স্কুল কলেজ এবং ইউনিভার্সিটি অন্তত এক মাসের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এটা একটা ন্যাশনাল হেলথ ইমারজেন্সি। হাসপাতালগুলো  তার পূর্ণ ধারণক্ষমতায় পৌঁছে গেছে। কোথাও কোথাও হাসপাতালের পুরো ইউনিটকে খালি করে দেওয়া হচ্ছে করোনাভাইরাস পেশেন্টের চিকিৎসার জন্য। কিন্তু এদিকে যথেষ্ট ডাক্তার এবং নার্স নেই। তারা অবসরপ্রাপ্তদেরকেও ডাকছে, এবং ডাকছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ দুই বছরের শিক্ষার্থীদের। কোন শিফট নেই আর, যত বেশি কাজ করতে পারো, ততটাই করে যাও। এদিকে ডাক্তার এবং নার্সরা আক্রান্ত হচ্ছে, এবং রোগ ছড়িয়ে দিচ্ছে নিজের পরিবার পরিজনের মধ্যে। 

নিউমোনিয়ার পেশেন্ট অনেক বেড়ে গেছে। অনেক মানুষেরই আইসিইউ সাপোর্ট দরকার পড়ছে, কিন্তু এত ইউনিট ফাঁকা নেই। এই অবস্থায় এসে ব্যপারটা অনেকটা যুদ্ধের মত হয়ে গেছে। ডাক্তারদের সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে যে কার বাচার সম্ভবনা কত– এবং সেটার উপরে নির্ভর করছে সে চিকিৎসা পাবে কিনা। এর মানে হচ্ছে বয়স্ক এবং ট্রমা/স্ট্রোকের রোগীরা চিকিৎসা পাচ্ছে না, কারণ করোনার পেশেন্টরা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু সবার জন্য রিসোর্স নেই, তাই যা আছে, তাকেই সবার জন্য কার্যকরভাবে বণ্টন করতে হচ্ছে। আমার বলতে খারাপ লাগছে, কিন্তু এটাই হয়েছে। মানুষ মারা গেছে, কারণ তাদেরকে বাঁচানোর মত জায়গা ছিল না।

আমার এক বন্ধু ডাক্তার। সে আমাকে ফোন দিয়েছিল বিপর্যস্ত অবস্থায়; কারণ তার ৩ জন পেশেন্টকে মারা যেতে দিতে হয়েছিল সেদিন তাকে। নার্সরা কাঁদছিল কারণ তাদের সামনেই রোগীরা মারা যাচ্ছিল এবং তাদেরকে অক্সিজেন দেওয়া ছাড়া তাদের কিছুই করার ছিল না। এক বন্ধুর আত্মীয় মারা গেছে গতকাল এদিকে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার অভাবে। নৈরাজ্য বিরাজ করছে, সিস্টেম কলাপ্স করছে। করোনাভাইরাস এবং এর ফলে উদ্ভূত সংকটের কথাই চারিদিকে শোনা যাচ্ছে কেবল।  

 

ধাপ-৫  

মনে আছে সেই ১০ হাজার ইডিয়টের কথা যারা রেড জোন থেকে পালিয়ে গিয়েছিল ইতালির বাকিসব স্থানে? এখন তাদের জন্য গোটা ইতালিকেই কোয়ারেন্টাইন ঘোষণা করতে হবে (মার্চ ৯)। লক্ষ্য হচ্ছে ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়াকে ধীরগতির করে দেওয়া। মানুষ কর্মস্থলে যাচ্ছে, খাদ্যদ্রব্য কিনছে, ফার্মেসিতে যাচ্ছে। সকল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও খোলা, কেননা নাহলে গোটা দেশের অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়বে (যদিও আসলেই ভেঙ্গে পড়তে শুরু করেছে এর মধ্যেই)। কিন্তু আপনি আপনার এলাকা থেকে উপযুক্ত কারণ ছাড়া বের হতে পারছেন না।

এখন চারিদিকে ভয় ছড়িয়ে পড়েছে। আপনি চারপাশে  মাস্ক এবং গ্লোভস পরা অনেক মানুষ দেখছেন কিন্তু তারা এখনো ভাবছে তাদেরকে রোগ স্পর্শ করবে না। এরা রেস্টুরেন্টে যাচ্ছে বড় দল করে, এবং বন্ধুবান্ধবদের সাথে সমবেত হচ্ছে ইত্যাদি। 

 

