সংসারী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় অথবা বাংলায় করুণ লেখক-জীবন

২৭৩ পঠিত ... ১৭:০৯, ডিসেম্বর ০৩, ২০১৯

কলেজে পড়া কয়েকজন তরুণ মাঝেমাঝেই সাহিত্যের পাঠচক্রের আয়োজন করে। সেখানে কখনও আমন্ত্রণ করা হয় নামীদামি লেখকদের। একবার তারা ভাবলো, সে সময়ে বাংলা সাহিত্যের ময়দান কাপিয়ে বেড়ানো মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে আমন্ত্রণ জানাবে।

সমস্যা দাড়ালো, কে যাবে মানিককে বলতে? শেষ পর্যন্ত দায়িত্বটা পড়লো এক তরুণের ঘাড়ে।

তার মাথায় নানান ভাবনা। অত বড় সাহিত্যিকের বাড়িঘর কেমন? তার সঙ্গে কীভাবে কথা বলবে?

তরুণটি চলে গেলো মানিকের তখনকার বরানগরের বাড়িতে। গিয়ে অবাক। এতো বড় সাহিত্যের এতো ছোট বাসা। দরজায় কড়া নাড়লে, দরজা খুললেন একজন মহিলা।

; মানিক বন্দোপাধ্যায় কি আছেন?

: বাজারে গেছেন।

লেখক আবার বাজারও করে! বিস্মিত সেই তরুণ।

: কিছু বলবেন?

: না, আমি এই মাঠটায় একটু ঘুরে বেড়াই। উনি ফিরলে কথা বলছি তাহলে। 

দরজা আবার বন্ধ হয়ে গেল। প্রায় আধঘণ্টা মাঠে চক্কর দেওয়ার পর সে দেখল, একজন লম্বা কালোপানা মানুষ লুঙ্গি আর ফতুয়া পরে, দুই হাতে দুই থলে নিয়ে ওই বাড়ির দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন।

ইনিই মানিকবাবু নাকি? গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে এল সে-ও।

মানিক তাকে আড়চোখে দেখে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, 'আপনি কি আমার জন্য অপেক্ষা করছেন?'

: হ্যাঁ।

: আসুন ভেতরে। আমি বাজারটা রেখে দিয়ে আসছি,’ বলে মানিক চলে গেলেন ভেতরের ঘরে।

সামনের যে ঘরের চৌকিতে ছেলেটি বসল। চারদিকে তাকিয়ে দেখল ঘরে ওই চৌকি ছাড়া আছে একটা নড়বড়ে টেবিল। ব্যস, আর কিছুই নেই!। এমনকি টেবিলের ওপরেও কোনও বইখাতা রাখা নেই।

মানিক ভেতরের ঘর থেকে ফিরে এসে বললেন, 'বলুন কী চান? গল্প? পত্রিকা করেন বুঝি?'

কী ভাবে কথা শুরু করবে বুঝে পাচ্ছে না সেই যুবক।

মানিক তার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'কী ভাবছেন? ভাবছেন যে একজন লেখকের ঘর এমন ফাঁকা কেন? আপনারা পাঠকেরা কিছু দেন না সেইজন্য ফাঁকা। ভাবছেন যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে হাতে বাজার করেন কেন?'

ছেলেটি হতবাক। ঠিক এই কথাগুলোই তো ভাবছিল। মানিক জানলেন কী করে!

মানিকই উত্তর দিলেন, 'না করে আর উপায় কী বলুন। লিখবার সময় পেতে হলে এসবের জন্য যে কোনও ঝি-চাকর রাখব, সে-রকম টাকা কে দেবে আমাকে? দেন কি আপনারা? পড়েন কি কেউ আমার লেখা? আপনি যে এসেছেন এখানে? আমার কোনও লেখা কি পড়েছেন?'

অমন কথা শুনে মনে মনে বেজায় অপমানিত হল যুবক। কী বলছেন উনি? মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা পড়িনি! মুখে বলল, ‘পড়েছি অনেক।'

'তাতে কী সুবিধে হল? কোনও বই কিনেছেন?' চাঁচাছোলা গলায় ফের প্রশ্ন করলেন মানিক।

: না, কিনে পড়িনি, সবই এর ওর কাছ থেকে চেয়ে কিংবা লাইব্রেরি থেকে। কলেজ ছাত্রদের অত বই কেনার টাকা কোথায়?

: তবে! পাঠকেরা কেউ বই কিনবেন না, প্রকাশক বলবেন বই বিক্রি হয় না, টাকাটা আসবে কোথা থেকে? লেখকের ঘরটাও তাই এমনই থাকবে। দুঃখ পেলে চলবে কেন?

মানিকের কথায় মাথা নিচু করল সেই তরুণ ছেলেটি।

ঠিক তখনই মানিক দরাজ গলায় বলে উঠলেন, 'বলুন এবার কী জন্য এসেছেন? গল্প চাই একটা?'

এ বার নিজের নাম পরিচয় দিয়ে পাঠচক্রের কথা জানাল সে। মনে মনে প্রস্তুতই হয়ে গিয়েছিল যে এই আমন্ত্রণে মানিক সাড়া দেবেন না।

কিন্তু তাকে একেবারে চমকে দিয়ে মানিক বললেন, 'ঠিক আছে যাব। কোথায় কবে কখন সব লিখে দিয়ে যান চিরকুটে।'

এ বার আনন্দে উচ্ছ্বসিত তরুণ বলল, আমরা এসে নিয়ে যাব আপনাকে।

কিন্তু অবাক হওয়ার আরও কিছু বাকি ছিল তার। মানিক বললেন, 'কিচ্ছু দরকার নেই। আপনারা পয়সা পাবেন কোথায়? যেতে পারব একাই। পথনির্দেশটা শুধু রেখে যান।'

তারপর আরও দু-চারকথা সেরে লেখকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল সেই কলেজ পড়ুয়া যুবক।

ফেরার সময় বাসভাড়াটুকু পকেটে থাকলেও আর বাসে চাপতে ইচ্ছে হল না তার। শরীর আনন্দে যেন পালকের মতো হালকা হয়ে গেছে। ওই বরানগর থেকে হাঁটতে হাঁটতেই কলেজস্ট্রিট, সেখান থেকে বউবাজারে বন্ধুর বাড়ি গিয়ে তারপর কলেজ।

বন্ধুদের হইহই করে জানাল সেই বিজয়বার্তা। সেদিনের সেই উনিশ বছরের তরুণের নাম শঙ্খ ঘোষ।

[ঋণস্বীকার: শঙ্খ ঘোষের বই ‘জীবনের জলছবি’]

২৭৩ পঠিত ... ১৭:০৯, ডিসেম্বর ০৩, ২০১৯

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top