'মোজার্ট অফ ম্যাথেমেটিক্স' শ্রীনিবাস রামানুজন সম্পর্কে আপনি যা নাও জানতে পারেন

৬৫৩ পঠিত ... ২১:০৯, ডিসেম্বর ২২, ২০১৯

 

জীবন যার গণিতময় 

এক দিন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ক্লাসে নিচ্ছিলেন। বলছিলেন, ‘যদি তিনটি কলা তিনজনের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়, প্রত্যেকে একটা করে কলা পাবে। এমনকি যদি, ১০০০টা কলা, ১০০০ জনের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয় তখনও প্রত্যেকে একটা করে কলা পাবে। অর্থাৎ কোনো সংখ্যাকে যদি ওই একই সংখ্যা দ্বারা ভাগ করা হয় ভাগশেষ সবসময়ই এক হবে।' 

ক্লাসের একটা শিশু হাত তুললো। জিজ্ঞেস করলো, যদি শূন্যকে শূন্য দিয়ে ভাগ করা হয়, তখনই কি ভাগশেষ এক হবে? শূন্যটি কলাকে যদি ‘কেউ না’ দিয়ে ভাগ করা হবে, প্রত্যেকে কি একটা করে কলা পাবে?’

এই ছোট শিশুটি ছিলেন পরবর্তীকালের প্রখ্যাত গণিতবিদ রামানুজন, মাত্র ১২ বছর বয়সে স্কুলের শিক্ষকদের কাছে যার পরিচয় ছিলো ‘শিশু গণিতবিদ’। 

 

অংকে অসামান্য হলেও ফেল করেছেন অন্য বিষয়গুলোতে

অংকে অসামান্য দক্ষতার জন্যে রামানুজনকে কুম্বাকোনাম-এর আর্ট কলেজে স্কলারশিপ দেয়া হয়। কলেজে গণিত নিয়ে বেশি মগ্ন থাকায় অন্য বিষয়গুলোতে মনোযোগ দিতেন না। ফলে  বাকি বিষয়গুলোতে ফেল করেন রামানুজম এবং তার স্কলারশিপ বাতিল করা হয়।

 

জীবনভর তীব্র দারিদ্র্যের মধ্যে কেটেছে রামানুজনের

সারাটা জীবন অর্থকষ্টের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। লেখার জন্যে যথেষ্ট কাগজ পর্যন্ত কেনার সামর্থ তার ছিলো না। ডেভিড লিভিটের ২০০৭ সালের জীবনী ভিত্তিক উপন্যাস ‘দি ইন্ডিয়ান ক্লার্ক' –এ রামানুজন ও তার এক বন্ধু সান্ডুর কথোপকথন-

সান্ডু: রামানজু, তারা তোমাকে জিনিয়াস বলে।

রামানুজন: কী!! আমি? জিনিয়াস? আমার কনুই দেখো, তাহলেই বুঝতে পারবে।

সান্ডু: কনুই-এ কী হয়েছে রামানজু? চামড়া ছিলে এতো কালচে হয়ে গেছে কেন?

রামানুজান: কনুই-এর চামড়া ছিলে গেছে, কালচে হয়ে গেছে আমার জিনিয়াস হতে গিয়ে। দিনরাত আমি স্লেটে ক্যালকুলেশন করি। একটা ন্যাকরা দিয়ে মুছে আবার করতে সময় লাগে বেশি। কয়েক মিনিট পর পরই আমি কনুই দিয়ে স্লেটটা মুছি।

সান্ডু: এতো ক্যালকুলেশন যেহেতু করতে হয় স্লেট কেন ব্যবহার করো? কাগজ কেন না?

রামানুজন: খাবারই যেখানে সমস্যা, কাগজ কেনার টাকা আমি কোথায় পাবো?  প্রতি মাসে আমার কত রিম কাগজ লাগবে তোমার কোন ধারনা আছে?  

 

রামানুজনের ক্যাম্ব্রিজের জীবন সুখের ছিলো না, এক পর্যায়ে আত্মহত্যা পর্যন্ত করতে চেয়েছিলেন  

লাজুক বলে ক্যাম্ব্রিজ ইউনিভার্সিটিতে রামানুজানকে প্রচুর মকারির শিকার হতে হয়েছিলো সহপাঠী ও শিক্ষকদের দ্বারা।  ইল্যান্ডের আবহাওয়ার সাথে মানিয়ে নিতে পারেন নি, তাছাড়া প্রডিজি রামানুজনের স্বাস্থ্যও ছোটবেলা থেকে খুব খারাপ ছিলো। এক পর্যায়ে ব্রিজের উপর দিয়ে ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যা করার চেষ্টাও করেছিলেন তিনি। পুলিশ হাতে নাতে ধরে ফেলে তাকে জেলে নিয়ে যাচ্ছিলো। তখন হার্ডি খবর পেয়ে সেখানে হস্তক্ষেপ করে। পুলিশের কাছে মিথ্যে বলে যে রামানুজন রয়্যাল সোসাইটির একজন ফেলো। এবং রয়্যাল সোসাইটির একজন ফেলোকে আপনি জেলে রাখতে পারেন না। অবশ্য কয়েক মাস পরে রামানুজন সত্যি সত্যি রয়্যাল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি ২য় ভারতীয় হিসেবে এই ফেলোশিপ পান।