ধাপ-৬ 

২ দিন পরে ,এটা ঘোষণা করা হয় যে (প্রায়) সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। বার, রেস্টুরেন্ট, শপিং সেন্টার, সকল ধরণের দোকান। সুপারমারকেট এবং ফার্মেসি ছাড়া সবই বন্ধ। আপনার সাথে লিখিত সার্টিফিকেট থাকলেই শুধু আপনি বাইরে ঘোরাফেরা করতে পারবেন। এই সার্টিফিকেটটি একটি অফিশিয়াল ডকুমেন্ট,যেখানে আপনি আপনার নাম, কোথা থেকে আসছেন, কোথায় এবং কেন যাচ্ছেন- - এসব লেখা থাকবে। স্থানে স্থানে পুলিশের চেকপোস্ট বসেছে।  

যদি আপনাকে কোন উপযুক্ত কারণ ছাড়া বাইরে পাওয়া যায়, তাহলে আপনাকে ২০৬ ইউরো পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। আপনি যদি পূর্বে শনাক্ত হওয়া করোনাভাইরাসের পেশেন্ট হয়ে থাকেন,, তাহলে  আপনার ১ থেকে ১২ বছরের জেল হতে পারে হত্যার দায়ে।  

 

সবশেষে

আজকে মার্চের ১২ তারিখেই পরিস্থিতি এমন। মাথায় রাখুন যে এতকিছু হয়েছে কেবল ২ সপ্তাহের মধ্যে। স্টেজ ৩ থেকে ৬ তে আসতে লেগেছে ৫ দিন মাত্র। ইতালি, চীন এবং কোরিয়া ছাড়া বাকি বিশ্ব সবে শুরু করেছে অন্য সব স্টেজে যাওয়া। আপনার কোন ধারণাই নেই আপনাদের দিকে কী ধেয়ে আসছে। আমি জানি কারণ ২ সপ্তাহ আগে আমার কোন ধারণা ছিল না, এবং ভেবেছিলাম এত খারাপ অবস্থা হতেই পারে না। কিন্তু হয়েছে, এবং সেটা কেবল ভাইরাসের কারণে না, এর ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে।  

এটা আসছে না, বা এত আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি নয়- দেশগুলোর এমন অবস্থান দেখাও কষ্টকর। আপনি এই লেখা পড়ে থাকলে, দয়া করে দায়িত্বশীল আচরণ করুন। অবহেলা করলে এই সমস্যাটি মিটবে না। 

কেবল আমেরিকাতেই না জানি কত আক্রান্তরোগী আছে, যাদের শনাক্ত করা হয়নি! এই ব্যাপারটা ভয়াবহ এবং তাদের জন্য বড় বিপদ অপেক্ষা করছে তাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য। আমাদের সরকার একটা ভাল কাজ করেছে এটা বলতেই হবে। গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো খুবই কঠোর হলেও দরকারি ছিল। হয়ত এটাই ছিল রোগের প্রসারকে সীমিত করার উপায়। এটা চীনে কাজ করছে তাই আমরা আশা করি এটা আমাদের এখানেও কাজ করবে (এইসব স্টেপ এর মধ্যেই ভাল কাজ করছে প্রথমে কোয়ারেন্টিন করা কয়েকটা জায়গায়)।

তারা নানান পদক্ষেপ নিচ্ছে আমাদের মত নাগরিকদের রক্ষা করতে, যেমন আগামি মাসের জন্য মর্টগেজের পেমেন্ট স্থগিত রাখা, দোকান বন্ধ রাখা দোকানিদের জন্য সাহায্য, ইত্যাদি। আমি বুঝতে পারছি এসব সিদ্ধান্ত কিছু দেশে নেওয়া খুবই কঠিন- এবং হয়ত অসম্ভবও। এবং তার ফলাফল বৈশ্বিকভাবে কী হয় সেটা খুবি চিন্তাদায়ক।

আমি জানি না এই প্যান্ডেমিক আমাদের সমাজের জন্য একটা টারনিং পয়েন্ট হবে কিনা। আপনি যেখানে বসবাস করেন, সেখানে যদি আক্রান্ত রোগী পাওয়া যায়, তাহলে আপনারা হয়ত আমাদের ১-২ সপ্তাহ পেছনে আছেন। কিন্তু আপনারাও আমাদের অবস্থায় আসবে যথাসময়ে। দয়া করে যে কোন প্রতিরক্ষামূলক সিদ্ধান্ত নিন যা আপনি নিতে পারেন। এমন ভান করবেন না যে এটা আপনার নাগাল পাবে না।

৪৯১০ পঠিত ... ০০:২৫, মার্চ ২২, ২০২০

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top