 

রামানুজনকে নিয়ে সিনেমা

রামানুজন-হার্ডির কাহিনীর উপর ভিত্তি করে ম্যাথিউ ব্রাউন ২০১৬ সালে নির্মাণ করেন ‘দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি’ নামে সিনেমা। সিনেমাটিতে রামানুজনের চরিত্রে অভিনয় করেন স্লামডগ মিলিনিয়র মুভিখ্যাত দেব প্যাটেল।

 

বিখ্যাত হার্ডি-রামানুজন সংখ্যা

ইল্যান্ডে যাওয়ায় রামানুজনের স্বাস্থ্য ক্রমশ খারাপ হতে থাকে। এক সময় পাটনিতে হাসপাতালে ভর্তি হন রামানুজান। রামানুজনকে হাসপাতাল থেকে রিলিজের দিনে  হার্ডি তাকে দেখতে আসেন। হার্ডি ছিলেন প্রখ্যাত ম্যাথম্যাটিশিয়ান, রামানুজনের মেন্টর ও বন্ধ। তিনিইৎ রামানুজনকে ইংল্যান্ডে নিয়ে গিয়েছিলেন।

‘বাবা কী শীত!/আজকের রোদটা সুন্দর’ ধরণের আবহাওয়া বিষয়ক খুচরা কথা সাধারণত কনভার্সেশন স্টার্টার  হিসাবে বলা হয়। হার্ডি যেহেতু জানতেন রামানুজনের ধ্যান-জ্ঞান-কল্পনা সব গণিত কেন্দ্রিক, হার্ডি তাই ট্যাক্সি থেকে নেমে রামানুজনকে জানালো যে, হার্ডি যে ট্যাক্সিতে এসেছে সেটার নাম্বার ১৭২৯। বললো,  খুব সাদামাটা একটা সাধারণ সংখ্যা, তাই না?  

রামানুজন বললেন, মোটেই না। ১৭২৯ একটা খুবই অদ্ভুত সুন্দর নাম্বার। দুটি সংখ্যার  কিউবের যোগফল হিসেবে দুইভাবে প্রকাশ করা যায় এমন সংখ্যাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ছোট সংখ্যা ১৭২৯  

[ 1729 = 1³ + 12³ = 9³ + 10³]

এই ঘটনা গণিতের ইতিহাসে স্মরনীয় হয়ে আছে। সংখ্যাতত্ত্বে ১৭২৯ সংখ্যাটিকে বলা হয় হার্ডি-রামানুজন সংখ্যা।  

 

মাত্র ৩৩ বছর বয়সে অকাল মৃ্ত্যু  

রামানুজন  ছিলেন চাইল্ড প্রডিজি এবং ম্যাথমেটিক্যাল জিনিয়াস। উচ্চতর গণিত চর্চার মতো যথেষ্ট রিসোর্স না পেলেও অল্প বয়সেই রামানুজন গণিতে অসামান্য দক্ষতা দেখিয়েছেন। বেশিরভাগ চাইল্ড প্রডিজির মতো, রামানুজনও বেশি দিন বাঁচেননি। মৃত্যুর আগে তার যক্ষ্মা ধরা পড়েছিল। শরীরে ছিলো তীব্র ভিটামিনের ঘাটতি। পরবর্তীকালে মেডিকেল স্টাডিজ-এ মনে হয়েছে, তার আসলে হয়েছিলো হেপাটিক এ্যামিবিওসিস বা এ্যামিবিক ডিসেন্ট্রি। নিষ্ঠাবান নিরামিষাশী ব্রাহ্মণ রামানুজন অনেকের বিশ্বাস ইল্যান্ডের আবহাওয়ার সাথে খাপ খাওয়াতে না পারার জন্যেই তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটেছিলো। আবার কোনো কোনো গবেষকের ধারণা, রামানুজন বংশগতভাবেই দূর্বল স্বাস্থ্যের ছিলেন। যা হোক, মাত্র ৩৩ বছর বয়সে ১৯২০ সালের ২০ এপ্রিল মারা যান এই ম্যাথমেটিক্যাল জিনিয়াস। যদিও তার সংক্ষিপ্ত জীবনে গণিতে তার যুগান্তকারী সব অবদানের জন্যে পরবর্তীতে তাকে অনেকে বলেছে, ‘গণিতের মোৎজার্ট’। তাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তার জন্মদিন ২২ ডিসেম্বরকে ভারতে ‘জাতীয় গণিত দিবস’ হিসেবে উদযাপন করা হয়।

৬৫৩ পঠিত ... ২১:০৯, ডিসেম্বর ২২, ২০১৯

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top